Scores

গিলক্রিস্টের কাছে ভক্তের খোলা চিঠি

অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, আপনি ক্রিকেটে আসার আগপর্যন্ত উইকেটকিপিং ছিল সবচাইতে অবহেলিত জায়গা; সে না ব্যাটসম্যান, না বোলার, ফলে উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে সে যত রানই বাঁচিয়ে দিক- তার মূল্যায়ন হতো না। মানুষ উইকেটকিপিং নিয়ে রসিকতা করে বলতো- ব্যাটিং-বোলিং কোনোটাই পারিনা, তবু ক্রিকেট খেলার প্রচণ্ড ইচ্ছা; কীভাবে ইচ্ছা পূরণ করবেন? আরে মশাই, স্রেফ উইকেটকিপার হয়ে যান! কিংবা, ক্রিকেট খেলায় ১১ জন মানুষ লাগে; দশজন ক্রিকেটার, একজন উইকেটকিপার!

অর্জনের ঝুলি কাঁধের ব্যাগটা ভারী করে না, গিলক্রিস্ট

দুটো সেঞ্চুরি করলে বা দুবার ৫ উইকেট পেলেই যেখানে রাতারাতি দর্শকপ্রিয়তা পাওয়া যায়, সেখানে উইকেটকিপিংয়ের মতো পরিশ্রমসাধ্য আর অতিসর্তক কাজে আপনি কেন জড়িয়েছিলেন- জানতে খুব ইচ্ছে করে। আপনি তো প্রথম থেকেই জানতেন না, পালাবদলের অভিযানে আপনাকেই প্রথম দায়িত্ব নিতে হবে। ব্যতিক্রমী কিছু করতে চাওয়ার ইচ্ছাই কি যুগিয়েছিল প্রাথমিক রসদ?

Also Read - বাতিল হচ্ছে আইপিএল!


অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান হওয়ার প্রতিযোগিতায় আপনি ওয়াকওভার পেয়ে যাবেন নির্দ্ধিধায়, কারণ আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই সেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। মাত্র ২০ বছর আগেও উইকেটকিপার ছিল দলের উইক লিংক, আপনি এসে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি। শুনেছি বাবা-মায়ের সাথে বাল্যকালে শপিং করতে গিয়ে এক জোড়া গ্লাভসে আপনার চোখ আটকে যায়। জেদের কারণে বাধ্য হয়ে সেই গ্লাভস জোড়া কিনে দিতে হল আপনার বাবাকে। তখন কি জানতেন, এই গ্লাভস পড়া ছেলেটি একদিন বিশ্ব-ক্রিকেটের সেরা গ্লাভসম্যান বনে যাবে?

উইকেট কিপার হিসেবে করেছেন রেকর্ড ৮৮৮টি ডিসমিসাল। ভাবা যায়? শুনলেই মনে হবে উইকেটের পিছনে ছিল এক বাজপাখি, যার কাজ সুযোগ পেলেই শিকার করা। আপনার মাধ্যমেই উইকেটকিপারকে অলরাউন্ডার হিসেবে গণ্য করার সংস্কৃতি চালু হয়। আপনাকে যুগসন্ধির নায়ক বলাই যায়। শুধু মুখে মুখে নয়, ইএসপিএনক্রিকইনফো ভোটাভুটির মত দৃশ্যমান কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে আপনাকে গত শতাব্দীর নবম গ্রেটেস্ট অলরাউন্ডারের স্বীকৃতি আদায় করে দিয়েছে। আপনার এই অর্জন উইকেটকিপিংয়ের প্রতি তরুণদের আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে সুবিধা করতে না পারায় নির্বাচকরা আপনাকে ওয়ানডের ওপেনার বানিয়ে দিয়েছিল; এই একটি পরিবর্তন ওয়ানডে ক্রিকেটের মর্যাদাই বাড়িয়ে দিবে তা কি তারা বা আপনি ভাবতে পেরেছিলেন?

অর্জনের ঝুলি কাঁধের ব্যাগটা ভারী করে না, গিলক্রিস্ট

মার্ক ওয়াহ এর সাথে আপনার ওয়ানডে ওপেনিং জুটিটা দেখার মতো ছিলো। একজন কব্জির মোচড়ে অসাধারণ শর্ট খেলছে, আরেকজন স্লগিং করে বোলারের জীবন অতিষ্ঠ করছে। ওয়ানডে দল থেকে ওয়াহ বাদ পড়ার পর এল ম্যাথু হেইডেন, যে আপনারই মতো শর্ট খেলতে পছন্দ করতো, কখনো শর্ট খেলায় আপনাকেও পিছনে ফেলে দিত। কার সাথে ব্যাটিং করে বেশি আনন্দ পেতেন, বলবেন কি? একদিনের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে আপনি ২৮৭ ম্যাচে অংশ নিয়ে ৫৫টি অর্ধশতক ও ১৬টি শতকের সাহায্যে ৩৫.৮৯ গড়ে করেছেন ৯৬১৯ রান। সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত স্কোর ছিল ১৭২। কুমার সাঙ্গাকারার পর ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ডিসমিসাল ও শতকের মালিক আপনি। ক্রিকেট অসট্রেলিয়াকে ৬ টেস্ট ও ১৫ ওয়ানডে ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রথম উইকেটকিপার হিসেবে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ৫০+ ডিসমিসালের মালিকও আপনি। ২০০৩ বিশ্বকাপে একাই ২৩টি ডিসমিসালের রেকর্ডও এই আপনার দখলে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনালে দ্রুততম শতক ও সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রানের (১৪৯) মালিক কে?এই প্রশ্নের উত্তরে আসে আপনার নাম। শুধু তাই নয়, একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে পরপর তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ৫০+ রান করার একক রেকর্ডটিও আপনার অনন্য অর্জন। সেই সাথে টানা তিনটি বিশ্বকাপজয়ী একমাত্র উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানটির নামও গিলক্রিস্ট । এক যুগের ক্যারিয়ারে আপনার যা অর্জন তা অন্য কোনো উইকেটকিপারের পক্ষে সম্ভব হয়নি।ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে আর কিছু নেওয়া বাকি আছে কি?

ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে ১০০টি ছক্কা মেরেছেন, ৮২ স্ট্রাইক রেটে রান করেছেন। এসব পরিসংখ্যান বলবে আপনি টেস্টেও টি-২০ মেজাজে খেলতেন। কিন্তু পাকিস্তানের ৩৬৯ রানের টার্গেট তাড়া করতে গিয়ে ৪র্থ ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ১২১ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে পরাজয়ের প্রহর গুনছিল, তখন জাস্টিন ল্যাঙ্গারকে নিয়ে আপনি যে প্রতিরোধ গড়েছিলেন এবং অসম্ভবকে পরাভূত করে জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। ২০১৫ সালে ফতুল্লা টেস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া ৯৩ রানে ৬ উইকেট হারালে ফলোঅনের আশঙ্কা থেকে ফেরাতে খেলেন ১৪৪ রানের ইনিংস! বাংলাদেশকে হতাশ করে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটি জিতেও নেয়। এই পরিসংখ্যানগুলো কি আপনাকে টেস্ট ক্রিকেটারের মর্যাদা দেয় না? অথচ টেস্ট ক্যারিয়ারে আপনি ছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বল। ৯৬ টেস্ট ম্যাচে অংশগ্রহণ করে ৪৭.৬০ গড়ে করেছেন ৫৫৭০ রান। রয়েছে ৫৭ বলে দ্রুততম শতকের রেকর্ডও। টেস্টে আপনার অর্ধশতকের সংখ্যা ২৬টি আর শতকের সংখ্যা ১৭টি। টেস্টে আপনার সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত স্কোর ২০৪* রান। একজন উইকেটকিপার হিসেবে টেস্টে সর্বোচ্চ ১৭টি শতকের মালিক। স্যার ভিভ রিচার্ডসন ও মিসবাহ উল হকের পর দ্বিতীয় দ্রুততম টেস্ট শতকের মালিক আপনি। যেটা করেছিলেন মাত্র ৫৭ বলে।

অর্জনের ঝুলি কাঁধের ব্যাগটা ভারী করে না, গিলক্রিস্ট

ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা যাই বলুক, তারা ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’ এর নেশায় যতোই বুঁদ হয়ে থাকুক, আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি- এমন কোনো একাদশ হওয়া সম্ভব নয় যেখানে ওয়ানডেতে ওপেনার আর টেস্টে ৭ নম্বর জায়গাটি আপনার জন্য বরাদ্দ থাকবে না। আপনাকে সম্মান করার অসংখ্য কারণ আছে। ২০০৩ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ডি সিলভার বলে আম্পায়ার আপনাকে আউট দেননি, অথচ আপনি নিজ থেকে ওয়াক করেছেন, পেয়ে গেলেন ‘ওয়াকার’ উপাধি। যেটির পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মতামত এসেছিল। মতামতে কিছুই প্রমাণিত হয় না, আমি শুধু জানি ‘জেন্টলম্যানস গেম’ হিসেবে যতই বলি, আচরণে তার প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত এই দাবি ভিত্তিহীন। আপনার মতো গুটিকয়েক ক্রিকেটার আছে বলেই এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে না!

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মাত্র ১৩টি টি-২০ ম্যাচে ১৪৭ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ২৭২ রান, ব্যাক্তিগত সর্বোচ্চ ৪৮ রান। আপনার স্বর্ণসময়ে টি-২০ এর আবির্ভাব ঘটলে ক্রিস গেইল বা ব্রেন্ডন ম্যাককালাম নয়, আপনিই হতেন টি-২০ এর ত্রাস। আইপিএলে ডেকান চার্জার্স বা কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের হয়ে কয়েক মৌসুম খেলেছেন বটে, কিন্তু খেলা দেখে কখনোই মনে হয়নি এটা শোয়েব আখতারের ঘণ্টায় ১৫০ কি.মি গতির বলকে ছক্কা মেরে গ্যালারিতে পাঠানো গিলক্রিস্ট, মনে হয়েছে বয়সের ভারে ন্যুব্জ একজন ক্লান্ত ব্যাটসম্যান যে টি-২০ তে মানিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তবুও ডেকান চার্জাসের হয়ে আইপিইএলেও শিরোপা জিতলেন।২০১১ আইপিএল মৌসুমে আপনি চার্লস ল্যাঙ্গাভেল্টের বলে ১২২ মিটার ছক্কা হাঁকিয়েছেন, যা এখনো আইপিএল ইতিহাসের চতুর্থ সর্বোচ্চ। এত শক্তি সেদিন পেলেন কোথায়? বিনিময়ে সেই ম্যাচে শতকও হাঁকিয়ে ফেলেন।

শোয়েব আখতার নিজেই অনেক ইন্টারভিউতে বলেছেন, তিনি আপনাকে বল করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। ৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড ধরাশায়ী হয়েছে শোয়েবের গতির সামনে, প্রতিটি ম্যাচেই ব্যাটসম্যান ভয়ে থেকেছে শোয়েবের গতি নিয়ে, অথচ ফাইনালে আপনি তাঁকে যেভাবে খেলেছেন, একবারও মনে হয়নি এই বোলার এতোটা জোরে বল করে ব্যাটসম্যানের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে সমগ্র টুর্নামেন্টে। তবে আপনার নিজের ক্যারিয়ার যে এতোদূর যাবে সেটাই বা কে ভেবেছিল! বিশ্বকাপের মাত্র দেড়-দুই বছর আগেও আপনি ছিলেন ইয়ান হিলির রিপ্লেসমেন্ট; অভিষেক ম্যাচে করেছিলেন ১৮, পরের ম্যাচে ০; সেখান থেকে এইটুকু সময়ের ব্যবধানে আপনি স্টিভ ওয়াহের ডেপুটি হয়ে যাবেন সেটা তো বাড়াবাড়ি কল্পনাই!

অর্জনের ঝুলি কাঁধের ব্যাগটা ভারী করে না, গিলক্রিস্ট

২০০২ সালে উইজডেন বর্ষসেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হলেন। পরপর দুই বছর (২০০৩ & ২০০৪) অস্ট্রেলিয়ার সেরা ওয়ানডে ব্যাটসম্যান নির্বাচিত হন। একই বছর অর্জন করেন অ্যালেন বর্ডার মেডেল। ২০০৪ সালে জায়গা করে নেন রিচিভিনো গ্রেটেস্ট একাদশে ও বিশ্ব একাদশে। ২০০৪-০৫ সালে বোলারদের ভোটে সেরা ভয়ংকর ব্যাটসম্যানের তকমা পান। ২০০৭ সালে ক্রিকইনফো জরিপে অস্ট্রেলিয়ার সর্বকালের সেরা ওপেনিং ব্যাটসম্যান ও উইকেটকিপার নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও ২০১৩ সালে আইসিসির মর্যাদা পূর্ণ ‘হল অব ফেম’ এ স্থান পান। এত সব অর্জনের ঝুলি কি আপনার কাধের ব্যাগটা ভারী করে না?

আপনি অবসরে গেলেন হুট করে। ২০০৮ এর ভারত সফরে টেস্টে ভিভিএস লক্ষণের ক্যাচ ফেললেন আর মনে হলো, বয়স হয়ে গেছে, ভেতর থেকে ক্রিকেট আর আসছে না। অথচ চাইলে আরও বছর দেড়েক ক্যারিয়ার দিব্যি টেনে নিতে পারতেন। রক্ত-মাংসে অস্ট্রেলিয়ান হলেও ব্যক্তিমানসে আপনি অনেকটাই এশিয়ান ভাবধারার। আপনার মধ্যে দম্ভ নয়, আবেগই দেখতে পেরেছি ক্রিকেটের প্রতি।

অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, প্রশংসা যতই করি, আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘ট্রু কালারস’ এর বিক্রি বাড়ানোর কৌশল হিসেবে বইয়ের ভেতরে আপনি শচীন টেন্ডুলকারের সততা আর স্পোর্টসম্যানশিপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, মুরালিধরনের বোলিংকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন- এই আচরণগুলো আপনার কাছে আশা করিনি। মারভান আতাপাত্তু যথার্থই বলেছেন, ‘শচীন আর মুরালিকে ছোট করে গিলক্রিস্ট নিজ বড় কিছু হতে পারেনি।’

ব্যাটসম্যানের অসাধারণ শট ও বোলারের চোখ ধাঁধানো ডেলিভারির পাশাপাশি উইকেটকিপারের দুর্দান্ত সেভিংসও ক্রিকেটের নন্দনতত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মনে রাখবেন, প্রথমবারের মত যার হাতে গ্লাভস উঠবে, সাথে সাথে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে আপনার নামটি শুনতে সে বাধ্য হবে।

লিখেছেন- ইসমাইল উদ্দিন সাকিব 

বল বাই বল লাইভ স্কোর পেতে আর নয় বিদেশি অ্যাপ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক খবর এবং বল বাই বল লাইভ স্কোর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে BDCricTime সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান ক্রিকেট অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

 

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Related Articles

সালমান-রল্টনের সাথে ডিনার করতে চান ইমরুল

অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের দিবারাত্রির টেস্ট চূড়ান্ত

বিশ্বকাপ না হলে আইপিএল কেন- বর্ডারের প্রশ্ন

অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট ফিরছে জুনে

দু’বছর পিছিয়ে ২০২২ সালে হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ?