Scores

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের স্মরণীয় যত জয়

নাফিজ ইয়াকিন রাজিন

কার্ডিফ স্টেডিয়ামের সবার চোখেমুখে তখন রাজ্যের বিষ্ময়! বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার দেয়া ২৫০ রানের টার্গেট তাড়া করতে গিয়ে শেষ ওভারে বাংলাদেশের দরকার ৭ রান, হাতে ৫ উইকেট। জেসন গিলেসপির প্রথম বলটিকে লং অন দিয়ে সীমানার বাইরে উড়িয়ে মারার পর দ্বিতীয় বলে একটি সিঙ্গেল তুলে নেন আফতাব আহমেদ। কার্ডিফে ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে লাল-সবুজের পতাকাবাহীদের বাধঁভাঙা উল্লাস। বলছিলাম ২০০৫ সালের ১৮ জুন তারিখে ন্যাটওয়েস্ট ত্রিদেশীয় সিরিজে টাইগারদের অজিবধের কাহিনী। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সেবার হারিয়ে দিয়ে একরকম লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ম্যাচে সর্বোচ্চ রান করা আশরাফুলকে সেদিন প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার দুইবারের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক রিকি পন্টিং। আর বাংলাদেশের জন্য সেটি ছিল এমনই ঐতিহাসিক এক জয়, যা চিরকাল হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেট রূপকথার এক অক্ষয় অধ্যায়।

লিখছি একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের এমনই কিছু স্মরণীয় জয় নিয়ে।

Also Read - অনলাইনে ক্লাস করবেন পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা


১২ এপ্রিল, ১৯৯৭; বাংলাদেশ – কেনিয়া

বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার খালেদ মাসুদের মতে, ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফির শিরোপা জয়ই মূলত বাংলাদেশ ক্রিকেটের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ঘুরিয়েছে বৈকি! ওই আইসিসি ট্রফিতে অসাধারণ পারফর্মেন্সের কারণেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ পেয়েছিল বিশ্বকাপের টিকিট। মূলত ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফিটা ছিল বাংলাদেশের জন্য অনেকটা স্বপ্নের মতো। পুরো টুর্নামেন্টে অপরাজিত বাংলাদেশ ফাইনালে মুখোমুখি হয় কেনিয়ার বিপক্ষে। প্রথমে ব্যাটিং করে কেনিয়া ২৪১ রান করলে বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের সামনে টার্গেট দাড়ায় ২৫ ওভারে ১৬৬ রান। ওভার প্রতি ৬.৬৪ এর রান তাড়া করে জয় পাওয়াটা অনেকটা অসম্ভবই দেখাচ্ছিল তখন। রফিক, বুলবুল আর আকরাম খানের ঝড়ো ব্যাটিংয়ের পরেও শেষ ওভারে দরকার ছিল ১১ রান। কিন্তু খালেদ মাসুদ ও হাসিবুল শান্তর দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে শেষ বলে রুদ্ধশ্বাস এক জয় পায় টাইগাররা। এই দিনটিকেই এখনো বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় দিন হিসেবে ধরা হয় কারণ আইসিসি ইভেন্টে বাংলাদেশ প্রথমবার কোনো শিরোপা জিতেছিল; বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সেদিন বিরাজ করেছিল উৎসবের আমেজ।

৩১ মে, ১৯৯৯; বাংলাদেশ -পাকিস্তান

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ নেয়া বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ‘৯২ এর চ্যাম্পিয়ন ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ পাকিস্তান। গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের মুখোমুখি হওয়ার আগে বাকি ৪ ম্যাচে পাকিস্তানের জয় যেখানে শতভাগ সেখানে বাংলাদেশের জয় ৪ ম্যাচে মাত্র একটা, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। এমনই একটা ম্যাচে তখন বাংলাদেশের জয় আশা করাটাই যখন ছিল অনেকটা দিবাস্বপ্নের মতো তখন টস জিতে পাকিস্তান ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ পাঠায় বাংলাদেশকে। প্রথম ইনিংস শেষে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে উঠে ২২৩ রান, যা লড়াইয়ের জন্য পর্যাপ্ত মনে হলেও হট ফেভারিট পাকিস্তানের সাথে জয় এনে দিতে পারে এমনটা মনে হচ্ছিল না। সেই অসম্ভবপ্রায় কাজটিকেই সেদিন সম্ভব করেছিলেন সুজন, নান্নু ও সাইফুদ্দিনরা। পাকিস্তান ইনিংসের ৪৫ তম ওভারের তৃতীয় বলে সাকলায়েন মুশতাকের সেই রান আউটের পর সেদিন নর্দাম্পটন শুনেছিল একদল বাঘের গর্জন। আর সেই গর্জনকেও কয়েকগুণ ছাপিয়ে গিয়েছিল কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আনন্দ ও উল্লাস।

২৬ ডিসেম্বর, ২০০৪; বাংলাদেশ – ভারত

২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ২ ম্যাচ টেস্ট ও ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আসে ভারতীয় ক্রিকেট দল। সিরিজের ২ টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে হারের পর ওয়ানডের সিরিজে হঠাৎ ঘুরে দাড়ায় বাংলাদেশ। ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইলালিস্ট ভারতকে প্রথম ওয়ানডেতেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় স্বাগতিক বাংলাদেশ। সেই প্রথম ম্যাচে ১১ রানে হারলেও দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অবিশ্বাস্য এক জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ, যা ছিল ক্রিকেটের যেকোনো ফরম্যাটে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয়। প্রথমে ব্যাট করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে বাংলাদেশ করে ২২৯ রান। সর্বোচ্চ ৬৭ রান এসেছিল আফতাব আহমেদের ব্যাট থেকে। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ভারত প্রথম ৪ ওভারেই ২ উইকেট হারিয়ে কিছুটা ব্যাকফুটে পড়ে যায়। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে ২১৪ রানেই ভারতের ইনিংস গুঁড়িয়ে দেন তাপশ বৈশ্য ও মাশরাফিরা। এ ম্যাচে বল হাতে দুই উইকেট করে পান তাপস, মাশরাফি, মোহাম্মদ রফিক, খালেদ মাহমুদরা। এছাড়া ব্যাট হাতে ৩১ রান করে ম্যাচসেরা হন মাশরাফি বিন মর্তুজা

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬; বাংলাদেশ – শ্রীলঙ্কা

বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে এইদিন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম জয় পায় বাংলাদেশ। ‘৯৬ এর চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা তখন বিশ্বক্রিকেটে অন্যতম একটি পরাশক্তি। প্রথমে ব্যাট করে ২১২ রান তোলে সফরকারী শ্রীলঙ্কা। জবাবে আফতাব, আশরাফুল ও হাবিবুল বাশারের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে সহজ জয় পায় বাংলাদেশ।২০০৭ বিশ্বকাপে ভারত-বধ

১৭ মার্চ, ২০০৭; বাংলাদেশ – ভারত

২০০৭ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশ মুখোমুখি ‘০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ভারতের। তবে পোর্ট অফ স্পেনে অনুষ্ঠিত ঐ ম্যাচে ভারতকে শুরু থেকেই চেপে ধরে বাংলাদেশ। মাশরাফি-রাজ্জাকদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ১৯১ রানেই অলঅাউট হয় ভারত। ব্যটিংয়ে তামিম, সাকিব ও মুশফিকদের নৈপুণ্যে ৫ উইকেটের সহজ জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। এই জয়ের ফলে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ বিশ্বকাপের সুপার এইটে কোয়ালিফাই করার সুযোগ পায়। এছাড়াও একই বিশ্বকাপের সুপার এইটে বাংলাদেশ শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও জয় পায়।

৯ মার্চ, ২০১৫; বাংলাদেশ – ইংল্যান্ড

বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সাফল্য এসেছে ২০১৫ বিশ্বকাপে। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে এবারই সর্বপ্রথম বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বাংলাদেশ ৩ ম্যাচ খেলে ২টি জয় এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পরিত্যক্ত হওয়া ম্যাচের এক পয়েন্ট নিয়ে অবস্থান করছিল পয়েন্ট টেবিলের চতুর্থ স্থানে এবং ম্যাচ জিতলেই কোয়ার্টার ফাইনালল নিশ্চিত এমন একটি সমীকরণ নিয়েই মাঠে নামে এইদিন টাইগাররা। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৮ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ব্যাকফুটে পড়া বাংলাদেশকে টেনে তুলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও মুশফিকুর রহিম। এই দিন প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে বিশ্বকাপে শতরান করেন তিনি আর মুশফিকের ব্যাট থেকে আসে অনবদ্য ৮৮। ২৭৬ রানের টার্গেট তাড়া করতে গিয়ে সাবধানেই এগুচ্ছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু মিডল ওভারে মাশরাফি, রুবেল, তাসকিনদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ১৬৩ রানেই ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলে ইংল্যান্ড। এরপর বাটলার আর ক্রিস ওকস মিলে ৭৫ রানের পার্টনারশিপ গড়লেও শেষ রক্ষা হয় নি। ৪৯ তম ওভারের প্রথম ও দ্বিতীয় বলে দুটি চোখ ধাঁধানো ইয়োর্কারে রচিত হয় ইংলিশবধের অমর কাব্য। অ্যাডিলেড ওভালের ১২ হাজার দর্শককে অবাক করে দিয়ে বাংলাদেশ পৌছে গিয়েছিল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে।নিউজিল্যান্ড বধের নায়ক মাহমুদউল্লাহ

৯ জুন, ২০১৭; বাংলাদেশ – নিউজিল্যান্ড

কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্সে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে গ্রুপ নিজেদের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ মুখোমুখি হয় নিউজিল্যান্ডের। আগের ২ ম্যাচের প্রথমটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮ উইকেটে হার আর বৃষ্টিবিঘ্নিত দ্বিতীয় ম্যাচটিতে প্রায় হারতে হারতেই বেঁচে যায় টাইগাররা। সেমিফাইনালে খেলতে হলে এই ম্যাচে জয় ছাড়াও পাহাড়সম সমীকরণ টপকাতে হবে। তাই সেমিফাইনালে খেলার আশা বাঁচিয়ে রাখতে জয়ের কোনো বিকল্প নেই; এমন একটি ম্যাচে ২৬৬ রানের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে নেমে ৩৩ রান তুলতেই টপ অর্ডারের ৪ ব্যাটসম্যান সাজঘরে! জয় পাওয়া তখন অসম্ভব প্রায়। ঠিক তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে মাঠে আসেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ আর তাকে সঙ্গ দেন বিশ্বক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত মুখ সাকিব আল হাসান। দুজনে মিলে করেছিলেন ২২৪ রানের জুটি, দুজনেই তুলে নিয়েছিলেন সেঞ্চুরি এবং দলকে এনে দিয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে প্রথম জয়। ২০৯ বলে ২২৪ রানের সাকিব-রিয়াদের সেই জুটি যেকোনো উইকেটে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি। আর এই জয়ে ওপর ভর করেই প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে আসা বাংলাদেশ ওই টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে খেলার সুযোগ পায়।

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Related Articles

বিশ্বকাপে মুশফিকের সেরা ইনিংসগুলো

শচীনদের ‘সবচেয়ে খারাপ সময়’ এনে দিয়েছিল বাংলাদেশ!