দায়টা কি শুধুই গামিনীর?

ফাইনালের আগের ম্যাচে মাত্র ৮২ রানে অলআউট হয়ে ১০ উইকেটের বিশাল পরাজয়, আর ফাইনালে ৭৯ রানের লজ্জাজনক হার। প্রথম ম্যাচে ১৬৩ রানের বিশাল পরাজয়ে যে দলটির ফাইনালে উঠাই কঠিন মনে হচ্ছিলো, সে দলটির কাছেই কিনা পরের দুই ম্যাচেই এমন ভয়াবহ পরাজয়ের পিছনে অনেকেই পিচের দোষ দিচ্ছেন। একদিক থেকে কথাটা ঠিকই আছে। কারণ, যে ধরনের পিচ বাংলাদেশ দল প্রত্যাশা করেছিল, তার কিছুই পাওয়া যায়নি এই ম্যাচে। কিন্তু আদতে সব দোষ কি শুধু পিচ কিউরেটর গামিনী ডি সিলভারই? তাই যদি হয়, তাহলে তার অপসারণ নয় কেন?

 

গামিনিকে বিসিবির কারণ দর্শানোর নোটিশ

Also Read - গামিনিকে বিসিবির কারণ দর্শানোর নোটিশ


পিচ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা গত বিপিএলেই নতুন মাত্রা পায়। সেসময় পিচ নিয়ে সমালোচনায় মেতেছিলেন ওয়ানডে ও বিপিএলে রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ক মাশরাফি এবং জাতীয় দলের ওপেনার ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের অধিনায়ক তামিম। পরে তামিমকে এজন্য ৫ লক্ষ টাকা জরিমানাও গুণতে হয়। পিচ নিয়ে সমালোচনা দেশের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিবি’রও অপছন্দ সেটা পরিস্কার বোঝা গিয়েছিল। আর এবারের ত্রিদেশীয় সিরিজে এসে মুখোমুখি হওয়া প্রথম ম্যাচেই শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দিয়ে পিচ প্রসঙ্গ তোলার কোন সুযোগই পাওয়া যায়নি। কিন্তু একই দলের বিপক্ষে পরের দুই ম্যাচেই পিচের আসল খেলা দেখা গেল। এক ম্যাচে ৮২ রানেই অলআউট টাইগাররা, পরের ম্যাচে রীতিমত ব্যাটসম্যানদের আত্মহুতি দিতে দেখা গেল। পিচের প্রসঙ্গ সেখান থেকেই শুরু। মিরপুরে ত্রিদেশীয় সিরিজে সাতটির পাঁচটিই লো স্কোরিং ম্যাচ দেখে বিষয়টা আরও স্পষ্ট বুঝা যায়।

ফাইনালে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় সাকিব আল হাসানের ইনজুরি দলের পরাজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সন্দেহ নেই। তাই বলে মাহমুদুল্লাহ ছাড়া আর কেউ দাঁড়াতেই পারবেন না, তা কি করে হয়? পিচের আচরণের হেরফের খুব স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় এই ম্যাচেই। স্বাগতিক দলের জন্য সারা বিশ্বেই কিছুটা সুবিধাজনক পিচ বানানো হয়। অথচ এই ম্যাচে পিচের আচরণ দেখে মনে হয়েছে যেন শ্রীলঙ্কাই স্বাগতিক দল। উইকেট এতো ধীর যে ব্যাটসম্যানদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিলো কোন বল বাউন্স করবে। ফল অকাতরে উইকেট হারানো। আর বিশাল পরাজয়। ত্রিদেশীয় কোন সিরিজ জয়ের এতো কাছে গিয়েও হার মেনে নিতে কষ্ট হবে বই কি!

ম্যাচ শেষে পিচ নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা বলেছেন মাশরাফিও, ‘অবশ্যই আমরা ভালো উইকেট চেয়েছিলাম। শুরু থেকেই বলেছি, প্রথম ম্যাচ থেকেই চেয়েছি, হাই-স্কোরিং উইকেটে ব্যাটিং করতে চাই। বোলিংয়ে আমাদের চারজন পেসার আছে, সাকিব ছিল। নাসির খেলেছে, মিরাজ খেলেছে। আমাদের বোলিং ইউনিট শক্তিশালীই ছিল। আমরা সব সময় চেয়েছি ভালো উইকেটে খেলতে। একটা ম্যাচ কেবল শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তিনশ’ করেছিলাম। প্রতি ম্যাচেই অন্তত ২৭০-৮০, তিনশ রানের উইকেটে খেলতে চেয়েছি আমরা।’

 

এদিকে খবর প্রকাশ হয়েছে, ম্যাচের আগে পিচ কিউরেটর গামিনী ডি সিলভা তার স্বদেশী শ্রীলঙ্কা দলের সাথে বৈঠক করে পাল্টে ফেলেছেন পিচের চিত্র। বল অসমান বাউন্স হচ্ছিল। এই সন্দেহের আরও একটা কারণ হচ্ছে, গামিনীকে নিষেধ করা সত্ত্বেও উইকেটে পানি দেওয়ার ঘটনা। এছাড়া লঙ্কান কোচ ও স্বদেশী হাথুরুসিংহের সাথে গোপন বৈঠকের অভিযোগও উঠেছে গামিনীর বিরুদ্ধে। এটা এক বেসরকারি টেলিভিশনে প্রকাশিত হয়েছে। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলেতো কঠিন সাজা পাওনা গামিনীর। বিসিবি তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছে।

কিন্তু বিসিবি’র উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। নোটিশ পাঠানো নিয়ে বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন বলেন, ‘ম্যাচের রেজাল্ট যখন ভালো হয় তখন কিন্তু আর এসব বিষয় নিয়ে কোনো কথা থাকে না। কিন্তু রেজাল্ট যখন কাঙ্খিত না হয় তখন বিভিন্ন রকমের আলোচনা আসে। তো আমি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় আলোচনা করব না কথা বলবো না। যদি এই ধরনের কোন বিষয় আমাদের চোখে পড়ে অবশ্যই বোর্ড সেটা দেখে। প্রত্যেকটা বিষয় কিন্তু আমাদের মাথায় আছে। এটা আমাদের মতো করে ইন্টারনালি দেখি।’

 

জিম্বাবুয়ের দুশ্চিন্তার নাম মিরপুরের উইকেট

এমন পক্ষপাতদুষ্ট কথা এর আগেও বলা হয়েছে বিসিবি’র পক্ষ থেকে। গামিনীকে রক্ষা করায় বিসিবি’র আগ্রহ যতো বেশি, ক্রিকেটারদের কথার গুরুত্ব তাদের কাছে ততোটাই কম! পিচ নিয়ে কথা বলায় ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ঘটনা এদেশে নজিরবিহীন নয় মোটেও। হাথুরু আর গামিনী স্বদেশী। একসাথে অনেকদিন বাংলাদেশের ক্রিকেটে কাজও করেছেন। এর আগে পিচ নিয়ে হাথুরু আর গামিনীর একসাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু ভিন্ন দলের সুবিধার জন্য সেই দলের কোচের সহায়তা করা সত্যিই বিস্ময়কর। আর বিসিবি’র ভূমিকা দিনদিন আরও বিস্ময়কর হয়ে উঠছে।

সাকিবের হাতে চারটি সেলাই

ফাইনালে হারের পিছনে পিচের ভূমিকা ছিল, এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তবে এদিন সাকিবের ইনজুরি, তামিমের জ্বলে না উঠা, হাথুরু’র দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের মিডল অর্ডারের ব্যর্থতাকেই দায়ী করা যায়। হাথুরুকে যারা প্রথম ম্যাচে জয়ের পর বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন তাদের জন্য শক্ত জবাব নিয়েই হাজির হয়েছেন তিনি পরের দুই ম্যাচেই। তার গেম প্ল্যানের কাছেই পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ বুঝেশুনে শর্ট বল করেছে, তাতে ব্যাটসম্যানরা হয়েছেন ব্যর্থ। এছাড়া বোলার ব্যবহারেও দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছে শ্রীলঙ্কা। কোচবিহীন বাংলাদেশের জন্য এটা একটা বড় শিক্ষা। মূল কোচের অভাব কখনো পূরণ হওয়ার নয়।

সাকিবের ইনজুরির চেয়েও বড় বিষয় মিডল অর্ডারের রান না পাওয়া। ২২২ রানের টার্গেট পূরণ করতে না পারার ব্যর্থতা শুধু সাকিবের অনুপস্থিতির কারণে হতে পারেনা। সাব্বির-নাসিরের ব্যাটে রানের খরা চলছে। ওপেনিংয়ে বিজয় ব্যর্থ, মিঠুন ফাইনালের চাপেই পরাস্ত। শেষের দিকে হাল ধরার মতো কেউ নেই। মাশরাফির ব্যাটে রান নেই, মিরাজ, সাইফুদ্দিন যেন এখনও মানিয়ে নিতেই পারছেন না। ফলে নতুন কোচের আগমন না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্যা সহজে কাটবে বলে মনে হয়না।

সব মিলিয়ে খুব বাজে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো টাইগারদের। পিচ কিউরেটর নিজেই যদি প্রতিপক্ষের হয়ে পিচ তৈরি করেন তাহলে তার উপর ভরসার কোন উপায় থাকে না। অতিসত্বর গামিনীকে সরিয়ে দেওয়াই এর সমাধান হতে পারে। তবে এই সিরিজ থেকে একটা শিক্ষা পাওয়া গেল প্রধান কোচ নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা আদতে দলের ক্ষতি করছে। বিসিবি’র উচিত দলের প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া, ইচ্ছামতো নয়।

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

আরও পড়ুনঃ ‘সাকিবের জায়গা পূরণ করা কঠিন’

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন