Scores

অর্জন বলতে শুধুই শিক্ষা

হাঁটিহাঁটি পা-পা করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের পথচলা তো কম হলো না। অধিনায়ক মাশরাফির যুগ বাদ দিলে ক্রিকেটের সকল সফরই শিক্ষা সফর হয়ে থাকছে। এখনো শিখেই যাচ্ছে বাংলাদেশ দল।

 

অর্জন বলতে শুধুই শিক্ষা
সাউদির স্লোয়ারে ক্যাচ তুলে দেওয়ার পর সৌম্য।

 

Also Read - তেইশে বিশ্বকাপ না জিতলে সাতাশেও খেলব : সাকিব


নিউজিল্যান্ডের মাটিতে এ পর্যন্ত ৩২ ম্যাচের সব হেরে নিজেদের রেকর্ডটাকে লজ্জার নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। নিউজিল্যান্ডে ক্রিকেট খেলা কঠিন। কিন্তু এতটা বাজে পারফরম্যান্স আর কোনো দলের আছে কি?

ওয়ানডে সিরিজে তিন ইনিংসে এক বার পার করতে পেরেছে দুইশ রানের চৌকাঠ, ঐ একবারই পঞ্চাশ ওভার ব্যাট করতে পেরেছে। ইনিংস প্রতি গড়ে বাংলাদেশ দলের রান ১৮৫-এর সামান্য বেশি।  আর টি-টোয়েন্টি সিরিজে গড় রান ১২০.৬৭। একবারও দেড়শ ছাড়ানো স্কোর করতে পারেনি। ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের যে পারফরম্যান্স, তা কোনো নিক্তিতেই এই সময়ের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে মানানসই নয়।

নিউজিল্যান্ড ব্যাটসম্যানদের যেখানে তিনটা সেঞ্চুরি  সেখানে তিন ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কোনো সেঞ্চুরি নেই। আছে তিন ফিফটি। আর টি-টোয়েন্টির তিন ম্যাচে মাত্র একটা ফিফটি। সেই ফিফটিটি করেছেন সৌম্য সরকার। দল আর সৌম্যর ধারাবাহিকতার যৌথচিত্র বলা যায় এই তথ্যকে। সৌম্য যেমন হঠাৎ হঠাৎ নিজের জাত চেনান আর ম্যাচের পর ম্যাচ দৃষ্টিকটুভাবে উইকেট ছুঁড়ে আসেন, বাংলাদেশ দলও ঠিক একইরকম।

সিরিজে বাংলাদেশের একজন মাত্র ব্যাটসম্যান একশর উপরে রান করেছেন, মাহমুদউল্লাহ ১১৯ রান। যেখানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন ডেভন কনওয়ে একাই করেছেন ২২৫ রান। টি-টোয়েন্টি সিরিজে দুজন কিউই ব্যাটসম্যান একশর উপরে রান করেছেন। বাংলাদেশের একজনও এই তালিকায় নেই।

জাতীয় দলের হয়ে প্রথমবার নিউজিল্যান্ড সফর করা মোহাম্মদ নাঈম শেখ বলা যায় তুলনামূলক অভিজ্ঞদের লজ্জাই দিয়েছেন। দলের সর্বাধিক রান এই তরুণের। তিন ইনিংসে এই ওপেনার ৮৪ রান করেছেন, ১২৭.২৭ স্ট্রাইকরেটে। ইনিংস বড় করতে না পারলেও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট বিবেচনায় তিনি যথেষ্ট ধারাবাহিক ছিলেন। অভিষেকের পর এখনো পর্যন্ত এই ফরম্যাটে তিনি পারফর্ম করে যাচ্ছেন। এই তরুণ ওপেনারের যে ব্যাটিং স্টাইল, ওয়ানডে দলেও সুযোগ প্রত্যাশা করেন তিনি। ২০২৩ বিশ্বকাপের জন্যে নাঈম শেখকে অবশ্যই পরিকল্পনায় রাখা উচিত।

ব্যাটিংয়ের মতো বোলিংয়েও দলের পারফরম্যান্স ছিলো হতশ্রী।  ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের বোলাররা মাত্র ১৩টি উইকেট নিতে পেরেছেন। টি-টোয়েন্টিতে নিয়েছেন মাত্র ১২টি। লাইন-লেংথের অবস্থা ছিলো তথৈবচ। রান দিয়েছেন দুই হাত ভরে।  তিন ওয়ানডেতে মাত্র একজন বোলারের একবার তিন উইকেট। রুবেল হোসেন সেই তিন উইকেট নিতে আবার ওভার প্রতি রান খরচ করেছেন ৭ করে।

তাসকিন আহমেদ ভালো বল করেছেন। দুই স্পিনার মেহেদী এবং মিরাজ মিতব্যয়ী ছিলেন। দুজনেই অফস্পিনিং অলরাউন্ডার। তবে আমি মিরাজের চেয়ে  নবাগত মেহেদীকেই এগিয়ে রাখব। বিদেশের মাটিতে মিরাজ পরীক্ষিত ব্যর্থ। মেহেদি নিউজিল্যান্ডে যেরকম মাথা খাটিয়ে বোলিং করেছেন, দেশের মাটিতে আরো বেশি সফল হবেন। ব্যাটসম্যান হিসেবেও অনেক বেশি সাহসী।

ফিল্ডিং ছিলো খুবই হতাশাজনক। এ বিভাগে উন্নতি না করলে আরো অনেক-অনেক ম্যাচে খেসারত দিতে হবে বাংলাদেশকে। ফিল্ডিং দেখে মনে হয়েছে সবাই সুযোগ নষ্ট করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

এছাড়া আফিফ হোসেন ও মোসাদ্দেক হোসেন আছেন। তারা মূলত ব্যাটসম্যান। আবার অফস্পিনটাও ভালোই করেন। কন্ডিশন অনুযায়ী মেহেদির সঙ্গে এদের একজনকে নিয়মিত সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। আমি আফিফ হোসেনের পক্ষে। তাতে দলে বৈচিত্র্য  আসবে। ব্যাটিং যথেষ্ট ভালো এবং তিনি থাকলে একজন বাঁহাতি ফিনিশার পাওয়া যাবে। সাকিব না থাকলে ব্যাটিং অর্ডারে চার থেকে সাত পর্যন্ত সকলেই ডান হাতি ব্যাটসম্যান। তাতে প্রতিপক্ষ অধিনায়ক এবং বোলারদের পরিকল্পনা করা সহজ হয়ে যায়। আফিফ এ সমস্যাটা সমাধান করতে পারেন। ফিল্ডার হিসাবেও তিনি ক্ষিপ্র গতির। সাকিব আল হাসান আর বেশি দিন ক্রিকেট খেলবেন না। সেই বাস্তবতা মনে রেখেই ২০২৩ বিশ্বকাপ এবং ভবিষ্যতের জন্যে আফিফকে তৈরি করা উচিত।

তিনজন ক্রিকেটারকে নিয়ে আলাদাভাবে বলতে চাই।  মুস্তাফিজুর রহমান, লিটন দাস এবং সৌম্য সরকার। তিনজনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন প্রায় সাত বছর হলো। প্রায় সকল কন্ডিশনেই খেলা হয়ে গেছে তাদের। সাত বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পর ওনাদের যা পারফর্ম্যান্স, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মুস্তাফিজ এখনো স্ট্রাইক বোলার। নিয়মিত উইকেট নিচ্ছেন। কিন্তু এ সিরিজে তিনিও ব্যর্থ। তিন ওয়ানডেতে তিনি নিয়েছেন ৩ উইকেট, ইকোনমি ৭.৭; টি-টোয়েন্টি সিরিজেও পারফরম্যান্স একই ধাঁচের। ২০১৮ এর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বিদেশের মাটিতে ওয়ানডেতে মোস্তাফিজের ইকোনমি ৬.২৮। রহস্যময় হিসেবে আবির্ভাব ঘটানো মুস্তাফিজ এখন ধীর উইকেট ছাড়া সব জায়গাতেই ‘প্রেডিক্টেবল’।

 

 

ভুলে যাওয়ার মতো এক সফর লিটনের
লিটন দাস পুরো সফরে ছয় ইনিংস মিলিয়ে করেছেন ৫০ রান। 

লিটন দাস এবং সৌম্য সরকারের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। তিন ওয়ানডেতে লিটনের রান সাকুল্যে ৪০, সর্বোচ্চ ২১। টি-টোয়েন্টি সিরিজে আরো করুণ অবস্থা। তিন ম্যাচে তার স্কোর ৪,৬ এবং ০। ওয়ানডে সিরিজে সৌম্যর রান ৩৩, এর মধ্যে এক ম্যাচেই করেছিলেন ৩২। বাকি দুইটাতে স্কোর ০ এবং এক। টি-টোয়েন্টি সিরিজে একটি দাপুটে ফিফটি পেয়েছেন। প্রায় সাত বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পর, বয়স এবং প্রতিভা অনুযায়ী এই দুজনের এখন বাংলাদেশ দলের প্রধান এবং নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হওয়াটাই ছিল যৌক্তিক। কিন্তু এখনো তারা নিজেদের হারিয়ে খুঁজছেন। এক ম্যাচে পারফর্ম করলে সাত-আট ম্যাচে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

সিরিজে প্রাপ্তি বলতে মেহেদি হাসান এবং নাসুম আহমেদ। দুই ফরম্যাট মিলিয়েই বোলিংয়ে আমার চোখে মেহেদি সেরা পারফর্মার। এই ক্রিকেটারের আত্মবিশ্বাস, শরীরী ভাষা সবই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্যে উপযোগী। দীর্ঘদিন ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্ম করে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পারফর্ম করা যে সহজ হয়, তারই দারুণ উদাহরণ মেহেদি এবং নাসুম।

বাংলাদেশের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ, অনিশ্চিত মুশফিক

টি-টোয়েন্টি সিরিজে বাঁহাতি স্পিনার নাসুমমের বোলিং বুঝিয়ে দেয় যে  ওয়ানডেতেও  সুযোগটা প্রাপ্য ছিল। হয়তো পিঠ বাঁচানোর জন্য একজন বাড়তি ব্যাটসম্যান খেলানোর মানসিকতা থেকে মেহেদীর পাশাপাশি মিরাজকে খেলানো। কিন্তু আক্রমাণাত্মক এবং ইতিবাচক চিন্তা না করে পরিকল্পনা সাজালে তা থেকে কোনো ভালো ফলাফল আসে না। এ সিরিজ তার বড় উদাহরণ।

লেখকঃ রুহুল মাহফুজ জয়, সাংবাদিক। 

Related Articles

বিসিবির পর্যবেক্ষণে মোসাদ্দেক

নিউজিল্যান্ড সফরের ব্যর্থতা নিয়ে ভেবে লাভ নেই : মুমিনুল

সব দলই নিউজিল্যান্ডে গিয়ে সংগ্রাম করে : বাশার

নিউজিল্যান্ডে সাকিব-মাশরাফিকে নিয়ে ভাবার সুযোগ পায়নি টাইগাররা

নিউজিল্যান্ডে আকাশ পরিস্কার, তাই ক্যাচ ছেড়েছে বাংলাদেশ!