SCORE

Trending Now

মাশরাফির নৈপুণ্যে ভাস্বর ৯ অক্টোবর

Share Button

তাকে বাংলাদেশের ক্রিকেট পাগল মানুষ নানা অভিধায় ভূষিত করেছে। আদতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নবজাগরণ ঘটেছে তার হাত ধরেই। ক্রিকেটের বহু রূপকথার নায়ক তিনি। ক্রিকেট মাঠের লড়াকু নেতা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের লিজেন্ড! তিনি আর কেউ নন সবার প্রিয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের মহানায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দলকে এনে দিয়েছেন দুর্দান্ত কিছু জয়। তার মধ্যে ইতিহাসের আজকের এই দিনে দুটি স্মরণীয় জয় এসেছিল তাঁর হাত ধরে। চলুন সেই স্মৃতিচারণ করা যাক। [আরও পড়ুন: নেতৃত্ব ছাড়ছেন না মুশফিকুর রহিম]

২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে উইকেট নেওয়ার পর মাশরাফির উল্লাস
২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একটি উইকেট নেওয়ার পর মাশরাফির উল্লাস

২০০৮ সালের ৯ অক্টোবরে ঢাকায় নিউজিল্যান্ড কে প্রথমবারের মত ওয়ানডেতে পরাজিত করে বাংলাদেশ। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা নিউজিল্যান্ড দলকে নিজেদের মাটিতে হারানোর আনন্দে ভাসে পুরো বাংলাদেশ। তরুণ বাংলদেশ দলটির অধিনায়ক ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরি করার রেকর্ডের অধিকারী মোহাম্মদ আশরাফুল।

প্রথমে ফিল্ডিং করতে নামা দলটির বোলিং ভরসা তখন ওয়ানডে দলের বর্তমান অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। তার দুর্দান্ত সুইংয়ে কিউই ব্যাটসম্যানদের পরাস্ত হতে দেখা দর্শকদের চোখে প্রশান্তি এনে দেওয়ার মতো ছিল। দলীয় অষ্টম ও ব্যক্তিগত চতুর্থ ওভারের শেষ বলে বিধ্বংসী কিইউ ওপেনার ব্র্যান্ডন ম্যাককালাম বল তুলে দেন সৈয়দ রাসেলের হাতে।বল  তালুবন্দি করেন তিনি আর এর সাথে দলের প্রথম উইকেট প্রাপ্তি নিশ্চিত করেন। অফ স্ট্যাম্পের অনেকটা বাইরের বল ম্যাককালাম(১৪) তুলে মারতে গিয়ে থার্ডম্যানে থাকা রাসেলের হাতে ক্যাচ দেন। পরের উইকেটটিও মাশরাফির শিকার। আরেক কিউই ওপেনার জেসি রাইডার(৩৪) মাশরাফির শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন। মিড উইকেটে থাকা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের নিরাপদ তালুতে বন্দী হয় বল।

Also Read - 'আমার অধিনায়ক মুশফিকই'

মাশরাফির সাথে আলাপচারিতায় মোহাম্মাদ আশরাফুল
ম্যাচের সময় মাশরাফির সাথে আলাপচারিতায় মোহাম্মাদ আশরাফুল

৫৫ রানে ২ উইকেট থেকে দ্রুতই আরেকটি উইকেটের (রস টেইলর) পতন ঘটে। এবার শাহাদাত হোসেনের বলে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেন আশরাফুল। ৫৯ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে তখন ধুঁকছে কিউইরা। ধুঁকতে থাকা দলটিকে দলীয় ৬৪ রানের মাথায় আরেকটি বড় ধাক্কা দেন মাশরাফি। তার উইকেট টু উইকেট বলের ফাঁদে পড়ে এলবিডব্লিউর শিকার এবার জ্যামি হাউ(৭)। স্কোর বোর্ডে আর এক রান যোগ করেই আব্দুর রাজ্জাকের এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে বিদায় ঘটে স্কট স্টাইরিসের(৪)। ৭৯ রানের মাথায় আবার রাজ্জাক ঝলক। এবার তার নিরীহ দর্শন বলে রিয়াদের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হয়ে ফিরেন ড্যানিয়েন ফ্লিন(৬)।

২২তম ওভারের মাথায় ইনজুরি জর্জরিত মাশরাফির হাঁটুতে ব্যথা শুরু হয়। রাজ্জাকের বলে বাউন্ডারি আটকাতে গিয়ে বাউন্ডারি লাইনে থাকা রোলারের সাথে আঘাত লেগে হাঁটুতে ব্যথা নিয়ে কাতরাতে থাকেন ‘ম্যাশ’। এই হাঁটু ততদিনে কয়েকবার সার্জনের ছুরির আঘাতে জর্জরিত। দর্শকদের উৎকণ্ঠা! তিনি বোলিং শেষ করতে পারবেন তো? ফিরেছিলেন তিনি। তবে তার বোলিং অবর্তমানে কিউই অলরাউন্ডার জেকব ওরাম ও কিউই অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেট্টোরি রানের চাকা সচল রাখেন।

৪১তম ওভারের প্রথম বলেই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের বলে ওই ম্যাচে অভিষিক্ত নাঈম ইসলামের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে বিদায় নেন ভেট্টোরি(৩০)। তার বিদায়ের পরও রান এগিয়ে নিয়ে যান ওরাম ও কাইল মিলস জুটি। আগ্রাসী ব্যাটিং করতে থাকা ওরামকে(৫৭) রাসেলের ক্যাচে পরিণত করেন আব্দুর রাজ্জাক। নিজের ৯ম ওভারে আক্রমণে এসে বিশাল ছক্কা হজম করেন মাশরাফি। কিন্তু ওই ওভারের চতুর্থ বলেই মিলস (১৬) শাহাদাতের ক্যাচে প্যাভিলয়নের পথ ধরেন। শেষ পর্যন্ত ৫০ ওভার শেষে ৯ উইকেট হারিয়ে ২০১ রানে থামে কিউইদের ইনিংস। বাংলাদেশের হয়ে ওই ম্যাচে সেরা বোলার মাশরাফি। ১০ ওভার শেষে ৪৪ রান দিয়ে ৪ উইকেট তুলে নেন তিনি, যার তিনটিই তিন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানের। ৩৩ রান খরচে তিন উইকেট তুলে নেন আব্দুর রাজ্জাক।

২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের মুহূর্ত
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের মুহূর্ত

 মাঝারি টার্গেট পেরোতে ধীরস্থিরভাবে শুরু করে টাইগাররা। ওপেনার তামিম ইকবাল দলীয় ১৮ রানের মাথায় বিদায় নিলে হাল ধরেন জুনায়েদ সিদ্দিকি ও মুশফিকুর রহিম। দলীয় ৮৫ রানের মাথায় মুশফিকের(৩০) বিদায় ঘটলেও অধিনায়ক আশরাফুলের ৬০ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস আর জুনায়েদের (৮৫) ধীরস্থির ব্যাটিংয়ে ভর করে কিউইদের প্রথমবারের মতো হারানোর স্বাদ পায় বাংলাদেশ। ৪৫.৩ বলে ৭ উইকেট হাতে রেখে এই জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অনন্য সংযোজন। ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন জুনায়েদ সিদ্দিকি।

পরবর্তীতে নিউজিল্যান্ডকে ‘বাংলাওয়াশ’ এর শিকার বানিয়েছিল টাইগাররা। তবে প্রথম জয়ের স্বাদ সবসময় অতুলনীয়। আর এই জয়ের পিছনে বল হাতে দুর্দান্ত মাশরাফির ভূমিকা ছিল মুখ্য। শক্তিশালী কিউই ব্যাটিং লাইনআপের টপ অর্ডার ধসিয়ে দিয়ে আসল কাজটা তিনিই করেছিলেন। যদিও ম্যান অব দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত হয়েছিলেন জুনায়েদ সিদ্দিকি। কিন্তু ম্যাচটি মানুষ মনে রাখবে দুর্দান্ত সুইং আর ইনজুরির কাছে মাশরাফি নামক এক তরুণের হার না মানা পারফরম্যান্সের কারণে।

ক্রিকেট ইতিহাসের এই দিনে আরও একটি স্মরণীয় জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। ক্রিকেট দুনিয়ার কুলীন সদস্য ইংল্যান্ডকে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর সিরিজ বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ৩৪ রানে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ। এই ম্যাচে অধিনায়ক মাশরাফির দুর্দান্ত নৈপুণ্যে জয় পায় টাইগাররা।

সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলকে জেতান মাশরাফি
সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২য় ওয়ানডেতে দলকে জেতান মাশরাফি

টসে হেরে প্রথমে ব্যাটিং করে ২৩৮ রান করে মাশরাফি বাহিনী। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের ১৩৩ বলে ৭৫ রান আর মাশরাফির ৩৭ বলে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে ৪৪ রানের উপর ভর করে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৩৮ রানের মাঝারি সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহর সাথে মোসাদ্দেক দুইজনের জুটি ৪০ ওভারের আগেই ১৫০ রান করে। তাঁর পর এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে বিদায় নেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তাঁর পরের ওভারের বিদায় নেন মোসাদ্দেকও।

এরপর নাসির হোসেনকে নিয়ে ব্যাটিং তাণ্ডব চালান মাশরাফি। মাশরাফির ইনিংসটি ২ চার আর ৩ টি ছক্কায় সাজানো। তবে এই মাঝারি সংগ্রহকে পুঁজি করেই দুর্দান্ত বোলিং করেন বাংলাদেশী বোলররা। শুরু থেকেই দাপটের সাথে বোলিং করতে থাকেন মাশরাফি ও সাকিব। চার ওভারের মাথায় মাশরাফির বোলিংয়ে মোসাদ্দেক হোসেনের হাতে বল তালুবন্দি হলে ফিরে যান জেমস ভিন্স। এর পরের ওভারে সাকিবের বলে বোল্ড হন বেন ডাকেট। এরপর ৮ ওভারের মাথায় আবারো আঘাত হানেন মাশরাফি। জেসন রয়কে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে সাজ ঘরে পাঠান মাশরাফি। এরপর বেন স্টোকসকে শূন্য হাতে বোল্ড করে ফেরান মাশরাফি। তখন ধুঁকছে ইংলিশরা।

২য় ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশের উল্লাস
২য় ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশের উল্লাস

খানিক বাদে রান নিতে হিমশিম খেতে থাকা জনি বেয়ারস্টো(৮৭ বলে ৩৫ রান ) তাসকিন আহমেদের বলে উইকেট কিপার মুশফিকের হাতে ক্যাচ তুলে দেন। মঈন আলীকে দ্রুত বিদায় করে দেন নাসির হোসেন। সাকিবের দারুণ ক্যাচে বিদায় ঘটে তার। এরপর ইংলিশ অধিনায়ক বাটলারকে(৮৪ বলে ৫৭) এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে বিদায় করে দেন তাসকিন আহমেদ। এরপর আবার তাসকিনের বলে ক্রিস ওকস মুশফিকের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে বিদায় নিলে, ইংলিশদের গুটিয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার হয়ে পড়ে। ডেভিড উইলিকে মোসাদ্দেক এলবিডব্লিউ আউট করে দেওয়ার পর আদিল রশিদ (৩৩”) ও জ্যাক বল (২৮) কিছুটা চেষ্টা করেন।

কিন্তু শেষ আঘাত নিয়ে হাজির হন মাশরাফি। তার বলে নাসিরের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন বল। ২০৪ রানে অলআউট হয় ইংলিশরা। ৮.৪ ওভারে ২৯ রান দিয়ে ৪ উইকেট তুলে নিয়ে আর ব্যাটিংয়ে ৪৪ রান সব মিলিয়ে ম্যাচের নায়ক মাশরাফি। ম্যান অব দ্যা ম্যাচ মাশরাফি। ইংলিশদের এমন লজ্জাজনক হার উপহার দেওয়ার এই ঐতিহাসিক ম্যাচটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। এই সিরিজের প্রথম ম্যাচে হেরে গিয়ে ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দলপতি মাশরাফিতে সওয়ার হয়ে পরের ম্যাচেই দুর্দান্ত জয়ে সিরিজে সমতা আনে টাইগাররা।

-মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেলো অস্ট্রেলিয়া

অ্যাশেজে লড়াই চলছে সমানে-সমানে

জয় দিয়েই অ্যাশেজ শুরু অস্ট্রেলিয়ার

ভোরে শুরু হচ্ছে ‘অ্যাশেজ সিরিজ’

ইংল্যান্ডের নতুন বোলিং কোচ সিলভারউড