SCORE

Breaking News

মতামতঃ শুধুই বিশ্বসেরা, নাকি সর্বকালের অন্যতম সেরা?

Share Button

রেকর্ড কী? এই প্রশ্নের উত্তরে কেউ যদি লিখে ফেলেন- ‘যাতে সাকিব আজকে ভাগ বসিয়েছেন অথবা যাতে তিনি আগামীকাল ভাগ বসাবেন!’ তাহলে কি খুব একটা ভুল বলা হবে? এমনকি ‘তিনি রেকর্ডের পিছনে ছুটেন না রেকর্ড তার পিছনে ছুটে’- তা নিয়েও বিতর্ক হতে পারে বিস্তর।

ইদানীং তার মাঠে নামা মানেই যে নতুন নতুন রেকর্ডের জন্ম নেওয়া! ছুটে চলেছেন সাকিব এবং কাকতালীয়ভাবে ছুটে চলাটা ক্রিকেট ইতিহাসের অক্ষত থাকা রেকর্ডগুলো লক্ষ্য করে। আর তার পিছন পিছন ছুটছে ক্রিকেট পাগল জাতিটার স্বপ্ন, আশা আর আকাঙ্ক্ষার জাহাজ।

Also Read - রেকর্ডের কথা জানতেনই না তাইজুল!

কিন্তু এই ছুটে চলার ব্যস্ততায় আমাদের অনেকটাই অগোচরে থেকে যাচ্ছে যে, সাকিব আল হাসানকে আর বর্তমানের গন্ডিতে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। বর্তমানের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আজ ইতিহাসের! বিশ্বসেরার তকমা গায়ে জড়িয়ে তিনি আছেন এখন সর্বকালের সেরা হওয়ার দৌড়ে! সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া প্রথম টেস্ট ম্যাচকে ধরা যায় সেই যাত্রার সুচনা হিসেবে। আসুন দেখে নেই সুপারম্যান খ্যাত সাকিব আল হাসানের এই ম্যাচে যত অর্জন-

  • ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে দ্বিতীয়বারের মত একই টেস্টে ১০ উইকেট ও ৮০+ রানের ইনিংস খেললেন সাকিব।
  • মুত্তিয়া মুরালিধরন, ডেল স্টেইন ও রঙ্গনা হেরাথের পর ৪র্থ বোলার হিসেবে ৯টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার সার্কেল পূর্ণ করলেন তিনি। তবে সব টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে ৫ উইকেট নেওয়ার দৌড়ে সাকিবই দ্রুততম।
  • একই টেস্টে হাফসেঞ্চুরি ও ৫ উইকেট এই নিয়ে ৮ম বারের মত নিলেন সাকিব। এই অলরাউন্ডার তালিকায় সাকিবের সামনে আছেন কেবল স্যার ইয়ান বোথাম। ১০২ টেস্টে তার আছে ১১ বার এই কীর্তি গড়ার কৃতিত্ব। ৬ বার করে দেখিয়েছেন স্যার রিচার্ড হ্যাডলি। রবিচন্দ্রন অশ্বিন ৫ বার।
  • এই নিয়ে ১৭ বারের মত কোনো ইনিংসে ৫ উইকেট স্বীকার করলেন সাকিব। বাঁহাতি স্পিনারদের মধ্যে তার সামনে আছেন এখন শুধু ডেরেক আন্ডারউড (১৭), ড্যানিয়েল ভেট্টোরি (২০) ও রঙ্গনা হেরাথ (৩১)।

উপরের পরিসংখ্যান গুলোতে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিন। একবার চিন্তা করে দেখুন তো- সাকিব নিজেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন দিনের পর দিন? বাবা ফুটবলার হওয়ার সুবাদে চেয়েছিলেন ছেলেও ফুটবলার হোক। ফুটবলকে করুক ধ্যান-জ্ঞান! কিন্তু যে ছেলের জন্ম হয়েছে ক্রিকেট খেলার জন্য, আরও স্পেসিফিকেলি বললে বলতে হয় যে ছেলেকে সৃষ্টিকর্তা তৈরিই করেছেন ক্রিকেট-বিশ্বকে শাসন করার জন্য; তাকে কি ফুটবল মাঠে মানায়? আর তাইতো, ‘ক্রিকেটের সাকিব’ ক্রিকেট খেলে ক্রিকেটকে করেছেন ধন্য! জিম্বাবুয়ের সাথে অভিষেক ম্যাচে ৩৯ রান দিয়ে ১ উইকেট আর ব্যাট হাতে অপরাজিত ৩০ রান দিয়ে শুরু। এরপর থেকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি ছেলেটিকে। আমরা শুধু ক্যানভাস সামনে এগিয়ে দিয়েছি, আর তাতে দক্ষ শিল্পীর মতো তুলির আঁচড় দিয়ে গেছেন সাকিব আল হাসান নিজেই।

প্রথমে শুধু ব্যাটিং আর সাথে টুকটাক বোলিং- এই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সাকিব হয়ে গেলেন দলের অপরিহার্য অংশ। আমাদের সাকিব ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বিশ্বের সাকিব আল হাসান। ২২ জানুয়ারি ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো দখল করলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের আসন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে সাকিব দখল করে নেন ওয়ানডে, টেস্ট, টি-২০ তিন ফরম্যাটেরই শীর্ষ স্থান, যা ছিল ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র! টানা আট বছর সেই স্থান ধরে রেখে সাকিব জানিয়ে দিয়েছেন- অলরাউন্ডার হিসেবে বর্তমান সময়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বললেই চলে!

এবার তাহলে চোখ বোলাতে হয় সর্বকালের শ্রেষ্ঠদের তালিকায়! আসুন, করে ফেলি সর্বকালের সেরাদের সাথে সাকিবের ক্যারিয়ারের তুলনা…

  • কপিল দেব বনাম সাকিবঃ ভারতের অলরাউন্ডার, বিশ্বকাপজয়ী সফল অধিনায়ক কপিল দেব ২২৫ ওয়ানডেতে করেছেন ৩৭৮৩ রান। আর সাকিব ১৭৭ ম্যাচেই করে ফেলেছেন ৪৯৮৩ রান! কপিলের আছে ২৫৩ উইকেট আর সাকিবের ২২৪ টি! কাজেই বোঝা যাচ্ছে, উইকেটের হিসেবে কপিলকে পিছনে ফেলাও শুধু সময়ের ব্যাপার। টেস্টে ১৩১ টেস্টে রান সংখ্যা ৫২৪৮ রান আর ৪৩৪ উইকেট! আর ৫০ টেস্টে সাকিবের রান ৩৫৬৮, এভারেজ ৪১.০০ ! কাজেই বলাই যায় কপিলের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছেন সাকিব। ম্যাচ খেলার সুযোগ কম পাওয়ায় বোলিং এর বিচারে হয়তো কপিলের চেয়ে একটু পিছিয়ে থাকবেন তিনি। কিন্তু অলরাউন্ডার হিসেবে এগিয়ে থাকবেন যোজন যোজন।
  • ইমরান খান বনাম সাকিবঃ পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খান ১৭৫ ওয়ানডেতে করেছেন ৩৭০৯ রান, সাথে আছে ১৮২ উইকেট। কাজেই, ১৭৭ ম্যাচ খেলা সাকিব তার চেয়ে এগিয়ে স্পষ্টভাবে। ৮৮ টেস্টে করেছেন ৩৮০৭ রান, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে যা সাকিব সহজেই টপকে যাবেন। নিয়েছেন ৩৬২ উইকেট। আবারো বলতে হয়, টেস্টে বোলিংয়ের দিক থেকে কিছুটা এগিয়ে থাকা সাকিব পরিপূর্ণ অলরাউন্ডার হিসেবেও ঢের এগিয়ে।
  • ফ্লিনটফ বনাম সাকিবঃ ১৪১ ওয়ানডেতে এন্ড্রু ফ্লিনটফ করেছেন ৩৩৯৪ রান এবং শিকার করেছেন ১৬৯ উইকেট। ৭৯ টেস্টে আছে ৩৮৪৫ রান এবং ২২৬ উইকেট! কাজেই এক্ষেত্রে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন!
  • শহীদ আফ্রিদি বনাম সাকিবঃ পাকিস্তানের এই খেলোয়াড়ের ওয়ানডে গড় মাত্র ২৩! উইকেট ৩৯৮ ম্যাচে ৩৯৫। ২৭ টেস্টে ১৭১৬ রান এবং ৪৮ উইকেট! তার সাথে সাকিবের সাথে তুলনা করা আসলে বোকামি!
  • ইয়ান বোথাম বনাম সাকিব আল হাসানঃ বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম কিংবদন্তী এই ক্রিকেটার ১০২ টেস্টে করেছেন ৫২০০ রান, পকেটে পুড়েছেন ৩৮৩ উইকেট। ১১৬টি একদিনের ম্যাচে তার রান ও উইকেট সংখ্যা যথাক্রমে ২১১৩ ও ১৪৫।
  • ক্যালিস ভার্সেস সাকিবঃ বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে পরিপূর্ণ অলরাউন্ডার। সত্যিকারের অলরাউন্ডার, সকল স্ট্যাটিকটিক্স বিচারে সাকিবের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ওয়ানডেতে ১১৫৭৯ রান-২৭৩ উইকেট কিংবা টেস্টে ১৩২৮৯ রান এবং ২৯২ উইকেট প্রমাণ করে তার পাশে যেতে হলে সাকিবকে আরও অনেকটা পথ পারি দিতে হবে। যা নিঃসন্দেহে অনেক কষ্টকর, তবে অসম্ভব নয়।

যেভাবে ছুটছেন সাকিব, তাতে আশা করাই যায় যে তাকেও পিছনে ফেলে সাকিব হয়ে যাবেন সর্বকালের সেরা। তখনও হয়তো সেরা ব্যাটসম্যান নিয়ে বিতর্ক থাকবে, বিতর্ক থাকবে সেরা বোলার নিয়েও! তবে যখনই সেরা অলরাউন্ডার এর হিসাব আসবে, তখন বিশ্ববাসী অকপটে স্বীকার করবে ‘সাকিব আল হাসান, দা বেস্ট অলরাউন্ডার এভার!’

– নাদের চৌধুরী, প্রতিবেদক, বিডিক্রিকটাইম 

Related Articles

সাকিবের ক্যারিয়ারের সেরা রেটিং