SCORE

সর্বশেষ

সাব্বির-তামিমের দুই বিপরীত সাজা

 

দুজনের শাস্তি দুই বিপরীত কারণে। তাই শাস্তির মাত্রাও ভিন্ন। তামিমের শাস্তি সত্যি কথাটা মুখ ফসকে বলে ফেলায় আর সাব্বিরের শাস্তি ম্যাচ চলাকালে কিশোর দর্শকের গায়ে হাত তোলার কারণে। সাব্বির অবশ্য আরও একটা অপরাধ করেছেন। ম্যাচ রেফারিকে হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে তরুণ ও প্রতিভাবান এই ক্রিকেটার জাতীয় চুক্তি থেকে বাদ পড়ার পাশাপাশি ২০ লাখ নগদ টাকা জরিমানা, এমনকি আরও বড় শাস্তির মুখোমুখি হবেন বলে জানা যাচ্ছে। জাতীয় দলের সামনে অনেক ক্রিকেট সূচি অপেক্ষা করছে। এর আগে এমন সংবাদ মোটেই ভাল হলো না। একইসাথে বিসিবি’র কর্মকাণ্ড নিয়েও অনেক প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর জবাব বা তার জন্য শাস্তি কে পাবে সেটাও ভাবতে হবে।

Also Read - ৪ জানুয়ারি থেকে পিচ নিয়ে আইসিসির নতুন নিয়ম

গত ২ জানুয়ারি (সোমবার) বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি গুরুত্বপূর্ণ দুইটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাল সারাদিন তামিম-সাব্বিরের শাস্তি নিয়ে উত্তাল ছিল সারা দেশের গণমাধ্যম। তবে একইদিনে তামিম আর সাব্বিরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিলেও হতো। কারণ, তামিমের অপরাধ ঠিক অপরাধ বলা যায় না। সদ্য সমাপ্ত বিপিএলে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ও রংপুর রাইডার্সের মধ্যকার চতুর্থ ও শেষ রাউন্ডের লো-স্কোরিং ম্যাচ শেষে পিচ নিয়ে সমালোচনা করেন কুমিল্লার অধিনায়ক তামিম ইকবাল।
সেসময় পিচ নিয়ে আরও সমালোচনা করেছিলেন একই ম্যাচের হেরে যাওয়া প্রতিপক্ষ রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। এছাড়া একই ফ্র্যাঞ্চাইজির আরেক খেলোয়াড় ব্র্যান্ডন ম্যাককালামও এমন সমালোচনা করেছিলেন। পিচ কিউরেটর গামিনী ডি সিলভাকে নিয়েও সমালোচনা করেছিলেন তামিম। ম্যাচজয়ী অধিনায়ক হয়েও যখন পিচের সমালোচনা করেছিলেন, তখন বিসিবি’র উচিত ছিল পিচ নিয়ে সমস্যার সমাধান করা। তামিম সিনিয়র ক্রিকেটার। তার কথার গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো তাকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই দোষে দোষী হয়েও মাশরাফি শাস্তির বাইরে!

 

'প্রয়োজন' ছিল তামিমের শাস্তি!

তামিমের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন, কিউরেটর নিয়ে তামিম কেন কথা বলেছেন? তামিমকে আরও দায়িত্ববান হতে হবে। আর শেষদিকে যা বলেছেন তা তার নিজের জন্যও প্রযোজ্য। তিনি বলেছেন, তামিমের কথাবার্তা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য প্রচুর ক্ষতি করতে পারে এবং তামিমকে তিনি আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। জনাব বিসিবি প্রধান এর আগে মুশফিকের ব্যাপারেও এমন কথা বলেছিলেন। একজন জাতীয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটার ভুল-ভ্রান্তির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবে না, কিন্তু বিসিবি বিশেষ করে বিসিবি প্রধান যেকোন মন্তব্য করতে পারবেন, কি সেলুকাস!

এবার আসি সাব্বির রহমানের বিষয়ে। সাব্বির বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ক্যারিয়ার শুরু করে একের পর এক বিতর্ক তৈরি করে ইমেজ নষ্ট করেছেন আর নিজের খেলার বারোটা বাজিয়েছেন। এর আগে বেশ কয়েকবার মাঠে এবং মাঠের বাইরে বাজে আচরণ এবং অনৈতিক কারণে শাস্তি এবং সমালোচনার মুখে পড়েও তার শিক্ষা হয়নি। বরং এবার আরও বড় অপরাধ করলেন। জাতীয় ক্রিকেট লিগের এক ম্যাচে খেলার সময় দর্শক পেটান সাব্বির, তাও এক কিশোর দর্শক। খবরে প্রকাশ, এই অপরাধের কারণ জানতে চাইলে ম্যাচ রেফারিকেও হুমকি দিয়েছেন তিনি।

ফলাফল, বিসিবি’র কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে সাব্বিরকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। সাব্বিরের শাস্তির এখানেই শেষ নয়। আগামী ছয় মাস ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে পারবেন না তিনি। শুধু তাই না, বিসিবি’র পরবর্তী বোর্ড সভায় শাস্তির পরিমাণ বাড়তে পারে। তবে জাতীয় দলের দরজা তার জন্য এখনও বন্ধ হয়ে যায় নি। অর্থাৎ, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তার হাতে থাকছে। কিন্তু, সাব্বির যাকে কি না বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘ব্যাডবয়’ বলে ডাকা হয়, তিনি নিজেকে শোধরে নিবেন কি না কে জানে।

সাব্বিরের শৃঙ্খলাভঙের ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটেছে। ২০১৬ সালের বিপিএলে গুরুতর শৃঙ্খলাভঙের অভিযোগে ১২ লাখ টাকা জরিমানা গুনেছেন তিনি। এবারের বিপিএলেও ম্যাচ শেষে হাত মেলানোর সময় আম্পায়ার মাহফুজুর রহমানকে গালি দিয়েছিলেন সাব্বির। সেখানেও ম্যাচ ফি’র ৪০ শতাংশ বা প্রায় দেড় লাখ টাকা জরিমানা গুণেছেন তিনি। জানা গেছে, গত দুই বছরে জরিমানা বাবদ প্রায় তেত্রিশ লাখ টাকা গুণেছেন তিনি। একজন ক্রিকেটার কতোটা উশৃঙ্খল হলে তাকে এমন শাস্তি পেতে হয়!
সাব্বিরের অপরাধের শাস্তি নিয়ে অনেকেই তার প্রতি সহানুভুতি দেখাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, দর্শকদের বাড়াবাড়ি আরও বেড়ে যাবে এতে। দর্শকদের বাজে আচরণের শিকার খেলাধুলায় অস্বাভাবিক কিছু না। পাকিস্তানের লিজেন্ড ইমজামাম একবার দর্শক পিটাতে গ্যালারিতে ছুটে গিয়েছিলেন। ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবলে এমন ঘটনা বেশি ঘটে। বর্ণবাদের শিকার হয়ে মাঠে দুয়ো শুনতে শুনতে মাঠ ছাড়ছেন ইতালির মারিও বালোতেল্লি, দুই চোখ ভর্তি জল। এমন ঘটনা ইউরোপীয় ফুটবলে নিয়মিত ঘটনা। তাই বলে কি, তারা দর্শকের গায়ে হাত তুলতে ছুটে যান? তারকাদের শুধু মাঠের খেলা দিয়েই নয়, বরং আচরণ দিয়েও তারকা হতে হয়। এর আগে দর্শকের সাথে অশালীন আচরণের কারণে সাকিব আল হাসান শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু দর্শক পিটানো, তাও এক কিশোর বয়সীকে? এটা সত্যিই মেনে নেওয়ার মতো না।

তবে, মনে রাখতে হবে খেলোয়াড়রাও মানুষ। তাদেরও আবেগ আছে। তাদের আবেগের জায়গাটাতে আঘাত করার অধিকার কারও নেই। কেউ কেউ বলছেন, খ্যাতি আর অর্থের কারণে সাব্বিরের এমন ঔদ্ধত্য। বিষয়টা যদি এমন হয়ও, তারপরও দর্শকদের উচিত ক্রিকেটারদের যথাযোগ্য সম্মান দেখানো, ইদানিং যেটার বড় অভাব। ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আজকাল খুব সহজেই অন্যের মুণ্ডুপাত করা যায়। এই সুযোগে তারকাদের ব্যক্তি জীবন এমনকি তাদের নিয়ে উদ্ভট, অশালীন এবং আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না তাদের। দায়টা তাই, শুধু একপক্ষ থেকে না দেখে দুই পক্ষের দায়টা ভেবে দেখতে হবে। যদিও, সাব্বিরের এবারের ঘটনা ব্যতিক্রম, কেননা এক্ষেত্রে ভিকটিম একজন কিশোর।

অর্ধশতক করে ফিরে গেলেন সাব্বির
বাংলাদেশর ক্রিকেটারদের আচরণে দিনকে দিন কেমন যেন আগ্রাসী পরিবর্তন আসছে। মাঠে আগ্রাসী হওয়াটা ভাল, কিন্তু মাঠের বাইরেও যদি পাগলাটে আচরণ করে কেউ তা মেনে নেওয়া উচিত নয়। তাই সাব্বিরের শাস্তি অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক হয়েছে। এরপরও যদি তিনি না শোধরাতে পারেন তাহলে সেটার চেয়ে খারাপ আর কিইবা হতে পারে। তরুণ ক্রিকেটারদের মাথা একটু গরম থাকে। কিন্তু সাব্বিরের মতো এমন গরম মাথার ক্রিকেটার দলে রাখা বিপজ্জনক। নতুনরা কি শিখবে তার মতো খেলোয়াড়দের কাছ থেকে?
তবে আশার কথা হচ্ছে, বিসিবি এবার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু, বিসিবি নিজেও নানা দোষে দুষ্ট। এই যেমন একই কথা বলেও তামিমের মতো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি মাশরাফিকেও। কিন্তু, আসলে কি তাদের কথাটা অন্যায় কিছু ছিল? এর আগে মুশফিক দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যা বলেছিলেন তাও কি অন্যায় কিছু ছিল? এটা ঠিক জাতীয় দলের ক্রিকেটার বিশেষ করে অধিনায়কদের ঘাড়ে অনেক দায় থাকে। অনেক কথাই তারা মুখ ফুটে বলতে পারেন না। কিন্তু সত্যটা জনসম্মুখে তখনই আসে, যখন তেমন পরিস্থিতির তৈরি হয়। যদি মুশফিকের সমস্যার সমাধান করা হতো তাহলে ওভাবে মুখ খুলতে হতো না তাকে।

আবার মিরপুরে পিচ নিয়ে মন্তব্য করারই প্রয়োজন হতো না, যদি কিউরেটর কাজটা ঠিকমত করতেন। তাই দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার যে অভ্যাস বিসিবি করে যাচ্ছে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য সেটা মোটেও শুভ কিছু নয়। বিসিবি প্রধানের খামখেয়ালী বক্তব্যও অনেকবার মিডিয়ায় এসেছে, কিন্তু এজন্য তাকে কেউ কোনভাবে অভিযুক্ত করতে পারবে না। নিয়ম তৈরি হলে সবার জন্যই তা প্রযোজ্য হতে হবে, না হলে নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়।

সাব্বিরের শাস্তি একটা নতুন মাত্রা দিয়েছে। এর আগে যদি রুবেল-সানি-শাহাদাতদের মতো ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রেও কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা হতো তাহলে হয়তো এমন ঘটনার হার কমে যেতো। তারকাখ্যাতি পেয়ে কেউ যদি তার অপব্যবহার করে তার জন্য সাব্বিরের মতোই কড়া শাস্তি প্রযোজ্য হোক এমনটাই প্রত্যাশা।
সাব্বিরকে নিয়ে অনেক উচ্চাশা ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের। কিন্তু এক লহমায় কোটি মানুষের ভালবাসা যেন ছুড়ে ফেলে দিলেন এই প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান। তবে দর্শকদেরও মনে রাখতে হবে তারকারাও মানুষ। দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন যারা, তাদের ভাল সময়ে যেমন উচ্ছ্বসিত হই, তেমনি তাদের দুঃসময়ে পাশে থাকাও উচিত, নতুবা তাদের ফিরে আসা কঠিন হয়ে যাবে।

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

আরও পড়ুনঃ ৪ জানুয়ারি থেকে পিচ নিয়ে আইসিসির নতুন নিয়ম

Related Articles

স্ট্রাইকিং প্রান্তে শুরু করতেই ভালোবাসেন তামিম

তামিমের দৃষ্টিতে যেমন হবে উইন্ডিজের উইকেট

প্রস্তুতি নিতে বাড়ি যাননি তামিম

ড্র দিয়ে শুরু করল তামিম-রুবেলের ব্রাজিলও

মুখোমুখি হয়ে মাশরাফি-তামিমের রঙ্গ-যুদ্ধ