SCORE

Trending Now

কোচ নিয়োগে মাশরাফিদের মতামত নয় কেন?

Share Button

দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিপিএলের এবারের আসর ছাপিয়ে আলোচনায় এখন হাথুরুসিংহের বিদায়। তার বিদায়ে নতুন কোচ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে বিসিবি’কে। কিন্তু, এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন না মাশরাফিরা। এমনকি সম্প্রতি জানা গেছে, কোচ নিয়োগে তাদের মতামত নেওয়া হয় নি কোনকালেই। এমনকি সিনিয়র ক্রিকেটাররা এই ইস্যুতে মন্তব্য করা থেকেও কার্যত বিরত থাকছেন। অথচ, বিসিবি কোচ হিসেবে যাকেই বেছে নিবে তার সঙ্গে মাঠে এবং মাঠের বাইরে সবচেয়ে বেশি সময় অতিবাহিত করবেন তাঁরাই। তাহলে কোচ নিয়োগে তাদের মতামত নয় কেন?

সদ্য সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের বিদায় বেশ আলোচিত বিষয়। জানা গেছে, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সাথে মনোমালিন্যই নাকি তার বিদায়ের কারণ। কাউকে কোন ইঙ্গিত না দিয়ে কোন আলোচনা না করেই পদত্যাগ করলেন তিনি। আর তার বিদায়ের সংবাদ প্রকাশ করলো তার নিজের দেশ শ্রীলঙ্কার সংবাদ মাধ্যম! তারপর অনেক জল গড়িয়ে তার থাকা না থাকা নিয়ে বহু আলোচনা শেষে এখন তার না থাকাটা নিশ্চিত। কিন্তু,যে কারণটা জানা গেছে তা মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। আর এটা কারও অজানা নয় যে, দলে হাথুরু’র ভূমিকা কতোটা নেতিবাচক ছিল। ফলে তার বিকল্প নিয়োগে যদি জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের মতামত না নেওয়া হয়, বিসিবি’র বাছাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

 

Also Read - দাপুটে জয়ে পয়েন্ট তালিকায় মজবুত অবস্থানে ঢাকা

যদিও ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বলছেন,’আমি মনে করি আজ পর্যন্ত কোন কোচ যখন নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে, আমার অন্তত মনে হয় না লাস্ট ১৬১৭ বছরের খেলা জীবনে বোর্ড কখনো কোন খেলোয়াড়ের সাথে আলোচনা করেছে। তো এখনও আমি মনে করছি না, আমাদের সাথে আলোচনা করার দরকার আছে।

কথাটা হয়তো ঠিক। কিন্তু, কোচ নিয়োগে ক্রিকেটারদের মতামত না নেওয়ার এই যে সংস্কৃতি সেটা কতোটা বাস্তবিক? পাশের দেশ ভারত কোচ নিয়োগে অধিনায়কের মতামতকেই শিরোধার্য মনে করেছে। যদিও এটা নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক কোহলির পছন্দেই রবি শাস্ত্রীকে বেছে নিয়েছেন কোচ নিয়োগে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি’র সদস্যরা, যাদের নাম ভারতে অনেক সম্মানের সাথে নেওয়া হয়। শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলী, ভিভিএস লক্ষণের মতো কিংবদন্তীরাও কোহলির মতামতকে মেনে নিয়েছেন। যার ফলও পাচ্ছে তারা। ভারত এখন ক্রিকেট বিশ্বের পরাশক্তি।

বাংলাদেশ ভারতের পথ অনুসরণ করতে হবে বিষয়টা তা নয়। অকাহ্নে কোহলি রীতিমত জেদ ধরেছিলেন। ফলে বোর্ড বাধ্য হয়েছিলো। কিন্তু কোহলির মতো এতো আগ্রাসী আমাদের অধিনায়কেরা নিশ্চই নন। বাকি দেশগুলোতে কিভাবে কোচ নিয়োগ দেয় তা তেমন আলোচনায় না এলেও সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার কোচ হিসেবে হাথুরু’র নিয়োগ নিয়ে সেদেশের ক্রিকেটার থেকে শুরু করে ক্রীড়া মন্ত্রীও মন্তব্য করছেন। বাংলাদেশেও সাবেক ক্রিকেটার থেকে শুরু করে ক্রিকেট বোদ্ধা অনেকেই মতামত রাখতে পারেন। অনলাইনে সাধারণ ক্রিকেট ভক্তদের মধ্যেও অনেকে গঠনমূলক মতামত দিচ্ছেন। এগুলোও কাজে লাগাতে পারে বিসিবি।

মাদক থেকে দূরে থাকার আহ্বান মাশরাফির
মাশরাফি বিন মুর্তজা। ছবিঃ বিডিক্রিকটাইম

মাশরাফি যতোই বলুন, আমাদের দায়িত্ব মাঠে খেলা এবং যেই কোচ আসুক না কেন তাঁর প্ল্যান মতো খেলা। তো এটা মেটার করে না যে ওনারা (বোর্ড) কাকে আনবে। যাকে আনবে তার ইন্টারভিউ নিয়েই, চিন্তা করেই নেওয়া হবে। এটা নিয়ে ভাবার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

কিন্তু, তার এই বক্তব্যের সাথে সবিনয়ে দ্বিমত পোষণ করে বলছি, বাস্তবে তার প্রয়োজন আছে। কোচ নিয়ে তিক্ত অতীতকে এবার আরও ছাপিয়ে গেছে হাথুরু ইস্যু। খেলোয়াড়দের সাথে দূরত্ব থেকেই পদত্যাগের পথে হাঁটতে হয়েছে তাকে। ফলে খেলোয়াড়দের সাথে সম্পর্ক কোচদের জন্য মুখ্য। আর এক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের অনেকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। যেমন সবচেয়ে বেশি সময় জাতীয় দলের কোচদের সান্নিধ্য পেয়েছেন মাশরাফি। অনেক কোচের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি ভাল করেই জানেন কেমন কোচ প্রয়োজন দলের জন্য।

শুধু মাশরাফি নন, জাতীয় টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক মুশফিক এবং সাকিব আল হাসানেরও অনেক অভিজ্ঞতা আছে। সাকিব তো দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি লিগে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। সেখানে অনেক আন্তর্জাতিক মানের কোচদের সান্নিধ্য পেয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তামিম, মাহমুদুল্লাহও দেশ ও দেশের বাইরে লিগে খেলেছেন। এছাড়া বিপিএলে দেশি-বিদেশি কোচদের অধীনেও খেলছেন তারা। আর খেলতে গিয়ে কোচদের বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতাও অনেক হয়েছে। ফলে তাদের মতামত এক্ষেত্রে অনেক গুরুত্ব বহন করে।

ক্রিকেট ক্যাপ্টেনস গেম। ফুটবলের মতো এটা ‘ম্যানেজারস গেম’ নয়। ক্রিকেট বিশ্বেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। কোচদের চেয়ে অধিনায়কদের ভূমিকা এখন অনেক বেশি। কোচ শুধু পথটা বাতলে দেন। মাঠের নেতা কিন্তু অধিনায়কই। এমনকি একাদশ গঠনেও থাকে অধিনায়কদের আধিপত্য। অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ক প্রয়োজন মনে করলে কোচ ও বাকী খেলোয়াড়দের পরামর্শ নিতে পারেন। কথাটা বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন নিজেই বলেছিলেন। যদিও আমাদের ক্রিকেটে এটা কতোটা সঠিক সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, হাথুরু’র শেষটায় দল গঠন এমনকি অধিনায়কের ভূমিকায় অন্যায্য হস্তক্ষেপের কথা সবাই জানে। আর তার ফলশ্রুতিতে বিদায়ই নিতে হলো তাকে। এমনটা আবার হোক তা নিশ্চয়ই চাইবে না বিসিবি।

কোর্টনি ওয়ালশ সহ বাকি কোচিং স্টাফদের ভবিষ্যৎ কি হবে এটাও ভাবার বিষয়। কেননা, এদের প্রায় সবার নিয়োগের ক্ষেত্রে হাথুরু’র ভূমিকা ছিল। ফলে প্রক্রিয়াটা মোটেই সহজ নয়। কোচ নির্বাচনে কমিটি গঠন করা হবে নিশ্চয়ই। সেখানে শুধু বোর্ড সংশ্লিষ্টদের মতামত না নিয়ে সাবেক ক্রিকেটার থেকে শুরু করে ক্রিকেট ভক্তদেরও অনেক গঠনমূলক মতামত নিয়ে ভাবতে পারে বিসিবি। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের মতো সাবেক তারকা খেলোয়াড় এবং দেশীয় কোচদের নিয়ে একটা প্যানেল গঠন করা যেতে পারে যার সদস্য করা যেতে পারে জাতীয় দলের বর্তমান তিন অধিনায়ককেই। যেহেতু অধিনায়কেরা পুরো দলের দেখভাল করেন আর কোচদের সাথে তাদেরই যেহেতু সবচেয়ে বেশি পরামর্শ করার প্রয়োজন হবে, তাই তাদের মতামত এখানে অনেক গুরুত্ব বহন করে।

হাথুরুসিংহেকে পেতে মরিয়া লঙ্কানরা

 

কোচ নিয়োগে খেলোয়াড়দের পছন্দ এখন জরুরী এই জন্য যে, একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা অতি সাম্প্রতিক সময়ে পেতে হয়েছে। বিশ্ব ক্রিকেটে শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হাথুরু’র অনেক ভূমিকা ছিল। তার হাত ধরে সৌম্য সরকার, মুস্তাফিজ, সাব্বির, মোসাদ্দেকদের মতো তরুণ ক্রিকেটার উঠে এসেছেন। ক্রিকেটে প্রকৃত ‘টাইগার’ তকমা তার সময়েই পেয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব ক্রিকেটের ডাকসাইটে দলগুলোকে ওয়ানডেতে অনায়াসে হারিয়েছে বাংলাদেশ। টেস্টেও এসেছে অধরা সাফল্য। ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ে অসাধারণ উন্নতি, বিশ্বকাপে সাফল্য মিলিয়ে হাথুরু অধ্যায়ের একটা বড় অংশ ছিল বাংলাদেশের সাফল্য গাঁথা।

এমন ফলপ্রসূ কোচিং অধ্যায় আর একজনের সময়েই পেয়েছিলো বাংলাদেশ। সেই কোচ হলেন ডেভ হোয়াইটমোর। বাংলাদেশের ক্রিকেটের ঘোর দুঃসময়ে দলের দায়িত্ব নিয়ে দলের মধ্যে জয়ের খিদে ও অভ্যাসটা তৈরি করে দেন তিনি। চার বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে বাংলাদেশ দলকে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি দলের সাথে নিজের বন্ধনটাও গড়ে তুলেছিলেন দারুণভাবে। হোয়াইটমোরের সময়ই বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল, শাহরিয়ার নাফীস, নাফিস ইকবালদের মতো প্রতিভার প্রবেশ ঘটে বাংলাদেশ দলে। হোয়াইটমোরকে তাই এখনও শ্রদ্ধার সাথেই স্মরণ করেন ক্রিকেটাররা। পরবর্তী কোচের ক্ষেত্রেও এমন কাউকেই প্রয়োজন বাংলাদেশের। আর এই বিষয়টা দলটির সিনিয়র খেলোয়াড়েরাই ভাল বুঝতে সক্ষম।

বিসিবি অনেক যাচাই-বাছাই করেই কোচ নিয়োগ দেবে সন্দেহ নেই। আর তাদের উপর আস্থাও প্রকাশ করেছেন মাশরাফিরা। কিন্তু, এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার এখনই সময় তাদের। আগামী বিশ্বকাপ সামনে রেখে যাকেই নিয়োগ দেওয়া হোক তিনি যেন মাশরাফি-মুশফিক-সাকিবদের মনের মতোই হবেন সেটাই কাম্য। অনেকে বলবেন, এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে ক্রিকেটারদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিতে পারে। কিন্তু, কোহলির মতো জেদ নিশ্চয়ই আমাদের অধিনায়কেরা ধরবেন না। ফলে, তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা কোচ নির্বাচনে দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে সন্দেহ নেই। আশা করি, বিসিবি বিষয়টি ভেবে দেখবে।

আরো পড়ুনঃ দাপুটে জয়ে পয়েন্ট তালিকায় মজবুত অবস্থানে ঢাকা

 

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

বিপিএলের কোয়ালিফায়ারে রিজার্ভ ডে নয় কেন?

‘বিকল্প বিপিএল’ কতোটা যৌক্তিক?

রংপুরের অপেক্ষা শুধু জ্বলে উঠার

বিপিএলে পাঁচ বিদেশি ক্রিকেটার কার স্বার্থে?

হাথুরুর বিদায়, বিকল্প কে?