SCORE

Breaking News

হাথুরুর বিদায়, বিকল্প কে?

Share Button

 

২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত মেয়াদ থাকলেও হুট করেই বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান কোচের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। যদিও ক্রিকেট বোর্ড এখনও অনেক কিছুই খোলাসা করছে না। তারপরও ওই পদে হাথুরুর না থাকাটা মোটামুটি নিশ্চিত। আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন কোচ দিয়েই কাজ চালিয়ে গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে হাথুরুর যোগ্য বিকল্প খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে শীঘ্রই। সেক্ষেত্রে বিসিবি চাইছে সময় নিয়ে দেখেশুনে এগুবে। বিকল্প হিসেবে হাই প্রোফাইল কাউকেই আনা হবে সেটা জানা গেলেও কে হবেন সেই উত্তরসূরি সেটি এখন আলোচনার বিষয়।

হাথুরুসিংহে ইস্যুতে সাকিবেরও রাখঢাক

Also Read - 'অধিনায়ক হিসেবে সাকিব খুবই ভালো করছে'

 

হাথুরুর বিদায়টা বেশ চমক জাগানিয়া। হাথুরু পদত্যাগ করেছেন, এমন খবর প্রথম প্রকাশিত হয় শ্রীলঙ্কার মিডিয়ায়। জানা গেছে, দল যখন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে, তখনই নাকি পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন এই শ্রীলঙ্কান। পরে তা বিসিবির’র পক্ষ থেকে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন নিশ্চিত করেন। তবে পদত্যাগ পত্র পাওয়ার তারিখ আর কারণ কোনটাই খোলাসা করেন নি তিনি। এমনকি হাথুরুও কোন যোগাযোগ করেন নি। বোর্ডের সাথে জড়িত অনেকেই এমনকি জাতীয় দলের অধিনায়কেরাও কিছুই জানতে পারেন নি।

বিসিবি যদিও জানিয়েছিল, ১৫ তারিখে ঢাকা ফিরলে সব পরিষ্কার হবে। বিসসিবি প্রধান আশ্বাস দিয়েছিলেন অভিমান ভেঙে ফিরবেন হাথুরু। কিন্তু এখন সব পরিষ্কার। আর ফিরছেন না তিনি। উল্টো হাথুরু নিজের দেশ শ্রীলঙ্কার প্রধান কোচের দায়িত্ব নিবেন এমন খবর চাউর হচ্ছে। সেই সাথে জানা গেছে লঙ্কান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের কোচ হিসেবে বাংলাদেশ দলের প্রতিপক্ষ হয়ে ফিরবেন তিনি!

 

এশিয়ান কোচদের দিকে চোখ বিসিবির

বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ হিসেবে পরিসংখ্যানের বিচারে সবচেয়ে সফল কোচ হাথুরু। ২০১৪ সালে যখন জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন তখন দল রীতিমত ধুঁকছে। শ্রীলঙ্কার সাথে হোম সিরিজে হোয়াইটওয়াশ। এশিয়াকাপে সব ম্যাচে পরাজয় এমনকি আফগানিস্তানের সাথেও। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের মূলপর্বে সব ম্যাচে হার এমনকি কোয়ালিফায়ারে হারতে হয়েছিল হংকংয়ের সাথেও। তৎকালীন কোচ শেন জার্গেনসন বিদায় নিলে দলের দায়িত্ব বুঝে নেন হাথুরু।

শুরুতে তিক্ত অভিজ্ঞতা পেতে হয়েছিল হাথুরুকেও। ভারতের দ্বিতীয় সারির দলের কাছেও যাচ্ছেতাই পরাজয় বরণ করে টাইগাররা। দ্বিতীয় এসাইনমেন্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেও যে দলের অবস্থা ছিল একই হারতে হয়েছিল সব ম্যাচ। সমালোচনায় বিদ্ধ হাথুরু এবার দলে পরিবর্তন আনলেন। অধিনায়ক হিসেবে মুশফিকের স্থলে আনা হয় মাশরাফিকে। টি-টোয়েন্টি অধিনায়কত্বে সাকিবের আগমন তার সময়েই ঘটে। হারতে হারতে ক্লান্ত একটা দলকে হার না মানা দলে পরিণত করার পিছনে তার ভূমিকা অনেক। সৌম্য, সাব্বির, মোস্তাফিজের উত্থান তার সময়েই। আর তারপরের ইতিহাস সবাই জানে।

 

২০১৫ বিশ্বকাপে মাহমুদুল্লাহর দুই মহাকাব্যিক সেঞ্চুরিতে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা। ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা বদ। ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারানো। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে রিয়াদ-সাকিবের সেই মহাকাব্যিক পার্টনারশিপে সেমিফাইনাল খেলা। তবে শেষটায় আবারও সেই শুরুর অভিজ্ঞতা নিয়েই ফিরলেন তিনি।

দলে অতিরিক্ত প্রভাব খাটানো, অধিনায়কত্ব নিয়ে টানাটানি, মাশরাফি বিন মুর্তজাকে টি-টোয়েন্টি থেকে দূরে সরে যেতে চাপ সৃষ্টি করা, নাসির হোসেন-মুমিনুলকে প্রায় অকেজো বানিয়ে ফেলা, ধারাবাহিক ছন্দে না থাকার পরও কিছু খেলোয়াড়ের কাঁধে আস্থার হাত রাখা, আবার ছন্দ হারিয়ে ফেলা একজন খেলোয়াড়ের খারাপ সময় গেলে তাঁকে ফর্ম ফিরে পেতে প্রয়োজনীয় সাহায্য না করে দূরে ঠেলে দেওয়া, নেটে বোলিং-ব্যাটিং দেখে আকস্মিক দলে সুযোগ দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় লজ্জার হারের পর কোন জবাবদিহিতার মুখোমুখি না হয়েই ছুটিতে চলে যাওয়া সবই তার চলে যাওয়ার লক্ষণ প্রকাশ করছিল। যার চূড়ান্ত রূপ পদত্যাগ।

 

এশিয়ান কোচদের দিকে চোখ বিসিবির

হাথুরুর এমন বিদায়কে নাটকীয়ই বলতে হবে। কারণ, দক্ষিণ আফ্রিকায় বাজেভাবে পরাজয়ের ধাক্কা সামলে উঠার আগেই কোন ইঙ্গিত না দিয়েই অস্ট্রেলিয়াতে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন হাথুরু। এর মধ্যে তার এমন অস্বাভাবিক ছুটি কাটানো নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। খোদ বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এদিকে বিপিএল চলছে। অথচ প্রধান কোচ ছুটি কাটাচ্ছেন। আর তারপরই সেই বিস্ফোরক সিদ্ধান্ত।

সিদ্ধান্তটা কেন নিয়েছেন হাথুরু সেটা নিয়ে বিসিবি সভাপতি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আবেগীয় কিছুর। খেলোয়াড়দের সাথে বনিবনা না হওয়া, মিডিয়ায় তুমুল সমালোচনাও কারণ বলছেন অনেকে। তবে কারণ যাই হোক, এভাবে বিদায় নেওয়াটা মোটেই সুফল বয়ে আনবে না। গর্ডন গ্রিনিজ থেকে চন্ডিকা হাথুরুসিংহে পর্যন্ত বেশির ভাগ কোচের প্রস্থানেই অপ্রীতিকর ঘটনার ছোঁয়া ছিল। গ্রিনিজকে তো রীতিমত অপমান করেই সরানো হয়েছিল। অথচ তার হাত ধরেই ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিতে জিতে ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে খেলে বাংলাদেশ। জ্যামি সিডন্সের বিদায়টাও সুখকর ছিল না। হাথুরুর বিদায়টা হলো আরও বেশি বিব্রতকর।

হাথুরুসিংহের বিদায়ে মুশফিকও বিস্মিতহাথুরু গেছেন, সে ঠিক আছে। কিন্তু আগামী বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নতুন কোচের সন্ধানে নামতে হবে বিসিবি’কে। অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে সাবেক ক্রিকেটার খালেদ মাহমুদ সুজনের নাম শোনা যাচ্ছে। কিন্তু পূর্ণকালীন কোচ নিয়োগের বিষয়টা দীর্ঘসূত্র হলে সমস্যা হতে পারে। আগামী বিশ্বকাপের আগেই নতুন কোচকে দলের সাথে সমন্বয়ে আসতে হবে। বিসিবি যদিও এক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতিতে এগুতে যাচ্ছে, কিন্তু এক্ষেত্রে দেরি করাটা সমীচীন হবে না বলেই মনে করেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক ও দুইবারের প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ যেমন বলেছেন, ‘আমি যেটা শুনেছি সে ফোন টোন ধরছে না। এমন কিছু হলে বিসিবির উচিত খুব তাড়াতাড়ি একজন কোচের সন্ধান করা।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হাথুরুর বিকল্প কে হবেন? দেশী কোচদের নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ভাবনার সময় এখনও আসেনি বলেই মনে হয়। বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস কোচ নিয়োগ নিয়ে বলেছেন, ‘উপমহাদেশর কোচ হলে খুবই ভালো হয়। মধ্যবর্তী সময়ে হয়তো আমাদের দেশি কোচ নিয়োগ দিতে হবে। উপমহাদেশের কোচ হলে আমাদের সংস্কৃতির সাথে খুব তাড়াতাড়িই খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। পাশাপাশি দলের সাথেও তার বোঝাপড়াটা দ্রুত হবে’

কথা ঠিক। সেক্ষেত্রে ভারতের জাতীয় দলের সাবেক কোচ অনিল কুম্বলে, শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে, ভারতের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির প্রসঙ্গ উঠতে পারে। এছাড়া বর্তমানে বিপিএলে রংপুর রাইডার্সের কোচ টম মুডিকে নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন জাতীয় দলের ওয়ানডে অধিনায়ক ও রংপুর রাইডার্সের আইকন ক্রিকেটার মাশরাফি। এমনকি মুডিকে বিশ্বের সেরা কোচ হিসেবেও অভিহিত করেছেন ম্যাশ। ২০০৫ সালে শ্রীলঙ্কা দলের কোচ মনোনীত হন মুডি। তার অধীনে শ্রীলঙ্কা দল ২০০৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। আইপিএলে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের কোচের দায়িত্বেও সফল তিনি। তাকে ভাবনায় রাখার কারণটা পরিষ্কার, উপমহাদেশে তার অভিজ্ঞতা দলের কাজে লাগবে দারুণভাবে।

ভারতের সাবেক কোচ অনিল কুম্বলেকে নিয়েও ভাবনার অবকাশ আছে। তার অধীনে ভারত টেস্ট ক্রিকেটে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল। উপমহাদেশের নিজস্ব কোচ হিসেবে তার বিকল্প খুব কমই আছে। পাকিস্তানের সাবেক বিশ্বসেরা পেসার ওয়াসিম আকরামকে কোচ হিসেবে পেলে তা হবে দারুণ। ওদিকে সাবেক লঙ্কান অধিনায়ক মাহেলার কোচিং অভিজ্ঞতা বেশিদিনের না হলেও অল্প সময়েই আইপিএলের মতো আসরে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সকে শিরোপা এনে দেওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। আর তার খেলোয়াড়ি দক্ষতার কোন তুলনা হয় না।

হাথুরুসিংহের পদত্যাগের ভাবনা টেরও পাননি মাশরাফি

আরেকজনের নাম এখন বেশ জোরসে উচ্চারিত হচ্ছে। তিনি হলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক বোলিং কোচ ও সাবেক জিম্বাবুইয়ান অধিনায়ক হিথ স্ট্রিক। তার অধীনে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৬ সালে টাইগারদের বোলিং আক্রমণ ছিল দুর্দান্ত এবং প্রায় বিশ্বসেরা। এছাড়া তার ব্যাটিং দক্ষতাও কারও অজানা নয়। আবার তারই সতীর্থ এন্ডি ফ্লাওয়ার যিনি জিম্বাবুয়ের ইতিহাস সেরা ব্যাটসম্যান ও ইংল্যান্ড দলের সাবেক কোচ ছিলেন। এই দুজনকে একসাথে কাজে লাগানো যেতে পারে। সাবেক প্রোটিয়া অধিনায়ক শন পোলক কিংবা সাবেক অলরাউন্ডার জ্যাক ক্যালিস হতে পারেন সেরা বিকল্প। এদের সবারই উপমহাদেশে খেলা ও কোচিং করানো উভয় অভিজ্ঞতাই আছে।

দেশীয় কোচদের নিয়েও ভাবার সময় হয়েছে। পাশের দেশ ভারত দেশীয় কোচদের নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। শ্রীলঙ্কাও একই পথে এগুচ্ছে, তাও হাথুরুকে নিয়েই! কোচ হিসেবে যার উত্থান বাংলাদেশে তাকে তার দেশ ঠিকই কাজে লাগাচ্ছে। কিন্তু, আমরা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। খালেদ মাহমুদ সুজন খন্ডকালীন কোচ হিসেবে থাকবেন শোনা যাচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে কি কেউ নেই? তাহলে ঘরোয়া লিগে যারা কোচিং করাচ্ছেন তাদের ভবিষ্যৎ কি? জাতীয় দলের সাবেক তারকারা কোচিং করানোর চেয়ে সাংগঠনিক পদেই বেশি আগ্রহী। কেউ কেউ নির্বাচক আবার কেউ কেউ ক্রিকেট কমিটির পরিচালক হয়েই কাটিয়ে দিচ্ছেন। তাহলে তাদের অভিজ্ঞতা কতোটা কাজে লাগছে দেশের ক্রিকেটে?

যাই হোক, জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে সম্ভাবনা আছে অনেকেরই। শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে সেটা সময়েই বলবে। কিন্তু, যেহেতু উপমহাদেশের কন্ডিশন মাথায় রেখেই কোচ বাছাই করতে হবে তাই এখানে কাজ করে যাওয়াদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিৎ। বিসিবি ধীরে চলার নীতিকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প খুঁজে বের করতে না পারলে হাথুরুর বিদায়ে যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে, আসন্ন বিশ্বকাপে তার প্রভাব পড়তে পারে। সময় কম। ২০১৬ সালের দুর্দান্ত দলটি কিভাবে যেন দুর্বল হয়ে পড়েছে। খেলোয়াড়দের নিয়ে তাই অনেক কাজ করতে হবে নতুন কোচকে। ফলে দীর্ঘসূত্রিতা মোটেই ঠিক হবে না।

আরো পড়ুনঃ অধিনায়ক হিসেবে সাকিব খুবই ভালো করছে’

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

হাথুরুকে পেতে বিসিবিকে এসএলসির চিঠি

অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের দিকে চোখ বিসিবির

প্রকাশ হলো হাথুরুর সঙ্গে মুশফিকের দ্বন্দ্বের কথা

সুজনই পাপনের পছন্দের শীর্ষে

হাথুরুসিংহেকে মিস করবঃ রিয়াদ