Scores

অগাধ আস্থা লোয়ার অর্ডারে!

ক্রিজে দুইজন ব্যাটসম্যানের মাঝে একজন স্বীকৃত বা অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। অপরজন নেমেছেন শুধু সঙ্গী হিসেবে থাকতে। টেলএন্ডার কিংবা লেজের ব্যাটসম্যান বলতে আমরা যাদের চিনি! জুটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মূল কাজটা করেন সেই স্বীকৃত ব্যাটসম্যান। অপরজন শুধু করে যান সঙ্গ দেওয়ার কাজটা। তাই স্বীকৃত ব্যাটসম্যান নিজের কাছেই রাখতে চান স্ট্রাইক। ব্যতিক্রম চিত্র শুধু বাংলাদেশ দলে!

অগাধ আস্থা লোয়ার অর্ডারে

বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ৩১৫ রানের লক্ষ্য সামনে। শেষ ৫ ওভারে জিততে চাই ৫১ রান। ক্রিজে তখন ৩০ বলে ৩৮ রান করা মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন এবং দশ নম্বরে নামা রুবেল হোসেন।

বর্তমানে লিস্ট এ ক্রিকেটে রুবেল হোসেনের ব্যাটিং গড় ৬.৫০ এবং আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ৫। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের আগে দুই অঙ্কের কোটায় গিয়েছেন দুইবার, প্রতিপক্ষ ছিল আফগানিস্তান। সেই রুবেল হোসেনের ওপর ভরসা রেখেছিলেন সাইফউদ্দিন। ৪৬তম  ওভারের শেষ বলে রুবেলের সিঙ্গেল নেওয়ার ডাকে সাড়া দিলে পরের ওভারে স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখেন রুবেল।

Also Read - টেস্ট ক্রিকেটে অনীহা প্রকাশকারীদের নিয়ে ভাবছে বিসিবি


ঐ ম্যাচে একের পর এক উইকেট ছেড়ে দিয়ে শট খেলতে গিয়ে পরাস্ত হচ্ছিলেন রুবেল হোসেন। ৪৭ তম ওভারে এসে প্রথম দুই বলে রুবেল রান নিলেন এক। নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তে ৩৩ বলে ৪০ রান করা সাইফুদ্দিন যিনি সেদিন ছিলেন দারুণ ছন্দে। ঐ ওভারের শেষ দুইটা বলও খেলেন রুবেল। তবে রান পাননি।

শেষ ১৪ বলে ২৯ রান প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের।  এবারও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে স্টাম্প ছেড়ে দিয়েছিলেন রুবেল। সেটাকে তাক করে জাসপ্রিত বুমরাহ দিলেন ইয়োর্কার। রুবেল হলেন বোল্ড। পরের বলে বোল্ড হলেন মুস্তাফিজুর রহমান। অপর প্রান্ত থেকে চেয়ে দেখলেন ৩৮ বলে ৫১ রানে অপরাজিত থাকা মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। ঐ দুই বলে স্টাম্প বাঁচানোর চেষ্টায় থাকলে  চিত্রনাট্যটা অন্যরকম হতো কিনা কে জানে!

বিশ্বকাপেই উইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ে ভারত। ৪৯ ওভারে ভারতের রান ৭ উইকেটে ২৫২। শেষ ওভারে স্ট্রাইকে মহেন্দ্র সিং ধোনি। প্রথম বলে ছক্কা মারার পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলে সুযোগ ছিল প্রান্তবদলের। কিন্তু অপর প্রান্তে থাকা কুলদীপ যাদবকে স্ট্রাইকে আনেননি ধোনি। চতুর্থ বলে মারেন চার। পঞ্চম বলে আবারও সিঙ্গেল না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শেষ করেন ছক্কা দিয়ে। তিন বলে সিঙ্গেল প্রত্যাখ্যান করেন ধোনি। অপর তিন বল থেকে রান হয় ১৬। ২৬৮ রান করা ভারত ম্যাচ জিতে ১২৫ রানে।

এ গল্পটাও বিশ্বকাপের। লিডসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের জিততে এক উইকেটে চাই ৪৭ রান, হাতে ৩৬ বল। এক প্রান্ত আগলে রেখে ৭৩ বলে ৫৭ রান করা বেন স্টোকসের সাথে শেষ উইকেটে জুটি বেঁধেছেন মার্ক উড। এ টেলএন্ডারের ওয়ানডেতে বর্তমানে ব্যাটিং গড় ৮।

অগাধ আস্থা লোয়ার অর্ডারে

লাসিথ মালিঙ্গার করা ৪৫ তম ওভারের ছয়টা বলই খেলেন বেন স্টোকস। দুইবার সিঙ্গেল নেওয়ার সুযোগ পেয়েও স্ট্রাইক ছাড়েননি। শেষ বলে রান নিয়ে পরের ওভারে স্ট্রাইক ধরে রাখেন। পরের ওভারের শেষ বলে স্ট্রাইক দেন মার্ক উডের কাছে। এর আগের পাঁচ বলে ছক্কা মারেন দুইটি। ঐ পাঁচ বলে রান সংগ্রহ করেন ১৫।  ৪৭ তম ওভারেও প্রথম চার বলে কোনো সিঙ্গেল নেওয়ার শট খেলেননি বেন স্টোকস। এর মাঝে দুইটি মারেন চার। পঞ্চম বলে সিঙ্গেল নিয়ে শেষ বলে স্ট্রাইক দেন উডকে। ঐ বলেই উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে উড আউট হলে ২০ রানের জয় পায় শ্রীলঙ্কা। স্টোকস অপরাজিত থাকেন ৮৯ বলে ৮২ রান করে।

অ্যাশেজের গল্পটা বেন স্টোকসের জন্য আর ট্রাজেডি হয়নি। এবারও ভেন্যু সেই লিডস। সিরিজের তৃতীয় টেস্টে ৩৫৮ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিং করছিল ইংল্যান্ড। ২৮৬ রানেই পড়ে যায় ৯ উইকেট। শেষ উইকেটে স্টোকসের সাথে ছিলেন জ্যাক লিচ। টেস্টে যার বর্তমান ব্যাটিং গড় ১৯.১১। ৮ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে আছে একটা ৯২ রানের ইনিংসও।

অগাধ আস্থা লোয়ার অর্ডারে

সেই জ্যাক লিচ ব্যাটিংয়ে নামেন ১১৫.২ ওভারের পর। ঐ ওভারের বাকি চার বল খেলেন তিনি। শেষ দুই বলে রান নেওয়ার সুযোগ থাকলেও পরের ওভারে স্ট্রাইক রাখার জন্য সিঙ্গেলের ডাকে সাড়া দেননি স্টোকস। এরপরের তিন ওভারে লিচ স্ট্রাইক পান একটি মাত্র বলে যেটি ছিল ওভারের শেষ বল।

দলের জয়ের জন্য দরকার যখন ৪৯ তখন ওভারের দ্বিতীয় বলে দুই রান নিতে গিয়ে উসমান খাজার ফিল্ডিং তৎপরতার কারণে একটির বেশি রান নেওয়া হয়নি। শেষ চার বলে বিপদ হতে দেননি লিচ। পরের চার ওভারে লিচ খেলেন পাঁচ বল যেগুলো ছিল ওভারের পঞ্চম বা শেষ ডেলিভারিটি। প্রায় প্রতি ওভারেই সিঙ্গেলের সুযোগ পেলেও তা গ্রহণ করেননি বেন স্টোকস। সিঙ্গেলের শট না খেলে বাউন্ডারির জন্য করেছেন আগ্রাসী ব্যাটিং। ব্যাট চালিয়েছেন তরবারির মতো করে!

জিততে দরকার আর মাত্র দুইরান। ওভারের পঞ্চম বলে সিঙ্গেল নিতে গিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয় লিচের সাথে। তবে নাথান লায়নের ভুলে রান আউট থেকে বাঁচেন লিচ। বেঁচে যায় ইংল্যান্ড। পরের বলটা ব্যাটে করতে না পারলে পরের ওভারে স্ট্রাইক পান লিচ। তখন যে জয়ের অনেক কাছে ইংলিশরা। একটি রান নিয়ে দলকে নিয়ে যান আরো কাছে। সেখান থেকে বাউন্ডারি মেরে জয় নিশ্চিত করেন স্টোকস। ৬২ বলের সেই জুটিতে মাত্র ১৭ বল স্ট্রাইকে থাকা লিচ হয়ে থাকলেন গল্পের পার্শ্বনায়ক!

ফিরে আসা যাক বাংলাদেশের আস্থা রাখার গল্পে। চট্টগ্রাম টেস্টে আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংসের ৩৪২ রানের জবাব দিতে গিয়ে কাবু বাংলাদেশ। দ্বিতীয় দিনের শেষ বিকেলে দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন মোসাদ্দেক হোসেন আর তাইজুল ইসলাম। দিনের প্রথম ওভারের তৃতীয় বলেই তাইজুল বড় শট খেলতে গিয়ে বোল্ড।

পরের ওভারে (৬৯ তম ওভার) শেষ ব্যাটসম্যান নাঈম হাসানকে প্রথম বলেই প্রান্তবদল করে পরের পাঁচ বল খেলার সুযোগ কর দেন মোসাদ্দেক। ওভারের পঞ্চম বলেই পরাস্ত হয়েছিলেন নাঈম। কানায় লেগে সেটি  হয় বাউন্ডারি। ৭০ তম ওভারের শেষ বলে নাঈমের সিঙ্গেলের ডাকে সাড়া না দিয়ে স্ট্রাইক নেন মোসাদ্দেক। কিন্তু পরের ওভারের দ্বিতীয় বলেই নাঈমের কাছে স্ট্রাইক দেন মোসাদ্দেক। ঐ ওভারেই রশিদের বলে এলবিডব্লিউ হন নাঈম হাসান।

দ্বিতীয় ইনিংসে যখন ম্যাচ বাঁচাতে লড়ছে বাংলাদেশ তখন শেষ উইকেটের জুটিতে ছিলেন সৌম্য সরকার আর নাঈম হাসান। দিনভর বৃষ্টির পর ৪ উইকেট হাতে রেখে ৭০ মিনিট টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ নিয়ে নেমেছিল বাংলাদেশ। তিনটি উইকেট হারানোর পর শেষ সম্বল ছিল সৌম্য-নাঈমের জুটি।  টিকে থাকলে জয় সম্ভব না হলেও সম্ভব ছিল পরাজয় এড়ানো।

এমন পরিস্থিতিতে ঐ ইনিংসে তিন উইকেট নেওয়া স্পিনার জহির খানের ওভারের দ্বিতীয় বলে সিঙ্গেল নিয়ে পরের চার বল নাঈমকে খেলতে দেন সৌম্য। হয়তো ভেবেছিলেন দুই রান নেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু তা আর হয়নি। এক রান নেওয়ার পর আফসোস প্রকাশ করেন মাথায় হাত দিয়ে। তখন প্রশ্ন উঠে দুই রান যদি হতো তাও কি প্রয়োজন ছিল নেওয়ার। সেই দুই রান নিলে তো আর দল জয়ের দ্বারে যাচ্ছে না। সেখানে তো ভুল বোঝাবুঝির কারণে একজন হতে পারতেন রান আউট। যদিও পরের চার বল দিয়েছিলেন নাঈম হাসান কিন্তু সৌম্য সরকারের সেই সিদ্ধান্ত দেখে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।

যেখানে অন্যান্য স্বীকৃত ব্যাটসম্যানরা দায়িত্ব নিচ্ছেন নিজের কাঁধে, সেখানে বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। ধোনি কুলদীপকে কিংবা স্টোকস উড বা লিচকে স্ট্রাইক না দিলেও বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা লোয়ার অর্ডারের রুবেল-নাঈমদের স্ট্রাইক দিতে দ্বিধাবোধ করছেন না তেমন। এদেশের লোয়ার অর্ডারের ওপর যেন স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের অগাধ আস্থা!

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Related Articles

একটি নয়, চারটি নতুন টুর্নামেন্ট করতেও রাজি বিসিবি!

“খেলা পারে না, বাজে খেলে— এদের টাকা দিব না”

বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস রক্ষা করেছেন পাপন!

কোয়াবের সদস্যপদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ফিকা

ফিকা ঠিকই দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পাশে