অনেক অপেক্ষার পর এক জয়

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চলতি সিরিজের প্রথম ম্যাচ জয়ের পর মুশফিক-তাইজুলের আলিঙ্গন ...
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চলতি সিরিজের প্রথম ম্যাচ জয়ের পর মুশফিক-তাইজুলের আলিঙ্গন …

মোঃ সিয়াম চৌধুরী

একটি জয় যেন উত্তপ্ত কড়াইয়ে প্রশান্তির জল ঢেলে দিয়েছে। সকল সমালোচনা আর ব্যর্থতা উবে গেছে তিন ম্যাচ টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়েকে তিন দিনেই হারিয়ে দেওয়ায়। কিন্তু বিস্ময় আর হতাশার বিষয়, টেস্ট রেংকিংয়ের নবম স্থানে থাকা দলটিকে হারিয়ে বাংলাদেশ কাটিয়েছে টেস্ট খেলুড়ে দলের বিপক্ষে এক বছরের জয়খরা! গত বছরের নভেম্বরের ১ম সপ্তাহে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডকে হারায়, ঢাকা টেস্ট জয়ের আগে যা ছিল টেস্ট খেলুড়ে কোনো দেশের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ জয়!

চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক সাম্প্রতিক সময়ে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটে কেমন অবস্থা বাংলাদেশের…

Also Read - কলকাতায় বিসিবি একাদশের হার


জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টের জয়টি টাইগারদের ৫ম জয়। দেশের মাটিতে দ্বিতীয়, দুটিই আবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাঁদের মাটিতে দুটি জয় ছাড়া বিদেশের মাটিতে অপর জয়টিও এই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই। ঢাকা টেস্টের আগে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে টাইগাররা সর্বশেষ জয়ের মুখ দেখেছিল গত বছরের এপ্রিলে। হারারেতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচের ৫ম দিনে জিম্বাবুয়েকে হারিয়েছিল ১৪৩ রানের বিশাল ব্যবধানে। যদিও ঐ সিরিজেরই প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশকে ৩৩৫ রানের ব্যবধানে হারিয়েছিল জিম্বাবুয়ে; ফলে সিরিজ ড্র হয় ১-১ এ। হারারের ঐ দুটি টেস্টের পর বাংলাদেশ হোম সিরিজে মোকাবেলা করে নিউজিল্যান্ডের। ব্যাটসম্যান আর বোলারদের প্রতাপে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি ম্যাচই ড্র হয়, জয়ও ছিল না বেশ অসম্ভব। কিন্তু আবারো গড়বড় দেখা যায় ২০১৪ সালে এসে। ‘অপয়া’ খেতাবপ্রাপ্ত এই ২০১৪ সালে ৫টি টেস্টের ৩টি পরাজয় বরণ করা ম্যাচেই ব্যবধানটা ছিল অনেক বেশি। জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে হার ইনিংস ও ২৪৮ রানের, অবশ্য ফেব্রুয়ারির চট্টগ্রাম টেস্টটা ড্র হয়েছিল দৃঢ়তার সাথেই। এরপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দুটি টেস্টেই পরাজয় জুটেছে বড় ব্যবধানে। প্রথম ম্যাচ ১০ উইকেটে হারার পর দ্বিতীয় ম্যাচে হারের ব্যবধানটা ছিল ২৯৬ রানের।

টেস্ট খেলার যথেষ্ট সুযোগ না পাওয়াকে হয়ত দৃষ্টিকটু পরাজয় কিংবা প্রেক্ষাপট বহির্ভূত পারফরমেন্সের অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো যায়, তবে বাস্তবতা বলছে টাইগারদের জয়ের লাগাম ছুটে গিয়েছিল ওয়ানডেতেও। টেস্ট খেলুড়ে কোনো দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ জয় এসেছিল ৩ নভেম্বর, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে। ৪ উইকেটের শ্বাসরুদ্ধকর সেই জয়ের আগের ২ ম্যাচ জিতে ব্ল্যাক ক্যাপসদের ‘বাংলা’ওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ দল। সেই শেষ, টেস্ট খেলুড়ে দল দূরে থাক, এরপর জয় আসেনি আর কোনো আন্তর্জাতিক দলের বিপক্ষেই। হোম সিরিজে শ্রীলঙ্কার কাছে ৩-০’তে ধোলাই, এশিয়া কাপে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কার কাছে হার, ভারতের ‘জাতীয় দল’ খ্যাত দ্বিতীয় সারির দলের কাছে ২-০’তে সিরিজ আর সম্মান খোয়ানো এবং সবশেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৩-০ নাস্তানাবুদ বাংলাদেশকে জয়হীন রেখেছে একদিনের ম্যাচে পুরো ১ বছর ধরে! তবুও চলতি বছর শতভাগ ম্যাচে ‘পরাজিত’ লেখা নেই ভারতের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হওয়ায়।

ঘরের মাটিতে টি২০ বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজন করলেও দল হিসেবে বাংলাদেশের পারফরমেন্স ছিল যথেষ্ট হতাশার। ‘গ্রুপ পর্ব’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বাছাই পর্বে খর্বশক্তির আফগানিস্তান আর নেপালকে হারানো গিয়েছিল হেসেখেলেই, কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় পুঁচকে হংকং। বাছাইয়ের শেষ ম্যাচে ২ উইকেটের পরাজয়ে সুপার টেনের রাস্তায় প্রলেপ না পড়লেও আত্মবিশ্বাসটা তলানিতে গিয়ে ঠেকে, যার প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল মূল পর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত, পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার কাছে যথাক্রমে ৭৩ রান, ৮ উইকেট, ৫০ রান ও ৭ উইকেটের বেমানান ব্যবধানে হেরে। এর আগে বছরের শুরুতে শ্রীলঙ্কার কাছে দুটি টি২০ ম্যাচই হারতে হয় ম্যাচের শেষ বলে। পারফরমেন্সকেই সবাই দোষারোপ করবে, কিন্তু ভাগ্যদেবীর দায়ও কি কম নয়! ২০১৩-র নভেম্বরের একমাত্র টি২০-তেও পরাজয়ই জোটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। টেস্ট খেলুড়ে কোনো দলের বিপক্ষে জয় খুঁজতে হলে চোখ মেলতে হবে গত বছরের ১৩ মে’র দিকে, যেদিন বাংলাদেশ জিম্বাবুয়েকে হারিয়েছিল ৩৪ রানে। চরম হতাশার বিষয়, গত ৩ বছরে টি২০’তে টেস্ট খেলা দেশগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের সংখ্যা এই ১টিই!

এই জয়টা খরা কাটানো বৃষ্টির চেয়েও বড়, কারণ ক্রিকেট পাগল লোক মানে টং দোকানের ঢ্যাঙা লোকটি থেকে শুরু করে বিশতলা দালানের অফিসার পর্যন্ত। আবেগ জড়িয়ে আছে শতভাগ- এমন কিছু যদি এদেশে থেকে থাকে তাহলে অবশ্যই সেটা ক্রিকেট। ঢাকা টেস্ট জয়ের মাহাত্ম্য বোঝাতে নিচের লাইনটিই যথেষ্ট-

‘চলতি বছর টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর বিপক্ষে সর্বমোট ২২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে জিতেছে একটি।’

গত এক বছরে এই একটিই জয় টেস্ট দলের বিপক্ষে, যেকোনো ফরম্যাটেই।

… এবং সেই ‘একটি’ তো ঢাকা টেস্টেই!