Scores

স্বর্গ থেকে পাতালে ‘এ যুগের ডন’

তাকে বলা হয় ‘এ যুগের ডন ব্র্যাডম্যান’। অসামান্য ক্রিকেটীয় জ্ঞান আর অসাধারণ ব্যাটিং প্রতিভাধর এই মানুষটি এইতো কিছুদিন আগেও ছিলেন অজিদের নয়নের মণি। কিন্তু, একটা অপরাধ একজন প্রবল প্রতাপশালী অধিনায়ককে কিভাবে স্বর্গ থেকে সোজা পাতালে নামিয়ে দিতে পারে, সদ্য সাবেক ও এক বছর নিষিদ্ধ হওয়া অজি অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ তার বড় উদাহরণ। চোখ ভরা অশ্রু নিয়েও তাই ভক্তদের সমবেদনা আদায় করতে পারছেন না তিনি। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফেরার পথে বিমানবন্দরে তাকে একপ্রস্থ হেনস্তার শিকার হতে দেখেও মন গলেনি ভক্তদের। গলার কথাও না, যে কাজ তিনি করেছেন তার আসলে কোন ক্ষমা হয়না। তার অবস্থান কদিন আগে কেমন ছিল তা ভাবলেই বুঝা যায় কতোটা নিচে নেমে গেছেন তিনি ভক্তদের কাছে।

 

Also Read - পদত্যাগ করলেন অস্ট্রেলিয়ার কোচ লেহম্যান


কি করেছিলেন স্মিথ? সবাই জানে বল টেম্পারিং কাণ্ডের কথা। এই কাজটি ক্রিকেটীয় ক্ষেত্রে অতি নিন্দনীয় কাজ এতে কোন সন্দেহ নেই। এটি বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় ক্রিকেটীয় আইনে। ক্রিকেটে বল টেম্পারিং হলো বলের স্বাভাবিক আকৃতি নষ্ট করা। এই আকৃতি যেভাবেই বদলানো হোক না কেন, শাস্তির মাত্রা প্রায় একইরকম হওয়ার কথা। আম্পায়ার যদি এই অপরাধে কোন বোলার-ফিল্ডারকে দোষী সাব্যস্ত করেন তাহলে ব্যাটিং সাইড তাদের পক্ষে ৫ রানের পেনাল্টি পায়। এছাড়া মাঠে এবং মাঠের বাইরে তাদের জন্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই আইনে অধিনায়ক যদি অপরাধে সরাসরি জড়িত নাও থাকেন তারপরও তাকে সমান অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে ব্যানক্রফটকে দিয়ে করানো ওই কাজটির মূল দায় তারই। আবার স্মিথ নিজেও তা স্বীকার করে নিয়েছেন। স্মিথের কদিন আগের অবস্থান মনে রাখলে এই স্মিথকে চেনার কোন উপায় নেই। তাকে বলা হচ্ছিলো ‘এ যুগের ডন’। কোথায় ছিলেন আর কোথায় এলেন। ফলে তার এতোদিনের জমানো সব সম্মান খুইয়ে এখন দিশেহারা না হয়ে তার কোন সুযোগ নেই।

 

দায়িত্ব থেকে সরানো হল স্মিথ-ওয়ার্নারকে

দোষ স্বীকার করার পর তুমুল সমালোচনার তীর ধেয়ে এসেছে স্মিথের দিকে। সাথে সদ্য সাবেক অজি সহ অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারও পেয়েছেন একই ধরনের শাস্তি। তার অবস্থানও ক্রিকেটবিশ্বে অনেক উপরের দিকেই ছিল। দুর্দান্ত একজন ওপেনিং ব্যাটসম্যানকে অনেকদিনের জন্য হারালো ক্রিকেটবিশ্ব। টেস্ট ক্রিকেটে তার ৪৭.৪২ গড়ে ৫,৪৫৪ রান (১৮টি সেঞ্চুরি, ওয়ানডেতে ৪৪.৭২ গড়ে ৪,০২৫ রান(১৩টি সেঞ্চুরি)। টি-টোয়েন্টির ওয়ার্নার আরও দুর্দান্ত। জাতীয় দলের চেয়ে সেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ক্রিকেটে তার ব্যাটিং আরও খুনে। আইপিএল আর বিগ-ব্যাশের অপরিহার্য ক্রিকেটার ছিলেন এই সেদিনও। আইপিএলে তার অধিনায়কত্বে সানরাইজার্স হায়াদ্রাবাদ দলটি একবার চ্যাম্পিয়নও হয়েছে। কি সুন্দর একটা ক্যারিয়ার এক লহমায় ধুলায় মিলিয়ে গেল যেন।

স্মিথের ক্ষতি আরও বেশি। তিনি দলের সেরা ব্যাটসম্যান, তবে তার চেয়েও বেশি দলের সফল অধিনায়ক। রিকি পন্টিংয়ের অদম্য অস্ট্রেলিয়া যখন ক্লার্কের হাতে ধুঁকছে, একসময় ক্লার্কের বিদায়ে তার ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পথে ছিল। তারপর জর্জ বেইলিসহ আরও কয়েক হাত ঘুরেছে অধিনায়কত্বের ব্যাটন। দলে তখন সদ্য সুযোগ পাওয়া তরুণ এক ক্রিকেটার স্মিথ। অধিনায়কত্বের ব্যাটন যখন হাতে পেলেন অস্ট্রেলিয়া অতি সাধারণ দলে পরিনত হওয়ার পথে। একজন অনিয়মিত লেগ স্পিনার হিসেবে দলে ঢোকা খেলোয়াড়টি আইসিসি র‍্যাঙ্কিংয়ে ১ নম্বর ব্যাটসম্যান হয়েছেন। ৩ নম্বরে ব্যাটিং পজিশন পেয়ে হয়ে উঠেছেন অদম্য ব্যাটসম্যান। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার মতো ক্রিকেটীয় পরাশক্তির অধিনায়ক। তারপর দলকে টেনে তোললেন পূর্বসূরিদের কাছাকাছি পর্যায়ে। প্রথমবার অধিনায়কত্ব করতে এসেই দলকে দারুণ জয় উপহার দেওয়ার পাশাপাশি তারপরের তিন টেস্টেই করেছিলেন সেঞ্চুরি। একসময়ের হাতের মোয়া হয়ে উঠা অ্যাশেজ যখন হাত পিছলে যাওয়ার পথে তখনই কাণ্ডারির ভূমিকায় স্মিথ। তারপর থেকে ক্রমাগত রানের ফুলঝুরির পাশাপাশি যেখানেই অধিনায়কত্ব করেছেন সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। সেসব জানা কথা। কিন্তু তার মতো এমন দুর্দান্ত অধিনায়ক কিভাবে এমন অপরাধ করলেন সেটাই বিস্ময়।

Image result for steve smith

স্মিথকে অন্যদের চেয়ে আলাদা ভাবতো সবাই। ভারতের অধিনায়ক বিরাট কোহলি আর তাকে প্রায় একই পর্যায়ে ফেলা হয়। ব্যাটসম্যান হিসবেও তিনি একই পর্যায়ের। বিশেষ করে রান করার ক্ষেত্রে। একজন সফল ব্যাটসম্যান আর দারুণ অধিনায়কের এমন অপরাধ বিস্ময়কর। যেজন্য এখন নিজে কাঁদছেন, কিন্তু সমর্থক ও ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের চোখে কোন সমবেদনা নেই। দেশে ফেরার পথে সাংবাদিকদের কাছে একপ্রকার হেনস্থা হতে হয়েছে তাকে। আশেপাশের কিছু মানুষ টিটকারি দেওয়ার পাশাপাশি দুয়ো দিয়েছে। পুলিশ তাকে এমনভাবে নিয়ে যাচ্ছিলো দেখলে মনে হয় কোন বড় অপরাধীকে নেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এমন কড়াকড়ি ক্রিকেটারদের জন্য, অনেকদিন পর দেখা গেলো। দেশে ফিরে ভেঙে পড়েছেন তিনি, কাঁদছেন নিরন্তর। তাতে এখন কারও কিছু যায় আসে না। কারণ, তিনি অপরাধী। বহু ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ভাঙার যে অপরাধ তার ক্ষমা হয়না।

ফাফ ডু প্লেসিস, যিনি কি না বর্তমান প্রোটিয়া অধিনায়ক। তার বিরুদ্ধেই কিন্তু এই একই অভিযোগ উঠেছিল। তার জন্য তাকে শাস্তিও পেতে হয়েছিল। কিন্তু তা স্মিথের প্রাপ্ত শাস্তির তুলনায় অনেক কম। সাবেক পাক অলরাউন্ডার শহীদ আফ্রিদি মুখ দিয়ে বল আপেলের মতো কামড় দেওয়ার কথা মনে আছে? বিশ্বের সব দলই বল টেম্পারিং করে, এমন কথাও বলে ফেলেছিলেন তিনি। ১৯৭৬-৭৭ মৌসুমে মাদ্রাজ টেস্টে ভারতের বিপক্ষে ‘ভেসলিন কেলেংকারিতে’ জড়ান বাঁহাতি ইংলিশ পেসার জন লেভার।  পাকিস্তানের সাবেক দুই অধিনায়ক ওয়াকার-ওয়াসিম, আজাহার মাহমুদ, ভারতের দ্রাবিড়, এমনকি শচীন টেন্ডুলকারের মতো গ্রেটের বিপক্ষেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু সাজা হয়েছিলো ভিন্ন ভিন্ন। একই অভিযোগে অভিযুক্ত হন ইংলিশ পেসার জেমস অ্যান্ডারসনও। পাকিস্তান কিংবা পেসারনির্ভর দলের আরও অনেকের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠেছে অনেকবার। কিন্তু সাজার ক্ষেত্রে আইসিসি আর দেশের নেওয়া আইনি ব্যবস্থা একরকম তো নয়ই অনেক ক্ষেত্রে প্রায়ই শাস্তি থেকে পার পেয়ে গেছেন অনেকে। স্মিথের ক্ষেত্রে একটা বড় উদাহরণ স্থাপন করতে দেখা গেলো। আন্তর্জাতিক আর দেশের দেওয়া দুইরকম শাস্তি আইসিসির আইনকে নিয়ে আবার ভাবার সুযোগ এনে দিয়েছে।

Image result for steve smith

 

স্মিথ যা করেছেন তার জন্য তার প্রাপ্ত শাস্তিটা ঠিকই আছে। কিন্তু একই অপরাধ করে বাকিদের জন্য একই রকম শাস্তির ব্যবস্থা করলে বিষয়টা আরও মানানসই হতো। অস্ট্রেলিয়া দেশ হিসেবে, জাতি হিসেবে কতোটা অপমানিত বোধ করেছে তা তাদের দেওয়া শাস্তির মাত্রা দেখলেই বুঝা যায়। তারা একটি মানদণ্ড স্থাপন করেছে, বাকিদের জন্য। তবে প্রকৃত ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে স্মিথ এক বিশাল আফসোস হয়ে থাকবেন। ক্রিকেটকে দিতে পারতেন আরও অনেক কিছুই। নয়নের মণি করে রাখা মানুষটি আজ ঘৃণ্য এক নাম। স্বর্গ থেকে পাতালে তলিয়ে যাওয়া ‘এ যুগের ডন’ আজ এক বিস্মৃত নাম।

-মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

আরও পড়ুনঃ পদত্যাগ করলেন অস্ট্রেলিয়ার কোচ লেহম্যান

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Related Articles

হেডিংলি টেস্ট: ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়া

আর্চারকে স্টেইনের সাথে তুলনা করলেন ওয়ার্নার

ভিডিওঃ আগুন ঝরানো বোলিংয়ে আর্চারের ৬ উইকেট

আর্চারের বোলিং তোপে লন্ডভন্ড অস্ট্রেলিয়া

হেডিংলিতে খেলা হচ্ছে না স্মিথের