SCORE

Breaking News

‘সবচেয়ে কঠিন এই সময়টা’

Share Button

ওয়ানডে সিরিজ শেষে দলের অন্যরা টি-২০ সিরিজের প্রস্তুতি নিলেও সেই তাড়া নেই মাশরাফি বিন মুর্তজার। ওয়ানডে অধিনায়ক টি-২০ ছেড়েছেন কয়েক মাস আগে, ফলে তাঁর দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থামছে ওয়ানডে সিরিজ দিয়েই। অবসরের ফাঁকে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠর সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় মত্ত হন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’। সেখানে উঠে আসে তাঁর নেতৃত্ববোধ, অধিনায়কত্বের ক্যারিয়ারের ভালো-খারাপ সময়ের কথা; যেখানে মাশরাফি সবচেয়ে কঠিন সময় হিসেবে দেখছেন বর্তমান পরিস্থিতিকেই।

নেতৃত্বগুণে সমৃদ্ধ মাশরাফি শুধু খেলার মাঠেই জনপ্রিয় না। তাঁর এই গুণটা সমাদৃত আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুমহলেও। এটি কীভাবে অর্জন করলেন? মাশরাফি বলেন, ‘দেখুন, কেউ কিছু পছন্দ না করলে আমি কখনো তা চাপিয়ে দিই না। সব সময় অন্যের জন্য ‘কমফোর্ট জোন’ তৈরি করতে চাই। এই চর্চা পরিবারে করি, মাঠেও করি। আর নেতৃত্বে আপনার নিজস্বতা থাকতে হবে। পরিবর্তন করলে তা মেকি হয়ে যাবে। মানুষের কাছে ধরাও খাবেন। ওরা ভাববে, আমি নতুন কিছু করতে চাচ্ছি।’

Also Read - 'অধিনায়ক হিসেবে চ্যালেঞ্জ এখন দেশের বাইরে ম্যাচ জেতা'

মাশরাফি বলেন, ‘আমি নেতৃত্ব পাওয়ার পর ভেবেছি, নিজের মতো করেই যতটুকু করতে পারি, করব জিম্বাবুয়ের সঙ্গে সিরিজের আগে ভেবেছি যে, আমরা জিততে পারব কিন্তু তারপর? সামনে বিশ্বকাপ, পাকিস্তানভারতদক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ আমি ওই সময়ে যদি তাকিয়ে দেখতাম, নিশ্চিত যে, তত দিন বাংলাদেশ ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না কারণ এসব দলের বিপক্ষে হেরে গেলে হয় আমি নেতৃত্ব থেকে সরে যেতাম অথবা আমাকে সরিয়ে দেওয়া হতো কারণেই আমি ম্যাচ ধরে ধরে এগোতে চেয়েছি সিরিজ ধরে ধরে।’

দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যতে কাউকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য মনে হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে দেশসেরা পেসার জানান, ‘গত তিন বছর বাংলাদেশকে টানা নেতৃত্ব দিতে গিয়ে মনে হয়েছে, কাউকে বাংলাদেশের অধিনায়ক হতে হলে তাকে অনেক ধৈর্যশীল হতে হবে কারণ, চারপাশের মানুষরা সবাই খুব অধৈর্য আর খেলাটা এমনই যে, ভালো পারফর্ম করলে প্রত্যাশা অনেক বেড়ে যাবে আবার খারাপ করলে প্রচণ্ড সমালোচনা হবে এখন যেটি হচ্ছে এসব মেনে নিয়েই প্রচণ্ড ধৈর্য ধরে এগোতে হয় অধিনায়ককে।’

মাশরাফি অধিনায়ক হওয়ার পর ওয়ানডেতে দেশের পক্ষে সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকার করেছেন তিনিই। যদিও তাঁর অধিনায়কত্বের আড়ালে এই অর্জন অনেকটাই চাপা পড়ে আছে। যদিও এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই তাঁর, ‘আমি ভালো করলেও কেউ কিছু বলছে না, এটা কোনো ব্যাপার নয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দল ঠিক পথে এগোচ্ছে কি না অধিনায়ক হিসেবে সেটিই মূল কাজ বোলার মাশরাফিকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে কি না, তা কখনো আমার মাথায়ই আসেনি এটা বরং একদিক দিয়ে ভালো কেন, তার উত্তর হয়তো আমি জানি না পাশাপাশি তো ঠিক, মানুষ আমাকে কম ভালোবাসা দেয়নি সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’

একটা সময় প্রতিপক্ষের ইনিংস শুরু মানেই বল হাতে দৌড়ে আসছেন মাশরাফি। সেই জায়গা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমানকে। কতটুকু কঠিন ছিল এই সিদ্ধান্ত? মাশরাফি বলেন, ‘এটা আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল বলতে পারেন, নতুন বল ছেড়ে নিজের ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিই আমি কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে মনে হয়েছে, নতুন বলে উইকেট পাওয়ার সামর্থ্য মুস্তাফিজের আছে এর ফলও পেয়েছি রোহিত শর্মাকে যেমন কয়েকবার দ্রুত আউট করে দেয় অধিনায়ক হিসেবে এটা আমার অর্জন পরে মনে হয়েছে, নতুন বল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সময় আমি অনেক সৎ ছিলাম।’

দলের সবচেয়ে কঠিন ও ভালো সময় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন এই সময়টা দল যেহেতু হারের ভেতর আছে নিউজিল্যান্ডে হারলেও সেখানে সম্ভাবনা অনুযায়ী কিছুটা খেলতে পেরেছি দক্ষিণ আফ্রিকায় তা পারিনি মোটেই আমার কাছে এই সময়টা আবার বেশ রোমাঞ্চকরও কারণ এখান থেকে বের হয়ে আসতে পারলে যে শান্তিটা লাগবে, ভালো সময় চলতে থাকলে তা কখনো বুঝতে পারতাম না অধিনায়ক হিসেবে আরেক হতাশার সময় ইংল্যান্ডের কাছে সিরিজ হারা আফগানিস্তানের কাছে প্রথম ওয়ানডে হারা চিন্তাই করতে পারিনি যে, এই ম্যাচগুলো হারব আর ভালো স্মৃতি তো অসংখ্য বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা, ভারতদক্ষিণ আফ্রিকাকে আমাদের দেশে হারানো এরপর এবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনাল খেলা।’

অধিনায়কত্ব করতে গিয়ে তৃপ্তিদায়ক সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে মাশরাফি বলেন, ‘অনেকগুলো আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চট্টগ্রামের তৃতীয় ওয়ানডেতে দুটি সিদ্ধান্ত ছিল। আমি প্রথম ২ ওভারে ১০ রান দিই, তবু নিজেকে বদলে বোলিংয়ে নিয়ে আসি সাকিবকে। ও ওর দ্বিতীয় ওভারেই পায় ফাফ দু প্লেসিসের উইকেট। ওই ম্যাচেই পরে একটা সময় রিয়াদকে (মাহমুদউল্লাহ) বোলিংয়ে আনার কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয়েছে ও উইকেট নিতে পারবে। ঠিকই রাইলি রুশোকে আউট করে দেয়। আরেকটি সিদ্ধান্ত ছিল, এবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের ৪২তম ওভারে মোসাদ্দেককে ম্যাচে প্রথমবারের মতো বোলিংয়ে আনা। তিন ওভারে ১৩ রান দিয়ে তিন উইকটে নেয় ও।’

বোলিং ও অধিনায়কত্ব সত্ত্বাকে ডেলিভারির সময় আলাদা রেখেই বল ছুঁড়েন- এও জানালেন মাশরাফি। তিনি বলেন, যখন বোলিং করি, তখন ভুলে যাই যে আমি অধিনায়ক এটা বলা সহজ, করা এত সহজ নয় আমি খুব ভাগ্যবান যে, তা আমার ভেতরে আছে যখন বসে থাকি, আমার মধ্যে দুটি ব্যাপার কাজ করে একটি হচ্ছে আমার নেতৃত্ব নিয়ে ভাবা, আরেকটি নিজের বোলিং নিয়ে ভাবা আলাদা ভাবে দুই ব্যাপারেই সময় দিতে হয়।’

অধিনায়কের প্রভাব খাটিয়ে কাউকে দলে অন্তর্ভুক্ত করে তাঁর ভালো খেলার তৃপ্তি কতটা আনন্দ দেয়, সেটি বোঝাতে গিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সম্ভবত এমন হয়েছে; রিয়াদকে নিয়ে আগের সিরিজে ওর আঙুল ভেঙে যায় সেরে উঠতে অনেক দিন সময় লাগছিল ওকে খেলানো নিয়ে সবাই তখন দ্বিধায় আমি কথা বলি রিয়াদের সঙ্গে বলে, খেলতে পারব তখন ওকে পুরোপুরি বিশ্বাস করি রিয়াদকে খেলাই এবং সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে মিলারের উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি করে ৫০ রান সেটা আমার জন্য আনন্দদায়ক ছিল খুব।’

অধিনায়ক হওয়ার পর বড় কোনো ইনজুরির শিকার হননি মাশরাফি, মিস করতে হয়নি কোনো ম্যাচ। মাশরাফির ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ‘কাকতালীয়’ হলেও একে তিনি দেখছেন ভাগ্যের খেল হিসেবে, ‘শুধু ক্রিকেট না, আমার ৩৫ বছরের গোটা জীবনটাই ভাগ্যের ওপর এটি প্রথম বুঝি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনতলা থেকে নিচে পড়েও বেঁচে যাই পড়ার পর দেখি, আমার ঠিক পাশেই একটা পাথরের দলা ওখানে পড়লেই মারা যেতাম তখন থেকেই আমার মনে হয়, দুনিয়া ভাগ্যের ওপর চলে জন্মমৃত্যুই যখন ভাগ্যের ওপর, তখন ক্রিকেটইনজুরি এসবে তো কথাই নেই।’

অধিনায়কত্ব ছেড়ে ওয়ানডে খেলতে ইচ্ছে হয় কখনও? মাশরাফির উত্তর, ‘খুব কঠিন প্রশ্ন কখনো মনে হয়, অধিনায়কত্ব ছেড়ে খেলে দেখি সেটি হবে আরেক চ্যালেঞ্জ আবার কখনো মনে হয়, যেভাবে চলছে, চলুক এগুলোর আসলে কোনো ঠিক নেই কোনো স্থির পরিকল্পনা নেই।’

দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা অধিনায়ক এ সময় জানান নিজের লক্ষ্যের কথা, ‘প্রথম লক্ষ্য যা ছিল, তা অনেকটাই সফল দলের সবাই মিলে দেশের মাটিতে ৮০ শতাংশের বেশি ম্যাচ জিততে চেয়েছি তা পেরেছি এখন লক্ষ্য দেশের বাইরের ম্যাচ জেতা এখানে এত তাড়াতাড়ি সফল হওয়া যাবে না কারণ চ্যালেঞ্জটা আরো বড়।’

অধিনায়ক হিসেবে বৈশ্বিক কোনো শিরোপা জেতার স্বপ্ন থাকলেও একে ভালো অধিনায়ক বা ভালো দলের কোনো মানদণ্ড হিসেবে দেখছেন না মাশরাফি। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক শিরোপা জেতা ভালো অধিনায়ক বা ভালো দলের মানদণ্ড বলে আমি মনে করি না তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকা কখনো ভালো দল হতে পারে না আমি তাই বৈশ্বিক শিরোপার কথা না ভেবে ভালো একটি দল তৈরি করতে চাই যারা দেশে ভালো খেলবে; বাইরেও ভালো দেশে তো আমরা ভালো খেলছিই; এখন বাইরে জিততে শুরু করাই চ্যালেঞ্জ।’

  • সিয়াম চৌধুরী, প্রতিবেদক, বিডিক্রিকটাইম

Related Articles

জয়ে খুশি ডুমিনি

মাইলফলকের সামনে মাশরাফি

স্বেচ্ছায় নেতৃত্ব ছাড়ছেন না মুশফিক!

সাকিবকে ছাড়িয়ে গেলেন মাশরাফি