SCORE

সর্বশেষ

সুজনের কাঁধেই লঙ্কাযাত্রার দায়িত্ব কতোটা যৌক্তিক?

একের পর এক পরাজয়ে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সাবেক কোচ হাথুরুসিংহের বিদায়ের পর দলের ব্যর্থতার মাত্রা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। ঘরের মাঠে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ খোয়ানো থেকে শুরু করে সর্বশেষ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে পরাজয়ের পর দলের ভিতর অস্থিরতা স্পষ্ট দেখা দিচ্ছে। এমতাবস্থায় শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে টাইগররা। গত সিরিজের মতোই এই সফরেও দলের দায়িত্বে থাকবেন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজন। তার অধীনে দলের কি অবস্থা তাতো দিব্য চোখেই দেখা যাচ্ছে। তিনি নিজেও চাইছিলেন না দায়িত্বে থাকতে। অথচ নিজের কাজে সন্তুষ্ট নন এমন একজনকেই আবারো দায়িত্ব দেওয়া কতোটা যৌক্তিক?

 

যে কারণে জায়গা পাননি রাজ্জাক

Also Read - বেলিসের প্রস্তাবে হেসনের উল্টো সুর

এই বাংলাদেশকে ঠিক চেনা যাচ্ছে না। যে দলটি ঘরের মাঠে একসময় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল, সেই দলটির এমন হাল মেনে নিতে কষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। নতুন বছরের শুরুটা হলো জয় দিয়ে। ত্রিদেশীয় সিরিজে জিম্বাবুয়েকে দুবার হারানো, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের জয়, তারপর সব শেষ। একের পর এক ব্যর্থতায় আগের জয় তিনটি কেউ মনেই করছে না। করবেই বা কেন, হারের ধরন দেখে কেইবা বলবে এই দলটি বছর শুরু করেছিল জয় দিয়ে? হাথুরু বিদায় নেওয়ার পর তার অধীনেই ধুঁকতে থাকা শ্রীলঙ্কা কি দুর্দান্ত খেলে পরাস্ত করে গেল টাইগারদের, অথচ সফরের আগে এই হাথুরুকে হিসাবের মধ্যেই রাখা হচ্ছিলো না। নিয়তির কী খেলা! শ্রীলঙ্কার চেয়েও বাংলাদেশের বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠলেন হাথুরুসিংহে। আর তাতে জয় হলো হাথুরুর। কিন্তু আসলেই কি তাই? হাথুরুকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে মূল কাজ, সঠিক পরিকল্পনা করতেই ভুলে গেলেন দলের টিম ম্যানেজমেন্ট, আর প্রথম ম্যাচে হারের ধাক্কা সামলে টানা জয়ের পথে বাংলাদেশকে নিয়ে রীতিমত ছেলেখেলা করলেন হাথুরু।

 

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছে হাথুরুসিংহে

হাথুরু বিদায় নেওয়ার পর প্রধান কোচের সন্ধান করেও নিষ্ফল বিসিবি। ফিল সিমন্স, রিচার্ড পাইবাস ইন্টারভিউ দিয়ে গেছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। পরে আফগানিস্তানের কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন সিমন্স। আর সেই আফগানিস্তান এখন বাংলাদেশের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে যেন। এই দুজনকে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দলের দায়িত্ব দেওয়া হয় টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পদের মোড়কে প্রধান কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনের কাঁধে। হাথুরুর অনুপস্থিতিতে তার সঙ্গী হিসেবে দল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় অন্তর্বর্তীকালীন কোচ রিচার্ড হ্যালসলকে। দায়িত্ব পেয়ে ‘দলের সবাইকে ‘ফাইটার’ বানাতে চাই’ বলে বেশ আশাবাদ ব্যক্ত করেন সুজন। কিন্তু ফল হয় উল্টো। ‘ফাইটার’ ক্রিকেটাররা যেন ‘ফাইট’ করতেই ভুলে গেছেন। সব কয়টা ম্যাচ দেখলেই তা বুঝা যায়। দলের ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষাই বদলে গেছে। হারের আগেই হেরে যাচ্ছে দল। সুজন বলেছিলেন হাথুরু’র সব পরিকল্পনা সম্পর্কে তার ভাল ধারণা আছে। এখন দেখা যাচ্ছে, তার পরিকল্পনা সম্পর্কেই ভাল ধারণা আছে হাথুরু’র। মাঠে লঙ্কান ক্রিকেটারদের দেখে হাথুরু’র অধীনে দেশের মাটিতে অদম্য টাইগারদের কথাই মনে হচ্ছিলো যেন।

শুধু সুজন কেন, দলের এমন বাজে পরিণামের জন্য দায়ী নির্বাচকরাও। দল সাজানো, ক্রিকেটার নির্বাচনে খামখেয়ালির চরম মূল্য দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। গেম প্ল্যানে বড় ধরনের ত্রুটি, সেই সাথে দলের ভিতরে জয়ের স্পৃহা না থাকাও অন্যতম মূল কারণ। নির্বাচকদের দায়টা এক্ষেত্রে বেশিই কারণ, দল নির্বাচনে তাদের স্বেচ্ছাচারিতা দেখা গেছে টেস্ট সিরিজ থেকে টি-টোয়েন্টি সিরিজেও। রাজ্জাককে নিয়ে যে অশোভন কাজটি করা হলো তাতো সবাই দেখেছে। তারপর পুরো স্পিন বোলিং নির্ভর দল বানিয়ে মিরপুর টেস্টে ভয়াবহ পরাজয়। আর টি-টোয়েন্টি সিরিজে একঝাক নতুন মুখ নিয়ে চমক আদতে বুমেরাং হয়েই এসেছে। দল নির্বাচনে এমন স্বেচ্ছাচারিতার আরও উদাহরণ দেখুন- গত দুই মাসে ২৮ জন ক্রিকেটার খেলেছেন জাতীয় দলের হয়ে, টি-টোয়েন্টি সিরিজে অভিষেক হয়েছে ছয়জন নবীন ক্রিকেটারের। অথচ, একমাত্র স্পিনার নাজমুল ছাড়া নতুনদের আর কেউই নজর কাঁড়তে পারেন নি।

তরুনীদের সাথে ফেসবুক লাইভে এসে বিতর্কিত সাব্বির

 

আর সাব্বির রহমানকে নিয়ে যতো সমালোচনা করা হবে ততোই কম হয়ে যায়। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে একজন খেলোয়াড় শাস্তির মুখে পড়ার পরও টিম হোটেলে রাত জেগে ফেসবুক লাইভে আসা কতোটা ইমেচুরিটির প্রমাণ তা নিশ্চয়ই আর বলতে হবে না। তার ফলও মাঠে দেখিয়েছেন তিনি। বাকিদের অবস্থাও তেমন সুবিধাজনক নয়। মুস্তাফিজ, রুবেলরা যেন বলের লাইনই খুঁজে পাচ্ছেন না। ব্যাটসম্যানদের কেউ কেউ জ্বলে উঠলেও বাকিদের ব্যর্থতায় তাদের অবদান কাজে আসছে না। আর নতুনদের নিয়ে নির্বাচকদের জুয়া কোন কাজেই আসেনি। একটি বহুল প্রচলিত দৈনিক পত্রিকায় লেখা হয়েছে- ‘ইদানীং বাংলাদেশ দলের একাদশ দেখলে মনে হয় কেউ বোধ হয় ‘হাউজি’ খেলেছেন!’ আসলেই তাই। সাকিব খেলবেন কি খেলবেন না তা নিয়ে বিস্তর নাটক শেষে তাকে আর মাঠে দেখা গেল না। অথচ ইনজুরি আক্রান্ত সাকিব যে খেলতে পারবেন না, তা না জেনেই তাকে স্কোয়াডে রাখা হয়েছিল! টেস্ট চলাকালীন স্কোয়াডে থাকলেও তিন ক্রিকেটার মোসাদ্দেক, কামরুল ইসলাম ও নাঈম হাসানকে প্রিমিয়ার লিগ খেলার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে হারের পর জাকির হোসেন আর আফিফ হোসেনকে বাদ দেওয়া হলো। আর সাইফউদ্দিন যে কবে সত্যিকারের অলরাউন্ডার হয়ে উঠবেন সেটাই এক রহস্য।

নির্বাচকদের পালা শেষে আবার সুজন প্রসঙ্গ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের হারের পর সমালোচনার জবাবে মিডিয়াকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তিনি বলে বসলেন, ‘আমাদের ক্রিকেটের বড় অন্তরায় মিডিয়া। এখন মিডিয়া ফিশি। মিডিয়ার কারণে আমাদের ক্রিকেট আটকে আছে কি না সেটাও দেখতে হবে। ক্রিকেট আমরা এতবছর ধরে খেলছি। এখন এত গসিপিং। মিডিয়াতে ভালো খারাপ সবই হবে। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেটের জন্য খুব কঠিন।’ তার মতে, এই মুহূর্তে ক্রিকেটের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ‘ফিশি’ অর্থাৎ, সন্দেহজনক ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের বিদায়ের পিছনেও মিডিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন তিনি। নিজের কোচিং আগের চেয়ে ভাল হয়েছে দাবী করে তিনি বলেছিলেন ক্রিকেটারদের ব্যর্থতায় দলের পরাজয় হয়েছে। এমন অদ্ভুত কথা যার মুখ থেকে বের হয়েছে তিনি কোচিং করানোর জন্য কি আদৌ যোগ্য ব্যক্তি? দলের পরাজয়ের দায় দলের খেলোয়াড় আর মিডিয়ার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া সুজন পরের সিরিজে কি করবেন কে জানে।

 

খালেদ মাহমুদ সুজন

এখানেই শেষ নয়। ত্রিদেশীয় ও টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশ দলের বাজে পারফরমেন্সে হতাশ হয়ে সুজন বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি আর আগ্রহী না। আমার আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গেই কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। আমার আসলে নোংরা লাগছে সত্যি কথা বলতে গেলে।’ অথচ তাকেই দেওয়া হচ্ছে লঙ্কাযাত্রার দায়িত্ব? তার মানে বিসিবি’র হাতে আর বিকল্প কেউ নেই। দেশেই কোচবিহীন দলের এই অবস্থা, শ্রীলঙ্কায় নিদাহাস ট্রফিতে কি হবে সেটাই ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশ দল এখন দুর্যোগ আক্রান্ত এলোমেলো এক স্কুল যেন। হেড মাস্টারবিহীন এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা (পড়ুন ক্রিকেটাররা) ভারপ্রাপ্ত কিন্তু পারতপক্ষে অসফল একজন শিক্ষকের অধীনে কি করে গুছিয়ে উঠবে সেটাই প্রশ্ন।

– মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক

আরও পড়ুনঃ বেলিসের প্রস্তাবে হেসনের উল্টো সুর

1 of 1

Related Articles

এবার দলের সঙ্গে থাকছেন না সুজন

মানসিকভাবে পিছিয়ে বাংলাদেশ!

মুস্তাফিজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ

‘র‍্যাঙ্কিং নয়, সিরিজ জয় নিয়েই ভাবনা’

বিসিবিকে ধন্যবাদ দিলেন মাশরাফি