আল ফাহাদ। ফাহাদের জন্ম ফেনীতে। কিন্তু বাবার চাকরির কারণে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে এক শহর থেকে আরেক শহরে। একসময় মৌলভীবাজারে বদলি হন জাকির হোসেন। তখন ফায়াদ দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। ওই বছরই ২০১৬ সালে মৌলভীবাজার ক্রিকেট একাডেমিতে ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দেন জাকির। সেখান থেকেই জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে এগিয়ে চলা ফাহাদের। সব রকম সুযোগ-সুবিধা আর পারিবারিক সমর্থন পেয়েই তিনি নিজেকে গড়েছেন একজন সম্ভাবনাময় পেসার হিসেবে।
বাংলাদেশের তাসকিন আহমেদ, অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক ও প্যাট কামিন্স এই তিনজনের ভীষণ ভক্ত আল ফাহাদ। তাসকিনের লাইফস্টাইল, ফিটনেস আর নিজেকে মেইনটেইন করার ধরন ফাহাদকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে। অন্যদিকে, কামিন্সের আগ্রাসী অ্যাটিটিউড আর স্টার্কের ধারাবাহিকতা মুগ্ধ করে এই উদীয়মান পেসারকে। তিনজনের আলাদা আলাদা গুণ থেকেই শেখার চেষ্টা করেন তিনি। তাঁদের থেকেই প্রেরণা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন নিজের স্বপ্নপূরণের পথে যুব দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পেসার।
অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৫ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বিডিক্রিকটাইমে। আজ থাকছে পেসার আল ফাহাদের সাক্ষাৎকার।
প্রশ্ন: এশিয়া কাপ মিস করাটা কতটা হতাশারা, এরপর ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা, সবমিলিয়ে কেমন লাগছে?
ফাহাদ: আলহামদুলিল্লাহ ভালো লাগছে। হতাশার কিছু নেই। যা হয় ভালোর জন্য হয়। ইনজুরির কারনে মাঠের বাইরে থাকাটাও আমার জন্য ইতিবাচক শিক্ষা। এমন একটা মঞ্চে খেলতে যাচ্ছি, সেখানে সবার চোখ থাকবে। চেষ্টা করবো সর্বোচ্চটা নিয়ে শিরোপা জেতার।
প্রশ্ন: আচ্ছা একটা বিষয়, আপনার জন্ম ফেনীতে। বাবা চাকরী করে চট্টগ্রামে। কিন্তু পরিবার থাকে মৌলভীবাজার। বিষয়গুলো ব্যাখা করবেন?
আল ফাহাদ: আমার বাবা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে সরকারি চাকরি করে। ফলে দেশের বহু জায়গাতেই আব্বার চাকরি করতে হয়েছে। আমি যখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি, তখন আব্বু মৌলভীবাজারে বদলি হন। যদিও এখন আছেন চট্টগ্রামে। তবে আমাদের বাসা মৌলভীবাজারে। আমার দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে এখানেই পড়ালেখা, খেলাধুলা সবকিছু। ফেনীতে আমার জন্ম হলেও মৌলভীবাজার নিজের জেলাই হয়ে গেছে!
প্রশ্ন: ক্রিকেটে এলেন কীভাবে?
ফাহাদ: ছোটবেলায় আব্বুর হাত ধরেই ক্রিকেটে নাম লেখানো। আমার আব্বা-আম্মা চাইতো আমি ক্রিকেটার হই। আমাদের পরিবারের সবাই ক্রিকেট খুব পছন্দ করে। একসাথে বাসায় আয়োজন করে আমরা প্রায়ই খেলা দেখার অভ্যাস ছিল। যেহেতু পরিবারের সবাই খেলা পছন্দ করেন, সেই কারনে আমার ক্রিকেট খেলা নিয়ে কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি।
প্রশ্ন: ক্রিকেট বলে শুরুটা কীভাবে?
ফাহাদ : ২০১৬ সালে আব্বা আমাকে মৌলভীবাজার ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন। ওখানে ট্রায়ালে আমি টিকে যাই, এরপর ওখান থেকেই শুরু হওয়া আমার ক্রিকেটে বলে ক্রিকেট শেখার মিশন। মৌলভীবাজার জেলার হয়ে আমি প্রথমবার অনূর্ধ্ব-১২ খেলার সুযোগ পাই। এরপর আস্তে আস্তে অনূর্ধ্ব-১৪, অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৮ খেলি।
প্রশ্ন: ২০২৩ সালে নাকি ক্রিকেটাই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কেন?
ফাহাদ: তিন বছর আগে ইনজুরির কারনে আমি অনূর্ধ্ব-১৮ বিভাগীয় দলে এক ম্যাচ খেলতে পারি। ২০২৩ সালে ইনজুরির কারনে ছিটকে যাই। যার কারনে ওয়াইসিএলে অনেকদিন খেলতে পারিনি। তখন একবার মনে হয়েছিল, আমাকে দিয়ে আর হবে না। একটু আফসেট ছিলাম। তবে পরিবার ও কোচদের কারনে সেখান থেকে বের হতে পারি।
প্রশ্ন: কোচদের ভূমিকার কথা বলছেন, কারা ভূমিকা রেখেছেন?
ফাহাদ: প্রথমেই পেয়েছি মৌলভীবাজারের মো. রাসেল আহমেদ স্যারকে। উনি আমার জেলার কোচ ছিলেন। এরপর পেয়েছি নাজমুল হোসেন স্যারকে। এখন কাজ করছি ডলার স্যারের সঙ্গে। প্রতিটি কোচই আমাকে খুব সহায়তা করেছেন। তাদের অবদান ছাড়া এতদূর আসা সম্ভব হতো না।
প্রশ্ন: বাবাতো থাকে চট্টগ্রামে, মায়ের অবদান নিশ্চয়ই অনেক?
ফাহাদ: অবশ্যই। মায়ের অবদান কম না। চাকরির কারনে বাবা যখন ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন মাইতো আামর সবকিছু দেখা শোনা করেছেন। সংসার সামলানোর পাশাপাশি আমাকে নিয়ে দিনের বড় একটা সময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছে মাকে। আমি আসলে পুরো পরিবারের সহায়তাই পেয়েছি।
প্রশ: পেসার হওয়ার পেছনে সিলেটি পেসারদের আধিপত্য, এটা কি কোন ভাবে প্রভাবিত করেছে?
ফাহাদ: আমি আসলে পেসার যখন হয়েছি, এগুলো কিছু বুঝতাম না। প্রথম থেকেই এমনি বল করতাম হাত ঘুরিয়ে। বল করতে করতে পেসার হয়ে গেছি। বোলিংটাও ভালো করতাম। সবাই প্রশংসা করতো। সবকিছু মিলিয়ে আসলে পেসার হয়ে উঠা।
প্রশ্ন: একসাথে তিনজন পেসার আপনার আইডল—তাসকিন আহমেদ, মিচেল স্টার্ক ও প্যাট কামিন্স। আলাদা করে বলবেন, কেন তারা আপনার প্রিয়?
ফাহাদ: মিচেল স্টার্কের ধারাবাহিকতা আমার খুব ভালো লাগে, বিশেষ করে তার বোলিংয়ের আগ্রাসী মনোভাব। প্যাট কামিন্সকে পছন্দ করি তার অ্যাটিটিউড, মাঠে ওনার উপস্থিতি, বোলিং-ব্যাটিং সবকিছুই দারুণ লাগে। তিনি লোয়ার মিডল অর্ডারে যেভাবে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাটিং করেন, সেটাও অনুপ্রেরণা। আর তাসকিন ভাই তো আমার ছোটবেলা থেকেই ফেভারিট। অন দ্য ফিল্ড হোক কিংবা অফ দ্য ফিল্ড উনার সবকিছুই ভালো লাগে। নিজের ফিটনেস, লাইফস্টাইল আর যেভাবে নিজেকে মেইনটেইন করেন, তা আমার জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা।
প্রশ্ন: দুই বছর ধরে দলটা প্রস্তুত হচ্ছে? অনেকগুলো ম্যাচ খেলেছেন আপনারা, প্রস্তুতি কেমন?
ফাহাদ: প্রস্তুতি আসলে আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো। আমরা অনেক ভালো শেপে আছি। সবাই লাস্ট দুই বছরে আমরা অনেক সিরিজ খেলছি, অনেক ম্যাচ খেলছি, আমাদের প্র্যাকটিসে অনেক হার্ড ওয়ার্ক করছে সবাই কোচিং স্টাফ, প্লেয়াররা। তো প্রস্তুতি আলহামদুলিল্লাহ ভালোই হইছে।
প্রশ্ন: প্রথম ম্যাচটা ভারতের বিপক্ষে, শুরুতেই কঠিন প্রতিপক্ষ, কতটা চ্যালেঞ্জ হতে পারে?
ফাহাদ: কঠিন বলতে চ্যালেঞ্জিং হবে একটু। আমি ব্যক্তিগত ভাবে চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি, উপভোগ করি। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে বাড়তি কিছু ভাবছি না। আমাদের নরমাল যে প্ল্যান আছে, ওইটা দিয়ে ই থাকবে। ইনশাল্লাহ ভালো কিছু হবে। সবাই অনেক আত্মবিশ্বাসী।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপে আপনার লক্ষ্য কী?
ফাহাদ: চেষ্টা করব যেন বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি বোলার হতে পারি। প্রতিটি ম্যাচেই ডমিনেট করে খেলাই আমার লক্ষ্য।
প্রশ্ন: লিস্ট ‘এ’ ও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে সিনিয়রদের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ফাহাদ: সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, অনূর্ধ্ব-১৯ লেভেল আর উপরের লেভেলের মধ্যে পার্থক্যটা মূলত মানসিকতায়। অনেক কিছু শিখেছি, যা বিশ্বকাপে কাজে দেবে ইনশাআল্লাহ।
একনজরে
নাম: মোহাম্মদ আল ফাহাদ
ডাক নাম: ফাহাদ
জন্ম : ২০ অক্টোবর ২০০৬
জন্মস্থান: দাগনভূঞা, প্রতাপপুর ইউনিয়ন, ফেনী
বাবার নাম: জাকির হোসেন
মায়ের নাম: নাসিমা আখতার
উচ্চতা: ৬ ফিট ২ ইঞ্চি
পড়াশোনা: অনার্স প্রথম বর্ষ
প্রথম ক্লাব: মৌলভীবাজার ক্রিকেট একাডেমি।
বর্তমান ক্লাব?: শাইনপুকুর।
প্রথম কোচ: মো: রাসেল আহমেদ
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি
প্রিয় শট: পুল।
বোলিং স্টাইল: ডান হাতি পেসার
প্রিয় ডেলিভারি: ইয়র্কার
যুব ওয়ানডেতে উইকেট: ২২ ম্যাচে ৪৩ উইকেট
লিস্ট ‘এ’: ১০ ম্যাচে ৭ উইকেট
টি-টোয়েন্টি: ১ ম্যাচে ১ উইকেট।
প্রিয় মানুষ: আমার পুরো পরিবার
প্রিয় ক্রিকেটার: মিচেল স্টার্ক, পাট কামিন্স ও তাসকিন আহমেদ
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন।
স্কুল ক্রিকেট: মৌলভীবাজার গভ: হাই স্কুলের হয়ে এক ম্যাচ