SCORE

সর্বশেষ

মতামত: কবে শিখবো টি-টোয়েন্টি?

স্ট্রোকে অভ্যস্ত বাংলাদেশ দল যখন ওয়ানডের মেজাজ না বুঝে ব্যাট চালাতে গিয়ে সমালোচনা কুঁড়িয়ে পকেটে পুরতো, তখন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের আবির্ভাব টাইগার ক্রিকেটে এনে দিয়েছিল স্বস্তির বার্তা। সেই বার্তায় মিশে ছিল প্রত্যাশা আর সামর্থ্যের মিশেলে গড়ে ওঠা রোমাঞ্চের হাতছানি। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, স্ট্রোকের ফুলঝুরি ছোটানোর প্রবণতা রাখা বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরাই এই ফরম্যাটে শাসন করবেন বিশ্বকে। আদতে তাই হয়েছে কি? না, হয়েছে ঠিক উল্টোটা।

মতামত: কবে শিখবো টি-টোয়েন্টি?
ছবি: গেটি ইমেজেস

২০০৬ সালের অভিষেক টি-টোয়েন্টি ম্যাচের পর কেটে গেছে প্রায় বারো বছর। এই এক যুগেও বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট নিয়ে নিজেদের প্রত্যাশার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেনি। বিগত কয়েক বছর ধরে একদিনের ক্রিকেটের দাপট কিংবা বছর দুয়েক ধরে টেস্টের গৌরবময় সাফল্য ম্লান হয়ে যায় বাংলাদেশ জাতীয় দলের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের পরিসংখ্যান আর পারফরম্যান্স ঘাঁটলে। টেস্ট আর ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ে উত্থানের বিপরীতে ক্রমশ অবনমন ঘটছে টি-টোয়েন্টিতে। অজান্তেই তাই বিড়বিড় করে ঠোঁটজোড়া প্রশ্ন করে বসে— আমরা কবে শিখবো টি-টোয়েন্টি?

ক্রিকেট শক্তিমত্তার খেলা বটে, তবে সেই সাথে মানসিক দক্ষতা আর কৌশলেরও। বিশেষ করে ফরম্যাটটা যখন টি-টোয়েন্টির মতো ছোট পরিসরের। একজন ব্যাটসম্যানকে মুহূর্তেই পড়তে পারার সক্ষমতা থাকতে হয় বোলারের বা ফিল্ডারের, তেমনি একজন ব্যাটসম্যানকেও অদূর ভবিষ্যতের মোমেন্টাম অনুমান করে নিতে হয় ফিল্ডিং করতে থাকা দলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে। সেই সাথে লড়াকু মানসিকতার প্রয়োজন তো আছেই। কেননা ম্যাচে একবার ব্যাকফুটে চলে গেলে কামব্যাক করার সুযোগ প্রতিপক্ষ দল আপনাকে খুব কমই দিবে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সেই অনুধাবন বোধটুকু বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের যথাযথভাবে আছে কি না, সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা ‘অসংলগ্ন আচরণ’ হয়ে উঠতে পারে; কেননা আমরা কেউই ক্রিকেটারদের মনের ভেতরকার খবর জানতে পারি না। তবে কিছু অসংলগ্নতা আসলেই উঠে আসে এবং সেটি ক্রিকেটারদের চিন্তা-চেতনা-অভিপ্রায় থেকেই।

Also Read - রশিদের সাফল্যর রহস্য কী?

নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে দীনেশ কার্তিকের সেই তাণ্ডবের কথা আমাদের মনে আছে। বাংলাদেশের মুঠো থেকে ট্রফি বের করে নেওয়ার আগেরদিন কার্তিক এরকম কিছু কথা বলেছিলেন— ‘বাংলাদেশের বিপক্ষে আমরা যখন খেলি, জিততে পারলে— ইট’স ওকে, তুমি বাংলাদেশের বিপক্ষে জিততে পেরেছ। কিন্তু যদি আমরা হেরে যাই, ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়ায়— তুমি বাংলাদেশের কাছে হেরেছ? কী করলে তোমরা!’

কার্তিকের সেই যুদ্ধংদেহী মনোভাবটাই ব্যাকফুটে থেকে তাকে ম্যাচ বের করতে সাহায্য করেছিল— এমন দাবির বিপক্ষে অবস্থান থাকবে খুব কম পাঠকেরই। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ বা সিরিজ শুরুর আগেই আমরা আসলে হেরে গেছি সেই মনোভাবটা না থাকার কারণে।

ক্রিকেটীয় অভিজ্ঞতা, পরিসংখ্যান, ইতিহাস কিংবা শক্তিমত্তা বিচার করা হলে সাকিব-তামিম-মুশফিকরা রশিদ-নবী কিংবা মুজিবদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন যোজন যোজন। বোমা আর বুলেটের আওয়াজে অভ্যস্ত আফগানরা ক্রিকেটকে জাতীয় সত্তায় ধারণ করেছে এই কয়েক বছর আগে। খেলেছে মাত্র একটি বিশ্বকাপ; আর টেস্ট স্ট্যাটাসও পেয়েছে সবেমাত্র। বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার প্রায় আড়াই বছর পর আফগানিস্তান পা রেখেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে। আফগানিস্তানকে যদি ক্রিকেটের একটি চারাগাছ ধরা হয়, তাহলে তেত্রিশ বছর ধরে ওয়ানডে, আঠারো বছর ধরে টেস্ট আর পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অন্তত একটি ছায়া দেওয়া বৃক্ষ তো বলা যায়?

হ্যাঁ পাঠক, ঠিকই ধরেছেন। টি-টোয়েন্টির পরিসংখ্যানটুকু এখানে কৌশলে এড়িয়ে গেলাম। কেন এড়িয়ে গেলাম, সেই প্রশ্ন করে আমাকে লজ্জায় না ফেলার অনুরোধ রইল।

মতামত: কবে শিখবো টি-টোয়েন্টি?
ছবি: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

দীনেশ কার্তিকের কথার সুতো ধরে আরও একটু হতাশার সৈকতে গড়াগড়ি খাওয়া যাক। অভিজ্ঞতা, শক্তিমত্তা, ইতিহাস আর পরিসংখ্যানের বিচারে বাংলাদেশ আর আফগানিস্তান ক্রিকেটের বর্তমান ফারাকটুকুকে আমরা ক্ষণিকের জন্য ধরে নিই ঠিক ভারতের ক্রিকেট আর বাংলাদেশের ক্রিকেটের বর্তমান ফারাকটুকুর সমান… (আসলে আমার মতে ফারাকটুকু সমানই। ‘নিরাপদ অবস্থানে’ থাকতে পাঠককে ‘ধরে নেওয়া’র মেটাফোরটা শুধালাম)। সিনিয়র বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারকে বিশ্রাম দিয়ে নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে ওঠা ভারত বাংলাদেশকে ছেড়েও কথা বলেনি, আবারও অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শনও করে বসেনি। কার্তিক তো তার কথায় সেটিই বুঝিয়েছিলেন— হেরে গেলে উঠবে ‘গেল গেল’ রব, জিতে গেলে অতি ‘স্বাভাবিক’ কাণ্ড। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশের মনোভাবটা দেখুন। ইনজুরির অভিশাপ বাদ দিলে সম্ভাব্য সেরা দলটাই দেরাদুন সফরে গেছে। সিরিজ শুরুর প্রায় মাসখানেক আগে আমরা আফগান স্পিনার রশিদ খানকে নিয়ে প্রকাশ্যে ময়নাতদন্ত শুরু করলাম, সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেই উগড়ে দিলাম রশিদ প্রসঙ্গে একগাদা অভিমত। সিনিয়র ক্রিকেটাররা বলেই বসলেন, এই সিরিজে আফগানিস্তান ফেভারিট! সমীহ করার একটি অতি মনোহর ব্যাপার ক্রিকেটে আছে। কিন্তু সমীহ করতে গিয়ে ভয় পেয়ে বসলে? আপনি যখন ক্রিকেটে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন তখন অঙ্কুরিত হওয়া একটি দলকে আপনি ভয় পাচ্ছেন কিংবা ‘ফেভারিট’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, আর তারা যে আসলেই ফেভারিট সেটার প্রতিফলনও পেতে হচ্ছে মাঠের ক্রিকেটে! ক্রিকেট বিধাতা যদি জানাতেন, এটাই কি সেই তথাকথিত ‘হারার আগে হেরে যাওয়া’ কিনা…

দিনশেষে তাই আমাদের ক্রিকেট জ্ঞান, অন্তত ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাটে… কতটুকু ব্যবহৃত হচ্ছে বা আদৌ ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেই বিতর্ক তৈরি হয়ে যায়। অথচ আধুনিক ক্রিকেটের সুস্বাদু রান্না ‘টি-টোয়েন্টি’-র সব কাঁচামাল বা উপকরণ আমাদের হাতেই ছিল, শুধু জানা ছিল না রেসিপিটা।

বিপিএল আমাদের ক্ষেত্রে কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, জানা নেই। আমাদের আয়োজনে মাঠে গড়ানো এই টুর্নামেন্টে অন্যান্য অনেক দেশ লাভবান হলেও লাভবান হতে পারছি না আমরাই। নতুন খেলোয়াড় বের হয়ে আসছে না, আসলেও টিকে থাকার দৌড়ে হয়ে উঠছেন ‘চুপসে যাওয়া ফানুশ’। পাঁচ বিদেশি খেলিয়ে গত বিপিএলে বাংলাদেশ দিয়েছে ‘বদান্যতা’র পরিচয়। সেই দানশীল আচরণের পর দিনশেষে দেখা যাচ্ছে, আমাদের হাঁড়িতেই ভাত নেই, তথা নেই টি-টোয়েন্টির উপযুক্ত ক্রিকেটার।

প্রতিবেশী দেশ কিংবা ‘ক্রিকেটের বড় ভাই’ ভারতের দিকে তাকালে ঠিক উল্টো চিত্র। ভারতের ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা আইপিএলকে যেভাবে ধ্যানজ্ঞান করেছেন, তেমনই ফল পাচ্ছেন হাতেনাতে। পুরনো খেলোয়াড়দের প্রতিস্থাপনের জন্য আইপিএলের অবদান শব্দের বিশেষায়নে প্রকাশ করা কঠিন। আফগানিস্তানের কাছে সিরিজের প্রথম ম্যাচে শোচনীয় পরাজয়ের পর এক সমর্থকের ফেসবুক স্ট্যাটাস ছিল এটি- ‘ভারত আইপিএল খেলে ব্যাক-আপের পর ব্যাক-আপ বানাচ্ছে। মহেন্দ্র সিং ধোনি নেই? লোকেশ রাহুল আছে। রাহুল নেই? দীনেশ কার্তিক আছে। কার্তিক নেই? ডোন্ট অরি, রিশাভ প্যান্ট আছে। এদিকে সাঞ্জু স্যামসনও লাইমলাইটে আছে। পেসার ভুবনেশ্বর কুমার নেই? ওদের শার্দূল ঠাকুর আছে। রবিচন্দ্রন অশ্বিন নেই? ওয়াশিংটন সুন্দর আছে। আমাদের সাকিবের বিকল্প সেই কোন দুনিয়ায়, এক মুস্তাফিজের বিকল্প পেতেই জান শেষ।’ আসলেই তো তাই। একদিন না একদিন সাকিব আল হাসান অবসরে যাবেন। সাকিবের সেই অবসরের কথা ভাবলে আমাদের গলা শুকিয়ে যায়, কারণ আমরা আরেকজন সাকিব তৈরি করতে পারিনি। মাশরাফি বিন মুর্তজা টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেওয়ার পরও আশার প্রদীপ হয়ে ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। সেই মুস্তাফিজ এবারও আইপিএল থেকে বাঁধিয়ে এসেছেন চোট, যা তাকে গায়ে জড়াতে দিচ্ছে না জাতীয় দলের জার্সি। বারবার ইনজুরিতে পড়ে বোলিংয়ের ধার হারানো মুস্তাফিজের অবেলায় হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা আমাদের মনে উঁকি দেয়, তখন আমরা দেখতে পাই ‘অন্ধকারের আভা’। বাংলাদেশ আবার কবে পাবে পুরনো মুস্তাফিজের মতো কাউকে?

মতামত: কবে শিখবো টি-টোয়েন্টি?
ছবি: গেটি ইমেজেস

নিদাহাস ট্রফি থেকে বাংলাদেশ সুখস্মৃতি নিয়ে ফিরেছিল ঠিকই। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, সেখানে ভাগ্যের স্পর্শ ছিল, ছিল দুই-তিনজন ক্রিকেটারের অনন্য পারফরম্যান্স আর সামনে থেকে দেওয়া নেতৃত্বগুণের অবদান। দলগত সফলতা হলেও সেখানে দলীয় অবদান ছিল কমই। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এখনও বাংলাদেশ কতটা নাজুক, সেটিই আবার প্রকাশ পেয়েছে ৩ জুন আফগানিস্তানের কাছে লড়াইবিহীন পরাজয়ে। বিপিএল থেকে সুবিধা আদায় করা কিংবা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের মেজাজ বুঝতে পারা দূরে থাক, আমরা এখনও অনুধাবন করতে পারিনি— কীভাবে লড়াই শুরুর আগে প্রতিপক্ষকে ভড়কে দেওয়া যায়

দিনশেষে হতাশা বা আক্ষেপ পুষে সমাধান খোঁজা তাই এক প্রশ্নে— কবে শিখবো টি-টোয়েন্টি?

আরও পড়ুনঃ ‘৪ ওভারেই মাশুল দিতে হলো’

1 of 1

Related Articles

ক্রিকেটের ৯০ শতাংশ দর্শকই উপমহাদেশের!

স্ট্রাইকিং প্রান্তে শুরু করতেই ভালোবাসেন তামিম

“খেলায় আপস অ্যান্ড ডাউনস থাকবেই”

আলোচিত ব্যাঙ্গালোর টেস্টে যত রেকর্ড

আফগানদের পরাজয়ে প্রোটিয়াদের স্বস্তি!