SCORE

Trending Now

মুশফিককে সরিয়ে দেওয়াই কি সমাধান?

Share Button

অনুমিতভাবেই প্রোটিয়াদের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে বিশাল ব্যবধানে হেরেছে টাইগাররা। আগের টেস্টের মতোই এবারও অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। তবে এই টেস্টে হারের চেয়েও বেশি আলোচিত বিষয় সম্ভবত মুশফিকের অধিনায়কত্ব। পরপর দুই টেস্টে তার টস জয়ের পর ফিল্ডিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত খেলার উপর বেশ বড় প্রভাব ফেলেছে সন্দেহ নেই। তাছাড়া বোলারদের ঠিকভাবে ব্যবহার বা তাদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার বিষয়টাও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সব মিলিয়ে হারের দায়টা যেন মুশফিকের একারই। তাকে সরিয়ে দেওয়াই শ্রেয় মনে হচ্ছে অনেকের কাছে। কিন্তু আসলেই কি সেটা সঠিক সিদ্ধান্ত?

প্রথমেই দেখা যাক, অধিনায়ক মুশফিকের ভুলগুলো ঠিক কি ছিল। টসে জিতে ফিল্ডিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত দুই টেস্টেই ভাগ্য গড়ে দিতে সাহায্য করেছে। আর এর ফলে দুই টেস্টেই প্রথম ইনিংসে বিশাল স্কোর গড়েছে প্রোটিয়ারা। প্রথম টেস্টে তবু বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকার ৪৯৬ রানের জবাবে তিনশোর্ধ্ব রান করে ফলোঅন এড়িয়েছিল। কিন্তু পরের ইনিংসে মাত্র ৯০ রানে অলআউট হয়ে ৩৩৩ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে যায়। ওই টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে মাত্র ৩২.৪ ওভার খেলতে পেরেছে বাংলাদেশ। ৪১ রানে শেষ ৮ উইকেট হারিয়েছে মুশফিকের দল। প্রোটিয়াদের সেরা বোলার মরনে মরকেলের ইনজুরি সত্ত্বেও ম্যাচ বাঁচানোর ধারে কাছে যেতে পারল না বাংলাদেশ। সবচেয়ে বড় ভরসা মুশফিকুর রহিম ফেরেন সবার আগে। আগের দিন ১৬ রান করা অধিনায়ক কোনো রান যোগ করতে পারেননি। মুশফিকের ব্যর্থতার পাশাপাশি দলের সেরা ব্যাটসম্যানদের স্কোর তামিম ০, ইমরুল ৩২, মুমিনুল ০, মাহমুদউল্লাহ ৯, লিটন ৪, সাব্বির ৪। তাহলে ব্যাটিং ব্যর্থতার দায় কার? প্রথম ইনিংসে যে দলটি ৩২০ রান করলো, সেই দলটি কিনা পরের ইনিংসে তাসের ঘরের মতো ঝড়ে পড়লো। আবার বোলিংয়ের দিকে দেখলে দেখা যাবে, প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের সেরা বোলার শফিউল ইসলাম। ৭৪ রানে ১ উইকেট। বাকিদের কথা বলার মতো না। আর দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিংয়ে সফল ব্যাটসম্যান কাম পার্টটাইম স্পিনার মুমিনুল (২৭/৩)। দলের বাকি বোলারদের কথা ঠিক বলার মতো না। দলে মুস্তাফিজ, শফিউল,তাসকিন, মিরাজের মতো বোলাররা উইকেট ফেলতে ব্যর্থ। অনেক আশার ‘ফিজ’ পুরো মাত্রায় ব্যর্থ। কিছু সময় ঝলক দেখিয়ে নিভে গেছেন বাকিরাও। এখানে মুশফিকের দায় কি একা?

Also Read - মুশফিককে সরানোর পক্ষে নন বুলবুল

এবার দ্বিতীয় টেস্ট। এখানেও যথারীতি টসে জিতে ফিল্ডিং নিয়ে আলোচনার জন্ম দিলেন মুশফিক। ফলাফল আগের ম্যাচের চেয়েও বড় ব্যর্থতা। এবার প্রোটিয়ারা মাত্র ৪ উইকেট হারিয়ে ৫৭৩ রানের বিশাল স্কোর গড়ে ইনিংস ঘোষণা দেয়। সেঞ্চুরি করেন দলটির চার ব্যাটসম্যান। এমন ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিরল। আবারও দলের বোলারদের নির্বিষ বোলিং। এক শুভাশিস রায়ের ৩ উইকেট প্রাপ্তি আর রুবেলের ১ উইকেট। দলের সেরা বোলার মুস্তাফিজ এদিন ক্যারিয়ারে প্রথম ১০০ রানের বেশি দিয়ে উইকেট শূন্য। তার সাথে রান দেওয়ার সেঞ্চুরিতে সামিল শুভাশিস, রুবেল আর তাইজুলও। জবাবে লিটন দাসের প্রতিরোধ (৭৭ বলে ৭০) সত্ত্বেও মাত্র ১৪৭ রানে শেষ বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস। বাকি সব ব্যাটসম্যানই ব্যর্থ। ফলোঅন করতে নেমে ইমরুল কায়েস (৩২) আর মাহমুদুল্লাহ (৪৩) বাদে বাকিদের বাজে ব্যাটিংয়ে মাত্র ১৭২ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস। ফলাফল ইনিংস এবং ২৫৪ রানের বিশাল পরাজয়।

টস জয়ের পর সিদ্ধান্ত কি হবে বা মাঠের সিদ্ধান্ত কি হবে তা অধিনায়কের উপর নির্ভর করে। কিন্তু টিম ম্যানেজমেন্টের ভূমিকা তাহলে কি? কোচদের কাজই বা কি? ম্যাচ শুরুর আগে প্রত্যেক দলের নিজস্ব কিছু পরিকল্পনা থাকে। অধিনায়ক সেই পরিকল্পনা মাঠে বাস্তবায়ন করেন। আদতে মাঠে মুশফিকের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি কি করবেন। যার ফলে ম্যাচ শেষে নিজের হতাশা তিনি সামলে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। করেছেন একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য। ৬ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে এসে হতাশা প্রকাশ করে মুশফিক বলেছিলেন, “আমার তো মনে হচ্ছে, টসে জেতাটাই ভুল হয়ে গেছে ভাই! শেষ দুইটা ম্যাচে যা হচ্ছে, জীবনে কখনও এমন হয়নি- মনে হচ্ছে টস হারলেই ভালো হয়।”

এই মন্তব্যের পর সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। তিনি দলের বোলারদেরও ধুয়ে দিয়েছিলেন। কার্যত মুশফিক কি ভুল বলেছিলেন? দলের বোলারদের ব্যর্থতার দায় কি তার একার? ব্যাটসম্যানরাও ব্যর্থ। এক্ষেত্রে মুশফিক নিজেও দায়ী। অনেকে তাকে রক্ষণশীল অধিনায়ক বলছেন এবং টেস্টে তাঁরা একজন আক্রমণাত্মক অধিনায়ক চাইছেন। একটা ম্যাচ হারলেই যেভাবে ব্যবচ্ছেদ করা হয় তাতে মাথা ঠাণ্ডা রাখা কঠিন বইকি। তবে এটাই আন্তর্জাতিক খেলা। আর টেস্ট ক্রিকেটে অধিনায়ক মুশফিকের অর্জন অনেক। আগ্রাসী না হলে দেশকে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার মতো দলের বিপক্ষে দেশকে জিতিয়েছেন কিভাবে? ফলে এক সিরিজ দিয়েই সব বিচার সম্পন্ন করা কতোটা ঠিক সেটাও ভেবে দেখতে হবে। মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মুশফিক কতোটা স্বাধীন সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেছেন, “মুশফিকের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, সে বেশ বিচলিত অবস্থায় আছে। বেশ চাপে আছে। সে কারণেই আবেগপ্রবণ হয়েই সে কিছু কথা বলে ফেলেছে। বোর্ডের উচিত ওর এই কথাগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করা। একজন অধিনায়ক কোন পরিস্থিতিতে ড্রেসিংরুমের কথাবার্তা সংবাদ সম্মেলনে এসে বলে ফেলে, সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।”

Mushi-inner20171005113809

যথার্থ বলেছেন। তার কথায় উঠে এসেছে, “আমি বিশ্বাস করি, একটি টেস্ট দলের অধিনায়ককে হতে হবে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু মুশফিকের ক্ষেত্রে কি সেটা ঘটছে? সে বাংলাদেশ দলের সেরা ব্যাটসম্যান। সে আবার উইকেটকিপিংও করে। অধিনায়ক হিসেবেও তাকে চাপ নিতে হয়। তিনটি কাজেই অসম্ভব মানসিক শক্তির দরকার হয়। এ জন্য মানসিকভাবে ভারমুক্ত হতে হয়। টিম ম্যানেজমেন্ট মুশফিককে ভারমুক্ত থাকতে দিচ্ছে বলে আমি মনে করি না। চাপে পড়েই সে মুখ খুলেছে।”

এমনকি টসে জিতে বোলিং নেওয়ার বিষয়েও টিম ম্যানেজমেন্টের ভূমিকা আছে বলে মনে করেন অনেকেই। টসে জিতে ফিল্ডিং না ব্যাটিং নেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত টিম ম্যানেজমেন্ট আগেই নিয়ে থাকে। অধিনায়ক শুধু মাঠে গিয়ে সেটা ঘোষণা দেয়। সুতরাং দায় কেন শুধু মুশফিককে বহন করতে হবে। এমন অনেক প্রশ্নের জবাব জানতে হবে যা মুশফিক বলেন নি এখনও। দলে বিভক্তির ছাপ স্পষ্ট। অধিনায়কের বাউন্ডারিতে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং দেওয়ার পিছনে যে যুক্তি টিম ম্যানেজমেন্ট দিয়েছে বলে মুশফিক জানিয়েছেন তাও আলোচনার দাবি রাখে। আরেকটা বিষয় সাকিবের অনুপস্থিতির কারণে দলটি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সাকিব দেশের সেরা খেলোয়াড়। যেকোন দলের বিপক্ষে তার উপস্থিতি দলের জন্য এখন পর্যন্ত অতি গুরুত্বপূর্ণ সেটা এই টেস্টে আবারও প্রতীয়মান হয়েছে।

টেস্টে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছে মুশফিকের নেতৃত্বেই। বাংলাদেশ টেস্টে যে ১০টা জয় পেয়েছে ৭টিই তাঁর অধিনায়কত্বে। মুশফিকের নেতৃত্বে ড্র করেছে ৯ টেস্টে। হার ১৭টিতে। ফলে অধিনায়ক মুশফিককে নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে সেটা আগে উঠেনি কেন? সফল হলে বাহবা আর ব্যর্থ হলে শুলে চড়ানোর সংস্কৃতি চালু হলে সেটা ভাল কিছু হবে না। আরও যে বিষয়টা লক্ষণীয় তা হলো ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই মুশফিকের অধিনায়কত্ব হারানোর খবর প্রকাশ হয়ে যাওয়া, তাও বিসিবি’র একজন কর্মকর্তার বরাতে। এটা ভাল কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন না বাংলাদেশের অনেক সাবেক ক্রিকেটারও। তবে ভাবগতিক আর আজকের খেলার ফলাফল, সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে মুশফিকের বিকল্প হয়তো শ্রীলংকার বিপক্ষে ঘরের মাঠে আসন্ন টেস্ট সিরিজের আগেই একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। প্রশ্ন হলো কে হবেন সেই বিকল্প? আলোচনায় আছে দুটি নাম। টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসান আর টেস্টে বর্তমান বাংলাদেশ দলের সহ অধিনায়ক তামিম ইকবাল। অধিনায়ক যেই হোন না কেন, মুশফিককে নিয়ে যেসব প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে সেগুলোর উত্তর না খুঁজেই নতুন অধিনায়ক নিয়োগ দেওয়া কতোটা যুক্তিযুক্ত সেটাই ভেবে দেখার বিষয়।

-মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

টাইগারদের পাশেই আছেন নান্নু

কোচের কাছে ব্যর্থতার কারণ জানতে চাইবেন পাপন

নীরবেই দেশে ফিরল টাইগাররা

‘হাথুরুসিংহেকে ক্ষমতা দেওয়াই বুমেরাং হচ্ছে’

‘পেস বোলিং এ পিছিয়ে যাচ্ছি’ – সুজন