SCORE

সর্বশেষ

হৃদয় ভাঙা হারে ম্রিয়মান শততম টেস্ট জয়ের স্মৃতি

আজকের এই দিনে শ্রীলঙ্কার মাটিতে অনুষ্ঠিত নিজেদের ইতিহাসের শততম টেস্টে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। কোথায় আজ সেই সুখস্মৃতি রুমন্থন করবে পুরো দেশ, তার বদলে একরাশ মনখারাপের প্রহর কাটছে সবার। গতকাল ভারতের বিপক্ষে নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে শেষ বলের ট্র্যাজেডিতে হেরে শোকে মুহ্যমান পুরো বাংলাদেশ। এই হার হৃদয় ভাঙা হার, কারণ এমন হার যে নতুন নয়। বারবার ফাইনালে উঠলেই হার নিয়ে মাঠ ছাড়ার যন্ত্রণা। ভক্তদের হৃদয় কেঁদে উঠে। সেই কান্নার রেশ সহজে মিলায় না। হারের যন্ত্রণা অব্যক্ত হাহাকার হয়ে বাজে আরও একটা জয়ের প্রাপ্তি পর্যন্ত।

২০১৭ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক বিশেষ দিন। এদিন শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে শততম টেস্টে জয় পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল পুরো বাংলাদেশ। তামিম ইকবালের অনবদ্য ৮২ রানের সুবাদে শ্রীলঙ্কাকে চার উইকেটে হারিয়ে পি সারা ওভাল মাঠে ইতিহাস রচনা করে উল্লাসে ফেটে পড়েছিল বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটার, কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পুরো বাংলাদেশ। সেই টেস্টে জয় পাওয়া সহজ ছিল না। শ্রীলঙ্কাকে তার আগে কখনো হারাতে পারেনি বাংলাদেশ। কিন্তু শততম টেস্টে ভিন্নরূপেই হাজির টাইগাররা। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে শ্রীলঙ্কা ৩৩৮ রান করে, জবাবে নিজেদের প্রথম ইনিংসে সাকিব আল হাসানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ৪৬৭ রান করে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে শ্রীলঙ্কা ৩১৯ রান করলে ১৯১ রানের টার্গেট ৬ উইকেট হারিয়ে পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। ম্যাচের নায়ক সাকিব আল হাসানের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে সেদিন কঠিন এক লড়াই সহজে জয় করে নেয় টাইগাররা। সাকিব প্রথম ইনিংসে করেছেন সেঞ্চুরি। ম্যাচে তাঁর ৬ উইকেট, রান ১৩১।

Also Read - ‘অভদ্রতাকে ভদ্র ভাবেই ধরিয়ে দিতে হয়’

 

Image result for bangladesh 100th test win

সিরিজ সেরা সাকিব। ম্যাচসেরা তামিম ব্যাট হাতে দারুণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২২ রানে ২ উইকেট হারানোর পর ৮২ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেন তিনি। তৃতীয় উইকেটে সাব্বির রহমানের সঙ্গে তার ১০৯ রানের জুটি জয়ের পথ তৈরী করে দেয়। তবে পার্শ্বনায়কের ভূমিকায় মুস্তাফিজের কথা না বললেই নয়। চতুর্থ দিন লাঞ্চের পর ৭ ওভারের আগুনে স্পেলে মুস্তাফিজের ৩ উইকেট তুলে নেওয়া ৩১৯ রানে শ্রীলঙ্কাকে আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছে। প্রথম ইনিংসে মোসাদ্দেক করেছিলেন ৭৫ রান, সৌম্য ৬১ আর দ্বিতীয় ইনিংসে সাব্বির ৪১ রান। শেষদিকে দলীয় ১৬২ রানে পঞ্চম উইকেট হারানো পর বেশ চাপে পড়েও ম্যাচ শেষ করে আসেন মুশফিক আর মোসাদ্দেক। আসলে সবার মিলিত প্রয়াসেই এসেছিল সেদিনের সেই ঐতিহাসিক জয়। বিদেশের মাটিতে চতুর্থ আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম জয় এসেছিল ওই ম্যাচেই। অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর বিশ্বের চতুর্থ দল হিসেবে শততম টেস্টে জয় তুলে নিয়ে আনন্দে ভাসে দল, আনন্দে ভাসে পুরো বাংলাদেশ।

 

Image result for Bangladesh vs indian nidahas

শততম টেস্টে জয়ের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা ম্লান হয়ে গেছে গতকালের হৃদয়বিদারক পরাজয়ে। ভারতের বিপক্ষে শেষ ওভারের ট্র্যাজেডিতে শেষ আরও একটি ফাইনাল জয়ের স্বপ্ন। সৌম্য সরকারের করা ইনিংসের শেষ ওভারের শেষ বলে ভারতীয় উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান দিনেশ কার্তিকের মারা এক অসাধারণ ছক্কায় আরও একবার তীরে এসে তরি ডুবল বাংলাদেশের। অথচ মুস্তাফিজের করা ১৮তম ওভার শেষে জয়টা নিঃশ্বাস দূরত্বেই মনে হচ্ছিলো। মুস্তাফিজ যখন নিজের শেষ ওভার করতে এলেন ভারতের ১৮ বলে লাগে ৩৫ রান। ক্রিজে মনিশ পান্ডে ২৮ আর বিজয় শঙ্কর ১২ রান নিয়ে। ফিজের ওই ওভারে লেগ বাইয়ে কেবল এক রান এল। প্রথম চার বল ডট। শেষ বলে পান্ডে আউট। উইকেট মেইডেন! কি অসাধারণ ওভার! শেষ ১২ বলে জয়ের জন্য ৩৪ রান লাগে ভারতের। কিন্তু বিপত্তিটা তার পরই ঘটলো। আগের তিন ওভার ভাল বল করা রুবেল নিজের শেষ ওভারে দিনেশ কার্তিকের কাছে অসহায় হয়ে পড়লেন। ২টি করে ছক্কা ও চার মেরে ২২ রান নিয়ে নিলেন কার্তিক। অথচ তার আগের ৩ ওভার করে মাত্র ১৩ রানে ২ উইকেট শিকার করেছিলেন রুবেল। নিজের ওই ওভারের জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন রুবেল। কিন্তু কার্তিক যা করেছেন তাতে রুবেলকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই।

শেষ ওভারে বোলার স্বল্পতায় সৌম্যর হাতে বল তুলে দিলেন সাকিব। তখনও জয় থেকে ১২ রান দূরত্বে ভারত। প্রথম ৩ বলে ৩ রান দিয়ে বাংলাদেশকে জয়ের স্বপ্ন দেখান সৌম্য। কিন্তু শেষ বলে ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচ শেষ করে দিলেন কার্তিক। এই নিয়ে ৫বার কোন টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠে খালি হাতে ফিরতে হলো টাইগারদের। ২০০৯ সালে ঢাকায় ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ফাইনালে বাংলাদেশ হেরেছে ২ উইকেটে। মুত্তিয়া মুরালিধরনের মতো বোলার সেবার ব্যাট হাতে তাণ্ডব চালিয়ে ম্যাচ বের করে নিলেন। এরপর ২০১২ সালের এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষেও ২ রানের হারে কেঁদেছিল পুরো দেশ। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের এশিয়া কাপের ফাইনালেও ভারতের বিপক্ষে ৮ উইকেটেরে পরাজয়। শেষবার ২০১৮ সালের শুরুতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ৭৯ রানের হার। আর গতকালের স্মৃতিতো টাটকা। বারবার এত কাছে এসেও অধরা সাফল্য ধরা দিচ্ছে না। হতাশাতো আছেই তবে সেই সাথে আশাও আছে। বাংলাদেশকে কিছুদিন আগেও মনে হচ্ছিলো অতি সাধারণ এক দল, কালকের ফাইনাল আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই অসাধারণ জয় সেই সংশয় অনেকটাই মিটিয়ে দিয়েছে। সেই লড়াকু বাংলাদেশ ফিরে এসেছে।

 

Image result for Bangladesh vs indian nidahas

ভারতের বিপক্ষে কালকের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার গ্যালারিতে শ্রীলঙ্কানদের হাতে তাদের স্বাধীনতা দিবসে ভারতের পতাকা উড়েছে। নাগিন ড্যান্স দিয়ে উৎসব করেছে ভারতীয়রা, সাথে শ্রীলঙ্কানরাও। এমনকি ভারতের সাবেক অধিনায়ক ও ধারাভাষ্যকার সুনীল গাভাস্কারও বাংলাদেশকে কটাক্ষ করে নাগিন ড্যান্স দিয়েছেন। পুরো সিরিজেই বাংলাদেশকে নিয়ে উপহাস আর কটাক্ষ করার প্রবণতা দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে সেটা হিংসায় পরিণত হয়েছে। সব কিছুই ভুলে যাওয়া যেতো যদি জয়টা ধরা দিতো। কিন্তু অধরা ফাইনাল কিছুতেই ধরা দিলো না। এই শ্রীলঙ্কার মাটিতেই গত বছর আজকের দিনে নিজেদের শততম টেস্টে জয় তুলে উল্লাস করেছিলো বাংলাদেশ। আর কাল সেখানেই কান্নার অশ্রু ঝরেছে টাইগারদের, লেখা হলো আরও একটি কান্নার গল্প। কিন্তু আশায় বুক বেঁধেইতো এতদূর। সুদিন আসবেই।

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

আরও পড়ুনঃ ‘অভদ্রতাকে ভদ্র ভাবেই ধরিয়ে দিতে হয়’

Related Articles

নিদাহাস ট্রফি থেকে ৪৮২ শতাংশ লাভ!

অসুস্থ রুবেল, দোয়া চাইলেন সবার কাছে

যেখান থেকে শুরু ‘নাগিন ড্যান্স’ উদযাপনের

‘খারাপ করছি দেখেই বেশি চোখে পড়ছে’

লঙ্কান দর্শকরা ভুল বুঝেছিল বাংলাদেশকে!