পুরনো তাসকিন, নতুন তাসকিন

স্পিডস্টার তাসকিন আহমেদ বহু আশা আর সম্ভাবনা নিয়েই আবির্ভাব ঘটিয়েছিলেন দেশের ক্রিকেটে। ভালো গতিতে বল করতে পারা তাসকিনকে নিয়ে ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা ছিলেন বেশ আশাবাদী। ২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে একটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়ে বোল্ড করেছিলেন অস্ট্রেলীয় সুপারস্টার গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে। ওয়ানডে অভিষেকেই পাঁচ উইকেট তুলেছেন ভারতের বিপক্ষে। দুর্দান্ত অভিষেকে তাসকিন দারুণ এক আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন ক্রিকেট বিশ্বকে।

Advertisment

তাসকিনের ব্যাপারে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- ধারাবাহিকভাবে ১৪০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে বল করতে পারেন। এমন গতিময় পেসার দেশের ক্রিকেট ইতিহাসেই দেখা যায়নি তেমন। আর সে কারণেই তাসকিনকে নিয়ে আশার বেলুন ফুলাতে শুরু করেন সবাই। শুরুর দিকের সেই ছন্দটা অবশ্য তাসকিন ধরে রাখতে পারেননি। ২০১৪ সালে অভিষেক, এরপর ২০১৬ সালে বোলিং অ্যাকশনের জন্য নিষিদ্ধ হন।

নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরলেও এলোমেলো লাইন-লেন্থ আর গতিময় বোলার হওয়ার কারণে প্রচুর খরুচে ছিলেন তাসকিন। ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করে বল করতে না পারা, আর প্রচুর রান দিয়ে ফেলা- সবকিছু মিলিয়ে বাজে ফর্মের কারণে তাসকিন বাদ পড়েন জাতীয় দল থেকে। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের দলেও জায়গা পাননি। ধারণা করা হচ্ছিল, এনামুল হক বিজয়, সাব্বির রহমান, নাসির হোসেনদের মত ঝরে পড়া ক্রিকেটারদের তালিকায় হয়ত আরো একটি নাম যুক্ত হলো- তাসকিন আহমেদ।

কিন্তু এবার ঘটনা ভিন্ন। ২০২০ সালে করোনার প্রকোপে খেলা বন্ধ ছিল অনেকদিন। লকডাউনে তাসকিন নিজের ফিটনেস নিয়ে কাজ করা শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রম করা তাসকিন নিজের পরিশ্রমের সুফলও পেয়েছেন হাতেনাতেই। করোনা পরবর্তী টুর্নামেন্ট বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ আর বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ- দুই টুর্নামেন্টেই ভালো পারফরম্যান্স করে জাতীয় দলে ফেরার দাবিটাও জানিয়ে রাখেন।

সবকিছু ত্যাগ করে দেশকে জয় উপহার দিতে চাই তাসকিন

ঘরোয়া ক্রিকেটে তাসকিনের দারুণ পারফরম্যান্স নির্বাচকদেরও নজর কাড়ে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে হোম সিরিজেই জাতীয় দলে ডাক পান। এরপর থেকে জাতীয় দলের প্রতিটা সিরিজেই দলে ডাক পাচ্ছেন নিয়মিতভাবে। নিউজিল্যান্ড সফরেও দারুণ বল করেছেন, বিশেষ করে তৃতীয় ওয়ানডেতে। বদলে যাওয়া এই তাসকিনের বোলিং এখন আরো বেশি কার্যকরী। আগের মত এলোমেলো লাইন-লেন্থ আর অগোছালো বোলিং দেখা যাচ্ছে না মোটেও। এখনকার তাসকিন অনেক বেশি পরিণত, অনেক বেশি ফিট, অনেক বেশি ডিসিপ্লিনড। দারুণ লাইন-লেন্থ ধরে রেখে করে স্পট অন বোলিং করে যাচ্ছেন, সাথে গতির ঝড় তো আছেই!

শুধু সীমিত ওভারে নয়, ঘাম ঝরিয়ে তাসকিন টেস্টেও দারুণ বল করেছেন; শ্রীলংকার পর জিম্বাবুয়েতেও। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোনো বোলারের দুর্দান্ত বোলিং সচরাচর দেখা যায় না, তাসকিন সেটাও করে দেখিয়েছেন। কামব্যাক করার পর টি-টোয়েন্টি খুব বেশি না খেললেও যতটুকু খেলেছেন মোটামুটি ভালোই করছেন। টেস্ট, ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টি তিন ফরম্যাটেই অসাধারণ বোলিং করছেন তাসকিন, বেকায়দায় ফেলছেন ব্যাটসম্যানদের।

স্বস্তির বিষয় হল, এমন নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে তাসকিন নিয়মিতভাবে উইকেটও পাচ্ছেন। আগের চেয়ে অনেক বেশি ধারালো আর কার্যকরী একজন বোলারের দেখাই মিলছে তাসকিনের মাঝে।

অজুহাত না খুঁজে নিউজিল্যান্ডে ভালো খেলতে প্রতিজ্ঞ তাসকিন

আরেকটা বিষয়ের কথা না বললেই নয়। জিম্বাবুয়ের সাথে একমাত্র টেস্টে শুরুতেই উইকেট হারিয়ে চাপে থাকা দলকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছেন ‘অচেনা’ ভূমিকায়। চাপের মুখে খেলেছেন ৭৫ রানের দুর্দান্ত একটি ইনিংস। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সাথে তাসকিনের রেকর্ড গড়া জুটি খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছে বাংলাদেশকে। ব্যাটিংয়েও যে বিশেষ নজর দিয়েছেন তাসকিন, তা এখানেই স্পষ্ট। নিউজিল্যান্ড সফরে ধরেছিলেন দারুণ একটা ক্যাচও। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং- তিন জায়গাতেই দারুণ উন্নতি করেছেন তাসকিন- এই ব্যাপারটি মানতেই হবে।

বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বে কমবেশি সব দেশেই জোরে বল করতে পারেন অর্থাৎ গতিময় বোলার আছেন, অন্তত একজন করে হলেও। বাংলাদেশে সেই বোলারের দায়িত্বটা দারুণভাবে পালন করতে পারেন তাসকিন আহমেদ। তাসকিনের ফর্ম, ফিটনেস সবকিছুই তাসকিনের পক্ষে কথা বলছে। আধুনিক ক্রিকেট বিশ্বে লড়াই করার জন্য তাই তাসকিনকে খুব দরকার বাংলাদেশের। তাসকিনের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক। তাসকিন এমন ধারালো আর কার্যকর হয়েই টিকে থাকুন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। তাসকিনের মাঝে ভবিষ্যৎের দারুণ এক পরিপূর্ণ ক্রিকেটার হওয়ার যে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, তা সত্যি হোক। ভক্ত, সমর্থক, ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা এমনটাই।

  • রাইসান কবির