লম্বা সময় ধরেই টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ফর্মের তুঙ্গে রয়েছে ভারত। সর্বশেষ দুই আসরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন তারা। দ্বিপাক্ষিক সিরিজেও তাদের পারফরম্যান্স দুর্দান্ত। [গুগল নিউজে বিডিক্রিকটাইম ফলো করুন]
ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২-২ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজ ড্র করে ভারত। ছবি : গেটি ইমেজসভারতের সিরিজ জেতার চেয়ে জয়ের ধরন নিয়েই প্রশংসা হচ্ছে বেশি। ২০২৪ থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঝে একটি সিরিজও হারেনি ভারত। ওপেনিংয়ে অভিষেক শর্মার ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিংয়ে ভালো শুরু পেয়ে গেলেই ম্যাচে জেতার প্রায় অর্ধেক কাজ সেরে ফেলে টিম ইন্ডিয়া। অভিষেকের সাথে এবার যুক্ত হয়েছেন বৈভব সূর্যবংশী। দুজনের ওপেনিং জুটিটাও জমে ক্ষীর। যে কারণে নিউজিল্যান্ড সিরিজে মাত্র ১৪ ওভারেই ১৯৯ রান তাড়া করে ফেলে ভারত। ওপেনিংয়ে এমন দুইজনের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের ফলে বাকিরাও বেশ সহজে ব্যাট করতে পারেন।
ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরও বেজায় খুশি দলের এমন পারফরম্যান্সে। ম্যাচ জেতার চেয়ে জেতার ধরনেই বেশি খুশি কোচ। জয়ের চেয়ে রাজত্ব দেখিয়ে জেতাতে বেশি তৃপ্তি গুরু গম্ভীরের।
নিউজিল্যান্ড সিরিজের পঞ্চম টি-টোয়েন্টি শেষে সংবাদ সম্মেলনে গৌতম গম্ভীর বলেছেন, ‘এই ছেলেরা শুধু সিরিজ জিতেছে তা নয়, আমার মনে হয় কন্ডিশনের সঙ্গে তারা যেভাবে মানিয়ে নিয়েছে এবং প্রথম তিনটি ম্যাচে যেভাবে নিষ্ঠুর (রুথলেস) ক্রিকেট খেলেছে, সেখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বিশেষ করে যখন প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ২২৬ রান তাড়া করতে হচ্ছিল, দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে আমরা যখন প্রায় ম্যাচ থেকে ছিটকে গিয়েছিলাম, তখন তিনজন তরুণ ক্রিকেটার আমাদের জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিয়েছে।’
গম্ভীর আরও জানিয়েছেন, ‘এরপর ১৯৯ রান তাড়া করতে নেমে ১৪ ওভারেরও কম সময়ে জেতা এবং মাত্র একটি অনুশীলন সেশন করেই প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়া, এগুলোই নিষ্ঠুরতা (রুথলেসনেস)। আমরা পরের দুটি ম্যাচও জিততে চেয়েছিলাম, কিন্তু কখনও কখনও সবকিছু আপনার পক্ষে যায় না। তাই আমার মনে হয়, সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, তারা কীভাবে চাপ সামলেছে, কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রথম তিন ম্যাচে কীভাবে নির্মম (রুথলেস) ক্রিকেট খেলেছে।’
ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর। ছবি : গেটি ইমেজসসিরিজটা ৩-২ ব্যবধানে জিতে নিয়েছে ভারত। কোচ বললেন, ‘আমরা যদি এই সিরিজ না জিততাম, তাহলে কেউ একটিমাত্র অনুশীলন সেশনের কথা বলত না। তখন সবাই বলত, “বিশ্বকাপের পর ভারতীয় দল কতটা বাজে খেলছে, সবকিছুই কীভাবে ভুল হচ্ছে!” এখানেই বাস্তবতা। ভারতে মানুষ শুধু ফলাফল দেখে, অন্য কিছু নয়, ব্যাপারটা কোনো গোপন বিষয় নয়। আমার কাজ হলো খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুত করা এবং তাদের মাঝে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া। কারণ নিউজিল্যান্ডের এই কন্ডিশনে আমি আগেও খেলেছি।’
গম্ভীর আরও বলেন, ‘তাই আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাদের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতা ও তথ্য ভাগাভাগি করা, তাদের মানসিকভাবে ভালো অবস্থায় রাখা এবং নিশ্চিত করা যে তারা যেন পুরোপুরি আক্রমণাত্মক থাকে। গত দুই থেকে আড়াই বছর ধরে আমরা এ ধরনের ক্রিকেটই খেলছি, উচ্চ ঝুঁকি, উচ্চ প্রাপ্তি (হাই রিস্ক, হাই রিওয়ার্ড)। আমরা ম্যাচ হারব, কখনও কখনও বড় ব্যবধানেও হারব। ভবিষ্যতেও এমনটা ঘটবে। কিন্তু আমাদের চিন্তাধারা ও দর্শনে কোনো পরিবর্তন আসবে না।’
২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবকে দল থেকে বাদ দেয় ভারত। নতুন অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ার। প্রথম ৭ ম্যাচে জয়হীন ছিলেন আইয়ার। প্রথম দুই ম্যাচ হারেন আয়ারল্যান্ডের কাছে। পরে ইংল্যান্ডের কাছে ৫ ম্যাচের মধ্যে ৪টিতেই হার, ১ ম্যাচ পরিত্যক্ত।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছে ভারত। ছবি : গেটি ইমেজসআইয়ারের অধিনায়কত্বেও বেশ খুশি প্রধান কোচ গম্ভীর। তিনি বললেন, ‘দেখুন, সে যখন দায়িত্ব নিয়েছিল, তখন তার হাতে ছিল অত্যন্ত সফল একটি টি-টোয়েন্টি দল। যে দল বিশ্বকাপ জিতেছিল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টানা দুই বছর কোনো সিরিজ হারেনি। আমার মনে হয় না বিশ্বের আর কোনো দল এমন কীর্তি গড়তে পেরেছে, টানা দুই বছর কোনো সিরিজ না হেরে বিশ্বকাপও জিতেছে।’
গৌতম গম্ভীর জানিয়েছেন, ‘অবশ্যই, আমাদের সামনে কঠিন প্রতিপক্ষও ছিল। বিশ্বকাপের পর আমরা ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিলাম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা অনেক নতুন খেলোয়াড়কেও সুযোগ দিয়েছি। বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের মতো জায়গায় খেলতে গেলে আমাদের অভিজ্ঞতার যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। তবে এটিও একটি দারুণ সুযোগ। পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য দল গড়ার চিন্তা করলে তরুণ খেলোয়াড়দের সুযোগ দিতে হবে এবং সফরে রেখেই তাদের গড়ে তুলতে হবে।’
প্রধান কোচ আরও বলেছেন, ‘কারণ, বিশ্বকাপের সময় আমাদের দলে যে অভিজ্ঞতা ছিল এবং বিশ্বকাপের পর বোলিং লাইনআপে যে ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল, তা প্রতিপক্ষের জন্য সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। আমার মনে হয়, এত অনভিজ্ঞ বোলিং লাইনআপ নিয়েও শ্রেয়াস অসাধারণ কাজ করেছে। কারণ, একজন অধিনায়ক ততটাই ভালো হবে যতটা তার বোলার ও ব্যাটাররা পারফর্ম করবে। বিশেষ করে অনভিজ্ঞ বোলিং আক্রমণ নিয়েও সে অসাধারণ দায়িত্ব পালন করেছে।’
অভিষেক শর্মার অফ স্পিনের বিপক্ষে দুর্বলতা নিয়েও কথা বলতে হয়েছে প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরকে। ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের সবচেয়ে বড় শক্তি অভিষেক শর্মা। শুরুতেই অভিষেকের টর্নেডো ব্যাটিং বেশিরভাগ ম্যাচেই ভারতকে এনে দেয় দুর্দান্ত শুরু। যা কাজে লাগিয়ে বড় বড় পুঁজি দাঁড় করায় টিম ইন্ডিয়া। অভিষেক শুরুতেই আউট হয়ে গেলে কিছুটা চাপে পড়ে যায় ভারত। ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামার ঘটনাও আছে। ফলে বর্তমান দলের বড় শক্তি অভিষেক শর্মার ব্যাটিং।
অনুশীলনে মেতেছিলেন ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর। ছবি : গেটি ইমেজসঅফ স্পিনের বিরুদ্ধে অভিষেকের দুর্বলতা নিয়ে গম্ভীর জানিয়েছেন, ‘হ্যাঁ, অভিষেক অফ স্পিনের বিপক্ষে সমস্যায় পড়েছে। এই জায়গায় যত উন্নতি করবে, সামগ্রিকভাবে সে তত ভালো খেলোয়াড় হয়ে উঠবে। নিজেকে উন্নত করতে হবে, কারণ প্রতিপক্ষ নিয়মিত আপনার খেলা বিশ্লেষণ করছে। আপনি কীভাবে ব্যাটিং করেন, কত রান করেন, কী গতিতে ব্যাট করেন, সবকিছুই তারা পর্যবেক্ষণ করে। তাই বিভিন্ন ধরনের বোলারের বিপক্ষে নিজের খেলার উন্নতি করতে পারলে আপনি প্রতিপক্ষের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকবেন।’
অফ স্পিন বা বাঁহাতি স্পিন যেসব স্পিনের বিপক্ষেই দুর্বলতা থাকুক, অভিষেককে সেসব কাটিয়ে ওঠার তাগাদা দিয়েছেন প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর। বর্তমান দুনিয়ায় ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স নিয়ে বিশ্লেষণ, কাটাছেঁড়া চলতেই থাকে। সেসব মনে করিয়ে দিলেন কোচ। সবকিছুকে জয় করেই অভিষেককে এগিয়ে যেতে হবে, সেসব নিয়ে অভিষেকের সাথে আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন গম্ভীর।
প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর বলেছেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলাম। প্রথম ম্যাচেও অফ স্পিনারের বিপক্ষে সে কিছুটা আটকে গিয়েছিল। তাই অফ স্পিন হোক কিংবা বাঁহাতি স্পিনার যখন তাকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছিল, বিষয়টি মূলত কৌশলগত ও টেকনিক্যাল কিছু ব্যাপার নিয়েই আমাদের আলোচনা হয়েছে।’
সর্বশেষ ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-২ ব্যবধানে ড্র করেছে ভারত। সিরিজ নির্ধারণী ৫ম টি-টোয়েন্টি বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়েছিল। এবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ৩-২ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছে ভারত। প্রথম ৩ ম্যাচে টানা জয়ের পর শেষ ২ ম্যাচে হেরেছে টিম ইন্ডিয়া। যদিও সিরিজটা তাদেরই থাকছে।