Score

শিক্ষা কি টি-টোয়েন্টিতে কাজে লাগাবেন সাকিবরা?

প্রোটিয়াদের বিপক্ষে টেস্ট আর ওয়ানডেতে রীতিমত বিধ্বস্ত হয়েছে টাইগাররা। এমনটা এবারই প্রথম নয়। কিন্তু এবার হারার ধরণের কারণে চরম হতাশা বিরাজ করছে দেশের ক্রিকেট মহলে। আসলে দেশের ক্রিকেটে এমন বাজে সময় আর আসেনি। এবারের বিপর্যয় ওয়ানডে দলপতি মাশরাফির ভাষায়, ‘দেশের ক্রিকেটের জন্য বিপদ সংকেত’। দলের সবার একযোগে ব্যর্থ হওয়ার এমন নজির সাম্প্রতিক সময়ে এদেশের ক্রিকেটে বিরল। আর তাই এটাকে ‘শিক্ষণীয় সফর’ আখ্যা দিয়েছেন ম্যাশ।

 

Also Read - 'ওরা ক্যাসিনোয় খেলতে যায়নি'

এতো ভালবাসার ক্রিকেট দলটির এমন হাল মানতে পারছেন না সমর্থকরাও। তবে একটা সুযোগ এখনও আছে ঘুরে দাঁড়ানোর। আসন্ন টি-টোয়েন্টি সিরিজ দিয়েই লড়াইটা করতে হবে সাকিবদের। যদিও প্রায় অপরিবর্তিত স্কোয়াড নিয়ে একই দলের বিপক্ষে আদৌ সফলতা পাবে কি না সেটাই দেখার বিষয়।

টেস্ট সিরিজে বাজে হারের পর বহু সমালোচনার পরও ওয়ানডে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। দলে ফিরেছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। শেষ ম্যাচে ফিরেছিলেন তামিম ইকবাল। অধিনায়ক মাশরাফিও অনেক বড় অনুপ্রেরণা হবেন মনে হয়েছিল। এছাড়া, ওয়ানডেতে সাম্প্রতিক দলীয় সাফল্যের রেশ তো ছিলই। কিন্তু টেস্টের দুঃস্বপ্ন কাটবে তো দূরের কথা, উল্টো ওয়ানডেতে আরও ভয়াবহ হোয়াইট ওয়াশ, সাথে এক গাদা লজ্জার রেকর্ড। সব সেক্টরেই ব্যর্থ হলো টাইগাররা। বিশেষ করে নখ-দন্তহীন বোলিং আক্রমণের সুযোগ নিয়ে রান বন্যা বইয়ে দিয়েছেন ভিলিয়ার্স-আমলা-ডি ককরা। সেই রান বন্যার ফল লজ্জার এক রেকর্ড।

 

এই প্রথমবারের মতো তিন ম্যাচের কোন দ্বিপাক্ষিক সিরিজে ১০০০ এর বেশি রান দিয়েছেন মাশরাফি-তাসকিন-রুবেলরা। এর মধ্যে সিরিজের প্রথম ম্যাচে কোন উইকেটই পান নি বোলাররা। বিনা উইকেটে মুশফিকের লড়াকু সেঞ্চুরির ইনিংস সমেত পাওয়া ২৮২ রানের টার্গেটও পাড়ি দিয়ে রেকর্ড গড়ে প্রোটিয়ারা। দ্বিতীয় ম্যাচে এক এবি ডি ভিলিয়ার্স একাই বিধ্বস্ত করে দেন বাংলাদেশি বোলিং লাইনআপকে। তৃতীয় ম্যাচে কোন সেঞ্চুরি ছাড়াই ৩৭০ রানের বিশাল টার্গেট দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। ফলাফল ২০০ রানের বিশাল পরাজয় ও সিরিজে ধবল ধোলাই মাশরাফিরা।

তিন ম্যাচেই বোলারদের ব্যর্থতা ছিল দৃষ্টিকটু। দলপতি মাশরাফি নিজেই সবচেয়ে বেশি রান খরচ করেছেন। ৩ ম্যাচে ২৭.৫ ওভার বল করে ২০১ রান দিয়েছেন ম্যাশ। ছিলেন উইকেট শূন্য। তাসকিন ২৪ ওভারে ১৯৮ রান (৮.২৫ রান প্রতি ওভার), রুবেল হোসেন ২৬ ওভারে ১৭৪ রান খরচ করেছেন। যদিও ৫ উইকেট ছিল তার ঝুলিতে। দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বোলার সাকিব ২ উইকেট পেতে ২৮ ওভার বল করে ১৬৮ রান খরচ করেছেন। বোলিংয়ের দুর্দশা বুঝাই যাচ্ছে। কিন্তু বোলিংয়ের এমন দুর্দশার দায় কার?

ম্যাচ বা সিরিজ হারলে সাধারণত দায়টা প্রথমে অধিনায়কের উপরই বর্তায়। টেস্ট সিরিজ হারের পর যেমন মুশফিকের অধিনায়কত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল। কিন্তু, ওয়ানডে সিরিজেও একই হাল হওয়ার পর অধিনায়কের উপর দায় চাপানোর প্রচেষ্টা কাজে লাগে নি। ম্যাশ নিজেই বলেছেন, এই সফর এদেশের ক্রিকেটের জন্য বিপদ সংকেত। অর্থাৎ, সব মিলিয়েই বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এই সময়টা ভয়াবহ। অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলাতে হবে। প্রয়োজনে কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়।

ওয়ানডেতে অধঃপতন সদ্য সমাপ্ত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকেই বুঝা যাচ্ছিল। ভাগ্যের ছোঁয়ায় সেমিফাইনালে পৌঁছালেও যে কয়টা পরাজয় সবই বড় ব্যবধানে। বিশেষ করে নির্বিষ বোলিংয়ের শুরুটাও সেই থেকেই। একই দল ঘরের মাঠে এবং শ্রীলংকার মাটিতে সফলতা পেলেও ক্রমেই আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে, যার এক্সট্রিম অবস্থা এবারের সিরিজে দেখা গেল। দেশের বাইরে জয় পাওয়া কঠিন। নিউজিল্যান্ডেও অনেক বাজে সময় কেটেছে টাইগারদের। কিন্তু সেখানে অন্তত জয়ের স্পৃহা দেখা গিয়েছিল, আয়ারল্যান্ডেও মোটামুটি সফল ছিল যে দলটি, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকেই সেই দলের রূপ পরিবর্তন তথা ‘হারার আগেই হেরে বসা’ মানসিকতার সূত্রপাত।

 

দলে তরুণ প্রতিভা আছে। অভিজ্ঞরাও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সেটা জয়ের উপযোগী হচ্ছে না। এই দলটিই কিছুদিন আগে আগ্রাসী ক্রিকেট খেলেছে। মাঠে গিয়ে তেড়েফুঁড়ে খেলার সেই মানসিকতা কোথায় হারালো? গত বিশ্বকাপে মাশরাফি-তাসকিনের সেই ট্রেডমার্ক উদযাপন এখনও এদেশের ক্রিকেট ভক্তদের মনে গেঁথে আছে। সেই বাঘের গর্জন কোথায়?

সেই আগ্রাসী বা জয়ের স্পৃহা এবার দলের খেলোয়াড়দের মাঝে অনুপস্থিত। বোলিংয়ের লাইন-লেন্থ কিছুই ঠিকভাবে হচ্ছিলো না। মুস্তাফিজ ইনজুরিতে ছিলেন। সেটা কোন অজুহাত নয়। তবে এমন ঘন ঘন ইনজুরি বিপদ সংকেত। আর অতি প্রত্যাশার চাপ মুস্তাফিজ সহ অন্যান্য তরুণদের খেলায়ও প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে সিনিয়রদের মাঝেও এবার ক্লান্তিভাব দেখা গেছে। মাশরাফিকে অনেকটা টেস্ট সিরিজের মুশফিকের মতোই দিকভ্রান্ত মনে হয়েছে।

 

প্রায় সবার খেলাতেই স্পষ্ট অমনোযোগিতা দেখা গেছে। যার প্রমাণ ভয়াবহ পরাজয়ের ঘন্টাখানেক পরই নাসির-শফিউল-তাসকিনের ক্যাসিনোতে যাওয়া। অমন পরাজয় তাদের আনন্দ-ফুর্তির ইচ্ছাকে দমাতে পারেনি! এবারই প্রথম নয়। দেশের ক্রিকেটে দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড আরও অনেক ঘটেছে। সেই আশরাফুলের ফিক্সিং থেকে শুরু করে হালের আরাফাত সানি-রুবেলদের কথা সবাই জানে। দেশের জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের উপর কোটি মানুষের নজর থাকে। তাদের আন্তরিক ভালবাসাকে অবহেলা করার কোন সুযোগ শীর্ষ পর্যায়ে থাকা উচিৎ না।

আবার আসন্ন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিপিএল নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। অনেকে বলছেন বিপিএলের টাকার ঝনঝনানি আর উৎসবের আবহের টানে খেলোয়াড়দের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটেছে। দ্রুত তারকা খ্যাতি আর দ্রুত টাকা কামানোর আকর্ষণ তরুণ খেলোয়াড়দের মাঝে মোহের সৃষ্টি করতে পারে। এইজন্য তাদের খেলায় গা ছাড়া ভাব দেখা গেছে। এমন অভিযোগকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর যদি তাই হয় তাহলে খেলোয়াড়দের জাতীয় দলের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রশ্নের সম্মুখীন।

অথচ, বিপিএল হলো নতুন প্রতিভা খুঁজে পাওয়ার প্ল্যাটফর্ম। যেমনটা আইপিএলে হয়। কিন্তু কার্যত বিপিএল থেকে যারা আসছেন তারা নিজেদের বেশিদিন ধরে রাখতে পারছেন না। আবার পাইপলাইনে খুব যে নতুন প্রতিভা উঠে আসছে তাও তো না। কিছু চমক উপহার দিলেও স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে না বিপিএল। এক্ষত্রে ঘরোয়া লিগে ভাল করা ক্রিকেটারদের দলে সুযোগ দিলে এইসব নতুন প্রতিভারা চাপটা ভালভাবে অনুভব করতো আর দলও উপকৃত হতো। যদিও নির্বাচক এবং কোচদের ভূমিকা এক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ।

ফলে দায়টা শুধু খেলোয়াড় নয়, কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে বিসিবির সকল দায়িত্ববানদের উপরই বর্তায়। কারণ বিসিবি হচ্ছে এদেশের ক্রিকেটের অভিভাবক। যেসব প্রশ্ন উঠেছে পুরো দল, টিম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে সেগুলোর সমাধান বিসিবিকেই করতে হবে। প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের প্রভাব বলয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পছন্দের খেলোয়াড়দের দলে বারবার সুযোগ দেওয়া, জাতীয় লিগের যোগ্যদের অবহেলা করা, খেলোয়াড়দের মনোভাব নষ্ট করা, এমনকি অধিনায়কের কাজেও হস্তক্ষেপের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এতোসব অভিযোগ যার বিরুদ্ধে তাকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

বোলিং কোচ হিসেবে ওয়ালশ পুরো মাত্রায় ব্যর্থ। পেসারদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনবেন তো দূরের কথা উল্টো পেসারদের স্বাভাবিক সামর্থ্যও এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনের দোহাই দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। ওয়ালশের আগমনের পর থেকেই পেস আক্রমণ উল্টো যাত্রা শুরু করেছে। এটা ঠেকাতে হলে আশু ব্যবস্থা নিতে হবে। ফিল্ডিংয়েও বাজে অবস্থা। এসব ঠিক না করতে পারলে আসন্ন বিশ্বকাপে অন্ধকার দেখতে হবে।

অনেকেই বলছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বাঘা বাঘা দলও নাকানিচুবানি খেয়ে যায়। কথা সত্য। সেই হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও এটা নতুন কোন অভিজ্ঞতা নয়। ২০০৮ সালের সফরেও একই ভাগ্যবরণ করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দুই দলের পার্থক্য অনেক। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ানডেতে বাংলাদেশ পরাশক্তি হয়ে উঠেছিল। ঘরের মাঠে বড় দলগুলোকে অনায়াসে হারিয়েছে দলটি। র‍্যাংকিংয়েও উন্নতি হয়েছে। জয়ের হার অনেক ভাল। কিন্তু সব হিসাবকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে যা হলো তা এদেশের ক্রিকেট ভক্তদের অনেকদিন পোড়াবে সন্দেহ নেই। আগে হারার মাঝেও বীরত্ব ছিল। বুক চিতিয়ে লড়াই ছিল। কিন্তু এবার সব উধাও। অসহায় আত্মসমর্পণ যাকে বলে।

শেষ আশা আসন্ন টি-টোয়েন্টি সিরিজ। কিন্তু দলে তামিমের স্থলে মুমিনুলের অন্তর্ভুক্তি আর মাশরাফির দেশে ফিরে আসা ছাড়া তেমন কোন পরিবর্তন নেই। অর্থাৎ, যে দলটি ক’দিন আগেই ওয়ানডেতে বিপর্যস্ত হয়েছে সেই দলটির উপরই এখন টি-টোয়েন্টির বৈতরণী পার হওয়ার ভার। এই সংস্করণে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। র‍্যাংকিংয়ে ১০ নম্বরে বাংলাদেশ, ছয় নম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণে এপর্যন্ত ৬৭ ম্যাচ খেলে মাত্র ২১ জয়, ৪৪ বার পরাজয় বরণ করেছে বাংলাদেশ।

 

প্রোটিয়াদের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে মুখোমুখি হওয়া সব ম্যাচেই পরাজিত দল বাংলাদেশ। আবার চলতি বছরের এপ্রিলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের পর এই ফরম্যটে খেলেনি বাংলাদেশ। তবু, মাশরাফির আশা সাকিবের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। একটা জয় খুব প্রয়োজন। দলে তামিম নেই, মুমিনুল আছেন। (অর্থাৎ, মুমিনুল টি-টোয়েন্টিতে তামিমের বিকল্প!) যাই হোক, প্রত্যাশার পারদ না চড়িয়ে শেষটা ভাল হোক এমন প্রত্যাশায় থাকবে টাইগার ভক্তরা।

-মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

Related Articles

ব্যাটিং ব্যর্থতার দিনে আলো ছড়ালেন আফিফ-শাকিল

বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে প্রথমে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ

পঞ্চমস্থান নির্ধারণী ম্যাচে প্রোটিয়াদের মুখোমুখি বাংলাদেশ

টাইগারদের পাশেই আছেন নান্নু

কোচের কাছে ব্যর্থতার কারণ জানতে চাইবেন পাপন