তামিমের যোগ্য সঙ্গী হবেন লিটন দাস?

এশিয়া কাপ ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ৩৩ বলে অর্ধ-শতক আর ৮৭ বলে শতক- এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে নামের পাশে যোগ করলেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রথম সেঞ্চুরি। হ্যাঁ, বলা হচ্ছিল ডানহাতি ওপেনার লিটন দাসের কথা।  শুক্রবার একইসাথে মেহেদী হাসান মিরাজকে সাথে নিয়ে ভারতের বিপক্ষে উদ্বোধনী জুটিতে সবচেয়ে বেশি রানের নতুন রেকর্ডও গড়েছেন লিটন।

ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপ ফাইনালে শতক হাকানোর লিটন দাস

এর আগে ২০১৫ সালে ঢাকায় এই ভারতের বিপক্ষেই তামিম ইকবাল সৌম্য সরকার করেছিলেন ১০২ রান, উদ্বোধনী জুটিতে। তিন বছর পর সেই রেকর্ড ভাঙল লিটন-মিরাজের জুটি। আর দাপুটে ব্যাটিংয়ে ওপেনিংয়ে তার শক্ত অবস্থানেরই জানান দিলেন যেন।

শুধু ওয়ানডে নয়, টি-২০’তেও সেরা জুটির রেকর্ড লিটনের দখলে, যেখানে তার সঙ্গী ছিলেন তামিম। এই বছরেরই ১০ মার্চ শ্রীলঙ্কার আর প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে ত্রিদেশীয় সিরিজের ম্যাচে ৭৪ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়ে এ রেকর্ডের দখল নেন তারা।  কলম্বোর এই মাঠে শ্রীলংকার বিপক্ষে সেদিন রীতিমত ঝড় তুলেছিলেন লিটন ও তামিম। গত ১১ বছর ধরে ওপেনিংয়ে নিজের প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছেন তামিম।  তবে এখন পর্যন্ত তামিমের বিপরীতে ১৪ জন ওপেনার নামানো হলেও সঙ্গী হিসেবে পাকাপোক্ত অবস্থান তৈরী করতে পারেননি কেউই।  যাকে নিয়ে আশার আলো দেখছিল বাংলাদেশ, সেই সৌম্য সরকারও নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। বাজে ফর্ম আর আস্থার প্রতিদানের চরম অভাবে তাকে নিয়েও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হয়েছে টিম ম্যানেজমেন্টকে। যদিও তামিম-সৌম্য জুটির শুরুটা ছিল অসাধারণ। তার সঙ্গেই সর্বোচ্চ তিনবার সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েছেন তিনি। কিন্তু ক্রমাগত পারফরম্যান্স খারাপের দিকে এগোতে থাকায় চিন্তায় পড়তে হয় টিম ম্যানেজমেন্টকে।

Also Read - আবারও ভারতের হাতে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব

এনামুল হক বিজয়কে দিয়ে দুই সিরিজে চেষ্টা করা হলেও তাতেও কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। ত্রিদেশীয় সিরিজ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে নিজেকে প্রমাণে ব্যর্থ হন এ ওপেনার।  টেস্টের সেরা জুটি হিসেবে পরিচিত তামিম ইকবাল-ইমরুল কায়েসের ‘উদ্বোধনী জোড়া’; ২০১৫ সালের এপ্রিলে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের সাথে এই দুই বাঁহাতি ওপেনার ৩১২ রানের জুুটি গড়েছিলেন, যা এখন পর্যন্ত টেস্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পার্টনারশিপ।

প্রথম উইকেটে সবচেয়ে বেশি রানের পার্টনারশিপের স্রষ্টা তামিম-ইমরুলের উদ্বোধনী জুটিতে আরও একজোড়া বড় সাফল্য, অর্জন ও কৃতিত্ব আছে। টেস্টে প্রথম উইকেটে বাংলাদেশের দ্বিতীয় (২২৪, ২০১৪ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে) ও তৃতীয় সর্বাধিক (১৮৫, ২০১০ সালের মে মাসে লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে) পার্টনারশিপটাও এ দুই বাঁহাতি ওপেনারের।

সেটাই শেষ নয়। দু’জনার আরও একটি শতরানের জুটি (১২৬, ২০১০ সালের জুনে ম্যানচেস্টারে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে) রয়েছে।  তবে এত কিছুর পরও ইমরুল লম্বা ইনিংস খেলার জন্য অনেক বেশি কার্যকর হওয়ায় টেস্ট ব্যতীত অন্য ফরম্যাটে তামিমের সঙ্গী হওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রশ্ন। ২০০৯ সালের পর থেকে তামিমের বিপরীতে ওপেনিং জুটি গড়তে নেমেছিলেন শাহরিয়ার নাফীস, জুনায়েদ সিদ্দিকী, নাজিম উদ্দিন, মেহরাব জুনিয়ররাও; তবে টিকে থাকতে পারেননি কেউই।

এর মধ্যে পারফরম্যান্সের কারণে আলোচনায় আসছেন লিটন দাসও।  ঘরোয়া ক্রিকেটে ঝড়ো ব্যাটিং দিয়ে সবার নজর কাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অবশ্য নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি।  তবে ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্যই পেয়েছেন ‘হার্ডহিটার’ উপাধি। এশিয়া কাপের ফাইনালের আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ৪১ রানের।  ব্যাটে রান না থাকায় সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হওয়ার ছিল স্বাভাবিক বিষয়।

শেষপর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই যেন সাকিব আল হাসান কিংবা তামিম ইকবালের শূণ্যতা ঘোচাতে বাড়তি দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিলেন এই ওপেনার। বছর দুয়েক আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে বাংলাদেশের সেরা পারফর্মারদের একজন হয়েই ছিলেন।  গত বছরের ২৯ জানুয়ারী ওপেনিংয়ে নেমে তার ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকান, যাতে ভর করে ওয়াল্টন মধ্যাঞ্চলের বিপক্ষে বড় সংগ্রহ পায় ইসলামী ব্যাংক পূর্বাঞ্চল। ঐ ম্যাচে লিটন খেলেছিলেন ২১৯ রানের ঝলমলে এক ইনিংস। ২০১৪ সালে আবুধাবিতে অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে চার ইনিংসে ২৩৯ রান করেছিলেন। রান-চার্টের শীর্ষে পৌছান জাতীয় ক্রিকেট লীগে, রংপুর বিভাগের হয়ে খেলে। তুলে নেন পাঁচ সেঞ্চুরি এবং হাজারের উপর রান। ৮৫.৩৩ গড়ে খেলে অসাধারণভাবে সেই মৌসুম শেষ করেন।  এখন পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার সংগ্রহ ৪২১২ রান, ৫২ ম্যাচ খেলার বিপরীতে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পূর্ণরূপে জ্বলে উঠতে না পারলেও ওপেনিং জুটিতে মাঝেমধ্যেই ভালো ইনিংস উপহার দিয়েছেন।  ২০১৫ এর জুনে ভারতের বিপক্ষে ৪৫ বলে ৪৪ রান করেন। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে হাফ-সেঞ্চুরি তুলে নেন।  এছাড়া কিছুদিন আগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২৪ বলে হাফ-সেঞ্চুরি আর ৬১ রানের ইনিংস খেলেন লিটন। সেসময় ম্যাচের সেরা ব্যাটসম্যান, দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরিসহ কয়েকটি পুরস্কারও ওঠে তার হাতে।

এশিয়া কাপের শেষ ম্যাচে জ্বলে ওঠা আর ওপেনিংয়ে নেমে ঘরোয়া ক্রিকেট ক্যারিয়ারের অসাধারণ সাফল্যতে বর্তমান তিনিই তামিমের যোগ্য সঙ্গী হতে পারেন বলে আশা করাই যায়।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ১৭ অক্টোবর ঢাকা বিভাগের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তার।  ২২ এপ্রিল ক্যাপবিহীন অবস্থায় সফরকারী পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি খেলার জন্য ডাক পান। অন্তর্ভুক্ত হন ১৪-সদস্যের দলে। কিন্তু দুই-টেস্ট সিরিজে খেলা হয়নি তার।  এরপর মুশফিকের চোটের কারণে সফরকারী ভারতের বিপক্ষে খেলার জন্য দলে রাখা হয় তাকে। ২০১৫ সালের ৫ জুলাই সফরকারী সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ৪৬তম বাংলাদেশী হিসেবে তার অভিষেক ঘটে।  ২০১৫ এর ১০ জুন ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক ম্যাচেই ৪৪ রান তোলেন যা বাংলাদেশী উইকেট কিপারদের মধ্যে সর্বোচ্চ।

লিখেছেন নুর মোহাম্মদ হৃদয়

Related Articles

এই মিরাজ অনেক আত্মবিশ্বাসী

মিঠুনের ‘মূল চরিত্রে’ আসার তাড়না

‘আঙুলটা আর কখনো পুরোপুরি ঠিক হবে না’

এক নয় মাশরাফির তিন ইনজুরি

‘বিশ্ব ক্রিকেটে সম্মানজনক জায়গা আদায় করেছে বাংলাদেশ’