SCORE

ক্রিকেট মাঠের ‘চার্লি চ্যাপলিন’র বিশেষ দিন

Share Button

ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা, কিন্তু এই খেলাকে আমুদে করে তোলার জন্য যেকজন ক্রিকেটার রেখেছেন অনন্য ভূমিকা উইন্ডিজ দলের সাবেক অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি তাদের মধ্যে অন্যতম। মাঠে বা মাঠের বাইরে তার সদা হাস্যোজ্জল মুখ দেখে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় এমনকি বিরুদ্ধ দর্শকেরও মন বিগলিত হয়ে উঠতে বাধ্য। ম্যাচ হেরেও প্রতিপক্ষের সাথে একগাল হাসিমুখ নিয়ে কথা বলার সামর্থ্য সম্ভবত ড্যারেন স্যামিরই আছে। ক্রিকেটটাকে উপভোগের পাশাপাশি হাসির আড়ালে তার ব্যাঙ্গও উঁকি দেয়। উইন্ডিজের হয়ে দুইটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয় করা অধিনায়ক স্যামি তথা ক্রিকেটের ‘চার্লি চ্যাপলিনে’র আজ ৩৪তম জন্মদিন।

 

Also Read - 'ডাইরেক্টর অফ কোচিং' হচ্ছেন কারস্টেন?

পুরো নাম ড্যারেন জুলিয়াস গার্ভে স্যামি। ১৯৮৩ সালের এই দিনে সেন্ট লুসিয়া নামক ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি দেশটির ইতিহাসে প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের প্রতিনিধিত্বকারী ক্রিকেটার। ক্রিকেটীয় পরিচয়ে তিনি একজন ডানহাতি ব্যাটসম্যান এবং ফাস্ট-মিডিয়াম বোলার। তার বয়স যখন ১৮ ছুঁইছুঁই, সালটা ২০০১, জ্যামাইকার বিপক্ষে নর্দার্ন উইন্ডওয়ার্ডের হয়ে লিস্ট-এ ক্যারিয়ার শুরু হয় তার। সে টুর্নামেন্টে দলের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান করেন স্যামি। সেই যে পাদপ্রদীপের আলোয় এলেন, তারপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

২০০২ সালে নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে খেলার জন্য ডাক পড়ে তার। সেই টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কাছে হেরে যায় স্যামিদের দল। সেই দলটিই পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলে ডোয়াইন ব্রাভো, লেন্ডল সিমন্স, রবি রামপলদের মতো তারকার জোগান দেয়। সেই টুর্নামেন্ট শেষেই প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া স্যামির। তার পুরনো দল নর্দার্ন উইন্ডওয়ার্ডের হয়েই প্রথম শ্রেণিতে নিজের প্রথম টুর্নামেন্টে ২২ উইকেট ও ২৬১ রান তুলে বড় কিছুর ইঙ্গিত দিয়ে রাখেন।

 

এরপর বেশিদিন অপেক্ষার প্রয়োজন হয়নি। পরের বছর ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত নিউজিল্যান্ড-ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ এর মধ্যকার ত্রিদেশীয় সিরিজের দলে ডাক পান স্যামি। তবে তার অভিষেক ওয়ানডে ম্যাচ ছিল ২০০৪ সালের ৮ জুলাই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। একাদশে জায়গা পেলেও বৃষ্টিতে ভেসে যায় সেই ম্যাচ। সেই সিরিজে আর সুযোগ না পেলেও সেপ্টেম্বরে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দলে সুযোগ পান। স্যামির একদিবসীয় ক্রিকেটে প্রকৃত অভিষেক ঘটে বাংলাদেশের বিপক্ষে। সেবারই দীর্ঘ শিরোপা খরা ঘুচিয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আইসিসির কোন টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়নের তকমা জোটে স্যামিদের ভাগ্যে।

২০০৭ সালে টেস্ট অভিষেক হয় স্যামির। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে সেই ম্যাচে তিনি ৬৬ রান দিয়ে তুলে নেন ৭ উইকেট। ৩-০ তে সিরিজ হারলেও স্যামির ওই বোলিং ছিল উইন্ডিজের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত। তবে এরপর অনেকটা সময় নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন তিনি। তিনি নিজেকে আবার পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে ধরেন ২০১০ সালে। সেবার ক্রিস গেইলকে সরিয়ে তাকে অধিনায়ক করা হয়।

অধিনায়ক স্যামির প্রথম সাফল্য কিন্তু বাংলাদেশের বিপক্ষেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাংলাদেশ সফরে ১-০ তে সিরিজ জিতে হাসিমুখে দেশে ফিরে দল। ওই বছরই ট্রেন্ট ব্রিজে ইংল্যান্ড এর বিপক্ষে তুলে নেন ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট সেঞ্চুরি। ২০১৪ সালে ব্যর্থতার দায়ে তাকে টেস্ট অধিনায়কত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। অভিমানে টেস্ট থেকেই অবসর নিয়ে ফেলেন তিনি।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ফেরিওয়ালা স্যামি খেলে চলেছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের ঘরোয়া লিগে। যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই সুন্দর হাসিমুখ আর অভিনব উদযাপনে মাতিয়ে রাখছেন মাঠ। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিপিএলেও প্রতিবারই কোন না কোন ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৩৮ টেস্ট খেলে ব্যাটে ১ সেঞ্চুরি আর ৫ হাফসেঞ্চুরি নিয়ে ১৩২৩ রান, বল হাতে ৪বার ৫ উইকেট নিয়ে ৮৪ উইকেট তার। ওয়ানডেতে ১২৬ ম্যাচ খেলে ব্যাট হাতে ৯টি ফিফটি নিয়ে ১৮৭১ রান, বল হাতে ৮১ উইকেট। টি-টোয়েন্টিতে ৬৮ ম্যাচ খেলে ব্যাট হাতে ৫৮৭ রান, বল হাতে ৪৪ উইকেট। তবে ঘরোয়া লিগের খেলায় ২৬২ ম্যাচে ৬ ফিফটিসহ ৩২৯১ রান, বল হাতে ১৫৫ উইকেট, যা তাকে বিশ্বের ঘরোয়া লিগগুলোয় অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের তকমা এনে দিয়েছে।

 

তার সেরা সাফল্য আসে ২০১২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। স্বাগতিক শ্রীলঙ্কাকে ফাইনালে হারিয়ে ৮ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২০১৬ সালে ঘরের মাটিতে ভারতকে হারিয়ে স্যামির নেতৃত্বে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয় করে ক্যারিবিয়ানরা। তার সম্মানার্থে সেন্ট লুসিয়ার বোসেজের ক্রিকেট গ্রাউন্ডের নাম পরিবর্তন করে ড্যারেন স্যামি ক্রিকেট গ্রাউন্ড রাখা হয়। খেলা চালিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে স্যামিই একমাত্র ক্রিকেটার যার নামে ক্রিকেট স্টেডিয়াম আছে।

কিন্তু, এমন কিংবদন্তী একজনকে কি না ২০১৬ সালের ৫ আগস্ট টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়! আদতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের সাথে বহুদিন থেকেই মনোমালিন্য ছিল ক্রিকেটারদের। স্যামি সব মেনে নেওয়ার পাত্র নন। ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে ইংল্যান্ডকে ৪ উইকেটে হারিয়ে পুরষ্কার মঞ্চে বলা তার সেই বিখ্যাত উক্তি আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।

সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘বোর্ড থেকে আমরা খেলার কোনো সামগ্রী পাইনি। আমাদের ম্যানেজার এগুলো কলকাতা থেকে নিয়েছেন। আজ রাতের আনন্দ আমি আমাদের কোচিং স্টাফ এবং ১৫ জন খেলোয়াড়ের সাথে ভাগ করে নিতে চাই। জানি না এর পর আমরা একসাথে মিলিত হব কিনা। বোর্ড আমাদের ওডিআই দলে সুযোগ দেয় না। টি-টোয়েন্টি দলে আমরা সুযোগ না-ও পেতে পারি। এ জয় আমি ক্যারিবিয়ান ভক্তদের উৎসর্গ করতে চাই।’

মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে এমনই খোলা মনের মানুষ স্যামি। আবেগ সংবরণ করা তার ধাতে নেই। ভারতের ক্রিকেট লিজেন্ড শচীন টেন্ডুলকারের বিদায়ী টেস্টে শচীনেরই ক্যাচ তালুবন্দি করেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন স্যামি। কিংবদন্তীর বিদায়টা তার হাত ধরেই হলো এটা যেন তাকে সেসময় সবচেয়ে দুঃখী মানুষে পরিণত করেছিল। এছাড়া বিপিএলে তার সেলফি তোলার ভঙ্গিতে উদযাপন, গ্যাংনাম স্টাইলে নৃত্য, পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) দ্বিতীয় আসরে পেশোয়ার জালমির হয়ে শিরোপা জিতে প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী মাথা ন্যাড়া করার মতো কাণ্ড তিনি ঘটিয়েছেন।

 

এবার বিপিএলে খেলার জন্য ঢাকায় এসেই পরিচিত সাংবাদিকদের খুঁজে খুঁজে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন, সেলফি তুলেছেন। নিত্যনতুন উদযাপনের নাচ আবিষ্কারে ক্যারিবিয়দের তো জুড়ি নেই। ব্রাভো, গেইলদের চেয়েও উদযাপনে এগিয়ে স্যামি। কখনো ছবি তোলার ভঙ্গি, কখনো ক্যামেরা নিয়ে দুষ্টুমি, মাঠের চিতরে শুয়ে পড়া, সতীর্থদের সাথে ঠাট্টা, কোমর দুলিয়ে নাচ আর গালভর্তি হাসি আর হাসি।

উদযাপন নিয়ে তার নিজের মত, ‘এইসব মজা আসলে মানুষকে চাপ থেকে বের করে আনে। জীবনটাকে এতো সিরিয়াস করে ফেললে সাফল্য আসে না। ভেবে দেখুন, সেলফি তোলার সময় লোকে কতটা উৎফুল্ল থাকে! আমাদের ব্যাপারটিও তাই। আমরা খেলায় তো সবসময় ভালো অবস্থায় থাকি না। কখনো চাপে পড়ি, কখনো টানটান টেনশন হয়। তখন আপনারা সেলফি তুলে যে স্বস্তিটা পান, সেটাই পেতে চাই আমরা। এক এক সময় এক এক ধরণের সেলিব্রেশন করে বের হই।’

তবে এই হাসির আড়ালে এক অন্য স্যামিও আছেন। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের অদ্ভুত ক্রিকেট কাঠামো, দলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও জায়গা না পাওয়া, ক্রিকেটটাকে গম্ভীরতার আবরণে ঢেকে ফেলার বিরুদ্ধে তার হাসিমুখ এক নীরব প্রতিবাদও। তার কাছে জীবনটা সিরিয়াস কিছু নয়, এইজন্যই সেলিব্রেশনে উৎফুল্ল ভাবটাকে টেনে নিতে পারেন হেরে যাওয়া ম্যাচেও। তার হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে ক্রিকেট যে শুধুই একটা খেলা, তা ভাল করেই অনুভব করা যায়। শুভ জন্মদিন, ক্রিকেটের ‘চার্লি চ্যাপলিন’।

আরও পড়ুনঃ ‘ডাইরেক্টর অফ কোচিং’ হচ্ছেন কারস্টেন?

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

ভোরে শুরু হচ্ছে ‘অ্যাশেজ সিরিজ’

ইংল্যান্ডের বোলিং কোচের চাকরি প্রত্যাখ্যান করলেন গিলেস্পি

‘টেস্ট ক্রিকেটের মান বাড়াবে ভারত-পাকিস্তান লড়াই’

সরফরাজের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে পাকিস্তানি টিভি চ্যানেলকে

Leave A Comment