আশরাফুলের ব্যাটে বাংলাদেশের সেরা তিন ইনিংস

বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম পোস্টার বয় মোহাম্মদ আশরাফুল। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পথচলার শুরুতে দল বড় দলগুলোর বিপক্ষে মাঠে নামত সম্মানজনক পরাজয়ের জন্য। সেখানে এক আশরাফুলই পাল্টে দিয়েছিলেন মানুষের ভাবনা, একাই খেলেছেন চোখ ধাঁধানো সব ইনিংস। কেড়ে নিয়েছিলেন সমস্ত আলো তার নিজের দিকে। আসুন দেখে আসি আশরাফুলের সেরা তিন যা এখনো ঐ সময়ের বাংলাদেশী দর্শকের কাছে বিস্ময়।

ডিপিএলে আবারও আশরাফুল ঝলক।

Advertisment
  • ইনিংস ১: সৌন্দর্যের রঙ আশরাফুলের ব্যাটিং





রান: ৮৭ (৮৩ বল, ৪*১২, ৬*০, স্ট্রাইকরেট ১০৪.৮১)
প্রতিপক্ষ: দক্ষিণ আফ্রিকা (বিশ্বকাপ ২০০৭)

বাংলাদেশের পক্ষে সেঞ্চুরির ইনিংস আছে অনেকগুলো। কিন্তু ব্যাটিং সৌন্দর্যের দিক থেকে বিচার করলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গায়ানায় মোহাম্মদ আশরাফুলের করা ৮৭ রানটিই আমার বিবেচনায় এযাবৎকালের সেরা বাংলাদেশী ওয়ানডে ইনিংস। দক্ষিণ আফ্রিকা সেদিন খেলতে নেমেছিল ৫ জন পেসার নিয়ে (পোলক, এনটিনি, ল্যাঙ্গভেল্ট, নেল, ক্যালিস)। ১০০ রানের আগে চলে গেছে ৪টি উইকেট। সেই পরিস্থিতিতে অসীম ধৈর্য নিয়ে আশরাফুল যে ইনিংসটি খেলেন এবং যেসব ভয়ানক সুন্দর শট খেলেন সেগুলোর একটি যেন অপরটিকে ছাড়িয়ে যায় সৌন্দর্যের দিক থেকে। আন্দ্রে নেল এ ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন। কিন্তু আশরাফুলের ব্যাটিং নেশায় সবাই এতোটাই বুঁদ হয়েছিল যে সেই ৫ উইকেট স্কোরকার্ড ছাড়া কোথাও লেখা নেই।






মাত্র ৮৭ রান কেন শ্রেষ্ঠ বাংলাদেশ ইনিংস, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আশরাফুলের করা শতরানের ইনিংসটি কেন নয়,এই প্রশ্নটা আসতে পারে। দুটি কারণে এই ইনিংসটি বিবেচনায় আসবে না। প্রথমত ইনিংসটি নিশ্ছিদ্র ছিল না। গিলেস্পি সহজ একটি ক্যাচ মিস করেন। দ্বিতীয়ত,গুণগতমান চিন্তা করলে ইনিংসে দৃষ্টিনন্দন শটের প্রাবল্য দেখা যায়নি। মূলত সিঙ্গেলস আর গড়পড়তা স্কোরিং শটই ছিল ইনিংসটির ভিত্তি।

পক্ষান্তরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এক একটি শট খেলেছেন আর চোখে ধাঁধা লেগে গেছে। বাংলাদেশী কোন ব্যাটসম্যান এতটা অবলীলায় কোয়ালিটি ফাস্ট বোলিংকে মোকাবেলা করে অদ্ভুত শট খেলতে পারেন এটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছিল এতদিন।

  • ইনিংস ২: আশরাফুলে উইলো বিষ্ফোরণ

রান: ৯৪ (৫২ বল, ৪*১১, ৬*৩, স্ট্রাইকরেট ১৮০.৭৬)
প্রতিপক্ষ: ইংল্যান্ড (ন্যাটওয়েস্ট সিরিজ,২০০৫)

এটা এমনই ইনিংস যা একজন ব্যাটসম্যান সারা জীবনে একবারই মাত্র খেলতে পারেন। চেষ্টা করে বা ঘোষণা দিয়ে এ ধরনের ইনিংস খেলা যায় না। এই দিনগুলো থাকে পুরোপুরি ব্যাটসম্যানের অনুকূলে; তিনি যেভাবে খুশি যেদিকে খুশি ব্যাট চালান। বল সীমানা পার হয়ে যায় অথবা ক্রমাগত রান আসতেই থাকে। এখানে ব্যাটসম্যানের কৃতিত্ব সামান্যই, পুরোটাই ভাগ্যনির্ভর।

ভাগ্যের উদাহরণটা স্পষ্ট করা যাক। এদিন মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই আশরাফুল বোল্ড আউট হয়েছিলেন, কিন্তু বল বেলস এর গায়ে আলতো ছুঁয়ে নিচে পড়ে যায়, বেলস নিজের জায়গাতেই স্থির থাকে। চোখে না দেখলে এই ঘটনা ব্যাখ্যা করা কঠিন। আশরাফুল নিজেও ম্যাচ পরবর্তী সাক্ষাৎকার বলেছিলেন, ‘বল লাগার পরও যখন বেলস পড়লো না তখনই সিদ্ধান্ত নিই আজ সব বল এ চালিয়ে খেলবো।’ সেই চালানোর নমুনা পাওয়া যায় ৫২ বলে ৯৪ রানের বিস্ফোরক ইনিংসের মধ্যে।

ম্যাচের উত্তেজনা প্রথম ইনিংসেই শেষ। এন্ড্রু স্ট্রাউস আর পল কলিংউড এর জোড়া সেঞ্চুরিতে ইংল্যান্ডের স্কোর ৪ উইকেটে ৩৯১; এরপর আর খেলা দেখার মানে হয় না। তবু ইংল্যান্ডের পাহাড়সম স্কোর কেউ মনে রাখেনি, সকলের চোখে ভাসে ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার একজন ব্যাটসম্যান ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি স্টিভ হার্মিসন আর এন্ড্রু ফ্লিন্টফকে কী বেধড়ক পিটুনি দিয়ে গেল। স্বীকার করতেই হবে, ক্লাসি ইনিংস বলতে যা বুঝায় এটি মোটেই তেমনটি ছিল না, অধিকাংশ শটই ছিল পিওর স্লগিং আর ব্যাকরণবহির্ভূত হিটিং, তবু ইনিংসটি মানুষ ভুলবে না, কারণ এতোদিন এধরনের ইনিংস কেবল বাংলাদেশের বিপক্ষেই খেলা হয়েছে। বাংলাদেশও এরকম পিটুনি উপহার দিতে পারে এই অভিজ্ঞতা সেটাই প্রথম। আশরাফুল বললে মানুষ অভিষেক টেষ্টে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান বুঝে না, অস্ট্রেলিয়াকে মাটিতে নামানোর নায়কও নয়, আশরাফুলের সমার্থকই এখন ৫২ বলে ৯৪ রানের বিস্ময়। লেখার শুরুতেই তো উল্লেখ করা হয়েছে, একজন ব্যাটসম্যান জীবনে মাত্র একবারই এমন ইনিংস খেলতে পারে।

  • ইনিংস ৩:আশরাফুলময় মাঠ

রান: ১৫৮* (বল ১৯৪, ৪*২৪, ৬*৩)
প্রতিপক্ষ: ভারত; এমএ আজিজ স্টেডিয়াম, চট্টগ্রাম

বাংলাদেশ এই টেস্টটিতে ইনিংস ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। তবু প্রথম ইনিংসে আশরাফুল এমন ব্যাটিং করেছেন যে তিনিই ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হয়েছেন। এই মনোনয়নটা বিস্ময়কর। গৌতম গম্ভীর, রাহুল দ্রাবিড় সেঞ্চুরি করেছেন, ইরফান পাঠান ৫ উইকেট নিয়েছেন, অথচ ইনিংস ব্যবধানে হারা একটি দলের ব্যাটসম্যান পেল ম্যাচ সেরা পুরস্কার। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই, যাদের নাম উল্লেখ করা হলো, তাদের জিজ্ঞাসা করা হলে তারাও নির্দ্বিধায় আশরাফুলকেই নির্বাচন করতেন। এমনভাবে তিনি ব্যাটিং করেছেন, একবারও মনে হয়নি তাঁকে আউট করা সম্ভব, এবং সত্যিই শেষ পর্যন্ত তিনি অপরাজিত ছিলেন। কুম্বলে আর হরভজনের স্পিনকে অনায়াসে বাউন্ডারি ছাড়া করেছেন, ইরফান পাঠান আর জহির খানের সুইংয়েও পরাস্ত হননি একবারের জন্য। সংখ্যাগত দিক থেকে শ্রীলংকার বিপক্ষে খেলা ১৯০ রানের ইনিংসটিই আশরাফুলের ক্যারিয়ার সেরা, আরো অনেক ভালো ইনিংস খেলেছেন। কিন্তু ব্যাটিং সৌন্দর্যের দিক থেকে এই ইনিংসের সাথে তুলনীয় হতে পারে এমন কোনো ইনিংস আশরাফুল তার সমগ্র ক্যারিয়ারেই খেলতে পারেননি।

লিখেছেন ইসমাইল উদ্দিন সাকিব

বল বাই বল লাইভ স্কোর পেতে আর নয় বিদেশি অ্যাপ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক খবর এবং বল বাই বল লাইভ স্কোর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে BDCricTime সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান ক্রিকেট অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।