আধিপত্য বিস্তার করে বাংলাদেশের স্বস্তির জয়

ব্যাটিংয়ে তামিম ইকবালের ১৩০ আর সাকিব আল হাসানের ৯৭ রানের ইনিংসের পর শেষে মুশফিকুর রহিমের ১১ বলে ৩০ রানের ঝড়। বোলিংয়ে দারুণ লাইন-লেন্থ বজায় রেখে উইন্ডিজদের আটকে রাখা। মাশরাফি বিন মুর্তাজার চার উইকেট শিকার। সব মিলিয়ে ব্যাটে-বলে আধিপত্য বিস্তার করেই গায়ানায় সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়া বাংলাদেশের ভিন্ন চেহারাই যেন দেখা গেল প্রথম ওয়ানডেতে।

ব্যাটে-বলে-উইন্ডিজকে-উড়িয়ে-দিয়ে-বাংলাদেশের-বিশাল-জয়

Advertisment

টস জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তাজা। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই ওপেনার এনামুল হক বিজয়কে হারিয়ে ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। জেসন হোল্ডারের বলে অ্যাশলে নার্সের হাতে ক্যাচ দিয়ে ০ রান করে ফিরে যান এনামুল।

দ্বিতীয় উইকেটে তামিম ইকবালকে নিয়ে হাল ধরেন সাকিব আল হাসান। ব্যাটিং করতে থাকেন সাবধানী হয়ে, একটু দেখেশুনে। মাঝে এসে হানা দ্র বৃষ্টি। বৃষ্টির সাময়িক বাধার পর আবার শুরু হয়য় সাকিব-তামিমের সাবধানী পথচলা।

ধীরলয়ের আউটফিল্ড, সাকিব-তামিমের মন্থর ব্যাটিং। তাই রানের চাকাও এগিয়ে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। দুজন মিলে প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেন।

শুরুর বিপর্যয় সামলে দলের ইনিংস গড়ার দায়িত্ব নেন দুজন। সাথে সহায়তা পান ভাগ্যেরও। একবার জীবন পান সাকিব। আরেকবার দেন নো ম্যান্স ল্যান্ডে ক্যাচ।

ইনিংস গড়ার কাজটা ভালোভাবেই করেন দুই অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান। দুজনই ক্রিজে পরিচয় দেন দৃঢ়তার। অর্ধশতক পূর্ণ করে এগিয়ে যান শতকের পথে।

ধীরে ধীড়ে বড় হতে থাকে তামিম-সাকিবের জুটি। ২০১০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ইমরুল কায়েস ও জুনায়েদ সিদ্দিকীর ১৬০ রানের জুটির রেকর্ট ভেঙে দ্বিতীয় উইকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড গড়েন দুজন। এরপর গড়েন উইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড।

৪৩ ওভারের মাথায় তামিম ও সাকিব মিলে পূর্ণ করেন বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের দ্বিতীয় দুইশ’ রানের জুটি।

অবশেষে তাদের ২৫৮ বলে ২০৭ রানের জুটি ভাঙেন দেবেন্দ্র বিশু। নার্ভাস নাইন্টিতে বিদায় নেন সাকিব। তিন রানের জন্য ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ শতকটা পাননি সাকিব। ৯৭ রান করে বিশুর বলে রানের তাড়ায় উড়িয়ে মারতে গিয়ে ধরা পরেন হেটমেয়ারের হাতে।

এক প্রান্ত আগলে রাখা তামিম দেখা পান শতকের। তবে বেশ মন্থর ব্যাটিং করেন তিনি। ক্যারিয়ারের দশম সেঞ্চুরি পেতে এ ওপেনারের লেগেছে ১৪৬ বল। বাংলাদেশের সবচেয়ে মন্থরতম শতক এটি।

৪০ ওভারের পরে দ্রুতগতিতে রান তুলতে পারছিলেন না তামিম। দ্রুত রানের আশায় সাকিবের বিদায়ের পর সাব্বির রহমানকে নামালে তিনি ৩ রান করে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হন। ৩ রান করে স্টাম্পিং হয়ে ফিরে যান।

এরপর এসে ঝড় তুলেন মুশফিকুর রহিম। ৪৯ তম ওভারের প্রথম বলে মিড উইকেট দিয়ে হাঁকান বিশাল ছক্কা। চতুর্থ বলে এক্সট্রা কাভার দিয়ে মারেন চার। শেষ দুই বলে মারেন আরেকটি ছয় ও চার। ঐ অভয়ারে ২২ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ।

শেষ ওভারে যেন খোলোস থেকে বেরিয়ে আসেন তামিমও। শেষ ওভারের প্রথম বলে লং অফ দিয়ে হাঁকান ছয়। এরপরের ছয়ের জন্য বেছে নেন লং অন। চতুর্থ বলে চার মারেন মুশফিক। পরের বলে স্কুপ খেলতে গিয়ে ১১ বলে ৩০ রান করে আউট হন তিনি। শেষ বলে রিয়াদের বাউন্ডারিতে বাংলাদেশের রান পৌঁছায় ২৭৯ তে। শেষ পাঁচ ওভারে ৬৮ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ।

১৬০ বলে ১৩০ রান করে অপরাজিত ছিলেন তামিম ইকবাল। তার ইনিংসে ছিল ১০ চার ও ৩ ছয়।

উইন্ডিজের হয়ে ইনিংস সূচনা করেন ক্রিস গেইল এবং এভিন লুইস। দুজনই করে থাকেন ঝড়ো ব্যাটিং। তবে তাদের শুরুতে ভালোভাবেই আটকে রাখেন মাশরাফি বিন মুর্তাজা এবং মেহেদি হাসান মিরাজ।

সঠিক জায়গায় বল ফেলে উইন্ডিজদের জন্য রান তোলার কাজটা কঠিন করে তুলেন এ দুই বোলার। দারুণ লাইন-লেন্থ বজায় রাখেন দুজন।

লাইন-লেন্থ বজায় রেখে শৃঙ্খল বোলিংয়ের পুরস্কার মাশরাফি পান  নবম ওভারে। উড়িয়ে মারতে গিয়ে মিড-অনে বৃত্তের ভিতরে থাকা রিয়াদকে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন লুইস (১৭)। পাওয়ারপ্লেতে ১ উইকেট হারিয়ে ৩১ রান করে স্বাগতিকরা।

বাংলাদেশকে দ্বিতীয় সাফল্য এনে দেন রুবেল হোসেন। ৪১ রানের মাথায় শাই হোপকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন তিনি। ৬ রান করে ফিরে যান হোপ। গেইলকে ফেরানোর সুযোগ আসলেও রিভিউ না নেয়ায় বেঁচে যান তিনি।

এরপর তৃতীয় উইকেটে ক্রিস গেইলকে সাথে নিয়ে হাল ধরেন শিমরন হেটমেয়ার। তাদের ৪০ রানের জুটি ভাঙে ভুল বোঝাবুঝির কারণে। রান আউট হয়ে সাজঘরে ফিরেন গেইল। ১ চার ও ২ ছক্কার সাহায্যে ৬০ বলে ৪০ রান করেন গেইল।

জেসন মোহাম্মদকে ফিরিয়ে দিয়ে স্বাগতিকদের ওপর চাপ বাড়ান মেহেদি হাসান মিরাজ, মিরাজের বলে ডাউন দ্যা উইকেটে এসে মারতে গিয়ে স্টাম্পিং হন ১০ রান করা জেসন। রানের গতিটাও থাকে বাংলাদেশের বোলারদের নিয়ন্ত্রণে।

শিমরন হেটমেয়ার নিজের উইকেট রক্ষা করে খেলতে থাকেন। পূর্ণ করেন অর্ধশতক। এরপর বেশিক্ষণ টিকেননি। ৫২ রান করে মুস্তাফিজুর রহমানের বলে ডাউন দ্যা উইকেটে এসে ড্রাইভ করতে গিয়ে ক্যাচ দেন সাকিব আল হাসানের হাতে। পরের বলে আবার আঘাত হানেন মুস্তাফিজ। মুস্তাফিজের বলে কিরন পাওয়েল ক্যাচ দেন মুশফিককে। মুস্তাফিজের বলে দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে উইন্ডিজকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন।

ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক জেসন হোল্ডার মাশরাফির বলে ছক্কা হাঁকানোর পরের বলে আবারো তুলে মারতে গিয়ে ধরা পড়েন মোসাদ্দেক হোসেনের হাতে।  উইন্ডিজের শেষ ভরসা আন্দ্রে রাসেল (১৩) ফিরে যান মাশরাফির তৃতীয় শিকার হয়ে। ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ধরা পড়েন বাউন্ডারির নিকটে থাকা রিয়াদের হাতে। নিজের পরের ওভারে এসে মাশরাফি ফেরান অ্যাশলে নার্সকেও। অনেকটা একইভাবে আউট হন নার্স। নিজের শেষ ৩ ওভারে ৩ উইকেট নেন মাশরাফি।

শেষ উইকেটের জুটিতে আলজারি জোসেফ ও দেবেন্দ্র বিশু রান ৫৯ যোগ করেন। মারকুটে ব্যাটিং করেন জোসেফ।  তবে তা শুধু হারের ব্যবধানই কমায় আর বাড়ায় বাংলাদেশের অপেক্ষা। শেষ ওভার পর্যন্ত টিকেছিল এ জুটি। জোসেফ ও বিশু দুজনেই ২৯ রান করে অপরাজিত থাকেন। ২৩১ রান করে থামে স্বাগতিকরা।

সংক্ষিপ্ত স্কোরঃ বাংলাদেশ ২৭৯/৪, ৫০ ওভার
তামিম ১৩০*, সাকিব ৯৭, মুশফিক ৩০
বিশু ২/৫২, হোল্ডার ১/৪৭

উইন্ডিজ ২৩১/৯, ৫০ ওভার
হেটমেয়ার ৫২, গেইল ৪০, জোসেফ ২৯*, বিশু ২৯*
মাশরাফি ৪/৩৭, মুস্তাফিজ ২/২৭

বাংলাদেশ ৪৯ রানে জয়ী 


আরো পড়ুনঃ  সিমন্স-স্যামুয়েলসের রেকর্ড জুটি ভাঙলেন সাকিব-তামিম