SCORE

Trending Now

এনামুল-বাশার বীরত্বে প্রথম টেস্ট জয়ের বর্ণিল স্মৃতি

Share Button

১৩ বছর আগের এই দিনে চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে ঘটেছিলো এক অসাধারণ ঘটনা। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ৫ বছর পর প্রথমবারের মতো জয়ের দেখা পেয়েছিলো টাইগাররা। সিরিজের প্রথম টেস্টে তৎকালীন দলপতি হাবিবুল বাশার সুমনের নেতৃত্বে দলটি ২২৬ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে দেয় জিম্বাবুয়েকে। টেস্ট ক্রিকেটের কুলীনদের শত বঞ্চনার জবাব ছিল সেই ম্যাচ। চলুন সেই বর্ণিল স্মৃতি রোমন্থন করে আসি।

২০০৫ সাল। ক্রিকেটের কুলীন এই ফরম্যাটে বাংলাদেশের বয়স তখন পাঁচ বছর। সেই ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর ওই বছরের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন ক্রিকেটের পরাশক্তি ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্ট খেলার পর টানা ৩৩ ম্যাচ পরও অর্জনের খাতা প্রায় শূন্য। ওয়ানডেতে তবু মাঝে মাঝে ঝলক দেখালেও টেস্টে কোনভাবেই সাফল্য ধরা দিচ্ছিল না। টেস্ট ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের অধিকাংশ ক্রিকেট বোদ্ধা তখন বাংলাদেশকে নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে ব্যস্ত।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশ সফরে জিম্বাবুয়ে আসে। দলটি তখন প্রায় ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায়। তারপরও মাসাকাদজা, সিবান্দা, মাতসিকানেরিরা জিম্বাবুয়েকে বাংলাদেশের চেয়েও এগিয়ে নিয়ে গেছেন। চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে চলছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের ২ ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট। এর আগে একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে রাজিন সালেহ’র বাংলাদেশ দলকে ঘাম ঝরিয়ে ছেঁড়েছে জিম্বাবুয়ে।

Also Read - 'বাবার স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করবো'

বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের পর ক্রিকেটারদের উচ্ছ্বাস।
বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের পর ক্রিকেটারদের উচ্ছ্বাস।

যাই হোক চট্টগ্রামে জয়ের প্রত্যাশা নিয়েই মাঠে নামে বাংলাদেশ দল। কারণ, দলে তখন তরুণ প্রতিভার ছড়াছড়ি। নাফিস ইকবাল, আশরাফুল, রাজিন সালেহ, হার্ড হিটার আফতাব, তরুণ প্রতিভা মাশরাফি, তাপস বৈশ্য, স্পিন সেনশেসান এনামুল জুনিয়র আর জাবেদ ওমর, অধিনায়ক হাবিবুল বাশার (মিস্টার ফিফটি), খালেদ মাসুদকে নিয়ে গড়া দলওটি বেশ ভারসাম্যপূর্ণ।

৬ তারিখ, শীতের সকালে জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক টাটেন্ডা টাইবুকে সাথে নিয়ে টস করতে নামলেন দলপতি হাবিবুল বাশার। টসে জিতে ব্যাটিং এর সিদ্ধান্ত নিলেন বাশার। তার সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণ করে টাইগারদের ব্যাটিং জ্বলে উঠলো। উদ্বোধনী জুটিতেই আসে ৯১ রান। এরপর নাফিস ইকবালের ৫৬, দলপতি বাশারের ৯৪, রাজিন সালেহ এর ৮৯, পাইলটের ৪৯, মোহাম্মদ রফিকের ৬৯ আর মাশরাফির ৪৮ মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের সংগ্রহ ৪৮৮, যা সে সময় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংস।

দ্বিতীয় দিনের শেষ সেশনের আগে ১৪৯.৩ ওভার ব্যাটিং করে অলআউট হয় বাংলাদেশ। শেষদিকে মাশরাফি খেলেন ৪৪ বলে ৪৮ রানের ঝড়ো ইনিংস। জিম্বাবুয়ের পক্ষে ১০৯ রান খরচে সর্বোচ্চ ৪ উইকেট দখল করেন ক্রিস্টোফার পোফু। শেষ সেশনে ব্যাটিং করতে নেমে বাংলাদেশের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে চাপে পড়ে যায় জিম্বাবুয়ে। ওই এক সেশনে মাশরাফি-তাপসদের পেস আর রফিকের ঘূর্ণি জাদুর সামনে রীতিমত অসহায় হয়ে পড়েন টাইবুরা। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে জিম্বাবুয়ের সংগ্রহ ৪ উইকেট হারিয়ে মাত্র ৮৪ রান। জয়ের সুবাস উঁকি দিচ্ছিল তখন থেকেই।

তৃতীয় দিনের প্রথম সেশনের শুরতেই আবারো টাইগারদের দুর্দান্ত বোলিং। ১৫২ রান করতেই ৬ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে জিম্বাবুয়ে। দলের এমন বিপদে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক টাইবু। ২৪১ বল খেলে ৯২ রানে যখন রফিকের বলে এলবিডব্লিউ’র ফাঁদে পড়লেন তখন ফলোঅনের চাপ সামলে ৩০৮ রান করে ফেলেছে জিম্বাবুয়ে। এলটন চিগুম্বুরা অধিনায়কের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াইয়ে সামিল হয়ে খেললেন ৭১ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। তবে এই প্রতিরোধ বেশিদূর এগুতে পারেনি। ৩১২ রানেই থামে জিম্বাবুয়ের ইনিংস। মোহাম্মদ রফিক ৬৫ রান খরচে ৫ উইকেট, মাশরাফি ৫৯ রান খরচে ৩ উইকেট আর তাপস বৈশ্য ৮৭ রান খরচে ১ উইকেট তুলে নেন।

নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামার আগেই বাংলাদেশ শিবিরে ধাক্কা। ওপেনার জাবেদ ওমর পায়ের ইনিজুরিতে পড়ে ব্যাট করতে পারছিলেন না। তার বদলে ওপেনিং করতে নামেন রাজিন সালেহ। চাপটা আরও বেড়ে গেল যখন ওপেনার নাফিস শূন্য রানেই ডগলাস হন্ডো’র বলে টেইলরের ক্যাচে পরিণত হলেন। দলের রান তখন মাত্র ৭। দলীয় ৪৭ রানের মাথায় ব্যক্তিগত ২৬ রানে আরেক ওপেনার রাজিন সালেহ বিদায় নিলে চাপ বাড়তেই থাকে।

মোহাম্মদ আশরাফুলও মাত্র ২২ রান করেই ক্রিস্টোফার পোফুর শিকার হলেন। আফতাব আহমেদ চিগুম্বুরার বলে ব্যক্তিগত ১১ রানে ক্যাচ আউট হলেন। দলের বিপদে আরও একবার ‘মিস্টার ফিফটি’ হাবিবুল বাশার দাঁড়িয়ে গেলেন। খেললেন ৫৫ রানের ঝকঝকে এক ইনিংস। অবশেষে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৯ উইকেটে ২০৪ করে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩৮১ রানের। বাংলাদেশের হাতে পুরো একদিনের বেশি সময়, ওভারের হিসাবে ১১৩ ওভার।

৩৮১ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের মতোই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে জিম্বাবুয়ে। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই তাপসের বলে জাবেদ ওমরের স্থলে ফিল্ডিং করতে নামা প্রয়াত মাঞ্জারুল ইসলাম রানার তালুবন্দি হন জিম্বাবুয়ে ওপেনার রজার্স। নিজের পরের ওভারে আবারো তাপসের শিকার জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং অর্ডারের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ভুসি সিবান্দা। ৩.৪ ওভারে জিম্বাবুয়ের স্কোর তখন ২/২! চতুর্থ দিনের শেষ সেশনের শেষে জিম্বাবুয়ের তৃতীয় উইকেটের পতন ঘটান এনামুল হক জুনিয়র। দিনশেষে জিম্বাবুয়ের স্কোর ৩ উইকেটে ৪৬ রান।

শেষ দিনে জিম্বাবুয়ের প্রয়োজন ৩৩৫ রান আর বাংলাদেশের ৭ উইকেট। এমন সমীকরণে খেলতে নেমে তরুণ স্পিনার এনামুল হক জুনিয়র সব আলো যেন একাই কেড়ে নিলেন। মূলত তার ঘূর্ণি জাদুতেই জিম্বাবুয়ের সর্বনাশ নেমে আসে। একাই পাঁচ উইকেট দখল করে জিম্বাবুয়ের পরাজয় নিশ্চিত করেন এনামুল। মাত্র ১৫৪ রানে অল আউট হয় জিম্বাবুয়ে। ২২৬ রানের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয় বাংলাদেশ। ম্যান অব দ্য ম্যাচ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। কিন্তু, শেষে এনামুল হক জুনিয়রের হাতেই উঠে প্রথম টেস্ট জয়ের ম্যাচসেরার পুরস্কার। ম্যাচটি জয়ে অবদান রাখা বাকিদের কথা হয়তো ম্যাচসেরার তালিকায় উঠেনি, কিন্তু তাদের অসামান্য অবদান আজীবন স্মরণীয় হয়েই থাকবে।

প্রথম টেস্ট জয়ের পর অধিনায়ক হাবিবুল বাশার বলেন, ‘সব অনুভূতিই তখন নতুন! প্রথম টেস্ট জয়ের অনুভূতি, প্রথম সিরিজ এগিয়ে যাওয়া, একপর্যায়ে প্রথমবারের মতো সিরিজ জিতে নেওয়া—সবকিছুই ছিল ‘‘প্রথম’’! এই প্রথমের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের নয়।’

বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের দিন ম্যাচ সেরার পুরষ্কার হাতে এনামুল হক জুনিয়র।
বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের দিন ম্যাচ সেরার পুরষ্কার হাতে এনামুল হক জুনিয়র।

 

সেই ম্যাচের দলে থাকা মাশরাফি বিন মুর্তজা বলেন, ‘ওই ম্যাচের কথা মনে থাকবে সারা জীবন। তখন একটা জয়, অনেক বড় ব্যাপার আমাদের কাছে। ক্রিকেট যে পর্যায়েই যাক, প্রথম জয়ের কথা অবধারিতভাবে আসবেই।’

আর সেই ম্যাচের ওপেনিং ব্যাটসম্যান শাহরিয়ার নাফীস বলেন, ‘ওই সময় কিন্তু আমাদের চেয়েও জিম্বাবুয়ের রেকর্ড ভালো ছিল। এর পরও পুরো টেস্টে আধিপত্য ধরে রেখে খেলেছি। এখনো ওই ম্যাচটি কথা ভীষণ অনুপ্রাণিত করে।’

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের পরের টেস্ট ড্র করে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ জয়ের ইতিহাসও গড়ে বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের উন্নতি অনেকটাই ধীর গতির। ১০৪ টেস্টের ইতিহাসে মাত্র ১০টি জয়। তবে আশার কথা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর মতো অভিজ্ঞতা হয়েছে টাইগারদের। অর্থাৎ, ধীরে হলেও উন্নতির ধারা অন্তত বজায় আছে। ধারাটা শুরু হয়েছে ওই প্রথম টেস্ট জয় থেকেই। ১৩ বছর আগের ওই জয় টাইগারদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে যে, টেস্ট ক্রিকেট থেকে আমরা ঝরে পড়তে আসিনি।

প্রথম টেস্ট জয়ের সেই মুহূর্ত আজও রোমাঞ্চ জোগায়। এনামুলের বলে সিলি পয়েন্টে দাঁড়ানো আশরাফুল পোফুর ক্যাচ ধরে যখন উল্লাসে দৌড় শুরু করলেন, পুরো স্টেডিয়াম তখন উল্লসিত। ড্রেসিং রুম থেকে মাঠ সব জায়গায় আনন্দের চিৎকার। পুরো মাঠ যেন তখন উৎসবের মঞ্চ। সেই সাথে পুরো দেশও তখন আনন্দে উদ্বেলিত। ক্রিকেটপাগল মানুষ তখন ঘর ছেঁড়ে রাস্তায় আনন্দমিছিলে নেমেছে। টেলিভিশন, রেডিও তখন এই খবর পৌঁছে দিতে ব্যস্ত। সে এক বর্ণিল মুহূর্ত। এরপর অনেক জয় পেয়েছে টাইগাররা। কিন্তু প্রথম টেস্ট জয়ের সেই মুহূর্তের আনন্দ অবর্ণনীয়। টাইগাররা সেদিন পুরো ক্রিকেট বিশ্বের সামনে দেখিয়ে দিয়েছিল, আমরাও পারি।

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

আরও পড়ুনঃ ‘বাবার স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করবো’

Related Articles

ডিপিএল মাতাতে ঢাকায় ইউসুফ পাঠান

মুশফিক-নাঈমের ব্যাটিং নৈপুণ্যে জয় রূপগঞ্জের

বিজয়-মাশরাফিতে আবাহনীর পাঁচে পাঁচ

কায়েসের পর মুমিনুলের ঝড়ো অর্ধশতক

বড় বিপদে পড়তে পারে বাংলাদেশ!

Leave A Comment