SCORE

সর্বশেষ

হারলেই নতুন মুখ!

চট্টগ্রাম টেস্টে ড্র করার পর ব্যাটসম্যানদের সফলতার হাত ধরে পরের টেস্টে ভাল কিছু করার উদ্দেশ্যে পুরো স্পিন বান্ধব পিচে স্পিন নির্ভর দল নিয়ে পরের টেস্ট খেলতে নামে বাংলাদেশ। ফলাফল, আড়াই দিনেই ম্যাচ প্যাকআপ। লঙ্কান স্পিনারদের সামনে টাইগারদের অসহায় আত্মসমর্পণেই পরাজিত হয় বাংলাদেশ। সেই দুঃস্বপ্ন শেষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের দলে একঝাক নতুন মুখ আনা হয়েছে। একটা টেস্ট ম্যাচ খারাপ হয়েছে বলে একেবারে ৫জন নতুন মুখ নিয়ে দল সাজানো বিস্ময়ের বই কি!

মিরপুর টেস্টে একপ্রকার ধোঁকা খেয়েছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের স্পিন বান্ধব পিচে ব্যাটসম্যানদের দারুণ ব্যাটিংয়ে অতি উৎসাহী হয়ে মিরপুরেও স্পিন নির্ভর পিচ বানানো যে কাল হয়ে দাঁড়াবে তা হয়তো বুঝতে পারেন নি নির্বাচক এবং খেলোয়াড়েরাও। যেজন্য একইরকম স্কোয়াড, তথা একজন মাত্র পেসার আর বাকি সব বোলাররা স্পিনার, এমন দল নিয়েই খেলতে নামে বাংলাদেশ। দলে হুট করে আনা হয় সাব্বির রহমানকেও। কিন্তু ফল হয় উল্টো। যদিও অতীতে এমন পিচে বরং মিরপুরের পিচেই অনেক দলকেই স্পিনে ঘায়েল করেছে টাইগাররা। কিন্তু এবার ব্যর্থ হলেন, কারণ প্রতিপক্ষ দলটি স্পিনে দারুণ ব্যালেন্সড শ্রীলঙ্কা আর তাদের কোচ হাথুরুসিংহে। অপরদিকে বাংলাদেশ দলের ব্যাটসম্যানদের অকারণ উইকেট বিলিয়ে দেওয়া।

Also Read - শুধু গামিনীর দায়, মানতে নারাজ সুজন

টেস্টের দলে অন্যতম অপূর্ণতা ছিল সাকিবের অনুপস্থিতি। তার মতো বিশ্বমানের স্পিনার এদেশে আর নেই। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট ফেলা সম্ভব হয়েছে খুব কমই। আর সাকিবের ব্যাটিংতো আছেই। তবে এটা কোন অজুহাত হতে পারেনা। দলে আরও অনেক ভাল ব্যাটসম্যান ছিলেন। তারা স্পিন ভাল খেলেন। কিন্তু ঢাকা টেস্টে তাদের ব্যর্থতাই ভুগিয়েছে দলকে। মাত্র ১১০ রানে প্রথম ইনিংসে সব উইকেট হারানো, মুমিনুলের আগের ম্যাচের ঝলক মিলিয়ে যাওয়া, তামিম-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহদের ব্যর্থতা আর সাব্বিরের আবারো দলে ফিরে কিছুই না করতে পারার সাথে ক্যাচ মিস। রীতিমত দুঃস্বপ্নের এক ম্যাচ। স্পিনারদের কারিশমাও কাজে লাগেনি। এইসব ব্যর্থতার দায় টিম ম্যানেজমেন্টের উপরও বর্তায়। এসবের আছর না আবার আসন্ন টি-টোয়েন্টি সিরিজেও পড়ে!

এবার আসি পরবর্তী টি-টোয়েন্টি সিরিজ নিয়ে। আসন্ন সিরিজ উপলক্ষে স্কোয়াড ঘোষণা করা হয়েছে। প্রথম টি-টোয়েন্টির দলে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে এসেছে সাকিব আল হাসানের নাম। ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফিরেছেন তিনি, এমনটাই ভেবেছিলেন সবাই। কিন্তু পরে জানা গেলো সাকিবের সুস্থ হতে লাগবে আরও দুই সপ্তাহ। ফলে তার স্কোয়াডে থাকা এক বিস্ময়। এমনকি প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীনও স্বীকার করেছেন, ‘১৫ তারিখে সাকিব যে খেলতে পারবে না, সেটা তো জানতামই। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে তাকে পাচ্ছি না। তবে পরেরটিতে প্ল্যান আছে তাকে নিয়ে।’ কিন্তু পরেরটাতেও তাকে পাওয়া যাবেনা এটা নিশ্চিত। তাহলে এমন খামখেয়ালির মানে কি? রাজ্জাককে নিয়েও চট্টগ্রাম টেস্টে এমনই এক খামখেয়ালী করা হয়েছিলো। প্রথমে চমক দেখিয়ে দলে এনে, আবার অকারণে বসিয়ে রাখার পর সমালোচনার ফলে আবার পরের টেস্টেই দলে নিতে হয়েছিল তাকে। অপরদিকে সাব্বিরকে নেওয়ার পক্ষে এক অদ্ভুত যুক্তি খাঁড়া করা হয়েছিল। তাকে নাকি টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রস্তুতির জন্য নেওয়া হয়েছিলো। টি-টোয়েন্টির জন্য প্রস্তুতি নিতে টেস্ট দলে নেওয়া? অদ্ভুত যুক্তি আর কাকে বলে।

 

এবার তাদের আরেক খামখেয়ালী দেখুন, সর্বশেষ দলের থেকে ৭টি বদল এনে ৫ জন নতুন মুখ এনে স্কোয়াড সাজানো হয়েছে। জাতীয় দলে এই প্রথমবারের মতো সুযোগ পেয়েছেন আবু জায়েদ রাহী, আরিফুল হক, মেহেদী হাসান, জাকির হাসান ও আফিফ হোসেন। এদের সবাই ঘরোয়া বা বয়সভিত্তিক পর্যায়ে দারুণ পারফরম্যান্স করছেন। কিন্তু একেবারে ৫ জন নতুন মুখ কেন? সাবেক বাঁহাতি স্পিনার রফিকের ভাষায়, ‘পাঁচজন নতুন মুখ নেওয়ার উদ্দেশ্য এই বাংলাদেশ টিম এখন খেলোয়াড় খুঁজে পাচ্ছে না।’ কথাটা কতোটা যৌক্তিক তাতো নির্বাচকদের অবস্থা আর দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজনের কথাতেই বুঝা যায়। নান্নুর কথা আগেই বলেছি, এবার সুজন হাল ছেঁড়ে দেওয়ার মতো করেই বললেন, ‘পার্সোনালি আমি আর আগ্রহী না। আমার আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গেই কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। আমার আসলে নোংরা লাগছে সত্যি কথা বলতে গেলে ওইভাবে।’

সুজনের চোখে বাংলাদেশের মিডিয়া নাকি ফিশি। মানে তাতো ঠিকই আছে। আপনারা যেসব কাজকর্ম করছেন তাতে ফিশি না হয়েই বা উপায় কি? সাকিবের খেলা না খেলা নিয়ে প্রধান নির্বাচক নান্নু আর বিসিবি চিকিৎসক ডাক্তার দেবাশিস দুজনের আলাদা বক্তব্য দেখলেই বুঝা যায় আসলে কতটা সমন্বয়হীন হয়ে পড়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট। দেবাশিস সাকিবের বিষয়ে বলেছেন, ‘এখন বলার মত কোন অবস্থা নেই। গ্যারান্টি দিয়ে বলা যাবে না সাকিব কত দিনের মধ্যে ফিট হবে। তাই আমরা বলতে পারবো না সাকিব এই সিরিজে মাঠে ফিরতে পারবে না। আবার মাঠে ফিরতে পারবে এটাও বলতে পারবো না।’ আর সাকিব নিজেই বলে দিয়েছেন তিনি এই সিরিজে খেলতে পারবেন না।

এবার আবারো আসি ৫ জন নতুন খেলয়াড়ের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে। সেই সাথে ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সবশেষ টেস্ট সিরিজে দলে জায়গা না পেলেও টি-২০ সিরিজের দলে রাখা হয়েছে সৌম্য সরকারকে। মানে বিজয়কে নিয়ে যে উচ্ছ্বাস আর আগ্রহ ছিল তা মিলিয়ে গেছে। দলে আসা-যাওয়ার এই খেলা চলতেই থাকবে। কিন্তু নতুন যাদের নেওয়া হলো তাদের ভিতর কজন টিকতে পারবেন সেটাই প্রশ্ন। কারণ, এক-দুই ম্যাচ খেলিয়ে আবারো দলের বাইরে যেতে হতে পারে এদের মধ্যে অনেকেরই। এর আগেও অনেক খেলোয়াড়ের অভিষেক সিরিজের পর আর দলে প্রবেশ করার সুযোগ হয়নি। সবচেয়ে ভাবার বিষয় এটাই যে, এতো বিশাল পরিবর্তন আদতে কি কাজে লাগবে?

পাঁচজন খেলোয়াড় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ইচ্ছা নির্বাচকদের জাগতেই পারে। তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু যারা দলে নিয়মিত ভূমিকা রাখছেন তাদের উপর কি বার্তা দিচ্ছে এটা? আমাদের নির্বাচকদের এই এক সমস্যা, ম্যাচ হারলেই দলে পরিবর্তন আনা। তাতে কাজ হোক আর না হোক। মোহাম্মদ মিঠুনকে ত্রিদেশীয় সিরিজে মাত্র এক ম্যাচের জন্য দলে নিয়ে আবার সরিয়ে দেওয়া হলো। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল খেলছেন মোসাদ্দেক। দ্বিতীয় টেস্টের দল থেকে তাকে সরিয়ে সাব্বিরকে নেওয়ার ফল হলো শূন্য। অথচ, দল থেকে বাদ পড়ার পর ঘরোয়া লিগের ম্যাচেই দুর্দান্ত খেলেছেন তিনি।

Image result for mohammad mithun

নতুনদের দুজন পেসার। আবু হায়দার রনি ও আবু জায়েদ রাহি। মিডিয়াম পেস বোলার হিসেব আরিফুল হকও আছেন। স্পিন নির্ভর দলে কি তাদের সুযোগ হবে? ১৫ জনের দলে অফস্পিনার আছেন দুজন, মেহেদি হাসান ও আফিফ হোসেন ধ্রুব। সাকিবের অনুপস্থিতিতে সম্ভবত আফিফ হোসেন ধ্রুবকে খেলানো হবে। তবে দলে নাকি চার পেসার খেলানোর কথা ভাবা হচ্ছে। কারণ, মিরপুর আর সিলেটের পিচ নাকি হবে ‘স্পোর্টিং উইকেট’! তা এমন কথা আগেও শোনা গেলেও টি-টোয়েন্টি সিরিজের পিচ নিয়ে দলের ভাবনা এমনই। তবে একটা কথা না বললেই নয়, নতুন যারা দলে আসছে তাদের যথেষ্ট সুযোগ দিতে হবে। নাহলে দলের কম্বিনেশন ঠিক করতে সময় লেগে যাবে। তাহলে পুরনোদের জন্য দলে ফেরার রাস্তা দীর্ঘ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ দল মানেই স্পিন নির্ভরতা। সাকিবকে নিয়ে ধোঁয়াশা কেটে গেছে। এখন তার স্থলে একজন বাঁহাতি স্পিনার আনার কথা বলা হচ্ছে। তাহলে অভিজ্ঞ আব্দুর রাজ্জাককে সুযোগ দিলেই তো হয়। নাকি সেখানেও নতুন মুখ আসবে কে জানে। ম্যাচ হারার এই প্রবণতা দলে বিশাল পরিবর্তন এনে কতোটা সামাল দেওয়া যাবে সেটা সময়ই বলে দিবে। কিন্তু, সবমিলিয়ে বাংলাদেশ দলটা কেমন যেন অগোছালো, সমন্বয়হীন বলে মনে হচ্ছে। আর কতো এসব দেখতে হবে কে জানে? সামনে বিশ্বকাপ। পরীক্ষা-নিরীক্ষার একটা সীমা টানার এখনই সময়। নয়তো এসবের প্রভাব বিশ্বকাপে পড়বেই।

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

আরও পড়ুনঃ শুধু গামিনীর দায়, মানতে নারাজ সুজন

Related Articles

আশাহীনতার দায় কি বিসিবি’র নয়?

তাসকিন-সৌম্যদের জন্য মাশরাফির প্যাশন টোটকা

পরের ম্যাচে সুযোগ পাবেন তো মুস্তাফিজ?

কেমন আছেন মুম্বাইয়ের মুস্তাফিজ?

টাইগার হয়ে উঠার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল যেদিন