SCORE

সর্বশেষ

গ্ল্যাডিয়েটর মুশফিকের পাশে বেমানান সাব্বির

কালকের প্রেমদাসা স্টেডিয়াম যেন একটুকরো রোমান কলোসিয়াম, আর মুশফিক যেন এক যুদ্ধাহত গ্ল্যাডিয়েটর। গ্যালারিভর্তি দর্শক আর তাদের প্রিয় দলকে স্তব্ধ করে দিয়ে যুদ্ধ জয়ের হুংকার ছুঁড়ে যেন যুদ্ধজয়ী গ্ল্যাডিয়েটরের ভূমিকায় মুশফিক। তার নাগিন ড্যান্সও তাই মোটেই বেমানান মনে হয়নি, বরং দলের বিপদে হাল ছেঁড়ে দেওয়া সাব্বির যেভাবে রণে ভঙ্গ দিলেন তাকে ঠিক ব্যাখ্যাতিত মনে হয়েছে। সব মিলিয়ে ঐতিহাসিক এক জয়ের রাতে মুশফিক যেন সত্যিকারের গ্ল্যাডিয়েটর আর সাব্বির তার পাশে বড়ই বেমানান।

নিদাহাস ট্রফিতে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে স্বস্তির জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। টানা হারের জ্বালা নিয়ে মাঠে নেমে বোলারদের ব্যর্থতায় শ্রীলঙ্কার ঝুলিতে ২১৪ রানের বিশাল পুঁজি তুলে দেয় বাংলাদেশ। বোলিং অলরাউন্ডার হওয়ার স্বপ্ন দেখা পেসার তাসকিন আবারো বোলিং ব্যর্থতার ডালি সাজিয়ে মাত্র ৩ ওভারেই ৪০ রানের বিনিময়ে ১ উইকেট তুলে নিলেন। তাকে বারবার সুযোগ কেন দেওয়া হয় সেই প্রশ্ন আবারো রেখে গেলেন তিনি। তার মতোই কাল রান দেওয়ার মেশিন হয়ে উঠলেন মুস্তাফিজ (৪ ওভারে ৪৮ রানে ৩ উইকেট), রুবেল (৪ ওভারে ৪৫ রানে উইকেটশূন্য)। বাকিদের অবস্থাও তথৈবচ। মুস্তাফিজ তবু ৩ উইকেট নিয়ে মান রক্ষা করেছেন। কিন্তু তাসকিন লঙ্কান অধিনায়ক চান্দিমালের  উইকেট পেলেও যা বোলিং করেছেন তা তাকে নিয়ে সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। তার বিকল্প এখন ভাবতেই হবে। স্কোয়াডের সাথে থাকা বাকিদের সুযোগ দেওয়ার এখনই সময়।

Also Read - মুশফিকের নাগিন উদযাপনের কারণ জানালেন তামিম

তবে স্বস্তি হয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ। মাত্র ২ ওভার বল করেই ১৫ রানের বিনিময়ে মেন্ডিস ও শানাকার গুরুত্বপূর্ণ ২ উইকেট তুলে নিয়ে। তাতে অবশ্য লঙ্কানদের রানের চাকা থামানো যায়নি। পাওয়ার প্লেতে ১ উইকেট হারিয়ে ৭০রান তোলে শ্রীলঙ্কা। শেষ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক খেলেই ওভারপিছু ১০.৭০ করে রান তুলে ২১৪ রানের পুঁজি গড়ে শ্রীলঙ্কা। তবে অন্য অনেক ম্যাচের মতো কালকের ম্যাচে বাংলাদেশ ব্যাটিং করতে নেমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রান তোলেনি। ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পাওয়া লিটন দাস কাল নিজের সেরাটা দিয়েই খেলেছেন। অমন দুর্দান্ত জয়ের পিছনে তামিম আর লিটনের ওপেনিং জুটিতে ৭৪ রানের জুটির অনেক বড় ভূমিকা ছিল। মাত্র ১৯ বলে ৫টি ছক্কা ও ২ চারে লিটনের ৪৩ রান আর তামিমের ২৯ বলে ৬ চার ও ১ ছক্কায় ৪৭ রানের দুই ইনিংস জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিল।

প্রথম উইকেট হারানোর পর সৌম্য সরকার ওয়ান ডাউনে নেমে যেন নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন। তার ২২ বলে ২৪ রানের ইনিংস আসলে বোঝাতে পারবে না কতোটা নড়বড়ে মনে হয়েছে তাকে। মুশফিক যখন মাঠে নামলেন তামিম ফিফটির আশা জাগিয়েও বডি লাইনে থিসারা পেরেরার বলে ক্যাচ তুলে দিলেন, আর তা বোলার নিজেই ধরলেন। মনে হচ্ছিলো আবারো একটি দুঃস্বপ্ন তাড়া করবে বাংলাদেশ দলকে। কিন্তু মুশফিক যেন অনেক রান ক্ষুধা নিয়েই নেমেছিলেন। শুরুতে কিছুটা দেখেশুনে খেললেও সময় বুঝে হাত খুলতে শুরু করেন তিনি। অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ ১১ বলে ২০ রান করে কিছুটা সঙ্গও দিলেন মুশফিককে। কিন্তু এরপর যখন সাব্বির নামলেন তখন সবার প্রত্যাশা ছিল হয়তো সাব্বির নিজ কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিবেন। তবে এমন দিনেও নিস্প্রভ সাব্বিরের ব্যাট। শূন্য রানে রান আউট হয়ে সাব্বির আবারো তার দলভুক্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছেন।

ম্যাচের শেষ দুই ওভারে যখন ১৯ রান প্রয়োজন, মুশফিক সিঙ্গেল নিলে ক্রিজে এসে নুয়ান প্রদীপের ইর্য়কার বলটি আলতো করে ঠেলে দিয়ে এক রান নেয়ার চেষ্টা করেন সাব্বির। আর এই রান নিতে গিয়ে মাঝ ক্রিজেই দৌড়ের গতি কমিয়ে দেন তিনি। সরাসরি থ্রোতে তাকে আউট করে দেন পেরেরা। টেলিভিশন রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা গেছে সাব্বিরের গাছাড়া ভাব। অমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার অমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ বাংলাদেশের দর্শকদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এমনকি দলের ক্রিকেটারদের মধ্যেও স্পষ্ট অসন্তোষ চোখে পড়েছে। তবে একপাশে অটল ছিলেন মুশফিক। ভাগ্যিস ছিলেন। নাহলে এতদিনের আরাধ্য জয়টা সুদূর পরাহতই থেকে যেতো। তার ৩৫ বলে ৭২ রানের ইনিংস আসলে তার বীরত্বের পুরোটা বুঝাতে পারবে না। ৫ চার, ৪টি ছক্কাও না। আত্মবিশ্বাসের স্ফুরণ দেখিয়ে যেভাবে জয় ছিনিয়ে আনলেন তাতে তাকে গ্ল্যাডিয়েটর উপাধি দেওয়াই যায়।

সাব্বিরের দায়িত্বজ্ঞানহীন আউট দেখেও অটল ছিলেন মুশফিক। তার নিজেকে প্রমাণের কিছু নেই, তবু এতদিন জমানো সব ক্ষোভ যেন আবার সেই ক্ষুধার্ত বাঘের মতোই জাগিয়ে তুললো তাকে। তিনি যখন ক্রিজে এলেন জয়ের জন্য দলের প্রয়োজন ছিল ৬৩ বলে ১১৫। এমন অবিশ্বাস্য হিসাবও কি নিপুণ দক্ষতায় মিলিয়ে দিলেন মুশফিক। জীবন মেন্ডিসের বলে অসামান্য রিভার্স সুইপ, শানাকার ভাল একটি ওভারকে শেষ দুই বলে ছক্কা-চার মেরে বাজে বানিয়ে দেওয়া, চামিরার ওভারে চার-সিঙ্গেল-ডাবলস, দানুশকার বলে স্লগ সুইপে ছক্কা, সৌম্য বিদায় নেওয়ার ওভারে নিজেকে সামলে নিয়ে শেষ বলে চার মেরে চাপ সরানো, সাব্বিরের আউটের ওভারেও ছক্কা মেরে চাপ সামলানো, শেষ ওভারে চার মেরে জয় ছিনিয়ে এনে থিসারা পেরেরার সামনে দাঁড়িয়ে বাঘের গর্জন। যুদ্ধ জয়ের গর্জন। তার অমন উদযাপন আর নাগিন ড্যান্স পুরো বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদেরও নাচিয়ে ছেঁড়েছেন। কতো অপরিচিত একটা দৃশ্য কতো আপন হয়ে উঠেছে যেন।

মুশফিকের সৌজন্যে পাওয়া এই জয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই বাংলাদেশের সেরা জয়গুলির একটি। অথচ এই মুশফিককে নিয়েই কতো সমালোচনা। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তার রানও বলার মতো ছিল না। কিন্তু কি মোক্ষম সময়ে কি মোক্ষম জবাটাই না দিলেন মুশফিক। হারতে হারতে ক্লান্ত একটা দলকে এনে দিলেন অমায়িক জয়ের সুবাস। মুশফিককে নিয়ে একটা কথা বলতেই হয়, নিজের সামর্থ্যের চেয়েও ভাল খেলেন তিনি। প্রতিটি ট্রেনিং সেশনে দলের সবার আগে গিয়ে ট্রেনিং করে ঘাম ঝরিয়ে আসেন তিনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে শটের পরিধি বাড়িয়ে নেওয়া আর ব্যকরণের বাইরে গিয়ে অভিনব সব শট খেলার দক্ষতা এসব তার অনন্য নিবেদনের ফসল। নিজেকে প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্রতই এই মুশফিকের সাফল্যের চাবিকাঠি।

সেই বেঙ্গালুরুতে জয়ের আগেই উদযাপন করতে গিয়ে ১ রানে ম্যাচ হেরে যে গ্লানি এতদিন বয়ে চলেছেন মুশফিক, কাল প্রেমাদাসায় সেই দুঃস্মৃতির গায়ে কালি লেপে দিলেন তিনি। হারতে হারতে অসুখী এক পরিবারের মুখে হাসি ফুঁটাতে কঠিন হয়ে উঠা প্রতিপক্ষকে নিদারুণ দক্ষতায় হারিয়ে বুনো উল্লাসে মাতলেন মুশফিক। তাই তো তাকে কলোসিয়ামের গ্ল্যাডিয়েটর বলা হচ্ছে। সাব্বিরের মতো ক্রিকেটারদের জন্য যুদ্ধজয়ের একটা মাপকাঠিও তুলে ধরলেন তিনি। শুধু তাই না, নিজের সন্তানের বয়স ৩৫ দিন আর সেই সমান ৩৫ বল খেলেই নিজের ও দলের জয় এনে দিয়েছেন মুশফিক। এ এক অনন্য জয়, সন্তানের জন্য বাবার দারুণ উপহার। আর ক্রিকেট থেকে ক্রমেই দূরে সরে যেতে বসা এদেশী ক্রিকেটভক্তদের জন্য এক স্বস্তির উপলক্ষ্য। জয়তু মুশফিক।

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

আরও পড়ুনঃ মুশফিকের নাগিন উদযাপনের কারণ জানালেন তামিম

Related Articles

নিদাহাস ট্রফি থেকে ৪৮২ শতাংশ লাভ!

অসুস্থ রুবেল, দোয়া চাইলেন সবার কাছে

যেখান থেকে শুরু ‘নাগিন ড্যান্স’ উদযাপনের

‘খারাপ করছি দেখেই বেশি চোখে পড়ছে’

লঙ্কান দর্শকরা ভুল বুঝেছিল বাংলাদেশকে!