SCORE

সর্বশেষ

একেই বলে রাজসিক প্রত্যাবর্তন!

ঠিক চার বছর পর টেস্ট ক্রিকেটে ফিরেই প্রথম ইনিংসে স্পিন ঘূর্ণিতে প্রতিপক্ষকে রীতিমত নাচিয়ে ঠিক চারটিই উইকেট তুলে নিয়েছেন বাঁহাতি স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক। করেছেন টেস্ট ক্রিকেটের এক ইনিংসে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। আর তাতেই লংকানদের মাত্র ২২২ রানে আটকে দিয়েছে বাংলাদেশ। অথচ এমন এক অসাধারণ স্পিনারকে কিনা জাতীয় দলে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল! ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত খেলেও জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়ার যন্ত্রণার কি রাজসিক প্রত্যাবর্তন!

 

প্রথম সেশন বাংলাদেশের

Also Read - 'ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব'

চট্টগ্রামের প্রথম টেস্টের স্কোয়াডে থাকলেও একাদশে জায়গা হয়নি আব্দুর রাজ্জাকের। অথচ, চট্টগ্রামে প্রথম টেস্টের জন্য তাকে স্কোয়াডের বাইরে থেকে ডেকে নেয়া হয়। তার স্থলে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয় সানজামুলের। সেই টেস্ট শুরুর আগে তাকে টেস্ট ক্যাপ পরিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এই রাজ্জাকই! সানজামুল নিজের প্রতি সুবিচার করতে ব্যর্থ হন। নির্বিষ বোলিং দিয়ে নির্বাচকদের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হন সানজামুল। আর ভাগ্যের কি খেল, পরের টেস্টে সেই সানজামুলের স্থলেই একাদশে স্থান করে নেন বাংলাদেশের ‘স্পিনের রাজা’ খ্যাত রাজ্জাক। সুযোগ পেয়ে তার নিদারুণ সদ্ব্যবহারও করলেন রাজ্জাক। ক্যারিয়ারে এক ইনিংসের সেরা বোলিং করে বসলেন, আর তার সঙ্গে যোগ্য সঙ্গ দিলেন তাইজুল। তাদের দ্বৈত স্পিন বিষে নীল হয়ে ২২২ রানেই থেমে গেল শ্রীলংকার ইনিংস। রাজ্জাকের বোলিং কার্ডঃ ১৬-২-৬৩-৪। রাজ্জাকের জন্য এর চেয়ে ভাল প্রত্যাবর্তন আর কি হতে পারে?

 

'ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব'

মিরপুর শেরাবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পিচ এমনিতেই স্পিন বান্ধব। আর এবার খেলার আগেই তার নিশ্চয়তাও পাওয়া গিয়েছিল। সেই স্পিন বান্ধব উইকেটের দারুণ ব্যাবহার করলেন রাজ্জাক-তাইজুল। শুরু থেকেই রাজ্জাকের বলের সর্পঘূর্ণি ছোবল হানাছিলো লংকানদের ব্যাটে। আর উইকেটের ধরণ বুঝেই কিনা অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ বোলিং ওপেন করালেন মিরাজ-রাজ্জাক জুটিকে দিয়েই। এটাও এক রেকর্ড! টেস্ট ক্রিকেটের ১৪০ বছরের ইতিহাসে প্রথম দুই ওভারে স্পিন আক্রমণ নিয়ে আসার এটি মাত্র দ্বিতীয় উদাহরণ। সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণ করতেই যেন ইনিংসের মাত্র ষষ্ঠ ওভারের প্রথম বলেই ধুকতে থাকা লংকান ওপেনার দিমুথ করুনারত্নেকে (৩) তুলে নিয়ে প্রত্যাবর্তনকে রাঙিয়ে তুলেন রাজ্জাক।

প্রথম উইকেট স্ট্যাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলে পেলেও নিজের দ্বিতীয় স্পেল ও ইনিংসের ২৮তম ওভারের প্রথম বলেই দানুষ্কা গুনাতিলকাকে মিড অফে থাকা মুশফিকের ক্যাচে পরিণত করেন রাজ্জাক। এরপরের বলে আবারো উইকেট। এবার এক স্বপ্নের মতো ডেলিভারিতে বোল্ড করে দেন ডিফেন্সিভ খেলা লংকান অধিনায়ক দিনেশ চান্ডিমালকে। প্রত্যাবর্তনেই হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা! খাঁদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা লংকানদের ভরসা তখন রোশেন সিলভা। তাকে আউট করে হ্যাটট্রিক তুলে নিতে কসুরে কোন ত্রুটি না রাখতে অধিনায়ক মাহুমুদুল্লাহ’র সাথে পরামর্শ করে ব্যাটসম্যানের চারদিকে ফিল্ডার দিয়ে ঢেকে ফেলেন রাজ্জাক। স্লিপ, সিলি পয়েন্ট, ফরোয়ার্ড শর্ট লেগ, ব্যাকওয়ার্ড শর্ট লেগ, গালি ও শর্ট এক্সট্রা কাভার, রীতিমত মৌমাছির চাক। তবে হ্যাটট্রিকটা হলো না। বরং ৬৮ রান করে ফেলা কুশল মেন্ডিসকে দ্বিতীয় সেশনের দ্বিতীয় বলেই বোল্ড করে সেই আক্ষেপ ঘুচান রাজ্জাক।

হ্যাটট্রিক না হলেও আসল কাজটা রাজ্জাকই করেছেন। লংকান ব্যাটসম্যানদের নিয়ে রীতিমত স্পিন ক্লাস করালেন যেন। রাজ্জাকের স্পিন ঘূর্ণি সোনালী সময়ের রাজ্জাককেই যেন মনে করইয়ে দিচ্ছিলো। একসময় জাতীয় দলের অপরিহার্য বোলার ছিলেন তিনি। ফর্মের পড়তির কারণে দল থেকে বাদ পড়লেও ৩৫ বছরের রাজ্জাক হাল ছেঁড়ে দেওয়ার পাত্র নন। এই বয়সেও তার দারুণ ফর্ম তার পরিশ্রমের সফল পরিণাম বলাই যায়। দলের নিয়মিত অধিনায়ক ও প্রধান বোলার সাকিবের অনুপস্থিতিতে তার উপরেই দায়িত্ব বর্তেছিল। চট্টগ্রামে সুযোগ না পাওয়ায় প্রমাণ করতে পারেন নি। সানজামুলের ব্যর্থতা তাকে সেই সুযোগ এনে দিলো। আর তা কত দারুণভাবেই না সামলালেন রাজ্জাক।

 

তবে এখনো অনেক পথ বাকি। যে স্পিন বিষে নীল শ্রীলংকা, একই বিষে আক্রান্ত বাংলাদেশও। স্কোর বোর্ডে মাত্র ৫৬ রান তুলেতেই নিজেদের প্রথম ইনিংসে খেই হারিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ। প্রথম দিন শেষে ২২ ওভার খেলে ৪ উইকেট হারিয়ে বসেছে টাইগাররা। আগের ম্যাচের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি পাওয়া মমিনুল আজ কোন রান না করেই রানআউট হয়ে ফিরেছেন। জ্বলে উঠতে ব্যর্থ তামিম, ইমরুল, মুশফিকও। যদিও লংকান বোলারদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সফল পেসার লাকমল। কাল আবার হেরাথ জাদু না শুরু হয়ে যায়! হেরাথ আর সান্দাকান হয়ে উঠতে পারেন রাজ্জাক-তাইজুল। ফলে এমন স্পিন স্বর্গে ব্যাটিং নিয়ে খুব বেশি আশা না করাই শ্রেয়। বরং দ্বিতীয় ইনিংসে লংকান ব্যাটসম্যানদের আবারো স্পিনে কাবু করতে রাজ্জাকের উপর ভরসা রাখতে হবে। ক্যারিয়ারের গুধূলি লগনে যেন তারুণ্যের ভরপুর, উচ্ছল সেই রাজ্জাক আবার ফিরে এসেছেন।

দুর্দান্ত বোলিং দিয়ে প্রত্যাবর্তন টেস্টের পাদপ্রদীপের আলো কেড়ে নিয়েছেন রাজ্জাক। উইকেটের সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন তিনি। ৮৫% গুড লেংথে বল করেছেন তিনি। আজ কতোটা ভয়াবহ ছিলেন রাজ্জাক সেটা অনুমান করা মোটেই কষ্টকর নয়। বরং, কষ্টকর হচ্ছে এটাই যে, এমন অসাধারণ বোলারকে কিনা দলে ডেকেও টিম ম্যানেজমেন্ট চট্টগ্রাম টেস্টে বিবেচনাতেই আনেনি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৫০০ উইকেট প্রাপ্তির আনন্দের পর চট্টগ্রাম টেস্টে ফেরা তার জন্য স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু ক্যারিয়ারে বঞ্চনা যেন তার পিছু ছাড়ছিল না। বর্তমান লংকান কোচ চন্ডিকা বাংলাদেশের কোচ থাকা অবস্থায় রাজ্জাকের দলে ঢোকার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত ভাল করেও তাই বঞ্চনার শিকার হতে হয় তাকে।

ক্যারিয়ারে মাত্র ১২টি টেস্ট খেলেছেন রাজ্জাক। ২০০৬ সালে অভিষেকেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছিলেন উইকেটশূন্য। তারপর ১৩ মাস দলের বাইরে কাটানোর পর ২০১৪ সাল পর্যন্ত বারবার দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছে তাকে। এই আট বছরে ৪বার দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছে তাকে। এর মধ্যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০১১ সালে হারারে টেস্টে মাত্র ১ উইকেট পাওয়ার পর ২৫ মাস দল থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয় তাকে। শুধু টেস্টে কেন, ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম বাংলাদেশী বোলার হিসেবে ২০০ উইকেট দখল করেও দল থেকে বাদ পড়তে হয় তাকে। ভাল ফর্মে থেকেও টি-২০ একাদশেও রাখা হয়নি তাকে। ক্যারিয়ার জুড়েই এমন বঞ্চনা সয়েছেন তিনি। এই শ্রীলংকার বিপক্ষেই সর্বশেষ ২০১৪ সালে টেস্ট খেলেছিলেন রাজ্জাক।

 

ঢাকা টেস্টেও তাকে নেওয়া-না নেওয়ার নাটক চলেছে। খেলা শুরুর আগে তাকে নেওয়া হবে কিনা তা স্পষ্ট করছিল না টিম ম্যানেজমেন্ট। এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরার পথেও ছিলেন তিনি। তার অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন হবে না এবারও প্রায় ধরেই নেওয়া হয়েছিলো। অথচ, ঢাকা টেস্টে সুযোগ পেয়েই একপ্রকার মানসিক চাপে পিষ্ট রাজ্জাক কি দারুণ রাজসিক প্রত্যাবর্তন করলেন। সত্যি রাজ্জাক একজন দুর্দান্ত লড়াকু ক্রিকেটার। যে বয়সে অনেকে জাতীয় দল থেকে অনেকে অবসর নিয়ে ফেলেন, সেই বয়সে কিনা তরুণদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কি অসাধারণ পারফরম্যান্স! একেই বলে রাজসিক প্রত্যাবর্তন।

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

উইন্ডিজ সফরের টেস্ট স্কোয়াডে ‘ইন-আউট’ যারা

দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ল রাজ্জাকদের বেতন

সাকিবের পাশে থিতু হতে চান অপু

রাজ্জাকের স্পিন ঘূর্ণিতে চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণাঞ্চল

‘যেখানেই খেলি না কেন ভালো খেলতে হবে’