রবিউল ইসলাম
একসময় বাংলাদেশের উঠতি ক্রিকেটারদের চোখে ভেসে উঠত বিদেশি তারকার ছবি। তবে এখন সময় বদলেছে। দেশের ক্রিকেটাররাই হয়ে উঠেছেন নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালদের হাত ধরে বদলে গেছে ক্রিকেটের ধারা। হালের শেখ মেহেদি হাসানও অনেক তরুণের প্রেরণার নাম। খুলনার তরুণ অলরাউন্ডার শেখ পারভেজ রহমানের অনুপ্রেরণার তালিকায় যেমন আছেন সাকিব, তেমনি রয়েছেন এবি ডি ভিলিয়ার্স, জস বাটলার, জেসন রয়ের মতো বিশ্ব তারকারা। তবে ক্রিকেটে জীবনের স্বপ্নের ডালপালা ছড়িয়েছে শেখ মেহেদির সংস্পর্শেই। তার হাত ধরে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে যাওয়া-আসা শুরু করেন তিনি। এখন তিনি এলাকার বড় ভাইয়ের মতোই জাতীয় দলে খেলার স্বপ্নে বিভোর। আর শৈশবে হাতে খড়ি যার কাছে, সেই কোচ সালাউদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বলের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরা জীবনের হৃদয়। তার মতে, জাতীয় দলে সুযোগ পেলে কিছুটা হলেও শোধ হবে কোচের ঋণ। [গুগল নিউজে বিডিক্রিকটাইম ফলো করুন]
বিশ্বকাপ মাতাবেন শেখ পারভেজ জীবন। ২০১৫ সালে খুলনার বেঙ্গল ক্রিকেট একাডেমিতে কোচ দিবাকর রায়ের অধীনে ক্রিকেটে দীক্ষা নেওয়া শুরু করেন পারভেজ। এরপর কোচ সালাউদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বলের তত্ত্বাবধানে চলতে থাকে অনুশীলন। ক্রিকেটের পেছনে ছুটতে গিয়ে লেখাপড়ায় ফাঁকি দিয়েছেন পারভেজ। স্কুলের টেবিলের চেয়ে অনুশীলনের নেটেই পড়ে থাকে তার মন। যদিও ভবিষ্যতে পড়ালেখায় ফিরতে চান তিনি।
গত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে দলের অংশ ছিলেন জীবন। এই আসরে দলের সবচেয়ে সিনিয়র ক্রিকোর তিনিই। ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথম শ্রেণী, লিস্ট ‘এ’ এবং টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে ৫০ টি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ জীবন। এই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগিয়ে যুব বিশ্বকাপ মাতাতে প্রস্তুত তিনি। শুরুতে অবশ্য বিশ্বকাপের ভাবনাতে সেভাবে ছিলেন না ১৯ বছর বয়সী এই বাঁহাতি স্পিনিং অলরাউন্ডার। হুট করে তাকে সুযোগ দেওয়া হয় সর্বশেষ এশিয়া কাপের দলে। এশিয়া কাপেও খুব একটা ভালো করেছেন সেটিও নয়। তবুও তার অভিজ্ঞতাকেই গুরুত্ব দিয়েছে নির্বাচকরা। বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে দলের ভারসাম্য রক্ষায় তিনিই হতে পারেন বড় ভরসা। গত আসরে দল সফল না হলেও এবার শিরোপা জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী জীবন। তিনি চান নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দলের জন্য বড় অবদান রাখতে। তার চোখে এখন একটাই স্বপ্ন, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামা।
অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশ স্কোয়াডকে নিয়ে বিডিক্রিকটাইমের ধারাবাহিক আয়োজনে আজ থাকছে অফ-স্পিনিং অলরাউন্ডার শেখ পারভেজ রহমান জীবনের সাক্ষাৎকার।
প্রশ্ন: ক্রিকেট কীভাবে এলেন?
পারভেজ রহমান জীবন: আমি খুলনার ছেলে। খুলনা আবু নাসের স্টেডিয়ামের পাশেই আমার বাড়ি। ছোটবেলা থেকে ক্রিকেট খুব ভালো লাগে। খুলনার ক্রিকেটার শেখ মেহেদি হাসান ভাইকে দেখে আমার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকে তার সঙ্গে খেলাধুলা করতাম। তিনি আমাকে বলতেন, ‘তুই গিয়ে একাডেমিতে ভর্তি হ।’ আমি বলতাম– হবো, হবো। একদিন মেহেদি ভাই হঠাৎ বলেন, ‘চল আমার সঙ্গে।’ তিনি আমাকে নিয়ে বেঙ্গল ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেখান থেকেই মূলত পেশাদার ক্রিকেটে যুক্ত হওয়া। তাকে দেখেই স্বপ্ন দেখেছি একদিন জাতীয় দলে খেলবো, তার মতো ম্যাচ জেতাবো। তিনিই আমার আইডল। বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারকে আমার ভালো লাগে। কিন্তু মেহেদি ভাই আমার কাছে স্পেশাল।
প্রশ্ন: আপনার পছন্দের ক্রিকেটারদের তালিকাতো বেশ লম্বা, আর কারা কারা আপনার প্রিয়?
জীবন: দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স এবং ইংল্যান্ডের জেসন রয় ও জস বাটলার আছেন আমার পছন্দের তালিকায়। তারা অনেক আক্রমণাত্মক খেলে। আমিও আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করি। এজন্যই তাদের অনুসরণ করি। যদিও আমার ব্যাটিংয়ের ধরন তাদের মতো না। তবুও চেষ্টা করি তাদের মতো খেলার। এছাড়া সাকিব ভাইকে (সাকিব আল হাসান) আমার ভালো লাগে। ছোটবেলা থেকেই তার বোলিংয়ের ভক্ত আমি।
প্রশ্ন: কত বছর বয়স থেকে ক্রিকেট মাঠে যাওয়া শুরু করেছেন?
জীবন: একদম ছোটবেলায়। সম্ভবত তখন আমার বয়স পাঁচ বছর। ওই যে বললাম, বাড়ির পাশেই মাঠ। ফলে মাঠে যাওয়া আসা করতে করতেই ক্রিকেটের প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয়। মূলত মেহেদি ভাইয়ের হাত ধরেই যাওয়া-আসা শুরু। তিনি আমাকে সবসময় গাইড করতেন। তবে ক্রিকেট যখন বুঝতে শিখেছি, তখন থেকে আমার ব্যক্তিগত কোচ সালাউদ্দিন স্যার (সালাউদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল)। তার তত্ত্ববধানেই ক্রিকেট শিখেছি। যেকোনও সমস্যায় পড়লেই তার কাছে চলে যাই।
প্রশ্ন: আপনি বলছিলেন, আপনার ক্যারিয়ারে কোচ সালাউদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বলের ভূমিকা অনেক। কিভাবে তার ঋণ শোধ করতে চান?
জীবন: সত্যি কথা বলতে, উনার অবদানের কথা আমি কখনো ভুলবো না। আমার ব্যক্তিগত জীবন হোক বা ক্রিকেট জীবন হোক সবখানেই উনি আছেন। কোথায় খেলবো, কোন দলে খেলবো, কোথায় সমস্যা হচ্ছে সবকিছুতেই উনি খেয়াল রাখেন। অনেক সময় এমন হয়েছে, আমি নিজেই বুঝতে পারছি না কী সমস্যা হচ্ছে, সেই জায়গাগুলোও উজ্জ্বল স্যার আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। বাবার মতোই তিনি আমার পাশে থেকেছেন। অনেকে আছে, যারা কেবল ভালো সময়ে খোঁজ নেয়, কিন্তু খারাপ সময়ে দূরে সরে যায়। উজ্জ্বল স্যার আমার জীবনে নিঃস্বার্থভাবে পাশে থেকেছেন। তার এই ঋণ শোধ করা সম্ভব না। তবে যদি জাতীয় দলে সুযোগ পাই, অন্তত কিছুটা হলেও ঋণ শোধ করা যাবে। যুব বিশ্বকাপ বড় মঞ্চ, এখানে ভালো করতে পারলে, আমার স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনা বাড়বে।
প্রশ্ন: এই যে ছোটবেলা থেকেই মাঠে পড়ে থাকতেন, বাবা-মা বকতেন না?
জীবন: শুরুতে একটু বকাঝকা দিতো। কিন্তু ধীরে ধীরে বাবা-মা বুঝতে পারেন ক্রিকেট আমার খুব পছন্দের। পরে আর তারা নিরুৎসাহিত করেননি। কয়েক মাস বেঙ্গল ক্রিকেট একাডেমিতে অনুশীলন করি। এরপর শেখ আবু নাসের ক্রিকেট একাডেমিতে অনুশীলন শুরু করি। তখন পড়াশোনার কিছুটা ক্ষতি হয়েছে।
প্রশ্ন: হুট করে এশিয়া কাপের আগে সুযোগ পেলেন, বিশ্বকাপও খেলতে যাচ্ছেন, কেমন লাগছে?
জীবন: অনুভূতিটা ভালো। তবে এশিয়া কাপে ভালো পারফরম্যান্স করতে না পারায় একটু খারাপ লাগছে। তবুও নির্বাচকরা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন, এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। ২০২৪ সালের এশিয়া কাপে আমি ভালো খেলেছিলাম, সেখানে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকার করেছিলাম। এই বছর ভালো করতে পারিনি, এশিয়া কাপে ব্যর্থ হয়েছি। এখন আমার নজর বিশ্বকাপে। আমি একজন অলরাউন্ডার হিসেবে চেষ্টা করব সেরাটা দেওয়ার।
প্রশ্ন: আপনি দুটো বিশ্বকাপে খেলার সামনে দাঁড়িয়ে। এখন দলের সবচেয়ে সিনিয়র খেলোয়াড়। আপনার কাছে বেশি প্রত্যাশা করাইতো স্বাভাবিক?
জীবন: আমিও সেটাই মনে করি। যারা আছে, আমি সবার চেয়ে সিনিয়র। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে কী কী পরিস্থিতি আসতে পারে, তার একটা স্পষ্ট ধারণা আমার আছে। তাই আমি আমার অভিজ্ঞতা সবার সাথে ভাগ করে নেব, যাতে দল হিসেবে সেরাটা দিতে পারি।
বাংলাদেশের জার্সিতে বিশ্বকাপ মাতাতে প্রস্তুত জীবন। প্রশ্ন: গত বছর শিরোপা জেতা হয়নি, এবার সুযোগ আরও একবার পাওয়া গেলো। এই সুযোগটাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে কি?
জীবন: আমি একটা জিনিস বিশ্বাস করি, মানুষ পারে না এমন কোন জিনিস নাই। ওয়ার্ল্ড কাপ যারা জিতেছে, তারতো এলিয়েন নয়, আমাদের মতোই মানুষ। টুর্নামেন্টে ভালো খেলতে পারলে আমাদের সামনে সুযোগ থাকবে ট্রফিটা জেতার। গত বিশ্বকাপে আমি যতটা ভালো খেলেছি, এবার চেষ্টা থাকবে তারচেয়েও ভালো করার। কিভাবে কি করলে আমাদের টিমটা ভালো করতে পারে, সেবাই মিলে সেটাই করব। সবমিলিয়ে আমাদের শুরুটা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: বয়স ভিত্তিক ক্রিকেটে একদম শেষ ধাপে। এখানে ভালো করলে পরের ধাপগুলাতে যাওয়া সহজ হয়ে যায়। ব্যক্তিগতভাবে আপনার লক্ষ্য কী?
জীবন: আমি কিন্তু ইমার্জিং দলেও ছিলাম। গত দুই বছরই এইচপিতে ছিলাম। পরে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়েছিলাম ‘এ’ দলের হয়ে। এছাড়া ইমার্জিং এশিয়া কাপেও ছিলাম। তবে সাইড স্ট্রেইন ইনজুরির কারনে আমি যেতে পারিনি। আমি কিন্তু জাতীয় দলের ধারে কাছেই ছিলাম। এবারও লক্ষ্য থাকবে যেন ভালো খেলতে পারি। যদি সেটা সম্ভব হয়, সেক্ষত্রে জাতীয় দলে সুযোগ তৈরি হবে। সবার মতো আমার স্বপ্ন জাতীয় দলে খেলার। আমিও সেটাই চাই। আমি চাই কীভাবে পারফর্ম করে, কম বয়সে যত তাড়াতাড়ি জাতীয় দলে ঢোকা যায়।
একনজরে
পুরো নাম: শেখ পারভেজ রহমান
ডাক নাম: জীবন
জন্ম: ৮ অক্টোবর, ২০০৬
জন্মস্থান: বৈকালি, খুলনা
বাবা: শেখ রুস্তম
মা: পান্না বেগম
উচ্চতা: ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি
প্রথম ক্লাব: বেঙ্গল ক্রিকেট একাডেমি
বর্তমান ক্লাব: গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্স
প্রথম কোচ: দিবাকর রায়
বোলিং স্টাইল: অফ-স্পিন
বোলিংয়ের শক্তির জায়গা: ফ্লাইট ডেলিভারি
যুব ওয়ানডে: ২৭ ম্যাচে ২৭ উইকেট
লিস্ট ‘এ’: ৩২ ম্যাচে ৩৮ উইকেট
প্রথম শ্রেণী: ১২ ইনিংসে ৪ উইকেট
টি-টোয়েন্টি: ১১ ম্যাচে ১৮ উইকেট
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি
প্রিয় শটস: স্ট্রেট ড্রাইভ
যুব ওয়ানডে: ১৯ ইনিংসে ৩৩১ রান
লিস্ট ‘এ’: ২৫ ইনিংসে ৩৩৩ রান
প্রথম শ্রেণী: ১২ ইনিংসে ২৭৩ রান
টি-টোয়েন্টি: ৪ ইনিংসে ৩৬ রান
প্রিয় মানুষ: বাবা-মা
প্রিয় ক্রিকেটার: এবি ডি ভিলিয়ার্স, জেসন রয়, জস বাটলার ও সাকিব আল হাসান
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: এশিয়া কাপ জয়