প্রিয় আশরাফুল, কেন এমন করলেন?

প্রিয় আশরাফুল… স্বর্গ থেকে অনেকেরই পতন হয়, কিন্তু সেই পতনে একেবারে পাতালে পৌঁছানোর দুর্ভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়। এটা এমনই এক দৃষ্টান্ত যা কোনো মানুষ কামনা করে না। আপনাকে ভুলে যেতে চাই, কিন্তু সেটাই পারছি না আপনার পূর্বেকার অসাধারণ কীর্তিগুলো আচ্ছন্ন করে রেখেছে বলে।

প্রিয় আশরাফুল, কেন এমন করলেন

Advertisment

আপনি প্রথম আলোচনায় এসেছিলেন বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের আগে আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে লেগ স্পিনে বোল্ড করার মাধ্যমে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই আমিনুল ইসলামের সাথে জুটি গড়েই যে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হবেন টেস্ট ক্রিকেটে, তা কি জানতেন? এমনকি বৃষ্টির কারণে প্রথম যে টেস্টটা ড্র করে বাংলাদেশ, সেখানেও আমিনুল ইসলামের সাথে আপনি অপরাজিত ছিলেন।





আমার ধারণা, অভিষেক টেস্টেই সেঞ্চুরি করা আপনার জন্য ক্ষতিকর হয়েছে।

আপনি যদি বাংলাদেশের অন্যান্য ক্রিকেটারদের মত ক্যারিয়ারের শুরুতে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতেন, দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকতেন, হয়তোবা আপনারও একটি গোছানো ক্যারিয়ার হত। শারীরিক গঠনের কারণে ২৫ বছর বয়সেও আপনাকে মনে হতো ১৮ বছরের কিশোর, হয়তোবা সে কারণে দিনের পর দিন ব্যর্থ হলেও সুযোগ পেয়েছেন। আপনার বিকল্প ছিল না সেসময়। বাংলাদেশ তখন মাঠে নামত ‘সম্মানজনক পরাজয়ে’র আশা নিয়ে। মাঝেমধ্যে আপনি যে বীরত্ব দেখাতেন ঐ একটুকু বিনোদনের মোহে পড়ে গিয়েছিল দেশী-প্রবাসী কোটি বাঙালি, আপনার মত এমন হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা আর কোনো বাংলাদেশী ক্রিকেটারের ভাগ্যে জুটেছে কিনা যাচাই করে দেখতে পারেন। সেই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলো যখন আপনারই অসৎকাজের প্রেক্ষিতে, সেই ক্ষতে প্রলেপ দেয়ার সামর্থ্য আপনার ছিল?






কোন ইনিংসের কথা বলব।

শ্রীলংকার বিপক্ষে সর্বশেষ যে ১৯০ রান করলেন এটা, নাকি ভারতের বিপক্ষে ১৫৮ রানে অপরাজিত থাকা- কোনটার সৌন্দর্য বেশি ছিল? ২০১৩ সালের দিকে আপনি অনেকটাই সুসময় পেরিয়ে এসেছিলেন, সৌন্দর্য্যে ভাটা পড়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে ২০০৪ এ আপনি তখন উদ্ধত শাসক, বোলারকে কোনো রকম ছাড় দেন না। ১৫৮ রানের পথে ইরফান পাঠানকে টানা তিন বলে যে তিনটি চার মেরেছিলেন সেই বিহ্বলতা কাটাতে ক্রিকেট দর্শকের অনেক দিন লেগে যাবে। ২০-২২ ব্যাটিং গড় দিয়ে আপনাকে যারা বিচার করে তারা ক্রিকেট মানে শুধু পরিসংখ্যান বুঝে, কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে একজন ব্যাটসম্যান ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলে তার রুদ্ররূপ কেমন হতে পারে তা ওই পরিসংখ্যান-প্রিয় দর্শকের জানা নেই। দুর্দন্ড প্রতাপশালী অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ হারিয়ে দেবে ২০০৫ সালে- এ কথা ছিল রসিকতার বিষয়। আপনি দেখিয়েছিলেন রসিকতাকে কি করে বাস্তব করতে হয়।

পরের ম্যাচে প্রথম বলে বোল্ড হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ভাগ্য ছিল আপনার সহায়, তাই বেলস পড়ল না, আপনি সেদিন ইচ্ছামতো ব্যাট চালানোর পণ করে নিলেন। তার পরিণাম কি হয়েছিল ইংলিশ বোলারদের একবার জিজ্ঞেস করলে জেনে নেওয়া যাবে। ৫২ বলে ৯৪, শুধু স্ট্রাইকরেটের  হিসাব দিয়ে আপনার ব্যাটিং ক্যারিশমা বোঝানো সম্ভব হবে না। ইউটিউবে এখনো সেই ইনিংসের হাইলাইটস পাওয়া যায়। গড় দিয়ে বিচার করা দর্শকরা যদি একটিবার আপনার ব্যাটিং দেখতো হয়তোবা তারা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হতো আপনার সামর্থ্য সম্পর্কে। মানুষের ধৈর্যের সর্বোচ্চ পরীক্ষা নিয়েছেন আপনি, ম্যাচের পর ম্যাচ তাদের হতাশ করেছেন; তবু আপনি ব্যাটিংয়ে নামলেই সবাই সজাগ হয়ে বসতো। প্রতিটি বল মনোযোগ দিয়ে দেখতো, আপনার ব্যাটিং নিয়ে নানান ধরনের তত্ত্ব আবিষ্কার করে ফেলেছিল।

প্রিয় আশরাফুল, কেন এমন করলেন

যেমন, যেদিন ভাল খেলবেন সেদিন প্রথম বল থেকেই আপনার টাইমিং ভালো হয়, যেদিন পারবেন না সেদিক প্রথম থেকেই নার্ভাস থাকেন, বলে বলে পরাস্ত হন। কিংবা ২৫ রান পার করতে পারলেই আপনি বড় ইনিংস খেলবেন… আপনার ইনিংসগুলো বিশ্লেষণ করেই দর্শকরা এসব তত্ত্ব তৈরি করে নিয়েছিল। আপনি অধিকাংশ ম্যাচেই ১৫ রান করার আগেই আউট হয়ে যেতেন। ১৫০টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন এমন ব্যাটসম্যানের মধ্যে একমাত্র আপনিই বোধহয় ১০ এর নিচে সবচাইতে বেশি স্কোর করেছেন। এটা আপনার জন্য তো বটেই, দর্শক হিসেবে আমাদের জন্যও গ্লানির। প্রচণ্ড হতাশা থেকে একশ্রেণির মানুষ একসময় আপনার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লো, আপনাকে ক্রিজে দেখলেই আউট হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে থাকতো এবং ধারাবাহিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও আপনাকে সুযোগ দেয়ার জন্য নির্বাচকদের দোষারোপ করতো। সেসময় পরিস্থিতি এমন হলো, দল হারুক বা জিতুক আপনাকে কিছুতেই দেখতে চায় না। তবু এর মধ্যে হঠাৎ করে কোনোদিন ভালো খেলে ফেললে ক্ষোভ অনেকটাই প্রশমিত হয়ে যেত। আসলে আপনি এমন একটা সময়ে খেলেছেন যখন দলে নিয়মিত পারফর্মার ছিল না, দল জিততো কালেভদ্রে। জেমি সিডন্স কোচ হয়ে আসার পর আপনার অপরিহার্যতা কমতে শুরু করে। ২০১১ বিশ্বকাপটা ঠিকমতো খেলাই তো হলো না। আয়ারল্যান্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুটো ম্যাচে সুযোগ পেয়েছিলেন, কিছুই করতে পারেননি।

আপনার ক্যারিয়ারকে তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত করা যায়। ২০০১-২০০৮, এই সময়ে তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যেসব কীর্তির জন্য আপনাকে মনে রাখবে মানুষ, তার প্রায় সবগুলোই এই সময়সীমায় করা, আপনাকে ঘিরে বিরক্তি তৈরি হওয়াও এসময়েই। ২০০৮-২০১৩ এর প্রথমভাগ, আপনার পতনকাল। দলে অনিয়মিত হয়ে পড়েন, এই ৫ বছরে বলার মতো কিছুই করেননি। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম প্রমুখ ক্রিকেটারের আবির্ভাবে আপনার সেই একক ইমেজটি ভাগাভাগি হয়ে যায়, দলও পূর্বের তুলনায় বেশি হারে ম্যাচ জিততে থাকে, এবং বছরে ২-৩ টা ভালো ইনিংস খেলে দলে টিকে থাকার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসে, যা দেশের ক্রিকেটের জন্যই কল্যাণকর। আপনি কবে ভালো খেলবেন সেই অধীর অপেক্ষায় থাকা তো ক্রিকেটের জন্য শুভলক্ষণ নয়। তাছাড়া ১০ বছর ধরে একজন মানুষের পক্ষে কাউকে মনোমুগ্ধ করে রাখা সম্ভব নয়, এটাও বুঝতে হবে আপনাকে।

সামগ্রিকভাবে ২০০৮ সালেই ক্রিকেটার হিসেবে আপনার পরিসমাপ্তি ঘটেছে; এরপর খেলেছেন বা খেলার চেষ্টা করেছেন সেটা অতীতকে ‘ক্যাশ ইন’ করে, সামর্থ্যের জয়গান নয়। ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কা আর জিম্বাবুয়ে সফর আপনার ক্যারিয়ারের তৃতীয় অধ্যায়। শাহরিয়ার নাফিস হঠাৎ ইনজুরিতে না পড়লে শ্রীলংকা সফরে আপনার যাওয়াই হয় না। সুযোগ পেয়েই ১৯০ করবেন, এটা বোধহয় আপনারও কল্পনাতে ছিল না। বস্তুত, তৃতীয় অধ্যায়ে এসে আপনার খেলার ধরনের ব্যাপক পরিবর্তন আসে; আগের সেই উজ্জ্বলতা বা অদ্ভুত সৌন্দর্য গায়েব হয়ে গেছে, আপনি তখন একেবারেই সাদামাটা একজন ব্যাটসম্যান। এই খেলা নিয়ে ১৯০ করেছেন বা একটু ধৈর্য ধরলে ২০০-ও হয়ে যেত, এটা অবিশ্বাস্য লাগে। জিম্বাবুয়ে সফরেও চোখে লাগার মতো কিছু করেননি, কিন্তু মনে হয়েছে আপনার উপর আস্থা রাখা যায়।

প্রিয় আশরাফুল, কেন এমন করলেন

এরপরই তো আকসুর প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো। আপনি বিপিএল ফিক্সিংয়ে দোষী সাব্যস্ত হলেন। জানা গেল আরও ভয়ানক তথ্য, বিপিএলই প্রথম নয়, আপনি আরও অনেক আগে থেকে ফিক্সিংয়ের সাথে জড়িত থাকার কথা উঠে এলো। কিন্তু সাবেক ক্রিকেটারদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলো না, আপনি একাই দোষী হলেন। টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে কান্না করেছেন। আমরা আবেগপ্রবণ জাতি, আপনার কান্না দেখেই অনেকে আপ্লুত হয়ে পড়েছেন, অনেকে এখনো বিশ্বাস করতে পারে না আপনি এমন কিছু করেছেন, কেউ কেউ বলে যে দেশ পরপর ৫ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয় সেখানে আপনি এমন কি-ই বা অন্যায় করেছেন! কিন্তু এসব ভ্রান্ত কথায় আপনার দোষ কি লঘু হয়ে যাবে? মানুষ আপনাকে প্রচণ্ড ভালবাসতো, সেই আপনি ভালবাসার কী প্রতিদান না দিলেন। বৈধভাবেই আপনি তো প্রচুর টাকা উপার্জন করেছেন, বন্ধুদের সাথে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নেমেছেন, আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন, একজন মানুষের একজীবনে কত টাকার প্রয়োজন হয়; ফিক্সিংয়ের ওই কয়টি টাকা না হলে আপনার কিছু কি কম পড়তো? আপনার সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বা ঘরোয়া ক্রিকেটে না খেললেও আপনি মোটামুটি ক্রিকেটেই ছিলেন। গুলশান ইয়ুথ ক্লাবে প্র‍্যাকটিস করেছেন, ঢাকার বাইরের লীগগুলোতে এক-দুটি ম্যাচ খেলেছেন, আমেরিকার লীগ খেলেছেন, এমনকি খেলেছেন সেলিব্রিটি ক্রিকেট লীগেও। বাংলাদেশের খেলা থাকলে টকশো গুলোতেও নিয়মিত উপস্থিত হয়েছেন। বরং আপনাকে পর্যবেক্ষণ করে মনে হয়েছে, ফিক্সিংয়ে জড়ানোর পর মিডিয়াতে আপনার গ্রহণযোগ্যতা অনকেখানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

আপনি কখনো জাতীয় দলে ফিরতে না পারলেও আমি আর মিস করবো না। ইউটিউবে আপনার প্রতিটি ইনিংস এর ভিডিও পাওয়া যায়। যখনই মন চাইবে সে সব দেখে আপনাকে স্মরণ করতে পারব। তবু আপনাকে শেষ বারের জন্য হলেও জাতীয় দলে দেখতে চাই। বাংলাদেশ ক্রিকেটকে একদা যেসব গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য এনে দিয়েছেন তার প্রতিদান স্বরুপ মাঠ থেকে বিদায় নেয়া আপনার প্রাপ্য। অন্যায় করেছেন শাস্তি ভোগ করেছেন; কিন্তু সেজন্য আপনার অর্জনগুলো ম্লান হয়ে যায়নি নিশ্চয়ই।  দেশজুড়ে এখনো আপনার অনেক ভক্ত, তারা ভুলের জন্য ক্ষমা করেছে বহু আগেই। শুধু চাই জাতীয় দলে ফিরে আসুন একটিবার।

লিখেছেন ইসমাইল উদ্দিন সাকিব

বল বাই বল লাইভ স্কোর পেতে আর নয় বিদেশি অ্যাপ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক খবর এবং বল বাই বল লাইভ স্কোর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে BDCricTime সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান ক্রিকেট অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।