SCORE

সর্বশেষ

অভিনন্দন সাকিব, তবে…

সম্প্রতি জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক পদে মুশফিকুর রহিমের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন বর্তমান টি-২০ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। ফলে জাতীয় দলের টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পর শেষ হলো মুশফিক অধ্যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেই এমন জল্পনা ছিল, কিন্তু এমন হুট করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অবাক হয়েছেন অনেকেই। যদিও টেস্ট অধিনায়কত্ব সাকিবের জন্য মোটেই নতুন নয়। খেলোয়াড়ি সাফল্যকে অধিনায়কত্বে টেনে আনবেন সাকিব এমন প্রত্যাশায় নতুন দায়িত্বে তাকে অভিনন্দন। তবে টেস্ট দলের অধিনায়কত্বে মুশফিকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সঠিক মূল্যায়ন করা হলো কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।

শীর্ষেই আছেন সাকিব-স্মিথ-অ্যান্ডারসন

অধিনায়ক মুশফিকের ক্যারিয়ার জুড়ে উত্থান-পতনের গল্প। ২০১১ সালে তিন ফরম্যাটের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পেয়েছিলেন উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিম। ২০১৪ সালে ওয়ানডে দলের বর্তমান অধিনায়ক মাশরাফির কাছে রঙিন পোশাকে অধিনায়কত্ব হারানোর পর গত প্রায় ৩ বছর টেস্ট দলের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। তার অধীনে টেস্ট ক্রিকেটে বেশ কয়েকটি স্মরণীয় জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।  ঘরের মাটিতে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয় ও গলেতে বাংলাদেশের শততম টেস্টে শ্রীলঙ্কাকে হারানোর স্মৃতি ভোলার নয়। চার ম্যাচে জয় এসেছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ দলকে ৩৪ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে ৭ জয়ের বিপরীতে ৯ ড্র অর্জনের পাশাপাশি ১৮টি পরাজয়, এই হচ্ছে তার অধিনায়কত্বের পরিসংখ্যান।

Also Read - খারাপ অভিজ্ঞতা মনেই নেই সাকিবের

মজার বিষয় হচ্ছে, সাকিব আল হাসানের কাছ থেকেই অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পেয়েছিলেন মুশফিকুর রহিম। আর এবার তার কাছ থেকেই দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছেন সাকিব। টেস্ট অধিনায়কত্বের ক্ষেত্রে সাকিবের অতীত মোটেই সুখকর নয়। ৯ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে একটা জয় ছাড়া কোন সাফল্য নেই তার ঝুলিতে। কিন্তু সাকিবকে অধিনায়ক বানানোর ক্ষেত্রে যে কারণটি মুখ্য মনে হয়েছে তা হচ্ছে তার আক্রমণাত্মক মনোভাব। এছাড়া, তার উপস্থিতি মানে দুই খেলোয়াড় একসাথে পাওয়া। ফলে তার হাতে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে টেস্টেও তার সেরা ভূমিকা দেখানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে এমনটাও হতে পারে।

বর্তমান যুগে আগ্রাসী অধিনায়কদের জয়জয়কার। ভারতের অধিনায়ক বিরাট কোহলির উদাহরণ উঠে আসছে এই আলোচনায়। টেস্ট ক্রিকেটে তার অধীনে ভারত র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে পৌঁছে গেছে। অজি অধিনায়ক স্টিভ স্মিথের উদাহরণও আছে। কিন্তু, টেস্ট ক্রিকেট শুধু আক্রমণ দিয়েই হয় না, মাথা ঠাণ্ডা রাখাও অনেক জরুরী। সাকিব কি সেটা পারবেন? মুশফিক মাথা ঠাণ্ডা রেখেই অনেক সাফল্য এনে দিয়েছেন। আরেকটা কথা না বললেই নয়, বিসিবি’র ভূমিকা মাঠের বাইরে থেকে যেভাবে ভিতরেও চলে আসছে সেটাকে সামলানোর কাজটাও তাকে করতে হবে। তবে, আশা করি, হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে অভ্যাস বিসিবি প্র্যাকটিস করছে, তার আশু সুরাহাও হবে।

স্যামির কাছে নেতৃত্ব হারিয়ে অখুশি নন মুশফিক

নতুন কোচ এলে তার সাথে সাকিবের সম্পর্ক এখানে বড় বিষয় হয়ে উঠবে, কারণ কোচদের সাথে খেলোয়াড়দের বাদানুবাদ অনেক ক্ষতি করেছে দেশের ক্রিকেটের। সাবেক কোচ হাথুরু’র বিরুদ্ধে অনেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছিলো। নতুন কোচ যেনো এমন কিছু না করতে পারেন সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরী। সামনে বিশ্বকাপ আসছে। এরপর হয়তো ওয়ানডে দলের অধিনায়কত্বও সাকিবের হাতেই উঠবে। তিন ফরম্যাট সামলানোর দক্ষতা অর্জন সহজ নয়। ফলে, সামনে অনেক বন্ধুর পথ অপেক্ষা করছে সাকিবের সামনে।

সদ্য সমাপ্ত দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে দলের ভরাডুবির জন্য অনেকেই মুশফিকের রক্ষণাত্মক অধিনায়কত্বের দায় দেখেছেন। কিন্তু, যারা এই দায় চাপাচ্ছেন তারা কি ভুলে গেছেন যে, একই সফরে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজেও ভরাডুবি হয়েছিলো বাংলাদেশ দলের। ফলে দায় যদি মুশফিকের হয়, তাহলে বাকি দুই অধিনায়ক মাশরাফি এবং সাকিবও দায় থেকে মুক্ত নন। টি-টোয়েন্টিতে সাকিবের অভিষেক অধিনায়কত্বের ফলও মোটেই সুখকর ছিল না। তাহলে ব্যর্থতার দায় মুশফিকের একার কেন হবে?

দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট সিরিজে ভরাডুবির পিছনে অন্যতম কারণ ধরা হয় সাকিবের অনুপস্থিতিকে। মুশফিক নিজেও সেসময় কিছুটা ক্ষুব্ধ ছিলেন এটা নিয়ে। ক্ষুব্ধ ছিলেন তৎকালীন কোচ হাথুরুও। বিদায়ী সাক্ষাতে সেটা পরিষ্কার করেছেন তিনি নিজেই। সাকিব নিজেও টেস্ট নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী তা বলা যাবে না। কারণ, বছর জুড়ে টি-টোয়েন্টি লিগ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এদিকটায় খুব বেশি মনোযোগ তিনি দিতে পারেন নি। তবে অধিনায়কত্বে ফিরলে হয়তো তার ভাবনায় পরিবর্তন আসবে।

মুশফিককে সরিয়ে দেওয়ার পিছনে কারণ নিয়ে বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন জানিয়েছেন,একেবারে নির্দিষ্ট যে কোনো কারণ আছে, তা কিন্তু নয়। আর থাকলেও সবসময় বলা যায় না। আমরা মনে করেছি, এখানে একটা পরিবর্তন করা দরকার। আমরা মুশফিকের সেরা ব্যাটিংটা চাই। আমরা মনে করেছি যে, ব্যাটিংয়েই সে মনোযোগী হোক। তাকে চাপ মুক্ত করতে চাচ্ছি। আমরা সব ভেবেই এই প্ল্যানটা করেছি। শুধু এখনকারটা দেখলে তো হবে না। আমরা আগামী চারপাঁচ বছরের জন্য একটা প্ল্যান করছিলাম। সেই অনুযায়ী এ প্ল্যান।

সাকিব না থাকায় খুশি ডু প্লেসিস

প্ল্যান আগেও করা হয়েছিল। তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়কের তত্ত্ব বিসিবিই জানিয়েছিল। কিন্তু হাথুরুর বিদায়ী সাক্ষাতের পরই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ আবারও প্রশ্ন তুলেছে। তার আকস্মিক পদত্যাগের ঘটনায় মুশফিকের টেস্ট অধিনায়কত্ব প্রসঙ্গটা প্রায় আড়ালেই চলে গিয়েছিল। আবারও তিনি দেশের ক্রিকেটকে একটা ধাক্কা দিয়ে গেলেন বলেই মনে হচ্ছে। অধিনায়ক মুশফিকের সাথে কোচের বাধানুবাদ নতুন নয়। মাঠে এবং মাঠের বাইরে কোচের অনৈতিক হস্তক্ষেপের কথা সবাই জানে। মাশরাফির টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের সমাপ্তির পিছনেও হাথুরুর ভূমিকার কথা অজানা নয়।

মুশফিকের প্রতি একটা ক্ষোভ ছিল বিসিবি প্রধানেরও। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে অধিনায়ক হিসেবে মুশফিকের সিদ্ধান্ত কিংবা সংবাদ সম্মেলনে ব্যর্থতার দায় টিম ম্যানেজমেন্টের ওপর চাপানো বা ড্রেসিংরুমের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে বলে দেওয়া, এমন সব কারণে বিসিবি প্রধান রীতিমত বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘মুশফিক যেভাবে কথা বলেছে, দেশের ভাবমূর্তি তাতে নষ্ট হয়েছে। এবার সেই বিরক্তির শিকার মুশফিক কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

২০০৯ সালে মাশরাফি বিন মুর্তজার চোটে হঠাৎই টেস্টে নেতৃত্ব পেয়েছিলেন সাকিব। সেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওই দলটি ছিল দ্বিতীয় সারির দল। এরপর অবশ্য বোর্ডের সাথে মনোমালিন্যে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব ছাড়তে হয় সাকিবকে। এবার ৬ বছর পর আবারও একই দায়িত্বে ফিরলেন সাকিব। টেস্টে বাংলাদেশ দলের অধিনায়কত্ব আগের মতো আর সহজ নয়। মুশফিকের অধীনে টেস্টেও একটা পর্যায়ে উঠেছে বাংলাদেশ দল। টেস্ট ক্রিকেটে ফাইট করার শুরুটা মুশফিকের হাত ধরেই হয়েছে। মুশফিক জয়ের একটা ধারা তৈরি করেছেন, যেটা অক্ষুণ্ণ রাখার ভার এখন সাকিবের উপর।

বিশ্ব ক্রিকেটে অনেক রেকর্ডের জন্ম দিয়েছেন সাকিব। তিন ফরম্যাটে অলরাউন্ডার হিসেবে শীর্ষে উঠেছেন অনেকবার। টেস্ট ক্রিকেটে ৫১ ম্যাচ খেলে ৩৫৯৪ রান আর ১৮৮ উইকেট দখল করেছেন তিনি। ব্যাটিং গড় ৪০.৩৮, সেঞ্চুরি ৫টি, হাফ সেঞ্চুরি ২২টি, আছে একটি দ্বিশতকও (নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে)। আর বোলার সাকিবের টেস্টে ১৭টি ৫ উইকেট আর দুইবার ১০ উইকেট নেওয়ার অর্জনও আছে। সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের তালিকায় উপরের দিকেই রাখা হয় তাকে।

খেলোয়াড়ি অর্জনের দিক থেকে সাকিবের ধারেকাছেও নেই বাংলাদেশের কেউ। কিন্তু অধিনায়ক সাকিবের রয়েছে অনেক অপূর্ণতা। তাছাড়া মাঠে এবং মাঠের বাইরে অনেকবার বাজে আচরণের কারণে হয়েছেন শাস্তির সম্মুখিন। একবার টানা ছয় মাস ছিলেন নিষিদ্ধ। সেই তুলনায় মুশফিক অনেক পরিণত ক্রিকেটার। সামর্থ্যের চেয়ে ভাল খেলার উদাহরণ আছে তার। শারীরিক গড়নকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বহু ম্যাচে জয় তুলে এনেছেন। ভয়ানক সব বোলারকে করেছেন তুলোধোনা। ৫৮ টেস্টে তার রান ৩৫১৬, গড় ৩৫.১৬, ১টি ডাবল সেঞ্চুরি সহ ৫ সেঞ্চুরি আর ১৮টি হাফ সেঞ্চুরি আছে তার ঝুলিতে। অধিনায়ক হিসেবে তার অবদান আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু অধিনায়কত্বের শেষটা এমনভাবে হবে সেটা নিতান্তই অস্বাভাবিক বোধ হচ্ছে।

অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে থাকলেও সাকিব দারুণ খেলোয়াড়। দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও বটে। আগের বাজে অভিজ্ঞতাকে পিছনে ফেলে দলকে একসুত্রে গাঁথতে পারলে সাফল্য আসবেই। এক্ষেত্রে দল পরিচালনায় সদ্য সাবেক অধিনায়ক মুশফিকের পরামর্শ গ্রহণ তার জন্য ভাল হবে। আর নব্য সহ-অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড় তো আছেনই। আছেন তার প্রিয় বন্ধু ও সদ্য সাবেক সহ-অধিনায়ক তামিম ইকবাল তো আছেনই।

খেলোয়াড়ি দক্ষতায় সাকিবের কোন তুলনা হয় না। কিন্তু অধিনায়ক সাকিবের অনেক কিছু প্রমাণ করা বাকি আছে। দীর্ঘ সময় পর দায়িত্বে ফিরে কেমন করেন তিনি সেটাই দেখার বিষয়। সামনেই শ্রীলঙ্কা আসছে বাংলাদেশ সফরে। সেই সিরিজে লঙ্কান কোচ হিসেবে প্রথম সফরে বাংলাদেশে আসবেন সাবেক কোচ হাথুরু। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নাড়িনক্ষত্র তার নখদর্পণে। অপরদিকে বাংলাদেশ দল খেলবে ভারপ্রাপ্ত কোচের অধীনে, কিংবা কোচ ছাড়াই। ফলে প্রথম এসাইনমেন্টেই চাপের মুখে পড়তে হবে সাকিবকে। দেখা যাক, তার পুনরায় শুরুটা কেমন হয়। অধিনায়কত্বের জন্য শুভকামনা সাকিব। তবে মুশফিকের জন্যও একটা আক্ষেপ থেকেই যাচ্ছে। মুশফিক হাথুরুর কাছ থেকে শোনা বিসিবি প্রধানের ‘একজন ক্রিকেটারের চেয়ে দেশ অনেক বড় তত্ত্বের শিকার হলেন না তো?

আরও পড়ুনঃ খারাপ অভিজ্ঞতা মনেই নেই সাকিবের

-মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

টস বাতিলের বিপক্ষে সৌরভ

সাদা ও লাল বলের জন্য পৃথক কোচ!

মাশরাফিকে টেস্ট খেলতে বলেছিলেন পাপন

টি-টোয়েন্টি নয়, শান্তকে নিয়ে ভাবনা ওয়ানডে-টেস্টে

টস তুলে নেওয়ার পক্ষে নন বাশার