হাথুরুর ছুটিতে বিলীন বিসিবি প্রধানের পাঁচের স্বপ্ন

Share Button

দক্ষিণ আফ্রিকায় সব সিরিজের ধবল ধোলাইয়ের শিকার হওয়ার পর পুরো টিম দেশে ফিরলেও ফিরেন নি প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রতিটি সিরিজ শেষে তার দীর্ঘ ছুটি কাটানো বিশেষ করে এবারের ছুটি কাটানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দলের পরাজয়ের পর পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে সবার সাথে কথা বলতে চান পুনর্বার নির্বাচিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রধান নাজমুল হাসান। দলকে ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ের পাঁচে তুলতে চান তিনি। কিন্তু যাকে ঘিরে মূল পরিকল্পনা সেই কোচ পরাজয়ের পর তা নিয়ে কোন জবাবদিহিতার বালাই না রেখে এখন সিডনিতে। বর্তমান প্রেক্ষিতে পাঁচে উঠার স্বপ্ন কোচের বাসস্থান সিডনির মতোই দূরের কিছু বলেই বোধ হচ্ছে।চন্ডিকা হাথুরুসিংহে

 

দক্ষিণ আফ্রিকার ভরাডুবির পর গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের মূল কাজ শেষ হওয়ায় নতুন করে দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের নেতৃত্বাধীন প্যানেল। নির্বাচিত হয়েই  সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলেন পাপন। এ সময় তিনি বাংলাদেশকে নিকট ভবিষ্যতে ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ের পাঁচে দেখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Also Read - বিপিএলে ডিজিটাল পেরিমিটারের যাত্রা শুরু

 

পাপনের আমলেই প্রথমবারের মতো ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে সাতে উঠেছে বাংলাদেশ। অনেক স্মরণীয় জয় এসেছে এই সময়। কিন্তু দেশের মাটিতেই প্রায় সব সাফল্য। দেশের বাইরে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। যার সর্বশেষ নমুনা দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। সামনে অধিকাংশ ম্যাচ দেশের বাইরে খেলতে হবে টাইগারদের। এমতাবস্থায় দলের মনোবল চাঙ্গা রাখা এবং ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজতে হবে। দলের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করে সেগুলোর সমাধান করতে হবে এখনই। দলের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে কোচের অনুপস্থিতি তার দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে সন্দেহ নেই।

 

বিসিবি প্রধানের কথায় ব্যর্থতার দায় অনেকটা কোচের উপর বর্তেছে। সংবাদমাধ্যমের সামনে নাজমুল স্পষ্টই বলেছেন, দল দক্ষিণ আফ্রিকায় কেন এত বাজে খেলল, তার কারণ তিনি জানতে চাইবেন কোচ, ম্যানেজার ও অধিনায়কদের কাছে। বাকিদের কাছে পেলেও হাথুরুকে পাওয়া সম্ভব না। তবে হাথুরুর ছুটিতে যাওয়া নিয়ে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে পাপন জানিয়েছেন, ‘সে যদি এখন ছুটিতে থাকে, তাকে আনার চেষ্টা করতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে প্রধান কোচের মতামত আমাদের জানা দরকার। আমাদের পারফরম্যান্স কেন এমন হলো? তার কী মন্তব্য? তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ করতে হবে। তার সঙ্গে কথা বলব। আমাদের জন্য এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ‘।

 

হাথুরুকে নিয়ে শুধু বিসিবি প্রধান নন, দেশের আপামর ক্রিকেট ভক্তদের মনেও অনেক প্রশ্ন আছে। দল গঠনে এবং পরিচালনায় তার ভূমিকা অনেকবার সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ফলে পাপনের বলা ‘সত্যিকার অর্থে কিন্তু অধিনায়কই সকল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে’ কথাটির উপর খুব বেশি বিশ্বাস করছে না তারা।

 

তবে তার ‘বাংলাদেশ হারতেই পারে। তবে, এভাবে হারাটা মোটেও মেনে নেয়ার মতো না। আমাদেরকে দেখতে হবে এর পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে কি না? এ বিষয়ে কোচিং স্টাফ, ম্যানেজার, নির্বাচক, খেলোয়াড় সবার কাছে জানতে চাইব। মূল সমস্যাটা কী সেটা আমাদের বের করতে হবে এই কথার সাথে সবাই একমত। কিন্তু সেটা হবে কিভাবে? হাথুরু যে দেশেই নেই।

 

হাথুরুকে পরিসংখ্যান সফল কোচই বলবে। তার সময়ে দল বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে, পাকিস্তানকে ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ করেছে, সাউথ আফ্রিকা, ভারতের মতো পরাক্রমশালী দলকে সিরিজ হারিয়েছে, এশিয়া কাপ টি২০ তে ফাইনালে উঠেছে, ইংল্যান্ড আর শ্রীলংকাকে টেস্টে হারিয়েছে। কিন্তু এগুলো ছিল ২০১২ সালে ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশ দলের প্রতিচ্ছবি। হাথুরুর আসার পর আগের সেই ফলগুলোই পরিস্ফুটিত হয়েছে মাত্র। তার সময়ে অনেক ভাল ভাল প্রতিভার সর্বনাশ হয়েছে। মুমিনুলের গায়ে টেস্ট ব্যাটসম্যানের তকমা ছেঁটে দিয়েও নিয়মিত সুযোগ না দেওয়া, নাসিরকে নিয়ে তামাশা করা, সৌম্য নামের তরুণ তুর্কির বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার ঘটনাও এই সময় ঘটেছে, যদিও তাদের শুরুটা তার সময়েই হয়েছে। ফলে দলটি এখনও মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ নির্ভর থাকতো না। এই সিনিয়ররা নিশ্চয় তার আবিষ্কার নয়!

 

দলের নীতি নির্ধারণে হাথুরুর অসীম ক্ষমতা বরাবরই প্রশ্ন তুলেছে। কোন রকম জবাবদিহিতা ছাড়াই দলে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনা, অধিনায়কের ক্ষমতায় ভাগ বসানো, খেলোয়াড়দের মনোবল ভেঙে দেওয়ার প্রায় সব কাজই তার হাত দিয়ে হয়েছে। এমনকি কে কিপিং করবেন, কে অধিনায়ক হবেন এসব বিষয়েও তার হস্তক্ষেপ আলোচনায় এসেছে। অথচ দক্ষিণ আফ্রিকায় হারের পর একবারের জন্যও কোন জবাবদিহিতায় পড়তে হয়নি তার। সংবাদ মাধ্যমকেও এড়িয়ে চলেছেন। একবার এক প্রতিবেদককে সাক্ষাৎকার চাওয়ার অপরাধে (!) ধমকও দিয়ে বসেছিলেন তিনি! কিন্তু দায় এড়িয়ে যাওয়ার  সুযোগ তিনি কিভাবে পান?

 

হাথুরু এমন এক বাংলাদেশ দল হাতে পেয়েছিলেন যে দল জয়ের জন্য মরিয়া ছিল। ক্রিকেট বহুলাংশে অধিনায়কনির্ভর খেলা। মাশরাফির অধিনায়কত্ব তার উজ্জ্বল প্রমাণ। তার অধীনে দলটির সামর্থ্যের কোন ঘাটতি ছিল না। তার ফলও পেয়েছে দল এবং হাথুরু। শুরুটা বেশ রঙিন ছিল তার। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহারের নিদারুণ উদাহরণ দেখিয়ে নিজেকে দলের নিয়ামক বানিয়ে ফেলেছেন তিনি। এমনকি বিসিবিও তাকে প্রশ্রয় দিয়েছে অবারিত। বিসিবি প্রধান অবশেষে বুঝতে পেরেছেন গলদ খুঁজতে হলে কাকে দরকার।

 

হাথুরু ছুটি কাটানোর ক্ষেত্রে রীতিমত স্বেচ্ছাচারী স্বভাবের। ছুটি তিনি নিতেই পারেন। কিন্তু তার ছুটি কাটানোর তালিকা রীতিমত বিস্ময়কর।  গত ১৬ মাসে হাথুরুসিংহে ছুটি কাটিয়েছেন প্রায় ১৫০ দিন! অথচ, চুক্তি অনুযায়ী ৬০ দিন ছুটি কাটানোর কথা। বিশ্বের চতুর্থ ধনী ক্রিকেট কোচ হাথুরু। মাসিক বেতন প্রায় ২৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে তার। বাংলাদেশ দল যখনই এমন লম্বা বিরতি পায়, বেশির ভাগ সময়ই কোচ থাকেন ছুটিতে। অথচ এই সময়টা দলের ভুল, উন্নতির জায়গা নিয়ে সময় দেওয়ার কথা ছিল তার।

 

গত বছর মার্চে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর প্রায় দুই মাস ছুটি কাটিয়ে তিনি ঢাকায় ফেরেন ২০১৬ সালের ১ জুনে। ১৯ দিন পর আবার সিডনিতে চলে যান কোচ। দেড় মাসের বেশি সময় ছুটি কাটিয়ে ফেরেন ৭ আগস্ট। ওই সময় প্রায় সাড়ে তিন মাস ছুটিতে ছিলেন হাথুরু। গত সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের পর মাত্র এক দিন বাংলাদেশে ছিলেন হাথুরু। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের দল নিয়ে বিসিবি সভাপতির সঙ্গে সভা করেই উড়াল দিয়েছিলেন সিডনিতে। (ছুটির পরিসংখ্যানের সুত্রঃ প্রথম আলো)

 

দলের প্রধান কোচ যদি সুযোগ পেলেই ছুটিতে চলে যান তাহলে দলের উন্নতির সুযোগ কিভাবে থাকে? ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া বিপিএল নিয়ে তার কোন ভাবনাই নেই? অথচ এটা একটা সুযোগ দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে ভাবার। তাদের ভুলত্রুটি নিয়ে কাজ করার এবং নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার। কিন্তু তিনি নেই, জবাবদিহিতাও নেই। দুর্দান্ত একটি দলের আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসার পিছনে দায় তাহলে কার?

 

বিসিবি প্রধান যতোই স্বপ্ন দেখেন র‍্যাংকিংয়ে পাঁচে উঠার, দলের মূল কোচকে জবাবদিহিতার বাইরে রেখে তা কিছুতেই সম্ভব না। যে সমস্যাগুলো সাধারণ ক্রিকেট ভক্তরাও ধরতে পারছেন, বিসিবি সংশ্লিষ্টরা কেন পারছেন না সেটা এক বিশাল প্রশ্ন। যদিও স্বপ্নটা ঠিকই দেখছেন বিসিবি প্রধান, গতবারেরই টার্গেট ছিল র‌্যাংকিংয়ের ৫এ যাওয়া। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা পারিনি। কিন্তু অল্প কিছু সময়ের জন্য ৬ এ গিয়েছিলাম। তারপরে আবার ৭এ চলে এসেছি। তবে সাতে কিন্তু আমাদের পজিশনটা বেশ মজবুত। আমার টার্গেট প্রথমত আমাদেরকে র‌্যাংকিংয়ে পাঁচের মধ্যে আসতে হবে।

 

স্বপ্ন দেখা আর বাস্তবে অর্জন করা অনেক দূরের বিষয়। বিসিবি প্রধানের স্বপ্নটা এদেশের সব ক্রিকেট ভক্তের। কিন্তু, একই কোচিং স্টাফ আর টিম ম্যানেজমেন্ট বিশেষ করে হাথুরুর মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন কোচকে নিয়ে সেই স্বপ্ন কতোটা সফল হবে সেটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে বই কি!

 

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক