SCORE

সর্বশেষ

টাইগার হয়ে উঠার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল যেদিন

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আজ টাইগার নামে পরিচিত। ক্রিকেটবিশ্বে উদিয়মান পরাশক্তি। দেশ-বিদেশ দাপিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে বহু অর্জনে সমৃদ্ধ এক ক্রিকেট জাতি আমরা। কিন্তু এই যে ক্রিকেটবিশ্বে মাথা উঁচু করে আজ টাইগারদের এতো অর্জন এসবের মুল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল আজ থেকে ২১ বছর আগের এই দিনে। আকরাম খানের নেতৃত্বে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জনকারী সেই দলটি বাংলাদেশ দলের আজকের টাইগার হয়ে উঠার মুল প্রেরণা। সেই সাথে এই দিনটিই প্রথম আইসিসির কোন শিরোপা জয়ের স্বাদ পাওয়ার দিন, নতুন কিছু পাওয়ার দিন, বিজয়ের দিন।

১৯৯৭ সালের ১৩ই এপ্রিল। চৈত্রের দাবদাহে জ্বলছে সারা দেশ। এমন এক দুঃসহ গরমের দিনে স্বস্তি হয়ে একপশলা বৃষ্টির মতোই সেদিন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠে এক দুর্দান্ত জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সেদিন কুয়ালালামপুরের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। আগের দিন খেলার শুরুতেই বৃষ্টির হানা। ২৪৯০ কিলোমিটার দূরে সেই বৃষ্টি বাংলাদেশের দর্শকদের মনেও শঙ্কার ডঙ্কা বাজিয়ে দিয়েছিল। বৃষ্টিবিঘ্নিত সেই ম্যাচের প্রথমে ব্যাটিং করে ৭ উইকেটে ২৪১ রান করে প্রতিপক্ষ কেনিয়া। কেনিয়ার সেসময়ের সেরা ব্যাটসম্যান স্টিভ টিকোলো খেলেন ১৪৭ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। বল হাতে স্পিনার মোহাম্মদ রফিক ৬ ওভারে ৪০ রান খরচ করে ৩ উইকেট, খালেদ মাহমুদ সুজন ৭ ওভারে ৩১ রান খরচে ২ উইকেট এবং সাইফুল ইসলাম ৯ ওভারে ৩৯ রানে ২ উইকেট তুলে নেন। তবে সেদিন আর ব্যাট হাতে নামতে পারেনি বাংলাদেশ। খেলার বাকিটা বৃষ্টির কারণে কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিলো না। খেলা শেষপর্যন্ত গড়ালো ‘আনলাকি ১৩’-এ, তথা রিজার্ভ ডে তে। সেই আনলাকি দিনটি পরদিন পয়মন্ত হয়েই এলো বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য।
পরদিনও বৃষ্টির কারণে খেলা শুরু হতে দেরি হচ্ছিলো। সিনথেটিক টার্ফে খেলা হওয়ায় বৃষ্টিতে পিচের কোন ক্ষতি না হলেও আউটফিল্ড ভিজে খেলার অনুপযোগী। আধবেলা লাগে সেই মাঠ খেলার উপযোগী করতেই। মরিস ওদুম্বে, স্টিভ টিকোলো, টমাস ওদেয়ো, টনি সুজি, আসিফ করিমদের কেনিয়া সেদিন জয়ের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। বৃষ্টি বিগ্নিত ম্যাচে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের টার্গেট দাঁড়ায় ২৫ ওভারে ১৬৬। কিন্তু শুরুতেই তথা শুন্য রানেই এক উইকেট হারিয়ে বসে বাংলাদেশ। নাইমুর রহমান দুর্জয় কেনিয়ান পেসার সুজির প্রথম ওভারের প্রথম বলেই বোল্ড। তবে ওপেনিংয়ে নামা রফিক সেদিন ১৫ বল খেলে ২৬ রানের ঝড়ো এক ইনিংস খেলেন। সেই সাথে মিনহাজুল আবেদিন নান্নু (২৬), আমিনুল ইসলাম বুলবুল (৩৭), আকরাম খান (২২) এমন কয়েকটি ছোট ছোট ইনিংসে আস্তে আস্তে জয়ের কাছে চলে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু শেষদিকে রানের চাকায় কিছুটা বাঁধ দিতে সক্ষম হয় কেনিয়া। খালেদ মাসুদ পাইলট শেষ দিকে জোড়া ছক্কা হাকিয়ে সেই বাঁধ ভেঙ্গে দিলেন। সাইফুল আর সুজনও ব্যাট হাতে আক্রমণাত্মক খেললে লক্ষ্য হাতের লাগালে চলে আসে।

শেষ ওভারে তুমুল উত্তেজনা। নাটকীয় মুহূর্ত। ১ বলে চাই ১ রান। বাংলাদেশের মানুষ বেতারে ধারাভাষ্য শুনছে আর থরথর করে কাঁপছে উত্তেজনায়। চৈত্র সংক্রান্তি শেষে পরেরদিন বাংলা নববর্ষ। এমন এক আবেগীয় মুহূর্তে এই জয়ের প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষমাণ পুরো দেশ। স্নায়ুক্ষয়ী সে মুহূর্তে বোলার ছিলেন কেনিয়ান পেসার টনি সুজি। স্ট্রাইকে হাসিবুল হোসেন শান্ত। অন্যপ্রান্তে খালেদ মাসুদ পাইলট। উত্তেজনা ছুঁয়ে যাচ্ছে তাদেরও। প্রথম কোন আইসিসি’র ট্রফির স্বাদ পেতে চলেছেন। উত্তেজনা থাকা স্বাভাবিক। স্ট্রাইকে থাকা শান্তকে ডেকে কিছু একটা পরামরশ করলেন পাইলট। এদিকে কেনিয়ানরা ভেবে বসে আছে জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ২ রান। আসলে ডাকওয়ার্থ লুইস ম্যাথড বা ডিএল ম্যাথডের হিসাবটা তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। তারা হিসাব ভুল করে ভেবেছিল জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ১৬৭ রান, যেটা ছিল আসলে ১৬৬ রান। ফলে ফিল্ডিং সাজানোতে ভুল করলো তারা। সব ফিল্ডারকে ক্লোজ না রেখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখলো কেনিয়ানরা। পেসার টনি সুজি তারপরও দারুণ একটা ডেলিভারিতে পরাস্ত করলেন শান্তকে। তবে বল তার ব্যাটে না লেগে তার প্যাডে লেগে বল চলে গেল শর্ট ফাইন লেগে। সেখানে কোন ক্লোজ ফিল্ডার না থাকায় প্রান্ত বদল করতে সক্ষম হলেন দুই ব্যাটসম্যান। আর রানটি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই শান্ত ছুট লাগালেন মাঠের পাশে তাবু খাটানো অস্থায়ী ড্রেসিং রুমের দিকে। সে সময়ের বিসিব্যয়ী প্রধান সাবের হোসেন চৌধুরী আর তার সহকর্মী বোর্ড কর্তারা তখন আনন্দের আতিশয্যে লাল-সবুজের টি-শার্ট পড়ে মাঠে ছুটে গেলেন। মাঠে খেলা দেখতে আসা বাঙ্গালী আর ড্রেসিং রুমে অপেক্ষমাণ ক্রিকেটারদের মাঝে সেই উচ্ছাস ছড়িয়ে পড়তে দেরি হলো না।

Also Read - সেঞ্চুরির হ্যাটট্রিক তুষারের

কেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আফগানিস্তান আর নেদারল্যান্ডস এসব দলের সমকক্ষ ধরা হতো যে বাংলাদেশকে, সেই দেশ সেই ট্রফি জয়ের পর তরতর করে এগিয়েছে। পেয়েছে টেস্ট স্ট্যাটাস। ফলে সেদিনের সেই জয় সব বিচারেই বাংলাদেশ দলের এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। ‘বাংলাদেশ-বাংলাদেশ’ ধ্বনিতে মাঠ প্রকম্পিত হচ্ছে বারংবার। ক্রিকেটার, কোচ, ম্যানেজার, বোর্ড কর্মকর্তা সবার চোখে আনন্দের জল। সেখানে সংবাদ সংগ্রহে যেসব সাংবাদিক গিয়েছিলেন তারাও সেই আনন্দে সামিল হলেন। সেইসাথে প্রবাসী বাঙালিরাও যোগ দিলেন সেই আনন্দের উৎসবে। আগের পাঁচবার চেষ্টা করেও যা সম্ভব হয়নি, এবার তা হলো। যদিও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেমির যুদ্ধে জেতার পরপরই বিশ্বকাপ নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের। তবুও ফাইনাল জিতে ট্রফি উঁচু করে ধরার যে আনন্দ আর গর্ব তার কি কোন তুলনা চলে? বাঙালির প্রাণের উৎসব, চেতনা ও ঐতিহ্যর প্রতীক বাংলা নববর্ষ শুরুর আগের দিন পাওয়া সেই জয় বাঙ্গালীর উৎসবকে বাড়িয়ে দিয়েছিল কয়েকগুণ।

এখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে যেভাবে শক্তিধর দল হয়ে উঠছে, তার প্লাটফর্মটা তৈরি হয়েছিল এই ট্রফি জয়েই। দুই দশক আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আনুষ্ঠানিক পথচলার শুরু। সেখান থেকে আজ পর্যন্ত হাটি হাটি পা পা করে বাংলাদেশ দলের প্রাপ্তির খাতায় যুক্ত হয়েছে অনেক অর্জন। তবে ভিত্তিটা কিন্তু সেই জয়েই রূপণ করা হয়েছিল। কেনিয়াকে হারিয়ে সেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিনেই বিশ্ব দেখেছিল ক্রিকেটের নতুন শক্তি বাংলাদেশের অভ্যুদয়। আজকে বাংলাদেশ সব দলের বিপক্ষেই কঠিন লড়াই করে, জয় ছিনিয়ে আনে। দেখতে দেখতে সেই দিনটি আজ ২১ বছর পার করলো। তবু মনে হয় এইতো সেদিন আকরাম খানের হাতে জ্বলজ্বল করছে সেই আইসিসি’র সোনালী ট্রফি।

আরও পড়ুনঃ আইপিএলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চান সাকিব

Related Articles

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির কফিনে আইসিসির পেরেক

‘বিসিবি-ক্রিকেটাররা সবাই আমার মস্তিষ্কে সারাজীবন থাকবে’

ভারতকে টপকে ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে ইংল্যান্ড

ভারত আয়োজন না করলে টি-২০ বিশ্বকাপ বাংলাদেশে?

‘আন্ডারডগ’ নয় পাকিস্তান?