SCORE

মুশফিক কিন্তু ওয়ানডে দলেও আছেন!

Share Button

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের দুই টেস্টেই বাজে পরাজয়ের পর তুমুল আলোচনা আর সমালোচনার চাপ সইতে হচ্ছে বাংলাদেশ টেস্ট দলকে বিশেষ করে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমকে। তীব্র সমালোচনা করছেন ক্রিকেট বোদ্ধা থেকে শুরু করে বিসিবি প্রধানও। ক্রিকেটারদের সামর্থ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। মুশফিকের অধিনায়কত্ব কেঁড়ে নেওয়ার প্রস্তাবও তুলছেন অনেকে।[আরও পড়ুন:‘আমার অধিনায়ক মুশফিকই’ তামিম ইকবাল]

ব্যাটিং করছেন মুশফিকুর রহিম
ব্যাটিংয়ে মুশফিকুর রহিম

অথচ ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হচ্ছে একই দলের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ। সেই সিরিজের জন্য ঘোষিত স্কোয়াডে আছেন মুশফিকুর রহিমও। দলের ব্যাটিং অর্ডারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তার। কিন্তু তার অধিনায়কত্ব নিয়ে বিতর্কে ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে উঠা পরিস্থিতিতে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজে তার মনোযোগ বিঘ্নিত হলে সেটা দলের জন্য আদৌ ভাল কিছু বয়ে আনবে না। দলের জন্যও এটা ক্ষতিকর। সবাই জানে দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের মাটিতে ওয়ানডেতেও দুর্দান্ত দল। তাদের হারানো সহজ হবে না। ফলে এখন সকল মনোযোগ ওয়ানডে ঘিরেই হওয়া উচিৎ।’

দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট জেতা টেস্ট ক্রিকেটের কুলীনদের পক্ষেও অনেক কঠিন। এশিয়ান ক্রিকেটের পরাশক্তিদের পক্ষেও আজ পর্যন্ত সেখান থেকে টেস্ট সিরিজ জয় সম্ভব হয় নি। সেখানে  সাফল্য বলতে টেস্ট সিরিজ ড্র করতে পেরেছে ভারত পাকিস্তান একবার করে। সবশেষ সাত বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট সিরিজ ড্র করেছিল ভারত। এর আগে পাকিস্তান সিরিজ ড্র করে ১৯৯৮ সালে। শ্রীলংকা কখনও সিরিজ ড্র করতে পারেনি। ভারত, পাকিস্তান দুই দলই মাত্র দুই টেস্টে জয় পেয়েছে। আর শ্রীলংকা মাত্র একবার। সেখানে বাংলাদেশের পরাজয় অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটা স্বীকার করে নিয়েছেন বিসিবি প্রধানও, ‘বাস্তবতা হচ্ছে, আপনারা যদি চিন্তা করে দেখেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে খেলাটা আসলেই কঠিন। আপনারা যদি পাকিস্তানেরটা দেখেন, ওরাও গিয়ে ইনিংস ব্যবধানে হেরে এসেছে। অন্য দলগুলোও গিয়ে হেরে এসেছে।

Also Read - স্থগিত হয়ে যেতে পারে টি-টোয়েন্টি গ্লোবাল লিগ!

যার ফলে খেলোয়াড়দের উপর চাপানো দায়কে কিছুটা করে তিনি আরও বলেন, আসলে এই কন্ডিশনটা আমাদের জন্য একটু আলাদা। এত দিন ধরে তারা যে কন্ডিশনে খেলে অভ্যস্ত, দশ বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে খেলতে গিয়ে একটু সমস্যায় পড়ছে। এটা আমরা বুঝি।

দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে পূর্বের চার টেস্ট ম্যাচের সবগুলোতেই ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়। এবার দীর্ঘ ৯ বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ। ফলে আগের দলে যারা ছিলেন তাদের প্রায় সবাই এখানে অনুপস্থিত। নতুনদের জন্য প্রোটিয়াদের দুর্দান্ত দলটির বিপক্ষে খেলা নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল। দলে মুস্তাফিজ, সাব্বিরদের অন্তর্ভুক্তি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক বলছেন, টেস্টের জন্য এখনও প্রস্তুত নন এই দুই তরুণ তারকা ক্রিকেটার। সেটা তাদের পারফরম্যান্স দেখলেও অনুমান করা যায়। তার উপরে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান টেস্ট থেকে সাময়িক বিরতি নিয়েছেন। দ্বিতীয় টেস্টে দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবালের ইনজুরির কারণে অনুপস্থিতি দলটিকে আরও দুর্বল করে দিয়েছিল। ফলাফল ৩৩৩ রানের হার প্রথম টেস্টে, দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ও ২৫৪ রানের হার। মরার উপর খাঁড়ার ঘা মুশফিকের অধিনায়কত্ব। মাঠে তার হাবভাবে বুঝা যাচ্ছিলো, ভীষণ চাপে ছিলেন তিনি। বোলারদের বিশৃঙ্খল বোলিং, ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিং সব মিলিয়ে দুই টেস্টেই ভরাডুবি হয়েছে বাংলাদেশের। এরপর সংবাদ সম্মেলনে বোলারদের দোষারোপ, টস বিতর্ক মিলিয়ে তার অধিনায়কত্ব প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। যদিও তামিম ইকবাল টস বিতর্কে মুশফিকের পাশেই দাঁড়িয়েছেন, টসে জিতে ফিল্ডিং করা অবশ্যই দলের সিদ্ধান্ত। এটা কোন সময় কারো একার হতে পারে ন। কোচ, অধিনায়ক, সহ- অধিনায়ক, সবারই মতামত থাকে এতে।আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে টসে জিতলে বোলিং নিব।

সাকিব-তামিম ছাড়াই আত্মবিশ্বাসী মুশফিক
প্রেস কনফারেন্সে মুশফিকুর রহিম

অনেকে অধিনায়ক হিসেবে মুশফিকের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাকে সরিয়ে দেওয়ার খবর গণমাধ্যমে খেলা চলাকালীন প্রকাশ হওয়ার পর ব্যক্তি মুশফিকের অভিব্যক্তি কেমন হওয়ার কথা সেটা অনুমেয়। তার কিছু মন্তব্য এমনকি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার মতো বলেও মত দিয়েছেন বিসিবি প্রধান। এমতাবস্থায় সব দায় তার উপর চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা চলছে। অনেক সাবেক ক্রিকেটার মুশফিকের পক্ষে দাঁড়িয়ে যুক্তি দিচ্ছেন। আবার তাকে সরিয়ে তামিম-সাকিবের একজনকে অধিনায়ক করতে বলছেন। অনেকে টিম ম্যানেজম্যান্টের কিংবা কোচিং স্টাফদের উপর দায় চাপাচ্ছেন। ড্রেসিং রুমের পরিবেশও এসেছে আলোচনায়। এহেন পরিস্থিতিতে সবার কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন মুশফিক। তবে সাথে এও বলেছেন, আমি মনে করি, যখন দল ভালো করে তখন সব কৃতিত্ব যায় টিম ম্যানেজমেন্টের দিকে। যখন দল ভালো করে না, তখন সব দায় এসে পড়ে অধিনায়কের ওপর।

সব মিলিয়ে ভজঘট অবস্থা। বিষয়টা যেন এমন যে, এই মুহূর্তে মুশফিককে সরিয়ে দিলেই বা কোচিং স্টাফ পাল্টে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আসলে কি তাই?

টেস্ট সিরিজ শেষ হয়েছে। এবার ওয়ানডে সিরিজের পালা। ওয়ানডেতে বাংলাদেশ অনেক ভাল দল সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। অধিনায়কত্বে ফিরছেন অনেকের মতে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। ফিরছেন সাকিব-তামিম। স্বাভাবিকভাবেই দলটি অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। দলে যুক্ত হচ্ছেন নাসির হোসেন, ২০১৫ সালে সর্বশেষ ওয়ানডে খেলা লিটন দাস, ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল পারফর্ম করা জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন।

জিমে মাশরাফি এবং মুশফিক হাস্যজ্জল অবস্থায়
জিমে হাস্যজ্জল মাশরাফি এবং মুশফিক

আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালের পর বাংলাদেশ দল রঙিন জার্সিতে ফিরছে। চলতি বছরের জুনে ভারতের কাছে সেমিফাইনালে হেরে বিদায় নেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার সাথে টেস্ট সিরিজ ড্র করে বাংলাদেশ। ফলে সীমিত ওভারের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে তাদের বিপক্ষে খেলা সহজ হবে না, স্বীকার করেছেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ও। তিনি বলেন, যারাই খেলুক, যত বড় প্লেয়াররা খেলুক না কেন, উপমহাদেশের কোনো দল দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে গিয়ে যে কোন দলের জন্য কঠিন হবে সেটা মাথায় রেখেই খেলতে হবে। ওরা ওদের ৮০ ভাগ খেললে আমাদের ওদের থেকে আরও বেশি, ১০% ভাল খেলতে হবে।

আশা দেখছেন মুশফিক নিজেও, ওয়ানডেতে সাকিব-তামিম খেলবে। তাছাড়া ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি ভাই চলে এসেছেন, এবার আমরা ওয়ানডেতে ঘুরে দাঁড়াব।

এই মুশফিকুর রহিমই কিন্তু মিডল অর্ডারে বাংলাদেশের অন্যতম ভরসা দীর্ঘদিন থেকেই। সেটা সব ফরমেটেই। ওয়ানডেতেই যেমন ১৬৮ ম্যাচে ৩০.১৬ গড়ে ৪ সেঞ্চুরিসহ ৪১২০ রান তাঁর। উইকেট-রক্ষক হিসেবেও আছে বহু সফলতা। যদিও লিটন দাসের উপস্থিতে তার এই ভূমিকা অনিশ্চিত। দলের প্রয়োজনেই মুশফিককে নির্ভার রাখতে হবে।

দলে মাশরাফি-সাকিব-তামিমের উপস্থিতি আর সাম্প্রতিক ফর্ম মিলিয়ে ভাল ফলাফল আশা করাই যায়।

তবে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপ এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা। হাশিম আমলা, ডিন এলগার, কুইন্টন ডি কক, ফাফ ডু প্লেসিস, আর ইনজুরি থেকে ফিরে আসা বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান এবি ডি ভিলিয়ার্স আছেন দলে। বোলিংয়ে আছেন বর্তমানে বিশ্বসেরা পেসার কাগিসো রাবাদা, দুর্দান্ত স্পিনার ইমরান তাহির। এদের সামলানো সহজ হবে না বাংলাদেশের জন্য। যদিও নিজেদের মাটিতে এই দলটিকেই ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু প্রোটিয়াদের নিজেদের মাটিতে হারানো কঠিন কাজ। তবে ওয়ানডে বলেই সাহস বাড়বে। কারণ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বাউন্সি পিচেও ভাল করেছিল টাইগাররা। আর আসন্ন সিরিজের উইকেট হতে পারে ফ্ল্যাট। কিম্বার্লি, পার্ল, ইস্ট লন্ডন, পচেফস্ট্রুম, ব্লুমফন্টেইন- সবগুলো উইকেটই ফ্ল্যাট। সবগুলো ব্যাটিংয়ের জন্য আদর্শ উইকেট। সাবেক প্রোটিয়া অধিনায়ক শন পোলক জানিয়েছেন এমন তথ্য। ফলে বাংলাদেশ নিজেদের পছন্দের উইকেট পাচ্ছে, এমন সম্ভাবনা বেশি।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ব্যাট করছেন মুশফিকুর রহিম
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ব্যাট করছেন মুশফিকুর রহিম

এ পর্যন্ত সাউথ আফ্রিকার সাথে ১৭টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ দল। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে একটি এবং ২০১৫ সালে ঘরের মাঠে ৩ ম্যাচ সিরিজের ২টি সহ মোট ৩টি জয়ের বিপরীতে ১৪টি ম্যাচেই পরাজয় বরণ করে বাংলাদেশ দল। ২০০৩ সালে সাউথ আফ্রিকার মাটিতে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। তিনটি ম্যাচেই করুন পরাজয়, ১ম ম্যাচে ১৬৮ রানে, ২য় ম্যাচে ১০ উইকেট ও ৩য় ম্যাচে ৭ উইকেটে পরাজয়বরণ করে বাংলাদেশ। ২০০৮ সালে ঘরের মাঠে ও আফ্রিকার মাটিতে ২টি সিরিজেই বাজে ভাবে হারে বাংলাদেশ দল। তবে সর্বশেষ ২০১৫ সালে ঘরের মাঠে সিরিজ হারনোর ঘটনা অনুপ্রেরণা হবে সন্দেহ নেই। তবে সেই সিরিজে যারা ভাল করেছিলেন, যেমন সৌম্য সরকার দুটি অসাধারণ ইনিংস খেলেছিলেন। বর্তমানে সৌম্য ফর্মে নেই। কিন্তু তারপরও খেলাটা ওয়ানডে বলেই তার ফিরে আশা অসম্ভব কিছু না। আর সাকিব-তামিম-মুশফিক-মাহমুদুল্লাহর মতো সিনিয়রদের ব্যাটের দিকেই নজর থাকবে পুরো দলের। আর বোলিংয়ে তাসকিনের পাশাপাশি অনেক ভরসার ‘মুস্তাফিজ’ জ্বলে উঠলে তো কথাই নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা দলের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, এখনও পর্যন্ত দলের সেরা পেসার এবং অধিনায়ক মাশরাফি আছেন।

টেস্টের দুঃস্মৃতি ভুলে আসন্ন ওয়ানডেতে দলের ভাল ফলাফলের জন্য দলের সবাইকে উজ্জীবিত রাখতে হবে। এসময় মুশফিককে নিয়ে বিতর্ক না বাড়িয়ে সবার এখন ওয়ানডের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। ক্রিকেট দলীয় খেলা। ১১ জন মিলেই দলের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। তাই দলের সদস্য কাউকে যদি এসময় চাপে রাখা হয়, যিনি আবার দলের অন্যতম বড় ভরসার নাম, তাতে দলের উপর প্রভাব পড়বে। এসব নিয়ে সিরিজ শেষে দেশে ফিরলেও আলোচনা করা যাবে। এখন নজর থাকুক শুধু ওয়ানডের দিকে। টেস্টের অমানিশা কেটে ওয়ানডেতে সাফল্য আসুক প্রত্যাশা হোক এমনই।

মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

‘টাইগার’ মাশরাফির বর্ণিল ১৬ বছর

মুস্তাফিজের ‘ফিজ’ হয়ে ফেরার অপেক্ষা

টাইগারদের ‘ক্যাঙ্গারু-বধ কাব্য

যেখানে যেমন মুশফিক

অনন্য সাকিব, অদম্য সাকিব