SCORE

Breaking News

মাশরাফি একজনই

Share Button

গতকাল বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিপিএলে রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ক মাশরাফির সাথে শুভাশিস রায়ের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় নিয়ে যা হলো, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। স্লেজিং ক্রিকেটের অংশ হলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে জাতীয় দলের অধিনায়কের সাথে তারই জুনিয়র সতীর্থের দুর্ব্যবহার মেনে নিতে পারেন নি কেউই। কিন্তু মানুষটা মাশরাফি। ‘বিগ হার্ট’ মাশরাফি পরিস্থিতি যেভাবে সামলেছেন তার জন্য তার প্রতি মানুষের ভালবাসা আরও অনেকগুণ বেড়ে গেছে সন্দেহ নেই।

মাইলফলকের সামনে মাশরাফি

ঘটনা সবাই অবগত। তবু একটু স্মরণ করতে চাই। কালকের ম্যাচে মুখোমুখি হয় দুই দল রংপুর রাইডার্স এবং চিটাগাং ভাইকিংস। টার্গেট নিয়ে ব্যাটিং করতে গিয়ে পেসার তাসকিনের বিধ্বংসী স্পেলে চাপে পড়ে যায় রংপুর। লো অর্ডারে ব্যাট করতে নামেন মাশরাফি। ঘটনা ১৭তম ওভারের। সেই ওভারের চতুর্থ বলে শুভাশিস দারুণ এক ইয়র্কার করলেন, কোনমতে ঠেকালেন মাশরাফি। নিজের বলে ফিল্ডিং করেই বল মাশরাফির দিকে ছুড়ে মারতে উদ্যত হলেন শুভাশিস। মাশরাফি ইশারায় বোলিং লাইনে যেতে বললেন। আর তাতেই জ্বলে উঠলেন শুভাশিস। তেড়ে গেলেন মাশরাফির দিকে। অবাক মাশরাফি অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন। শুভাশিস তবু থামার পাত্র নন। সতীর্থরা এসে যখন টেনে নিচ্ছেন, শুভাশিস তখনও হাত-পা ছুড়ে গর্জে যাচ্ছেন। মাশরাফি তখনও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ঘটনা মোটামুটি এমনই।

Also Read - যোগাযোগ করছেন না হাথুরুসিংহে - পাপন

খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে অবধারিতভাবে এই প্রসঙ্গ উঠে এলে মাশরাফির জবাব, ঘটনা যা ছিল, তা সিরিয়াস কিছু নয়। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এ রকম হয়। সিরিয়াস কিছু নয়।

কিন্তু সংবাদ কর্মীরা নাছোড় বান্দা। আবারও একই প্রসঙ্গ। এবার স্বভাবসুলভ বিনয় নিয়ে বললেন, আমিআমি মনে করি, আই শুড সে সরি টু হিম। আমারই সরি বলা উচিত। ক্রিকেটেরই অংশ। হয়ে থাকে এমন। ওর জায়গা থেকে হয়ত ঠিকই আছে। সে জিততে চায়, আমিও জিততে চাই।

আর শেষ কথায় তার দুর্দান্ত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে জানালেন, যেহেতু সে আমার ছোট, আমারআরেকটু মাথা ঠাণ্ডা রাখলে ভালো হতো। সিরিয়াস কিছু হয়নি অবশ্যই। আমি জানি না, ওর কি করা উচিত ছিল। কিন্তু সিনিয়র হিসেবে আমার আরেকটু শান্ত থাকলে ভালো হতো।

প্রতিবন্ধীদের উৎসাহ দিতে রংপুর যাচ্ছেন মাশরাফি

এই জন্যই কোটি মানুষ তাকে ভালবাসে। অনুজ ক্রিকেটারকে সমালোচনার হাত থেকে বাঁচাতে নিজেই ফেইসবুক পাতায় দেওয়া ভিডিওতে মাশরাফি বিন মুর্তজা অনুরোধ করেছেন এ ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে। মানুষ যেভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন তাতে শুভাশিসের জন্য বড় কিছুই হয়তো অপেক্ষা করছিলো। ক্রিকেটকে এদেশের মানুষ অনেক বেশি ভালবাসে। আর এই আবেগের বেশ বড় অংশ জুড়ে আছেন মাশরাফি। তার কিছু হলে মানুষ পাগল হয়ে পড়ে। আবেগে আপ্লুত হয়। সেই ভালবাসার মানুষগুলোকে শান্ত করতে নিজেই ভিডিও বার্তায় বললেন, আসলে যে জন্য ভিডিওটা করা সেটা আমার কাছে মনে হচ্ছে যে এটা বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। মানুষের কাছ থেকে অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। অনেক কিছু পেয়েছি। কিন্তু একই সাথে মনে করি শুভাশিষও বাংলাদেশের হয়ে খেলে। তারও ভালোবাসা প্রাপ্য।

শুধু তাই না, আগলে রাখলেন শুভাশিসকে, আমি শুভাশিষের কাছে এজন্য ক্ষমা চাচ্ছি যে ও আমার ছোটো ভাই। ওকে অবশ্যই আমার ওভাবে বলা উচিত হয়নি। তাহলে হয়তো ওরও মাথা ঠান্ডা থাকতো।

আর বলে দিলেন এই নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে। শেষটায় যা করলেন তার কোন তুলনা হয়না। একসাথে ফেসবুক লাইভে এসে শুভাশিস চাইলেন ক্ষমা। আর মাশরাফি বড় ভাইয়ের মতো স্নেহের পরশ বুলিয়ে বললেন, কংগ্রেচুলেশন টু হিম। ইনশাল্লাহ সে বাংলাদেশের হয়ে অনেক ভাল খেলবে সামনে। এ দোয়া আমিও করি, আপনারাও করবেন

সেই লাইভ ভিডিও যারা দেখেছেন তারা জানেন খেলা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এতো বড় ঘটনা যেভাবে সামাল দিলেন মাশরাফি তা অন্য কেউ পারতো কি না সন্দেহ। দেশের ক্রিকেটে হঠাৎ করে জমা হওয়া কালো মেঘ কি দারুণভাবে সরিয়ে দিলেন। শুধু ভালবাসা দিয়েই জয় করা যায় মানুষের মন সেটা তিনি ভালই বুঝেন। এইজন্যই মাশরাফি অনন্য।

কাল (৮ নভেম্বর) ক্যারিয়ারের ১৭তম বছরে পা দিয়েছেন ম্যাশ। এমন বিশেষ দিনে এমন ঘটনা অনভিপ্রেত। তাছাড়া মাশরাফির অবস্থান এমন এক জায়গায় যে তার সাথে কোন বাজে আচরণ কেউ মেনে নেবে না। শুভাশিস সেটা ভালভাবেই টের পেলেন। আর এদেশের ক্রিকেটারদের বড় ভাই, যাকে দেখে তরুণরা ক্রিকেট খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে তাকে তার নিজের সতীর্থ যদি এভাবে বিব্রত করে সেটা মানার মতোও না।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্লেজিং একেবারে নতুন কিছু নয়। মাঠে বাকবিতণ্ডাও নতুন না। গত আসরে সাব্বির-শেহজাদের মধ্যেও উত্তপ্ত বাক্য বিনময় হয়। তাছাড়াও মাঠে হাতাহাতি করেছিলেন দলের সিনিয়র ক্রিকেটার তামিম ইকবালও। এরপর এবার জাতীয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটার মুশফিককে আউট করে স্ট্যাম্পে লাথি মেরেছিলেন সাব্বির। এছাড়া আল-আমিন, শহীদদের কথা সবাই জানে। সাকিবেরও মাঠে মেজাজ হারানোর বহু ঘটনা আছে। কিন্তু জাতীয় দলের অধিনায়কের সাথে এমন আচরণ সত্যিই নতুন ঘটনা।

ভারতের ঘরোয়া লিগ আইপিএলে এমন ঘটনা অনেক আছে। গৌতম গম্ভির-বিরাট কোহলির সেই বিখ্যাত লড়াই এখনও ইন্টারনেটে দেখা যায়। নিজ দলের খেলোয়াড় যারা জাতীয় দলে সতীর্থ তাদের মধ্যে এমন ঘটনা মোটেই কাম্য নয়। আর বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থাই এমন যে, এখানে বড়দের সম্মান আর ছোটদের স্নেহ করা কর্তব্য। ফলে মাঠে মাশরাফির প্রতি অসম্মান দেখানো এক্ষেত্রে সেই সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে। সবচেয়ে বড় কথা মাশরাফি এদেশের সবচেয়ে বড় তারকা। তার সম্মান তাই আলাদা। জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা সেটা স্বীকারও করে।

তরুণদের আদর্শ মাশরাফি। শুধু মাশরাফি কেন, যেকোন তারকাই বহু মানুষের কাছে অন্য মর্যাদার। তাদের কথা বলার ধরণ থেকে স্টাইল, মোট কথা তাদের চলাফেরা অনুকরণ এবং অনুসরণ করে বহু মানুষ। ফলে তাদের কাছ থেকে ভাল কিছুর প্রত্যাশা থাকে সবার। কিন্তু ইদানিং বাইরের দেশের ক্রিকেট তারকারাতো বটেই এদেশেরও কয়েকজন ক্রিকেট তারকার মাঠের বাইরের জীবন নিয়ে অনেকবার প্রশ্ন উঠেছে। এসব ত্যাগ করতে হবে। টেলিভিশনে খেলা দেখার সময় অনেক কিছু চাক্ষুষ দেখা যায়। অনেক কিশোর-তরুণ এসব ফলো করে। তাই, মাঠে এবং মাঠের বাইরে সবাইকে সজাগ হতে হবে।

কালকের ঘটনা মাশরাফি যেভাবে সামলেছেন তা আর কারও দ্বারা সম্ভব হতো কি না কে জানে। পুরো দলকে এক সুতোয় গাঁথার অসাধারণ অবদান তার। তাসকিনের নিষিদ্ধ হওয়ার পর তার অশ্রুসজল চোখে পরিবারের এক সদস্যকে হারানোর আক্ষেপ সবাই দেখেছে। ক্রিকেট মাঠে আগ্রাসী ক্রিকেট আর খেলোয়াড়দের দুঃসময়ে নিজে আগলে রেখে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার মতো অধিনায়ক কবে পেয়েছিল বাংলাদেশ? পায় নি, আর এইজন্যই ‘মাশরাফি একজনই’।

আরো পড়ুনঃ যোগাযোগ করছেন না হাথুরুসিংহে – পাপন

 

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

রংপুরকে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে খুলনা

মুশফিককে হটিয়ে শীর্ষে রিয়াদ

রংপুরের বিপক্ষে বাড়তি পরিকল্পনা নেই খুলনার

বিপিএল মাতাতে প্রস্তুত মুস্তাফিজ

বিপিএলে আধিপত্য দেশি পেসারদের