Scores

একজন ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিকের গল্প

কমেডি ড্রামা ফিল্ম ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’ ছবিটি যারা দেখেছেন তারা হয়তো ভাবছেন, দেশ সেরা অধিনায়ক মাশরাফির এমন বিশেষণ কেন? আসলে ছবির ওই ক্যাপ্টেনের সাথে আমাদের ক্যাপ্টেনের কিছু মিল হয়তো আছে, কিন্তু মোটা দাগে সবার প্রিয় ম্যাশ তারচেয়েও বেশি কিছু। তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট জগতে অনেকটা রূপকথার নায়কের মতো হিসাব পাল্টে দেওয়া এক দলনেতা। যার উদাহরণ গতকাল ১২ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) আরও একবার পাওয়া গেলো। যদিও উইন্ডিজের ব্যাটিং দানব গেইলের দানবীয় তাণ্ডবে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতেছে রংপুর রাইডার্স, তথাপি পুরো বিপিএল জুড়ে দলকে একসুত্রে গেঁথে সেরা ফলাফল ঘরে তোলার জন্য মূল কৃতিত্ব মাশরাফিরই। পাঁচ বিপিএল শিরোপার চারটিই বগলদাবা করে যিনি গড়লেন অনন্য কীর্তি, তিনিই তো সবার প্রিয় ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’।

 

'একটাই বার্তা ছিল, সুযোগ কাজে লাগাতে হবে'- মাশরাফি

Also Read - টেস্টে বিগ থ্রি'র পরেই বাংলাদেশ!


বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিপিএলের পঞ্চম আসরের শুরুতে মাশরাফির রংপুরের অধিনায়কত্ব নেওয়ার সময় থেকেই দলটির প্রতি প্রত্যাশার বারুদ ছিল তুঙ্গে। সেই প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায় যখন দলে গেইল-ম্যাককালামের মতো টি-টোয়েন্টির বিধ্বংসী ব্যাটসম্যানদের ভিড়ানো হলো। কিন্তু, এবারের আসর শুরু হতেই এই দুই ব্যাটিং মায়েস্ত্রোর অনুপস্থিতির কারণে দলীয় অবস্থান নড়বড়ে ছিল। লিগ পর্বের সিলেট অংশে জয় দিয়ে শুরু হলেও মাঝখানে একাধিক হার দলের শেষ চারে উঠা নিয়েই আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তারপর লিগ পর্বের শেষ দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সুপার ফোর নিশ্চিত করে দল। এই সাফল্য অর্জনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া মাশরাফির রয়েছে অনন্য ভূমিকা। তাইতো বলা হয়, ‘বিপিএলে শিরোপা জিততে চাও, মাশরাফিকে দলে ভেড়াও।’

ছক্কার হিসাবটাও রাখেন না গেইল!

সুপার ফোরে এসে জ্বলে উঠেন ব্যাটিং দানব ক্রিস গেইল, জনসন চার্লস, ম্যাককালামরা। অলিখিত সেমিতে জনসন চার্লস, ম্যাককালামদের ব্যাটিং ঝলকে কুমিল্লাকে বিদায় করে দেয় রংপুর। গেইলের ব্যাট হাসে ফাইনালেও। শুধু হাসেই না, একহাতে পুরো ম্যাচ জিতিয়ে নেওয়ার অবিশ্বাস্য যোগ্যতা যে তার আছে সেটা গেইল আবারও প্রমাণ করেন ৬৯ বলে ১৮ ছক্কায় ১৪৬ রানের ঝড় তুলে। দুই সেঞ্চুরিসহ ১১ ম্যাচে প্রায় ৫৪ গড়ে ৪৮৫ রান করে বিপিএলের ৫ম আসরের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন ক্রিস্টোফার হেনরী গেইল। অথচ কোয়ালিফায়ারে তার ইনজুরির আভাস পাওয়া গিয়েছিলো। সেই তিনিই ফাইনালটাকে একপেশে বানিয়ে মাশরাফির হাতে তুলে দিলেন শিরোপা।

এবার নিয়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) পাঁচটি আসরের মধ্যে চারটির শিরোপা তুলে ধরলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। ভিন্ন তিন দলের অধিনায়ক হয়ে চার শিরোপা জয় করে বিপিএলের ইতিহাসে অমর করে রাখলেন নিজের নাম। তাকে দলে নেওয়া মানে শিরোপার সুযোগ বেড়ে যাওয়া, যা রংপুরের ফ্র্যাঞ্চাইজিটির কর্তারাও অনেকবার বলেছেন। প্রথম তিন আসরে অধিনায়ক মাশরাফি জিতেছিলেন হ্যাটট্রিক শিরোপা। ম্যাশের চার শিরোপার মধ্যে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের হয়ে দুইবার এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে একবার। বাকি একটি গতকালের ফাইনালিস্ট ঢাকার অধিনায়ক সাকিব আল হাসান বগলদাবা করেছেন।

২০১২ সালে অনুষ্ঠিত বিপিএলের প্রথম আসরে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের হয়ে প্রথম শিরোপা জয় করেন মাশরাফি। পরেরবার আবারও ঢাকার হয়েই শিরোপা, এরপর একবছর বিপিএল বন্ধ ছিল। আবার বিপিএল শুরু হলে সেই আসরের নবাগত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সকে শিরোপা এনে দেন, যা ওই ফ্র্যাঞ্চাইজির একমাত্র শিরোপা। চতুর্থ আসরেও একই আশা নিয়ে শুরু করলেও ওই একবারই শেষ চারের আগেই বিদায় নেয় মাশরাফির দল। সেবার শিরোপা যায় সাকিবের ঢাকা ডায়নামাইটসের হাতে।

আর এবার নিজের চতুর্থ এবং নতুন মালিকানার রংপুরকে প্রথম শিরোপা এনে দিলেন মাশরাফি। অথচ এবারের আসরের শুরুটা ভাল হয়নি রংপুরের। টুর্নামেন্টের শুরুর ম্যাচটি জয় পেলেও টানা তিন ম্যাচে তাদের থাকতে হয়েছে জয়হীন। পঞ্চম ম্যাচে সিলেটকে হারালেও ঢাকার বিপক্ষে হার, সপ্তম ম্যাচে খুলনার বিপক্ষে হার খাদের কিনারায় পৌঁছে যাওয়া দলটি পরের দুই ম্যাচেই চিটাগং ভাইকিংস ও সিলেট সিক্সার্সকে হারায় রংপুর। দশম ম্যাচে কুমিল্লার কাছে হেরে গেলেও খুলনাকে লিগ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে হারিয়ে প্লে-অফে পা ফেলে রংপুর। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, প্লে-অফ রাউন্ডের আগে গেইল, ম্যাককালাম নিজেদের হারিয়ে খুঁজেছেন। সেসময় দলকে সামনে থেকে পথ দেখিয়েছেন মাশরাফি। বাকীটা তো সবাই জানে।

মাশরাফির চোখে সেরা দুই

 

এবার দেখা যাক এবারের আসরে দলকে সামনে থেকে কিভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন ম্যাশ। গত এপ্রিলেই আন্তর্জাতিক টি-২০ থেকে অবসর নেওয়ার পর বিপিএলেই আবারও ক্রিকেটের এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণে খেলেছেন মাশরাফি। গুঞ্জন আছে, তার বয়সের কারণে কিংবা কোচ হাথুরুর কারণে তাকে টি-টোয়েন্টি ছাড়তে হয়েছিলো। কিন্তু বিপিএলের এবারের আসরেই তিনি মাঠের পারফরম্যান্সে দিয়ে সব নেতিবাচক ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া কাকে বলে, আর পুরো দলের অনুপ্রেরণা কিভাবে হতে হয়, মাশরাফি তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।

আগের সেই গতি আর নেই। নেই আগের মতো সুইং। শত শত সেলাইয়ের ছাপ যে হাঁটুতে পড়েছে সেই হাঁটুকে সামলে শুধু মস্তিষ্ক খাঁটিয়ে ব্যাটসম্যানদের রানের চাকা আটকে দিয়েছেন মাশরাফি। কমপক্ষে ত্রিশ ওভার বোলিং করেছেন, এমন বোলারদের মধ্যে চতুর্থ সেরা ইকনোমি রেট, ১৪ ম্যাচে ১৫টি উইকেট। আর ব্যাট হাতেও প্রয়োজনে ব্যাটিং অর্ডারে উপরে এসে দলের জয়ের পথ মসৃণ করতে গিয়ে ক্রিস গেইলের মতো ব্যাটসম্যানকেও ছাপিয়ে গেছেন এক ম্যাচে। গেইলের মতো চরম মুডি খেলোয়াড়কেও এমন আপন করে নিয়েছেন যে, নিজের সেরা খেলা খেলতে বাধ্য হয়েছেন গেইল। ১২৬ আর ১৪৬ রানের দুই ঝড় তারই প্রমাণ বহন করে।

গেইলের কাছে ম্যাশ একজন গ্রেট অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘মাশরাফি গ্রেট ক্যাপ্টেন। অনেক অভিজ্ঞতা। এমনিতে সে খুব ঠাণ্ডা মেজাজী, সবাইকে হাসাতেও পছন্দ করে। মাশরাফির নেতৃত্বে খেলা সবসময়ই দারুণ ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত না গিয়ে সে হাল ছাড়ে না। মাশরাফি একজন ভাল শ্রোতাও বটে। তার কাছ থেকে পাওয়া শ্রদ্ধা উল্লেখ করার মতই।’

 

মিরপুরের উইকেট নিয়ে অসন্তুষ্ট মাশরাফি

দলের সবাইকে যার যার মতো করে খেলার স্বাধীনতা দিয়ে সেরা খেলা বের করে এনেছেন ম্যাশ। যা তার নিজের কথাতেই স্পষ্ট, ‘চতুর্থ দল হিসেবে যখন গ্রুপ পর্ব পার করলাম, একটিই বার্তা ছিল, আমরা যে সুযোগ পেয়েছি, সেটা কাজে লাগাতে হবে। আমরা যেন অলআউট ক্রিকেট খেলি, স্বাধীনতা নিয়ে। যেটা করতে মন চায়, সেটা যেন পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে করি। কোনো দোষাদোষী নেই। দায় চাপানো নেই। কেউ কাউকে দোষ দেয়নি। এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

মাশরাফি অনন্য, অসাধারণ। কোচের কাজটাকে সহজ করে দেওয়ার দায়িত্বও তিনি পালন করেন সুনিপুণভাবে। ফলে কোচের ভাবনাটা মাঠে বাস্তবায়ন করা সহজ হয়ে যায়। শিরোপা জিতে রংপুরের কোচ টম মুডি নিজের অফিসিয়াল টুইটার পেজে মাশরাফির সঙ্গে বিপিএলের পঞ্চম আসরের ট্রফি হাতে একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘এই শীর্ষ মানুষটির সঙ্গে কাজ করাটা আনন্দের।’

গতকাল ব্যাট হাতে না নামলেও বল হাতে খারাপ করেননি। ফিল্ডিংয়েও সোহাগ গাজীর বলে এভিন লুইসের ক্যাচটি যেভাবে দৌড়ে গিয়ে তালুবন্দি করলেন তা দলের প্রতি তার কমিটম্যান্টের স্পষ্ট উদাহরণ। গেইল-ম্যাককালামরা এসেই ভালো করতে পারেননি। তিনিই হয়ে উঠেছিলেন সবার অনুপ্রেরণা। শুধু কি তাই, টুর্নামেন্ট জুড়ে তার নেতৃত্ব যেমন প্রশংসিত হয়েছে তেমনই প্রতিপক্ষের সাথে তার দুর্দান্ত আচরণ তাকে সবার চোখের মণি বানিয়ে দিয়েছে।

 

তাসকিনের পাশে মাশরাফি

চিটাগং ভাইকিংস ও জাতীয় দলের সতীর্থ শুভাশিস রায়ের সাথে মাঠের বাকবিতণ্ডাকে যেভাবে সামলেছেন তা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হতো কি না কে জানে। অনুজ ক্রিকেটারকে সমালোচনার হাত থেকে বাঁচাতে নিজেই অগ্রণী ভূমিকা রেখে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এছাড়া একই দলের এবং জাতীয় দলের আরেক সতীর্থ তাসকিনকে যেভাবে ম্যাচ শেষে ডেকে নিয়ে বুঝিয়েছেন, নাসিরের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, সাকিবকে জড়িয়ে ধরে শূন্যে তুলে ফেলা, বাইলজ ভেঙে রিজার্ভ ডে নিয়ে যখন উত্তপ্ত মাঠ তখনও তামিমের সাথে সৌহার্দ্য নিয়ে ঘনিষ্ঠ আলোচনা কিংবা পিচ নিয়ে সমালোচনার ক্ষেত্রে তার স্পষ্ট অবস্থান, সবই তার নেতৃত্বগুণের বহিঃপ্রকাশ।

সফল অধিনায়ক, নেতা, দেশপ্রেমিক, অদম্য লড়াকু মাশরাফি মানেই গ্যালারিতে জনসমুদ্রের গর্জন, ‘মাশরাফি, মাশরাফি’। কোটি মানুষ মাঠের খেলায় নজর রাখেন এই মানুষটিকে সফল হতে দেখার জন্য। গ্যালারি আর মাঠের বাইরে টেলিভিশনের কোটি ভক্তদের একটাই চাওয়া, ‘মাশরাফির সাফল্য’। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বাস্তবেও রূপ নেয়। যেমনটা হলো এবারের বিপিএলের ফাইনালে। অভিনন্দন প্রিয় ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক, আমাদের সুপারহিরো, বেঁচে থাকুন কোটি মানুষের হৃদয়ে।

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

আরও পড়ুনঃ টেস্টে বিগ থ্রি’র পরেই বাংলাদেশ!

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
Tweet 20
fb-share-icon20

Related Articles

ফিক্সিং কাণ্ডে পাকিস্তানি ক্রিকেটারের কারাদণ্ড!

বিপিএলের সেরা একাদশ বাছাই করল ক্রিকইনফো

বিপিএলের রান সংগ্রাহকদের তালিকায় দেশিদের জয়জয়কার

মুশফিকের কাছে আইপিএলের পর বিপিএলই সেরা লিগ

গণমাধ্যমের চিরায়ত প্রশ্ন ‘অদ্ভুত’ ঠেকেছে রাসেলের কাছে