SCORE

সর্বশেষ

আসলেই কি হাথুরু ফ্যাক্টর?

টানা তিন ম্যাচে জিতে উড়তে থাকা বাংলাদেশ দলকে মাটিতে নামিয়ে আনলো চন্ডিকা হাথুরুসিংহের শ্রীলঙ্কা। সিরিজে প্রথমবারের দেখায় যে দলকে ১৬৩ রানের বিশাল ব্যাবধানে হারিয়ে দিয়েছিল, সেই দলের সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাতেই ১০ উইকেটের হার দেখতে হলো টাইগারদের। হারের কারণ খুঁজতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু, টাইগারদের সাবেক কোচ, বর্তমান লঙ্কান কোচ হাথুরু’র কথা ভুলে গেলে চলবে কেন? এই দলের নাড়ি-নক্ষত্র যার নখদর্পণে, এক ম্যাচ জিতেই তাকে হিসাবের বাইরে রাখার ভুলটাই লজ্জার পরাজয়ের কারণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

Also Read - বোলারদের দিনে অস্ট্রেলিয়ার কষ্টার্জিত জয়

আগেই ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ায় অনেকটাই নির্ভার হয়ে খেলেছে বাংলাদেশ দল, সেটা কালকের (২৫ জানুয়ারি) ম্যাচের শুরুতেই স্কোরবোর্ডে মাত্র ৫ রান যুক্ত হতেই এনামুল হক বিজয়ের বোল্ড আউট দেখেই মনে হচ্ছিলো। ৬ বল খেলে শূন্য রানেই বিদায় নিয়ে বিজয় তার খারাপ সময়কে দীর্ঘায়িত করলেন বই আর কিছু না। আগের তিন ম্যাচেই ভাগ্যের ছোঁয়া পেলেও এদিন সেই সৌভাগ্য তার হয়নি। ফলে সৌম্যকে বাদ দিয়ে তাকে দলে নেওয়ার যৌক্তিকতা এখন তিনি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুললেন। ফাইনালে বিজয়ের ওপেনিং করা এখন পেন্ডুলামের মতো ঝুলছে।

ঘরোয়া ক্রিকেটে এই বিজয়ই রানবন্যার কারণে জাতীয় দলে আবারো সুযোগ পেয়েছেন। অথচ, চার ম্যাচেই সুযোগ পেয়েও তার ঝুলিতে মাত্র ৫৪ রান, এর মধ্যে টানা দুই ম্যাচেই কোন রান না করেই সাজঘরে ফিরেন তিনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজয়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন অধিনায়ক মাশরাফি, “কঠিন সময় যেতে পারে। এমন না যে ফার্স্ট ক্লাসে রান করে এসেই আপনি আন্তর্জাতিক ম্যাচে রান করবেন। আমাদের ফার্স্ট ক্লাসের সঙ্গে একটা গ্যাপ অবশ্যই আছে।” এই কথাতেই স্পষ্ট ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল খেলা আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত ভাল করা আলাদা বিষয়, অন্তত আমাদের দেশে।

দ্রুততম বাংলাদেশি হিসেবে 'হাজারি ক্লাবে' বিজয়

বিজয়কে একা দায় দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে এদিন উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার মিছিল শুরু করেছেন বাকি ব্যাটসম্যানরাও। একমাত্র মুশফিক ও সাব্বির দুই অংকের দেখা পেয়েছেন। লাকমল, চামিরা, পেরেরা, সান্দাকান এদিন যেন রীতিমত দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছিলেন। যার ফল মাত্র ৮২ রানেই বাংলাদেশের ইনিংস গুটিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের সবচেয়ে কম দলীয় সংগ্রহের তালিকায় এটি নবম। মাত্র ২৪ ওভার টিকতে পারে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। অনেকেই বলছেন, পিচ ব্যাটিং উপযোগী ছিল না। এই কথা ধোপে টিকে না, কারণ একই পিচে মাত্র ১১.৫ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে লঙ্কানদের জয়ের বন্দরে পৌঁছে গেছে। খেলার স্থায়িত্ব মাত্র ৩৬ ওভার!

পিচ নিয়ে প্রশ্ন তুলেন নি মাশরাফিও। বরং তিনি ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন ,’ইনিংস শেষে আমি কথা বলেছি তামিম ও সাকিবের সঙ্গে। তারা কেউই আমাকে বলেনি উইকেট এতটা খারাপ ছিল। তাই আমার মনে হয়েছে, ব্যাটসম্যানরা ধৈর্যের পরিচয় দিতে পারলে, ১৮০ থেকে ২০০ রান করা যেত। এ ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছে সেটা আমি বলব না, তবে তারা চেষ্টা করেছে, সাফল্য পায়নি।’

আসলে মিডল অর্ডার এখন ভাবনার অন্যতম বিষয়। বোলিং এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। মুস্তাফিজ ফর্মে ফেরার কাছাকাছি, বাকিরাও ভাল বল করছেন। এখন পর্যন্ত সিরিজে ব্যাটিংয়ে তামিম আর সাকিবের উপর ভর করেই ভাল স্কোর পেয়েছে বাংলাদেশ। মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ’র ব্যাটেও কিছু রান এসেছিল কিন্তু মিডল অর্ডারে সাব্বির-নাসিরের ব্যাটে রীতিমত রান খরা চলছে। এটা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ধরে খেলে রানের চাকা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব যাদের উপর, তারা যদি লোয়ার-অর্ডারের মতো আগ্রাসী খেলে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন, দলের জন্য তা বিপদ বই কি! ফাইনালকে উদ্দেশ্য করে দলে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। ওপেনিং জুটিতে আবারো পরিবর্তন আসতে পারে, যেহেতু দলে ইমরুল কায়েসের ডাক পড়েছে। মোহাম্মদ মিঠুনের অন্তর্ভুক্তিও কার্যকর হতে পারে, তবে মেহেদী হাসান মিরাজের একাদশে ফেরার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল।

 

জিম্বাবুয়ের দুশ্চিন্তার নাম মিরপুরের উইকেট

অনেকে যদিও বলছেন আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এটা হারের একটা কারণ হতে পারে, তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে যে বিষয়টা আড়ালে চলে যাচ্ছে কিংবা কেউ মানতে চাইছেন না, তা হলো হাথুরু ফ্যাক্টর। বাংলাদেশের কোচ থাকা অবস্থায় এই হাথুরু’র অধীনে টাইগাররা অনেক স্মরণীয় ম্যাচ এবং সিরিজ জয় করেছে। বিশেষ করে ঘরের মাঠে বাংলাদেশ বাঘে পরিণত হয়েছিল তার আমলেই। বর্তমান দলের অনেকেই তার সময়ে উঠে আসা, অনেকে তার সময়ে ঝরে পড়া। ফলে টাইগারদের সব পরিকল্পনাও তার জানা।

মিরপুরের পিচ নিয়েও হাথুরু’র বেশ ভাল জানা আছে। তার অধীনে খেলার সময় যে পিচ বানানো হতো, তার অধিকাংশের পিছনে তার পছন্দের একটা প্রচ্ছন্ন ভূমিকা থাকতো। গত ম্যাচে পিচ নিয়ে এতো কথা উঠার পিছনে পিচকে দোষারোপ করা হচ্ছে। আর পিচের কন্ডিশন না বুঝে প্রথমে ব্যাটিং নেওয়াকে দোষারোপ করা হচ্ছে। এখানেই হাথুরু প্রসঙ্গ চলে আসে।

বর্তমান সিরিজে কোচবিহীন অবস্থায় সাকিব-মাশরাফির কাঁধে কোচের ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজনও কোচের ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু, তাতে কি কোচের অভাব পূরণ হয়? প্রথম ম্যাচে লংকানদের পরিকল্পনা কাজে লাগেনি। এর পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে হাথুরু’র সামর্থ্যকে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই। অল্প কদিন আগেই যে দলটি ভারতে গিয়ে গো হারা হেরে এসেছে, সেই দল বাংলাদেশের বিপক্ষে তাও ঘরের মাঠে শুরুতেই জিতে যাবে এমনটা ভাবার কিছু নেই। তা হয়ওনি। আমাদের দেশের ক্রিকেট ভক্তদের বড় একটা অংশ হাথুরু’র সামর্থ্যকে মূল্যায়ন করেন না। তাদের ভাবনায় পরিবর্তন আনার বার্তাই যেন দিলেন হাথুরু।

অনেক বলবেন, কথায় কথায় হাথুরু প্রসঙ্গ কেন আসে? কেউ বলবেন, আরে ভাই, খেলাটা বাংলাদেশের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার, বাংলাদেশ বনাম হাথুরু না। সিরিজ শুরুর আগে এই নিয়ে অনেক কথাও হয়েছে। হাথুরু’কে স্যালুট জানিয়েছেন মাশরাফি। আবার বাংলাদেশের জন্য শুভকামনা জানিয়ে হাথুরুও বেশ আন্তরিক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ক্রিকেট খেলা হলেও মাঠে আদতে দুই দলের লড়াই বা যুদ্ধ। এখানে কেউ কাউকে একচুল ছাড় দিবেনা এটাই স্বাভাবিক। ফলে মুখে যতোই বলুক ভিতরে ভিতরে একটা বিরোধী ভাব ঠিকই আছে। এদিকে চলতি ত্রিদেশীয় সিরিজ শেষে দ্বিপাক্ষিক টেস্ট আছে, আছে টি-টোয়েন্টি সিরিজও। ফলে লড়াই এখানেই শেষ নয়। হাথুরু তাই ফ্যাক্ট বই কি!

 

ব্যাটিং ধ্বস বাংলাদেশের, ফাইনাল নিশ্চিত শ্রীলঙ্কার

শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট এখন পুনর্গঠনের উপর দিয়ে যাচ্ছে। তরুণ ক্রিকেটারে ঠাসা। নতুন কোচ হাথুরু এসেই চমক দেখাবেন এটা খোদ লঙ্কানরাও ভাবে না। ফলে প্রথম ম্যাচ জিতেই যারা ভেবেছিলেন হাথুরু শেষ, তাদের জন্য বড় এক শিক্ষা এই ম্যাচ। হাথুরু বড় মাপের কোচ সেটা বাংলাদেশ দল ভাল করেই জানে। ফলে তার পরিকল্পনা আর অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পরিকল্পনা একরকম হবে না সেটাই স্বাভাবিক। তবে হাথুরু’র সাথে কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় আন্দাজ করাই যায়। তবে গত ম্যাচে যেভাবে হেরেছে বাংলাদেশ তাতে সঠিক পরিকল্পনা এবং মনোযোগ দুইটারই অভাব বুঝা গেছে। পিচ নিয়ে হাথুরু’র যেমন বিশ্লেষণ করেছেন, আগের ম্যাচ জিতে উড়তে থাকা বাংলাদেশ দলে তার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

যা হবার তা হয়েছে, এবার সামনের ম্যাচে আরও দায়িত্বপূর্ণ হয়ে খেলতে হবে টাইগারদের। উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসার মানসিকতা পাল্টানো জরুরি। কোন ম্যাচই গুরুত্বহীন নয়। হারের আগেই হেরে যাওয়ার ওই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া আবশ্যক। বিশেষ করে মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা আরও দায়িত্ববান না হলে ফাইনালে তার ফল ভুগতে হবে টাইগারদের। আর তাহলে বাংলাদেশকে নিয়ে হাথুরু সিরিজের আগে যে তাচ্ছিল্য করেছিলেন তাই সত্য হবে। আদতে, যতোই বলা হোক না কেন, হাথুরু বড় ফ্যাক্টর।

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

আরও পড়ুনঃ বোলারদের দিনে অস্ট্রেলিয়ার কষ্টার্জিত জয়

Related Articles

হাথুরুসিংহেদের বিরুদ্ধে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ!

হাথুরুসিংহের মতোই ‘স্বাধীন’ রোডস

হাথুরুসিংহের উত্তরসূরি হচ্ছেন স্টিভ রোডস!

কারস্টেন ব্যর্থ হলেও প্রস্তুত আছেন কোচ!

পরামর্শকই কারস্টেনের ভূমিকা