SCORE

Breaking News

বিপিএলে পাঁচ বিদেশি ক্রিকেটার কার স্বার্থে?

Share Button

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিপিএলের এবারের আসরে চারজনের পরিবর্তে পাঁচজন বিদেশী খেলোয়াড় খেলানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বহু সমালোচনা হয়েছে। যেখানে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএলে চারজন থেকে তিনজন বিদেশি খেলোয়াড় খেলানোর ভাবনা শুরু হয়েছে সেখানে এদেশে উল্টো যাত্রা বেশ আশ্চর্যজনকই বটে। তবে এর পিছনে যে যুক্তি বিসিবি দেখিয়েছে সেটা আরও বেশি অদ্ভুত। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর দাবির কারণে নাকি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। টুর্নামেন্টকে আরও জমজমাট করতে এটা দরকার এমন দাবীও করা হয়েছিল তাদের পক্ষ থেকে। কিন্তু, তাতে এদেশের ক্রিকেটের কি লাভ? নতুন দেশী তরুণ ক্রিকেটার না উঠে এলে এমন লিগ আয়োজনে কার স্বার্থ হাসিল হচ্ছে?

টুর্নামেন্টের সর্বশেষ আসরে খেলেছিল সাতটি দল। এবারও রয়েছে সাতটি দল। বাদ পড়েছে বরিশাল বুলস। এক আসর পর নতুন মালিকানায় বিপিএলে ফিরেছে সিলেট। তবে কমেছে দেশি খেলোয়াড়ের সংখ্যা। পাঁচ বিদেশি খেলোয়াড় নেওয়ার সিদ্ধান্তে উল্টো অনেক ভাল স্থানীয় ক্রিকেটার দলই পান নি। নামকরা পুরনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের দলে ভিড়িয়ে টুর্নামেন্ট জমানোর চেষ্টা করার প্রবণতা আগের মতো এবারও দেখা যাচ্ছে। মানহীন বিদেশি খেলোয়াড়ে বিপিএল সয়লাব। জনপ্রিয়তার বিচারে বেশ এগিয়ে থাকলেও মানের দিক থেকে তাই আইপিএল, বিগ ব্যাশ এমনকি পিএসএলের চেয়েও অনেক পিছিয়ে বিপিএল। সম্প্রচারের মান নিয়ে আর নাইবা বলি। অথচ এবার বিদেশি খেলোয়াড় বাড়িয়ে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে!

Also Read - সর্বোচ্চ দুই বিদেশি লিগে আপত্তি নেই মাশরাফির

পাঁচ বিদেশী ক্রিকেটার নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন জাতীয় দলের তিন অধিনায়ক মাশরাফি, সাকিব ও মুশফিক। টেস্ট দলের অধিনায়ক মুশফিক বলেছিলেন, ‘পাঁচজন বিদেশি প্লেয়ার যে কোনো টিমে থাকলে আমাদের একজন লোকাল প্লেয়ারের স্পট কমে যাবে।’

জাতীয় টি-টোয়েন্টি দল ও ঢাকা ডায়নামাইটস অধিনায়ক সাকিবের মন্তব্য, ‘প্রথমে আমি এই ব্যাপারে ইতিবাচক ছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি আমাদের স্থানীয় ক্রিকেটাররা সুযোগ পাচ্ছে না। দেশের ক্রিকেটের জন্য এটা ভাল হচ্ছে না।’

যদিও শুরুতে তার ভাষ্য ছিল আলাদা, ‘পাঁচজন বিদেশি হওয়াতে সবগুলো দল সমানভাবে স্ট্রং হবে। ৬ জন করে খেলছে তার মানে ৪২ খেলোয়াড় সবাই প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলবে। আমার কাছে মনে হয় প্রতিযোগিতা আরও বেড়ে গেল।’

 

জাতীয় দলের তরুণ অলরাউন্ডার মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত বলেছেন, ‘৫ জন করে বিদেশি প্লেয়ার খেলায় আমাদের পারফর্ম করাটা অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কেননা পাঁচ জন বিদেশি খেললে ওদের তিন চারজন টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যান থাকে। নরমালি আমরা যে ধরনের ব্যাটিং করি তাতে আমাদের অর্ডার ৬-৭ এ চলে যায়। এটা আমরা ঘরোয়া ক্রিকেটে আসলে করি না। আমরা যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভালো করতে চাই তাহলে এসব লেভেলে অবশ্যই আমাদের উপরে ব্যাটিং করতে হবে এবং সুযোগটা বেশি পেতে হবে। ভবিষ্যতে এটা থাকলে আমাদের জন্য ভালো হবে না।’

পাঁচ বিদেশি ক্রিকেটার খেলানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই মাশরাফি এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে বলেছিলেন, ‘আগের আসরগুলোতে যারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তাদের স্থানীয় খেলোয়াড়রাই ভালো খেলেছে। এ টুর্নামেন্টে স্থানীয়রা নিজেদের সর্বোচ্চ দেয়ার চেষ্টা করে। তবে আমার কাছে যদি বোর্ড জানতে চায় তাহলে চারজন বিদেশি নেয়ার কথাই বলব। এখন আমরা যদি বিদেশি খেলোয়াড় বাড়াই, তাহলে খেলার জয়-পরাজয় ওদের উপর নির্ভর করবে। পাশাপাশি আপনি যদি একজন বিদেশি ক্রিকেটার বাড়ান তার মানে একজন দেশি ক্রিকেটার কমে যাচ্ছে। যেটা আমি চাই না।’

তাদের কথার বাস্তবতা এখন পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে। বিপিএলের এবারের আসরে ব্যাটিংয়ে বিদেশি খেলোয়াড়দের দাপট দেখা যাচ্ছে। বোলিংয়ে কিছুটা ভাল করছে স্থানীয়রা। বিদেশিরা ভাল পারফর্ম করায় প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি চেষ্টা করছে তাদের বেশি বেশি খেলিয়ে ম্যাচ জেতার। আদতে এতে লাভ হচ্ছে বিদেশি খেলোয়াড়দের আর ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর। শ্রীলঙ্কার সাথে আসন্ন সিরিজের আগে লঙ্কান খেলোয়াড়দের জন্য এই আসর অনেক কাজে দিবে, কিন্তু তাতে এদেশের ক্রিকেটের কি লাভ? সাকিবও এমন কথাই বলেছেন।

বিদেশি ক্রিকেটারদের আধিক্যের কারণে এবার বিপিএলে দলই পান নি অনেক সাবেক জাতীয় দলের খেলোয়াড়। গতবার রংপুর রাইডার্সের হয়ে অধিনায়কত্ব করা নাঈম ইসলাম, জাতীয় দলের একসময়ের ওপেনার জুনায়েদ সিদ্দিকি, লেগ স্পিনার জুবায়ের হোসেন লিখন, শাহাদাত হোসেনরা দল পান নি এই নতুন নিয়মের কারণে। অথচ বিশ্ব ক্রিকেটের অনেক সাবেকদের দলে নেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকে নিজেদের দেশের জাতীয় দলে টেস্ট আর ওয়ানডের খেলোয়াড়ের তকমা পেয়েছিলেন। কেউ কেউ ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত আসরে চান্সই পেতেন না। অথচ এখানে তাদের রীতিমত জামাই আদর করে দলে রাখা হচ্ছে।

 

চিটাগংকে ১৮ রানে হারালো খুলনা

খেলায় জয়ের চেষ্টাটাই বড়। জয়ের জন্যই দলগঠন করা হয়। সাবেক লঙ্কান অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে তাই দলে পাঁচ বিদেশি ক্রিকেটার নিয়ে বেশ পজিটিভ, ‘আমার মতে কম্বিনেশনের কথা ভাবলে পাঁচজন বিদেশি ক্রিকেটার দলগুলোকে একটা অন্য শক্তি দিবে। এটি টুর্নামেন্টের জন্য ভালো। স্থানীয় ক্রিকেটারদের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ। মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করবে স্থানীয় ক্রিকেটাররা। দলে কেবল সেরা ক্রিকেটাররাই সুযোগ পাবে।’

জয়াবর্ধনে এদেশের খেলার সাথে সরাসরি জড়িত নন। বিপিএলে খুলনা টাইটান্সের কোচ হিসেবে মাত্র কয়েক মাস এখানে কাটাবেন। তারপর হয়তো অন্য কোন দেশে একইরকম দায়িত্ব পালন করতে যাবেন। তাই দীর্ঘ মেয়াদে পাঁচ বিদেশি খেলোয়াড় খেলানো নিয়ে তার ভাবনা পজিটিভ হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, তার প্রয়োজন দলের জয়। তাহলে তার কোচিং প্রোফাইল ভারী হবে। তাতে স্থানীয় ক্রিকেটারদের ভবিষ্যতের ক্ষতি হলেও তার কিছু যায় আসার কথা না। বাকি কোচদেরও নিশ্চয়ই একই মত। কিন্তু যারা এদেশের ক্রিকেটের নিয়ামক তাদের দায় এড়ানোর সুযোগ আছে কি?

বিপিএলে এতো বিদেশির কারণে দেশীয় খেলোয়াড়দের ব্যাটিং অর্ডারে সুযোগ হচ্ছে কম। আবার বোলিংয়েও এর প্রভাব পড়ছে। ঢাকা ডায়নামাইটসের অধিনায়ক সাকিব নিজেই এর উদাহরণ। তার মতো অনেক দেশী বোলারই নিজেদের বোলিং কোটা পূরণ করতে পারেন নি কয়েকটি ম্যাচে। অনেক ব্যাটসম্যান সারাজীবন যে অর্ডারে ব্যাটিং করে এসেছেন, বিদেশি ক্রিকেটারদের কারণে নামতে হচ্ছে নিচের অর্ডারে। এটা সত্য স্থানীয় খেলোয়াড়দের অনেকের মান ‘আপ টু দ্য মার্ক’ নয়। তাই বলে তাদের সুযোগ দিতে হবেনা? না হলে তাদের খেলার উন্নতি কিভাবে হবে? শফিউল, আরাফাত, সোহান, মোসাদ্দেক, জহুরুলের মতো তরুণরা কিন্তু সুযোগ পেলে তার সদ্ব্যবহার করছেন। তার মানে স্থানীয়দের সঠিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।

ঢাকাতেও ভালো করতে মুখিয়ে সিলেট সিক্সার্স

বিপিএল যদি সত্যিই দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য আয়োজন করা হয়ে থাকে তাহলে তো পাঁচ বিদেশি ক্রিকেটার একাদশে থাকার সুযোগ দিত না ফ্র্যাঞ্চাইজি কিংবা বিসিবি কেউই। ২০১২ ও ২০১৩-এর বিপিএলে পাঁচ বিদেশি খেলানোরই নিয়ম ছিল। প্রথম দুই আসরে পাঁচ বিদেশি রাখার কারণও ছিল ভিন্ন এবং অসংলগ্ন। এজন্য বিপিএলকে অনেকে ‘বিদেশি প্রিমিয়ার লিগ’-এর তকমা দিয়ে দিয়েছেন। তবে কার্যত বিদেশি যারা খেলছেন তাদের অনেকেই নিজ দেশে টি-টোয়েন্টি একাদশে ছিলেন ব্রাত্য। আবার যারা এই ফরম্যাটে কার্যকর তাদের অল্প কয়েকটা ম্যাচেই পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ক্রিস গেইল কিংবা শহীদ আফ্রিদি কিংবা ব্র্যান্ডন ম্যাককালামের কথা।

এবারের আসরে সব দলেরই নজর বিদেশী খেলোয়াড়দের দিকে। বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের জন্য খবরটি মোটেই সুখবর নয়। বিপিএল আয়োজক ও প্রতিযোগী দলগুলোর মালিকদের জন্য এটা আর্থিক দিক থেকে লাভবান হওয়ার পথ। আর এতে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের তেমন অসুবিধা হবার কথা নয়। তবে জাতীয় দলের বাইরের ক্রিকেটারদের জন্য অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সিদ্ধান্ত। তাই দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে শুধু লাভ আর জৌলুসের কথা চিন্তা না করে আগামী আসরে পাঁচ বিদেশী খেলোয়াড় রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত সংশ্লিষ্টদের।

আরো পড়ুনঃ সর্বোচ্চ দুই বিদেশি লিগে আপত্তি নেই মাশরাফির

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

মন খুলে খেলতে দেন রিয়াদ

রশিদের পরিবর্তে কুমিল্লায় তরুণ আফগান মুজিব

রংপুরের মুখোমুখি খুলনা, সিলেট-চিটাগংয়ের ঘুরে দাঁড়ানোর ম্যাচ

বিপিএলের উঠতি তারকারা

ঢাকাকে ৪ উইকেটে হারালো কুমিল্লা