যত কারণে ‘বিতর্কিত’ সাকিব

0
1036

বাংলাদেশ ক্রিকেটের মুকুটহীন সম্রাট সাকিব আল হাসান। ক্রিকেটের বাইশ গজে তিনি যা করে দেখিয়েছেন, তার আগে কিংবা পরে, সাকিবের ধারেকাছে নেই বাংলাদেশের আর কোনো ক্রিকেটার। কেবল ক্রিকেট দিয়েই বিচার কেন! একুশ শতকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সাকিবের মতো করে আর ক’জন বঙ্গ সন্তানই বা দেশের নাম উজ্জ্বল করতে পেরেছেন?

Advertisment

১৪ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে সাকিবের অর্জনের ঝুলি যেমন পরিপূর্ণ, তেমনি তাকে ঘিরে বিতর্কিত ঘটনার অবতারণাও কম হয়নি৷ যার সর্বশেষ উদাহরণ, গতকাল ১১ জুন ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগের (ডিপিএল) সপ্তম রাউন্ডের ম্যাচে আবাহনী লিমিটেডের বিপক্ষে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে স্টাম্পে লাথি মারা, স্ট্যাম্প উপড়ে ফেলা ও আবাহনী কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনের দিকে তেড়ে যাওয়া।

ক্যারিয়ার জুড়ে সাকিবের এমন বড় ধরনের বিতর্কিত ঘটনা নেহায়েত কম নয়। সংখ্যার হিসেব কষলে সেটি অন্তত অর্ধডজন পেরিয়ে যাবে। নয়া বিতর্কের সামনে দাঁড়িয়ে তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ অক্রিকেটীয় আচরণগুলোতে চোখ বুলানো যাক।

অশোভন অঙ্গভঙ্গি ও তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনা। ‘হোম অব ক্রিকেট’ খ্যাত মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ২৪ রানে আউট হয়ে ড্রেসিংরুমে বসে ছিলেন সাকিব। আউট হওয়ার পর বিরক্ত সাকিব ক্যামেরা দেখে মেজাজ হারান। ম্যাচ চলাকালীন সময় সরাসরি সম্প্রচার চলাকালীনই ক্যামেরার সামনে করে বসেন অশোভন অঙ্গভঙ্গি।

দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকার এমন আচরণে সে সময় বেশ কঠোর অবস্থান নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি)। টাইগার বোর্ডের ডিসিপ্লিনারি কমিটি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে তিন ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ ও তিন লাখ টাকার অর্থদন্ডও দেয়। সময়ের চাহিদা মেনে কাজটি মোটেও সহজ ছিল না বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তথা এদেশের ক্রিকেটের জন্য।

তবুও এশিয়া কাপের আগে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ কমাতে তৎকালীন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম ও হেড কোচ শেন জার্গেনসেনের আবেদনে সাড়া দেয়নি বিসিবি। ফলে ২০১৪ সালে ঘরের মাঠের এশিয়া কাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভারত ও দ্বিতীয় ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সাকিবকে ছাড়াই মাঠে নামে বাংলাদেশ।

হাথুরুসিংহের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, সিপিএল না খেলে দেশে ফেরা ও ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা

২০১৪ সালে মাঠের বাইরের নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে বারবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন সাকিব আল হাসান। ফেব্রুয়ারিতে ড্রেসিংরুমে অশোভন অঙ্গভঙ্গির পর জুনে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ চলাকালীন স্ত্রীকে উত্যক্ত করা এক দর্শককে পিটিয়ে আবার আলোচনার জন্ম দেন সাকিব। ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে সেই সিরিজ শেষে তিনটি ওয়ানডে, দুটি টেস্ট ও একটি টি-টোয়েন্টি খেলতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর করে বাংলাদেশ।

তখনকার কোচ চন্ডিকা হাথুরাসিংহের পরিকল্পনা ছিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ যাওয়ার আগে সিপিএলের শেষ কিছু ম্যাচ না খেলে সাকিব যেন দলের সঙ্গে প্রস্তুতি ক্যাম্পে যোগ দেন। এদিকে সিপিএলের সম্ভাব্য সবগুলো ম্যাচ খেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজেই দলের সঙ্গে যোগ দিতে চাইছিলেন সাকিব। এমন পরিস্থিতিতে হাথুরাসিংহে ও সাকিবের মধ্যে কথা কাটাকাটির মতো ঘটনা ঘটে। উত্তেজিত সাকিব সে সময় টেস্ট ও ওয়ানডে থেকে অবসর নেওয়ার হুমকিও দেন। যদিও পরে সাকিব নিজেই স্বীকার করেন, আবেগের বশে খেলা ছাড়ার কথা বলেছিলেন।

ভক্তের ফোন ভাঙার গুঞ্জন নিয়ে মুখ খুললেন সাকিব
সাকিব আল হাসান। ছবি : বিডিক্রিকটাইম

কোচের সাথে দ্বন্দ্বের পর সাকিব সিপিএলে খেলতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও বোর্ডের ডাকে মাঝপথ লন্ডন থেকেই দেশে ফিরতে হয়। সাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি বোর্ডের অনাপত্তিপত্র (এনওসি বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) না নিয়েই বিদেশি লিগ খেলতে যাচ্ছিলেন।

 

সাকিবের দর্শক পেটানো, কোচের সাথে দ্বন্দ্ব ও অনাপত্তিপত্র না নিয়ে সিপিএল খেলতে যাওয়ার ঘটনায় দেশের ক্রিকেট অঙ্গন তখন টালমাটাল। সেই সময় এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে দেড় বছরের জন্য বিদেশি লিগ খেলার অনাপত্তিপত্র না দেওয়া ও সবধরনের ক্রিকেট থেকে সাকিবকে ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় বিসিবি। যদিও পরে সাকিব আবেদন করলে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ তিন মাস কমায় ক্রিকেট বোর্ড।

বিপিএলে আম্পায়ারের সাথে তর্কে জড়িয়ে নিষিদ্ধ

২০১৫ সালের ঘটনা। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) তৃতীয় আসরে সাকিব খেলেছিলেন রংপুর রাইডার্সের হয়ে, ছিলেন দলটির অধিনায়কও। সিলেট সুপারস্টার্সের বিপক্ষে ম্যাচে থিসারা পেরেরার বলে মুশফিকের বিপক্ষে রংপুর রাইডার্স খেলোয়াড়দের করা ক্যাচ আউটের আবেদন আম্পায়ার তানভীর আহমেদ নাকচ করে দিলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান অধিনায়ক সাকিব। সেই দৃশ্যপট এখনো সমর্থকদের চোখে পরিষ্কার। কিভাবে তেড়ে এসে আম্পায়ারকে শাসান সাকিব।

একই ম্যাচে নিজ দলের এক ব্যাটসম্যানের আউট হওয়ার পর তাকে উদ্দেশ্য করে বাজে মন্তব্য করার অভিযোগ উঠে সাকিবের বিরুদ্ধে। এই দুটি ঘটনায় সাকিবকে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এতেও টনক নড়েনি সাকিবের।

বিপিএলের পরের আসরেও পাকিস্তানি আম্পায়ার খালিদ মাহমুদের সঙ্গে বাজে আচারণের কারনেও সাকিবকে ম্যাচ ফি’র ২০ শতাংশ জরিমানা গুনতে হয়।

নিদাহাস ট্রফিতে সাকিবের লঙ্কাকান্ড

স্বাধীনতার ৭০ বছর পূর্তিতে স্বাগাতিক শ্রীলঙ্কা, ভারত ও বাংলাদেশকে নিয়ে ২০১৮ সালে দেশটিতে বসেছিল টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের আসর নিদাহাস কাপ। কুড়ি ওভারের ফরম্যাটের সেই আসরের ষষ্ঠ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার দেয়া ২১৫ রানের বড় লক্ষ্যের দিকে বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। শেষ ৬ বলে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ১২ রান। শেষ ওভারের প্রথম দুই বলেই দুটি বাউন্সার দেন লঙ্কান পেসার ইরুসু উদানা।

আইসিসির নিয়ম অনুয়ায়ী, এক ওভারে একটির বেশি বাউন্সার গ্রহনযোগ্য নয়। তাই দ্বিতীয় বাউন্সারে অনফিল্ড আম্পায়ার ‘নো বল’ কল না করায় চতুর্থ আম্পায়ারের কাছে অভিযোগ করেন সাকিব। চতুর্থ আম্পায়ারের সাথে বাদানুবাদের এক পর্যায়ে মাঠে থাকা বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের ফিরে আসতে বলেন তিনি। সে সময়ের জাতীয় দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে নিষেধ করেন। সুজনের প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে খেলা আবারও শুরু হয়।

এবং এক বল বাকি থাকতে জয় ছিনিয়ে আনেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ম্যাচ শেষে শ্রীলঙ্কান গণমাধ্যম সাকিবের বিরুদ্ধে ব্যাট দিয়ে খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুমের কাঁচের দরজা ভাঙ্গার অভিভোগ আনে। এই ঘটনার পর সাকিবকে অবশ্য বড় ধরনের কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি।

shakib সাকিব

ফিক্সিং বিতর্কে নিষিদ্ধ সাকিব

বোর্ডের কাছে দেশের ক্রিকেটারদের ১৩ দফা দাবির রেশ তখনও কাটেনি। যে আন্দোলনে আবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। এর মধ্যেই এক ভারতীয় জুয়াড়ির সাথে যোগাযোগের তথ্য গোপনের অভিযোগে এক বছরের স্থগিত নিষেধাজ্ঞাসহ দুই বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেটীয় কার্যক্রম থেকে সাকিবকে নিষিদ্ধ করে বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি।

আইসিসির দেয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, দীপক আগারওয়াল নামের এক ভারতীয় জুয়াড়ির সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্তত তিন দফায় সাকিবের সাথে ম্যাচ ফিক্সিং বিষয়ক কথোপকথন হয়। সতীর্থ ক্রিকেটারদের ফোন নম্বর চাওয়াসহ ২০১৮ সালে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকর ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং একই বছরে আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের একটি ম্যাচে সাকিবের কাছে দলের ভেতরের তথ্য ফাঁস করার প্রস্তাব দেয় ওই জুয়াড়ি। সাকিব জুয়াড়ির প্রস্তাবে ফিক্সিংয়ে না জড়ালেও নিয়ম অনুয়ায়ী জুয়াড়ির থেকে পাওয়া প্রস্তাবের তথ্য আইসিসিকে অবহিত না করায় তাকে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়।

ডিপিএলে আম্পায়ারিং নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে স্ট্যাম্পে সাকিবের লাথি

সাকিবের বিতর্কিত ঘটনার তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন ডিপিএলে আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচে স্টাম্পে লাথি মারা, স্ট্যাম্প তুলে ফেলা ও আবাহনী কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনের দিকে উত্তেজিত হয়ে ছুটে যাওয়া। গত ১১ জুন ডিপিএলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীর বিপক্ষে করা নিজের প্রথম ওভার ও দলীয় ওভারের পঞ্চম বলে মুশফিকুর রহিমের পায়ে লাগলে জোরালো আবেদন করেন সাকিব ও তার সতীর্থরা। কিন্তু মোহামেডান খেলোয়াড়দের সেই আবেদনে সাড়া দেননি আম্পায়ার ইমরান পারভেজ। মুহুর্তের মধ্যেই সাকিব তেড়েফুঁড়ে বাঁ পায়ের লাথিতে স্টাম্প ভেঙে ফেলেন।

এরপর উত্তেজিত হয়ে আম্পায়ারের সাথে কথা বলতে দেখা যায় সাকিবকে। পরের ওভারেই আরেক আম্পায়ার মাহফুজুর রহমানের সাথে তর্কে জড়ান মোহামেডান অধিনায়ক। বৃষ্টির আগে শুভাগত হোমের করা ষষ্ঠ ওভারের শেষ বলের আগে মাহফুজুর রহমান খেলা বন্ধ করেন এবং মাঠকর্মীদের কভার নিয়ে আসার ইঙ্গিত দেন। এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে আম্পায়ারের সামনে থাকা ননস্ট্রাইক প্রান্তের স্টাম্প উপড়ে ফেলেন সাকিব। এরপর আগেরবারের মতোই উত্তেজিত কন্ঠে আম্পায়ারের সাথে কথা বলতে থাকেন।

ঘটনার শেষ এখানেই নয়। মাঠ ছাড়ার সময় সাকিবের দিকে তেড়ে যান আবাহনী কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন, সাকিবও এগিয়ে যান সুজনের দিকে। মোহামেডান ক্রিকেটার শামসুর রহমান শুভ সুজনকে আটকালে উত্তেজনাকর সেই পরিস্থিতি আর বেশিদূর আগায়নি। এই ঘটনার পরদিন ১২ জুন শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে সাকিবকে ৩ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে ঢাকা লিগের আয়োজক সিসিডিএম।

এ তো গেল সাকিবের মোটা দাগের বিতর্কিত ঘটনা। এসব কাণ্ড ঘটানো ছাড়াও রয়েছে টেস্ট খেলতে অনীহা, আউট হওয়ার পর ব্যাট দিয়ে স্ট্যাম্প ভাঙা, বিসিবির চুক্তি ভঙ্গ করে গ্রামীণফোনের সাথে চুক্তি, জাতীয় দলের সিরিজ চলাকালীন ছুটি নিয়ে ফ্র‍্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে খেলতে যাওয়া, বায়োবাবলের নিয়ম ভঙ্গ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সব অভিযোগ।