বাংলাদেশ দলের অস্ট্রেলিয়া সফর শেষ। দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ১-১ ব্যবধানে ড্র করেছে বাংলাদেশ। অজি সফরটা ভালো-মন্দের মিশেলে কেটেছে বাংলাদেশের। প্রাপ্তির খাতা খুলে বসলে অবশ্য বেশ কিছু অধ্যায়ই খুঁজে পাওয়া যাবে। [গুগল নিউজে বিডিক্রিকটাইম ফলো করুন]
পেসারদের রাজত্বের গল্প যুগ যুগ ধরে লালন করা যাবে। সফর শুরুর আগের সময়ে একটু ফিরে যাওয়া যাক। দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রশ্ন ছুঁড়েছিলেন সাংবাদিকদের দিকে। অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে সাংবাদিকদের প্রত্যাশা কী? কেমন করবে বাংলাদেশ? উত্তর ছিল ‘ভালো খেলা।’ শান্ত জবাবে বলেছিলেন, ‘এই উত্তর আমি দিলে পছন্দ হত কি?’ এছাড়া প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন বলেছিলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে রেসপেক্ট আদায় করে নেওয়াই বড় লক্ষ্য।’
সফর শেষে যদি এই দুই বাক্যকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে নেওয়া হয়, তাহলে তো সফরটা দারুণ সফল। ডারউইনে টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে অজিদের সম্মান তো বাংলাদেশ অর্জন করেছেই, পুরো ক্রিকেটবিশ্ব কুর্নিশ জানিয়েছে টাইগারদের। সেই সাথে ডারউইনে ১১ সেশনের ১১ সেশনই রাজত্ব করে অজিদের নাচিয়ে ছেড়েছিল বাংলাদেশ। এমন দুর্দান্ত খেলা টেস্টে বাংলাদেশ কবে খেলেছিল? ভালোর সর্বোচ্চ চূড়াটাই তো যেন বাংলাদেশ ছুঁয়ে ফেলেছিল, অন্তত ডারউইন টেস্টে। ভালো খেলাও হয়েছে সেই সাথে সম্মান আদায় করার কাজও হয়েছে।
দলগত পারফরম্যান্স বিবেচনা করলে অজি সফর স্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে। অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় – এই জিনিস জীবদ্দশায় দেখে যাওয়া নিয়েই তো সংশয় ছিল অনেকের মাঝে। ঘটনা বাস্তবে ঘটেছে এবার। অনেকের মতে, দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা জয় এটি, সব ফরম্যাট মিলিয়ে, সবকিছু মিলিয়েই। আগামী দিনে বাংলাদেশ কোনো ফরম্যাটে বিশ্বকাপ জিতে না গেলে এই জয় সেরার মুকুট হারাবে বলেই আশা করা যায়।
ডারউইনে অজিদের বিপক্ষে দারুণ জয়ের পর ম্যাকাইয়ে ধসে পড়েছে বাংলাদেশ। দুই ইনিংসের কোনোটিতেই একশ রানও পার করা যায়নি। সেই ম্যাচ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, হবেও, স্বাভাবিক। তবে ডারউইনের স্কোরকার্ড তো আর মুছে যাবে না। ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের বীরত্বের গল্প তো আর মিথ্যা হয়ে যাবে না। ব্র্যাড হাডিন, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, রিকি পন্টিং, হার্শা ভোগলে, ইয়ান বিশপ, ডেভিড ওয়ার্নার, ব্রেন্ডন জুলিয়ানের মত লোকদের এত এত প্রশংসার ঝুলিকে তো আর মিথ্যা করে দেওয়া যাবে না। ডারউইনের মহাকাব্য তাই দেশের ক্রিকেটে চিরস্মরণীয় হিসেবেই লেখা থাকবে। প্রাপ্তির খাতাতে সবচেয়ে বড় অধ্যায়টা ডারউইন টেস্টের ঐতিহাসিক জয়ের গল্প নিয়েই।
হাসান মাহমুদের বোলিং নজর কেড়েছে দারুণভাবে। অন্যান্য অধ্যায়ে ছোট ছোট গল্প, জয়ের নায়ক, পার্শ্বনায়করা থাকবেন নিশ্চিতভাবেই। ডারউইনে ম্যাচসেরা হওয়া হাসান মাহমুদকে দিয়েই শুরু করা যাক। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট তোলা হাসান ম্যাচে নিয়েছেন ৯ উইকেট। দুই ওপেনার জ্যাক ওয়েদারাল্ড এবং ট্রাভিস হেডকে ফিরিয়ে ডারউইনে বাংলাদেশকে স্বপ্নের মত শুরুটা এনে দিয়েছিলেন হাসানই। পরে পথের কাঁটা হয়ে যাওয়া স্টিভেন স্মিথকে ফেরানো এবং দ্বিতীয় ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান ক্যামেরন গ্রিনকে বিদায় করে দলের জয়ের পথ সুগম করা – সবগুলোকেই ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বলে দেওয়া যায়, চাইলে ডিসাইডিং ফ্যাক্টরও বলতে পারেন। অজি কন্ডিশনে বাংলাদেশের কোনো পেসারের এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্স – আহা! মধু মধু! এই মধুর আশাতেই তো কতশত দিন পার করা।
বল হাতে বাকিরাও কম যাননি। ইবাদত হোসেন চৌধুরী, তাসকিন আহমেদকে পেস এন্ড বাউন্সে অজিদের চাপে রেখেছেন। প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানেই থেমেছে অস্ট্রেলিয়া। গ্রিন টপে অজিদের ব্যাটিং দুর্দশা দেখে টাইগার সমর্থকরা বুঝি ভেবেছিলেন, এবার বাংলাদেশ হয়ত ১০০ রানের আগেই থামবে। দেশের ক্রিকেটের একনিষ্ঠ সমর্থক হলেও তখন এই কথাতে দ্বিমত করার সুযোগ কমই থাকত। দেশের ক্রিকেটে এমন উদাহরণ তো ভুরিভুরি আছে। তবে না, এবারের গল্পটা ভিন্ন। এবারের অধ্যায়টা লেখা হয়েছে ভিন্ন ধাঁচে, যেখানে বড় নায়ক তানজিদ হাসান তামিম।
ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা তানজিদ তামিম দারুণ নিয়ন্ত্রণের সাথে ব্যাট চালালেন। সুযোগ বুঝে রান বের করেছেন। অযথা তেড়েফুঁড়ে মেরে উইকেট দিয়ে আসেননি। ঠাণ্ডা মাথাতে সামলেছেন অজিদের বোলিং। মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা তানজিদ অজি তারকা বোলারদের সামলেছেন পরিপক্ক ব্যাটিংয়ে। হাঁকিয়েছেন দারুণ এক সেঞ্চুরিও। যে সেঞ্চুরিতে ভর করে লিডের ভীত পায় বাংলাদেশ। যা কাজে লাগিয়ে ২২৮ রানের বড় লিডও নিয়ে ফেলে টাইগাররা।
ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্টেই তানজিদ হাসান তামিমের শতক। প্রাপ্তির খাতার আরেক অধ্যায়ে থাকবেন মেহেদী হাসান মিরাজ। অলরাউন্ড নৈপুণ্যে অজিদের হারানোর বড় নায়ক মিরাজও। দ্বিতীয় ইনিংসে ফাইফার তোলার আগে প্রথম ইনিংসে দারুণ লড়াকু এক ফিফটিতে দলকে বড় লিড এনে দেন মিরাজ। প্রথম ইনিংসে সম্ভাব্য ব্যাটিং কলাপ্স থেকে দল বাঁচিয়েছেন মিরাজ এবং লোয়ার অর্ডারের ব্যাটাররা। সেই সুবাদেই বড় লিড এবং সেই লিডে অজিদের চাপা দিয়েই হেসেখেলে বাংলাদেশের জয়। দ্বিতীয় ইনিংসে স্টিভেন স্মিথের উইকেটও নিয়েছিলেন মিরাজ। দলের জয়ে যা বড় ভূমিকা রেখেছে নিশ্চিতভাবেই।
নাজমুল হোসেন শান্তর কথা না বললে নির্ঘাত পাপ হবে। দুর্দান্ত অধিনায়কত্ব, বোলিং পরিবর্তনের সাথে প্রথম ইনিংসের ফিফটি – সব জায়গাতেই একশতে একশ পেয়ে পাশ করেছেন ক্যাপ্টেন শান্ত। সংবাদ সম্মেলন বা মাঠের ক্রিকেট কিংবা মাঠের বাইরে – সব জায়গাতেই অধিনায়ক শান্তর কৌশল, বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্ব নজর কেড়েছে। টেস্টে বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক ইতোমধ্যে হয়ে গিয়েছেন। এবার নিজেকে আরও ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ শান্তর সামনে।
ডারউইন বীরত্বের পর এক ফ্রেমে বাংলাদেশ দল। এসবের বাইরে মুমিনুল হক, তাসকিন আহমেদ, ইবাদত হোসেনদের পারফরম্যান্স থাকবে প্রাপ্তির খাতাতে। দ্বিতীয় টেস্টে শরিফুল ইসলামের বোলিংটাকে ভুলে গেলেই বা চলবে কেমন করে! বাংলাদেশের ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়াকেও যে ২১০ রানে থামিয়ে দেওয়া গেছে সেখানে বড় কৃতিত্ব তো শরিফুলেরই। ৭ উইকেট তুলে অজি ইনিংসের কোমর ভেঙে দিয়েছেন শরিফুল। প্রথম টেস্টে চোটের কারণে খেলা হয়নি। দ্বিতীয় টেস্টে সুযোগ পেয়েই নিজেকে মেলে ধরেছেন। যারাই সুযোগ পাচ্ছেন নিজেদের প্রমাণ করছেন, এই সুস্থ স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার বাংলাদেশ দলই তো দরকার ছিল!
পারফরম্যান্স, ফর্ম, দলের সাফল্য বিবেচনায় নিলে এই অস্ট্রেলিয়া সফর বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা সিরিজগুলোর তালিকাতেই থাকবে। একেবারে সেরা বলে দিলেও অবাক হওয়ার বেশি কিছু থাকবে না হয়ত। যে দল নিয়ে বাইরে এত এত সমালোচনা, এত এত বিতর্ক সেই দল অস্ট্রেলিয়ার চোখে চোখ রেখে এভাবে লড়ছে, তাও অজিদেরই মাটিতে টেস্ট ফরম্যাটে, এমন একটি দিনের জন্যই তো বেঁচে থাকা ক্রিকেট সমর্থকদের, এমন কিছু দেখার জন্যই তো এত এত অপেক্ষা, এমন সিরিজ এমন ম্যাচ দেখার জন্যই তো বছরের পর বছর ধরে সমর্থন করে যাওয়া। বাংলাদেশ দল তাই কিছুটা হলেও সমর্থকদের খুশি করতে পেরেছে।
ম্যাকাইয়ে আলো ছড়িয়েছেন শরিফুল ইসলামও। বাংলাদেশের ডারউইন বীরত্বের মাহাত্ম্য অনেকখানি বেড়েছে আরও এক কারণে। প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়া, জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হারা বাংলাদেশ দল যে প্রত্যাবর্তনের অনিন্দ্য সুন্দর গল্প লিখে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে, এমন অনবদ্য প্রত্যাবর্তন দেশের ক্রিকেটে আগে কে দেখেছে কবে? বিশ্ব ক্রিকেটেই বা এমন উদাহরণ কতগুলো আছে? এসব বিবেচনায় নিলেও তো বাংলাদেশকে দলকে আরও বেশি করে বাহবা দেওয়া উচিত।
ম্যাকাইয়ে বাংলাদেশ হেরে গেছে, বাজেভাবেই হেরেছে। তবে মাথা উঁচু করেই দেশে ফিরতে পারে বাংলাদেশ। কারণ ম্যাকাইয়ে ইনিংস ব্যবধানে হারার পরেও অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রাপ্তির খাতাটা দারুণ রঙিন সব অধ্যায়ে ভরপুর, যেসব গল্প যুগের পর যুগ লালন করে যাওয়া যাবে।