বিশ্বজুড়ে অপমানের পরও ক্রিকেট ছাড়বেনা মালির খেলোয়াড়রা

বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে মালি নারী ক্রিকেট দল। একের এর এক বিশ্ব রেকর্ড গড়ার মাধ্যমেই আলোচনায় তারা। কিছুদিন আগে রুয়ান্ডায় হয়ে গেলো কুইবুকা নারী আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। রুয়ান্ডার গনহত্যায় নিহতদের স্মরনে অনুষ্ঠিত হয় এই বহুজাতিক নারীদের আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। গত বছর থেকে আইসিসির সকল সদস্যকে আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি খেলার মর্যাদা দেওয়ায় এই আসরটির সকল খেলা আন্তর্জাতিক মর্যাদা পায়।

বিশ্বজুড়ে অপমানের পরও ক্রিকেট ছাড়বেনা মালির খেলোয়াড়রা
ছবি : মালি ক্রিকেট দল, কাওরি বার্থে / উইমেন্স ক্রিকেট জোন

মালি নারী দলটি ছিলো একেবারেই অনভিজ্ঞ। ২০ এর উপর বয়স মাত্র ৪ জনের। ১৫ বছর বয়স্ক খেলোয়াড়ও ছিলো। আসরের প্রথম ম্যাচেই রুয়ান্ডার বিপক্ষে ৬ রানে অলআউট হয়ে টি টোয়েন্টিতে সর্বনিম্ন দলীয় স্কোরের রেকর্ড গড়ে মালি। পরবর্তী ম্যাচে তানজানিয়ার বিপক্ষে ১১ ও উগান্ডার বিপক্ষে ১০ রানে অলআউট হয় মালি। উগান্ডার বিপক্ষে তারা রেকর্ড ৩১৪ রানের লক্ষ্য তারা করছিলো।

Advertisment

আসরে একের পর এক ভয়াবহ রেকর্ড গড়ে বিশ্ব মিডিয়ায় হাসির পাত্র হয় মালি ক্রিকেট দল। বিশ্বজুড়ে তাদের নিয়ে করা হয় নানান ট্রল ও ঠাট্টা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেন তাদের ক্রিকেট খেলারই দরকার কি? কেউ আইসিসির সকল দেশকে টি টোয়েন্টি স্ট্যাটাস দেওয়ার বিরোধিতা করেন। এত সমালোচনার পর অবশেষে মুখ খুলেছেন মালি ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান কাওরি বার্থে। ব্রিটিশ ওয়েবসাইট দ্য ক্রিকেটারের সাথে আলোচনায় মালি ক্রিকেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন কাওরি।

কাওরি বলেন ” ৩ ম্যাচ যাওয়ার পর অনেকেই বলছিলো আমরা কেন খেলতে এসেছি। দলের খেলোয়াড়রা এটা শুনে খুব হতাশ হয়েছিল। উগান্ডার বিপক্ষে ম্যাচের পর আমি খেলোয়াড়দের বলি আমরা আসর থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেই। আমরা আরো অপমানিত হতে চাইনা। ”

তবে মালি দলের অধিনায়ক ইয়োমা সাংগারে তাকে বলেন ” না কোচ, আমরা ফিরে যেতে চাইনা। মালি ছাড়ার আগে জানতাম আমাদের ৬টি ম্যাচ খেলতে হবে। আমরা মারা গেলেও আমরা খেলবো সব ম্যাচ। আমরা এখানে শিখতে এসেছি। আমরা শিখবো এখানে “।

মালি দলের খেলোয়াড়দের এই সাহসী মনোভাবের প্রশংসা করেন কোচ নিজেও।

তিনি জানান কীভাবে মালির মতো দেশে ক্রিকেট শুরু করেন তিনি। ২০০১ সালের আগে মালিতে ক্রিকেটের তেমন প্রচলন ছিলোনা। তখন কাওরি বামাকোর একটি স্কুলে ইংরেজি শিখাতেন। তখন তার দেখা হয় ডায়ালোর সাথে যিনি ছিলেন মালিতে ব্রিটিশ কাউন্সিল জেনারেল। সে তাকে ক্রিকেটের সাথে পরিচয় করায়।

পরবর্তীতে কাওরি ড. ওয়াটসনের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি ছিলেন একজন ইংরেজ ও তার চার সন্তান কাওরির স্কুলে পড়াশোনা করতো। কাওরি তাকে প্রস্তাব দেয় স্কুলে ক্রিকেট শেখানোর। তাতে আনন্দের সাথে রাজি হয় ইংরেজ ড. ওয়াটসন। ওয়াটসন তার নিজের দেশ থেকে খেলার সামগ্রী এনে তাদের ক্রিকেট শেখান। স্কুলের শিক্ষার্থীরাও খেলাটি পছন্দ করে। পরবর্তীতে কাউরি ও ড. ওয়াটসন মালির ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সংস্থা খোলেন ২০০৩ সালে।

কাউরি মালি ক্রিকেট এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হন ও ওয়াটসন হন ডাইরেক্টর। তবে সরকারের অনুমোদন পেতে তাদের ক্রিকেটকে বামাকোর বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার দরকার ছিলো। তারা ৩ বছরের চেষ্টায় ক্রিকেটকে বামাকোর বাইরে দুইটি শহরে ছড়িয়ে দেয়। অবশেষে ২০০৫ সালে তারা মালির সরকারের অনুমোদন পায় ও আইসিসির এফিলিয়েট সদস্য হয়।

বিশ্বজুড়ে অপমানের পরও ক্রিকেট ছাড়বেনা মালির খেলোয়াড়রা
ফেয়ার প্লে ট্রফি হাতে মালির অধিনায়ক

তবে এরপরও মালিতে ক্রিকেট ছড়িয়ে দিতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। মালিতে ক্রিকেট সামগ্রী পাওয়া যাবে এমন কোনো দোকান নেই। তাদের আনতে হয় সবকিছু দেশের বাইরে থেকে যা খুব মূল্যবান ও তাদের বেশ বেগ পোহাতে হয় তা আনার জন্য।কাওরি জানান একবার ক্রিকেটের সামগ্রী আনতে তাকে মালি থেকে নাইজেরিয়া যেতে হয়েছিল যার জন্য টিকেট খরচই ছিলো ৯০০ ডলার। সরকারের অনুদান খুব কম তাদের জন্য ।

এরপরও তারা তাদের সংগঠন চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তি পর্যায়ে অনুদানের মাধ্যমে। আইসিসির কাছ থেকে বছরে ১৬ হাজার ডলার পেয়ে থাকে তারা যা খুবই অপ্রতুল তাদের সংস্থার জন্য।যেহেতু খেলাটি মালিতে এখনো জনপ্রিয় নয় তাই স্পন্সর পেতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তাদের। কাউরি জানান যেহেতু মালিতে বিভিন্ন ভারতীয় কোম্পানি আসছে তাই আশা করেন ভবিষ্যতে কিছু স্পন্সর পাবেন। মালিতে বর্তমানে ১৯টি দল রয়েছে আঞ্চলিক পর্যায়ে। কোন সিনিয়র নারী দল নেই। আসরে খেলা দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড় ছিলো ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী।

কাওরি আরো বলেন “আমি এই মেয়েদের সাহসের সাধুবাদ জানাই। আমি জানি বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষই অখুশি আমাদের অংশগ্রহণ নিয়ে তবে তাদের এই অসন্তুষ্টি আমাকে থামিয়ে দিবেনা মালির প্রতিটি শহরে ক্রিকেট ছড়িয়ে দিতে। তার জন্য আমাদের অনেক বেশি চেষ্টা করতে হবে। ঘরোয়া ক্রিকেট অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তবে আমাদের আরো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে হবে। আমি এমন সুযোগ পেলে আমাদের দলকে পুনরায় পাঠাবো আন্তর্জাতিক আসরে খেলার জন্য। যখন আমরা এয়ারপোর্টে রুয়ান্ডা যাচ্ছিলাম তখন অনেক মানুষ আমাদের দেখেছিলো ও উৎসাহ দিয়েছিল। যখন আমরা ফিরে আসি ফেয়ার প্লে ট্রফিসহ তখন আমাদের আরো অনেক মানুষ উৎসাহ দেয় এয়ারপোর্টে ”

বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট নিয়ে কাওরি বলেন ” আমরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেও ক্রিকেট শুরু করেছি ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খেলোয়াড়রা উঠে এসেছে এর সাহায্যে। আইসিসি সঠিক যে ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতির দরকার। তবে একজন খেলোয়াড় বছরের পর বছর ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার পরও যদি নিজের দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ না পায় তাহলে সে খেলার উৎসাহ কীভাবে পাবে? আমি এই আসরের মতো আরো আসরে আমার দলকে পাঠাবো “।

মালির ক্রিকেটারদের স্বপ্ন আইসিসি কতটুকু পূরন করতে পারবে সেটা হয়তো সময়ই বলে দিবে। তবে বিশ্বের সকল ক্রিকেট ভক্তের উচিত হবে এই উঠতি দলগুলোকে উৎসাহ দেওয়া নাকি তাদের নিয়ে ঠাট্টা করা। এতেই হয়তো ক্রিকেট একসময় ছড়িয়ে যাবে আরো নতুন দেশগুলোতে।