Scores

হাল ছাড়েননি অলোক কাপালি

তিনি যেন বর্ষাকালের সূর্য। হঠাৎ দেখা দিয়ে আবার হারিয়ে যান, যেভাবে সূর্য হারায় মেঘের আড়ালে। একসময় তাকে ছাড়া বাংলাদেশ দল কল্পনা করা যেত না। আবির্ভাবের পর ভালোই চলছিল সবকিছু। হঠাৎ ঝড় হয়ে এল নিষিদ্ধ টুর্নামেন্ট আইসিএল, এর জেরে নিষিদ্ধের পাতায় নাম লেখালেন তিনিও। সেই ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল সব। বিপর্যয় সামলে আবারও ফিরে আসলেন। কিন্তু এরপর থেকেই সেই যাওয়া-আসার মাঝে ব্যস্ত। ঠিক যেন বর্ষাকালের সূর্য!

হ্যাঁ, বলা হচ্ছিল অলোক কাপালির কথা। দেশের ক্রিকেটের উত্থানের সময়ে রাজত্ব করা এই অলরাউন্ডার সম্প্রতি আবারো এসেছেন আলোচনায়। জাতীয় ক্রিকেট লীগে (এনসিএল) দারুণ পারফরমেন্স করে হয়েছেন এবারের আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। জাতীয় দলে তার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা হাজারো সমর্থক যখন ফের স্বপ্ন দেখছেন অলোক কাপালিকে নিয়ে, তিনি নিজে তখন কী ভাবছেন? তা জানতেই কোনো এক শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে আমরা হাজির হয়েছিলাম সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। সিলেট বিভাগের প্রথম সারির ক্রিকেটাররা এখানে রোজই আসেন প্র্যাকটিস করতে। অলোকের সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্যে আমরা যখন স্টেডিয়ামে ঢুকেছি, প্র্যাকটিস করছেন অলোক একাই। কুয়াশা মিলিয়ে একসময় রোদ উঠল, উষ্ণতার তীব্রতায় আমরা গায়ের সোয়েটার-চাঁদর খুলে রাখলাম। আর অলোক? তখনও প্র্যাকটিসে মশগুল! এই ৩৩ বছর বয়সে এসেও নিজের পুরনো কাজে যেন একটুও ফাঁকি নেই!

Also Read - ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ওয়ার্নার


মাঠের চারদিকে দৌড়ানোর সময় অলোকের নজরে পড়লাম গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমরা। দৌড় থামিয়ে হেঁটে এলেন আমাদের দিকে। মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে যেন দুঃখ প্রকাশ করলেন এতক্ষণ অপেক্ষায় রাখার জন্য। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, খুলে রাখলেন জ্যাকেট। জাতীয় ক্রিকেট লীগের সদ্য সমাপ্ত আসরের সেরা ব্যাটসম্যানকে চোখের সামনে পেয়ে বেরসিক আমরা ছুঁড়ে দিলাম একের পর এক প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ অলোক ব্যাট হাতে যেভাবে দক্ষতার সাথে বল সামলান, সেভাবে সামলালেন আমাদের।

বিডিক্রিকটাইমকে দেওয়া অলোক কাপালির একান্ত সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য সম্পূর্ণ তুলে ধরা হল।

বিডিক্রিকটাইমঃ কেমন আছেন?

অলোকঃ (হাসি) আছি ভালোই।

বিডিক্রিকটাইমঃ ঘরোয়া ক্রিকেটে দাপটের সাথে খেলে যাচ্ছেন অনেক বছর ধরে। গত কদিন ধরে যাচ্ছে ব্যস্ত সময়। বিপিএল শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হয়েছিল এনসিএল, এনসিএল শেষে সামনে বিসিএলের শিডিউল। বিগত দুটি টুর্নামেন্ট সম্পর্কে জানতে চাই। দলগত এবং ব্যক্তিগভতভাবে সর্বশেষ বিপিএল এবং এনসিএল আপনার চোখে কেমন গেল? এনসিএলের শেষ রাউন্ডে ডাবল সেঞ্চুরি…

অলোকঃ এবারের বিপিএল আমার জন্য খুব একটা ভালো ছিল না। যদিও দল ভালো খেলেছে, খুলনা টাইটান্স সেমিফাইনাল পর্যন্ত যেতে পেরেছে। ব্যক্তিগত পারফরমেন্স আগের আসরের মতো সন্তোষজনক ছিল না। তাই বিপিএল শেষ করার পরপরই টার্গেট হিসেবে ঠিক করেছিলাম- এনসিএলে ভালো খেলতে হবে। সবার সমর্থনে আমি কামব্যাক করতে পেরেছি, সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছি। সবকিছু মিলিয়ে এনসিএল ভালো হয়েছে আমার জন্য। ব্যক্তিগতভাবে রাহীর (ফাস্ট বোলার আবু জায়েদ চৌধুরী) জন্যও ভালো ছিল, এবারের আসরে সর্বোচ্চ উইকেট ওর। দলগতভাবে আরও ভালো করতে পারলে সাফল্য পরিপূর্ণ হত।

বিডিক্রিকটাইমঃ সিলেট বিভাগের অধিনায়ক হিসেবে খেলে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। বিপিএলসহ ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যান্য টুর্নামেন্টেও অধিনায়কত্ব করেছেন বিভিন্ন সময়ে। দলকে নেতৃত্ব দেওয়াটাকে কেমন উপভোগ করেন?

অলোকঃ অধিনায়কত্ব অনেক সম্মানের একটা ব্যাপার। অনেক বছর ধরেই বিভিন্ন দলের অধিনায়কত্ব করছি। এনসিএল, বিপিএল… সর্বশেষ প্রিমিয়ার লীগে গাজী গ্রুপের অধিনায়ক ছিলাম। দায়িত্বটা উপভোগ করি, নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করি। যে দলেরই অধিনায়ক থাকি না কেন, উঠতি খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেই, যাতে ওরা একসময় এই জায়গাটা নিতে পারে। মূলত এজন্যই সিলেট বিভাগের অধিনায়কত্ব করছি। যে দল থেকেই অধিনায়কত্বের প্রস্তাব পাই বা দায়িত্ব দেওয়া হয় না কেন… ব্যাপারটা আসলেই অনেক সম্মানের।

বিডিক্রিকটাইমঃ একটু স্মৃতি রোমন্থন করতে বলি যদি… ২০১৫ বিপিএলে আপনার ব্যাটে ভর করে শিরোপা জিতেছিল ঐ আসরের নতুন দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। ফাইনাল ম্যাচে আপনার দারুণ পারফরমেন্সেই নতুন দলটির শিরোপাস্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। ঐ ম্যাচটি নিয়ে শুনতে চাই।

অলোকঃ ২০১৫ বিপিএলের উইকেট বোলারদের জন্য খুব সহায়ক ছিল। সব ম্যাচই ছিল লো-স্কোরিং। ব্যাটসম্যানদের জন্য রান করা সহজ ছিল না। বিশেষ করে ফাইনাল ম্যাচে ওরকম একটা সিচুয়েশনে… ঐ ম্যাচে ব্যাটিংয়ে নেমে একটা চিন্তাই মাথায় ছিল- শেষ পর্যন্ত খেলতে হবে, তাহলে হয়ত ম্যাচটা জিততে পারবো। শেষ ওভারে সম্ভবত ১৩ রান প্রয়োজন ছিল। কুপারকে টানা দুটো বাউন্ডারি হাঁকানোর পর কনফিডেন্স বেড়ে গিয়েছিল আমার। তখন উইকেটে টিকে থাকাই ছিল মূল টার্গেট, কারণ শেষ ওভারে শুভাগত (শুভাগত হোম) আর এর আগে সব ব্যাটসম্যানই আউট হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত ওভারের শেষ বলেই এসেছিল শিরোপা জেতানো রান। ঐ ম্যাচের কথা মনে পড়লে এখনও অনেক ভালো লাগে।

বিডিক্রিকটাইমঃ ২০০৩ সালে মুলতান টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে হ্যাট্রিক, তাও আবার দেশের হয়ে প্রথম। স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল ২০০৮ এশিয়া কাপের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি, যা কিনা শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের উত্থানের সময়টাতে আপনার অবদান ভোলার মতো নয়। সেই সময়ে তৈরি হওয়া আপনার সমর্থকগোষ্ঠী এখনও পুরনো অলক কাপালিকে দেখার জন্য মুখিয়ে থাকেন। এনসিএলে আপনার ব্যাটে রান তাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, আশা জাগিয়েছে। আপনার সেসব ভক্ত-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান?

অলোকঃ সমর্থকদের উদ্দেশ্যে এটাই বলব- আপনাদের সমর্থনই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সবাই দোয়া করবেন আমার জন্য… এই একটাই চাওয়া। প্রতি বছরই চেষ্টা করি ভালো করার, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলার। যদিও অনেকসময় মনের মতো হয় না সবকিছু। আগামী দিনগুলোতে আমি আমার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করবো, সবাই দোয়া করবেন। সামনে বিসিএল আছে। সিলেট-চট্টগ্রাম নিয়ে গড়া ইসলামি ব্যাংক ইষ্ট জোনের হয়ে খেলবো আমি। সেখানে ভালো পারফরমেন্স উপহার দিতে চাই আপনাদের।

বিডিক্রিকটাইমঃ ভারতের বিপক্ষে করা সেঞ্চুরিটি নিয়ে আপনার অনুভূতি জানতে ইচ্ছে করছে… আপনার ইনিংসটি দেশের হয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরি ছিল তখন।

অলোকঃ ব্যাটিংয়ে নামলে আমি সবসময়ই চেষ্টা করি দলের জন্য খেলতে। হোক সেটা জাতীয় দল, সিলেট বিভাগ, জেলা বা অন্যকিছু। ঐ ম্যাচেও প্ল্যান ছিল একটাই, দলের জন্য কিছু করা। প্রথমে ব্যাট করতে গিয়ে দ্রুত আমাদের পাঁচ উইকেট পড়ে গিয়েছিল। ওখান থেকে আমার আর মুশফিকের পার্টনারশিপ, মুশফিক আউট হওয়ার পর রিয়াদের সাথে… দলের হাল ধরার চেষ্টা করছিলাম। এভাবে দলের জন্য খেলতে গিয়েই সেঞ্চুরিটা হয়ে যায়। ঐ ম্যাচ জিতলে হয়ত সেঞ্চুরিটা বাড়তি প্রাপ্তি হিসেবে থাকত আমার কাছে।

বিডিক্রিকটাইমঃ দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম হ্যাট্রিক আপনার, তাও টেস্টে…

অলোকঃ এটা অবশ্যই বড় কিছু। এই রেকর্ডটা তো কেউ ভাঙতে পারবে না! (হাসি) বাংলাদেশের প্রথম হ্যাট্রিকটা আজীবন আমারই থাকবে। ইউটিউবে যখন পাকিস্তানের বিপক্ষে মুলতান টেস্টের ভিডিওটা দেখি, ভালো লাগে অনেক। যখন বাংলাদেশ দল ভালো খেলে, গর্ব অনুভব করি যে আমিও ঐ দলে খেলেছি। এটা আসলেই বিরাট কিছু।

বিডিক্রিকটাইমঃ জাতীয় দলে ফেরা নিয়ে ভাবছেন?

অলোকঃ আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। যদি সুযোগ আসে… যদি জাতীয় দলে নাও থাকি, তারপরও পারফরমেন্সটা যেন ভালো থাকে- এটাই চাই। মূল লক্ষ্য ভালো খেলা। হতে পারে সেটা বাংলাদেশের হয়ে, হতে পারে সিলেট বিভাগের হয়ে কিংবা ঘরোয়া যেকোনো দলের হয়ে।

বিডিক্রিকটাইমঃ বাংলাদেশের বর্তমান দল এবং পারফরমেন্স নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

অলোকঃ বর্তমানে আমরা অনেক ভালো ক্রিকেট খেলছি। নিউজিল্যান্ড সফরটা হয়ত একটু খারাপ ছিল। কিন্তু আমার যতটুক মনে হয়, আমরা অনেক ভালো ক্রিকেট খেলছি। আমাদের উন্নতির গ্রাফটা চোখে পড়ার মতো। নিউজিল্যান্ডে গিয়ে আমরা ভালো ক্রিকেট উপহার দিয়েছি। হয়ত ভাগ্য সাথে না থাকায় কিংবা ছোটখাটো ভুলের কারণে জিততে পারিনি। নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনে ভালো করা কিন্তু স্বাগতিক ছাড়া অন্য যেকোনো দলের জন্য কঠিন। গত দেড়-দুই বছর ধরে আমাদের পারফরমেন্স সন্তোষজনক। ওয়ানডেতে এখন আমরা সাত নম্বরে আছি। আমরা টেস্ট খেলছি তুলনামূলক কম। এজন্য লম্বা ভার্শনে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। আশা করি একসময় বাংলাদেশ সব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠবে।

বিডিক্রিকটাইমঃ আমরা দেশে যেভাবে পারফর্ম করি, বিদেশের মাটিতে বিশেষ করে পেস সহায়ক ভেন্যুগুলোতে আমরা সেভাবে পারফর্ম করতে পারছি না; যার সর্বশেষ উদাহরণ নিউজিল্যান্ড সফর। এর কারণটা কী?

অলোকঃ নিউজিল্যান্ডের উইকেটে কিন্তু উপমহাদেশের কেউই ভালো খেলতে পারে না। পাকিস্তান একটানা সাতটা সিরিজ জিতে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের মাঠে ওদের বিপক্ষে ভালো করা অনেক কঠিন। রস টেলর কয়দিন আগে বলেছে, আমাদের দেশে আসলে ওরা স্বস্তিতে থাকে না, ওরা সহজে স্পিন খেলতে পারে না। আমাদের মাঠে আমরা বাঘ, ওদের মাঠে ওরা। এটাই স্বাভাবিক। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মতো দল যারা কিনা পেসে অভ্যস্ত, ওরাও নিউজিল্যান্ডে খাপ খাওয়াতে পারে না। সেই তুলনায় আমরা কিন্তু একদম খারাপ করিনি। আমাদের ভালো কিছু ইনিংস আছে, ব্যক্তিগত পারফরমেন্স আছে।

বিডিক্রিকটাইমঃ আমাদের উইকেট আর ওদের উইকেটে অনেক পার্থক্য আছে। স্পিনে অভ্যস্ত বলে পেস সহায়ক উইকেটে গেলে আমরা ভালো করতে পারি না। পেস সহায়ক উইকেটে খেলা কি আমাদের দেশে সম্ভব নয়? আপনার কী মনে হয়।

অলোকঃ অবশ্যই সম্ভব। সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উইকেট যথেষ্ট বাউন্সি। পেস সহায়ক কন্ডিশনে খেলতে যাওয়ার আগে আমাদের উচিত ছিল দলকে এখানে এনে প্রস্তুতি নেওয়া। বাংলাদেশ পরবর্তীতে নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডে খেলতে যাওয়ার আগে আমার মনে হয় সিলেটে ক্যাম্প করা উচিত। এখানকার (সিলেট স্টেডিয়াম) উইকেটের সাথে ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়ার উইকেটের অনেক মিল রয়েছে।

বিডিক্রিকটাইমঃ বিডিক্রিকটাইমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

অলোকঃ আপনাকেও ধন্যবাদ। আমার জন্য দোয়া করবেন।

  • সাক্ষাৎকার গ্রহণেঃ মো. সিয়াম চৌধুরী, প্রতিবেদক, বিডিক্রিকটাইম.কম
  • কৃতজ্ঞতাঃ মোহাম্মদ আফজাল

আরও দেখুনঃ জাতীয় দল নিয়ে ভাবছেন না শাহরিয়ার নাফিস

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন


Related Articles

টিকিটও পাননি রাজিন-এনামুলরা!

লোটোর ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডর হলেন মুশফিক