বিপিএলে থাকবে খুলনা বিভাগের ক্রিকেটারদের আধিপত্য!

জাতীয় ক্রিকেট লিগ, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ থেকে শুরু করে জাতীয় দল পর্যন্ত খুলনা বিভাগের ক্রিকেটারদের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। বিপিএলের ৬ষ্ঠ আসরেও খুলনা বিভাগের ক্রিকেটারদের ওপর স্পটলাইট থাকবে।

প্রতিশ্রুত জমি পাচ্ছেন মিরাজ
খুলনার ছেলে মিরাজ বিপিএল খেলবেন রাজশাহীর হয়ে

বাংলাদেশ ক্রিকেটের শুরু থেকেই জাতীয় দলে রয়েছে খুলনা বিভাগের ক্রিকেটারদের আধিপত্য। হাবিবুল বাশার সুমন, মাশরাফি বিন মুর্তজা, আব্দুর রাজ্জাক, সাকিব আল হাসান থেকে শুরু করে মুস্তাফিজুর রহমান, মেহেদী হাসান মিরাজ, সৌম্য সরকারদের ক্রিকেটে হাতেখড়ি এই খুলনা বিভাগের আনাচে কানাচেতেই।

এছাড়া সৈয়দ রাসেল, মানজারুল ইসলাম রানা (মৃত), মঞ্জুরুল ইসলাম, তুষার ইমরান, ইমরুল কায়েস, এনামুল হক বিজয়, রুবেল হোসেন, নুরুল হাসান সোহান, জিয়াউর রহমান, রবিউল ইসলাম, আল আমিন হোসেন, মোহাম্মদ মিঠুনরা সবাই পরীক্ষিত ক্রিকেটার যাদের ছেলেবেলাও কেটেছে খুলনা বিভাগের কোনো না কোনো শহর বা গ্রামে।

Advertisment

জাতীয় দলের হয়ে এই বছরই টি-টোয়েন্টি অভিষেক হওয়া অলরাউন্ডার আফিফ হোসেন ধ্রুব ও মেহেদি হাসানের ঠিকানাও সেই খুলনা বিভাগ। খুব বেশি ম্যাচ খেলে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ এইবার না পেলেও সামনে দেশের জন্য অবদান রাখার অপার সম্ভাবনা আছে আফিফ ও মেহেদির।

খুলনার ক্রিকেটাররা যে শুধু জাতীয় দলে সুযোগ করে নেয় তাই-ই কিন্তু নয়। জাতীয় দলে তাদের পারফরম্যান্সও সব সময় উপরের দিকেই থাকে। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা অধিনায়ক হাবিবুল বাশার, মাশরাফি, সাকিবরা সবাই খুলনা বিভাগের সন্তান।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের এগিয়ে যাওয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল হাবিবুল বাশার জাতীয় দলের অধিনায়ক থাকাকালীন আর এই পর্যন্ত  বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাস দেখলে তার স্বর্ণযুগ কাটছে মাশরাফি-সাকিবদের অধিনায়কত্বের সময়ে। দেশসেরা পেসার, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারও কিন্তু এই তাঁরাই। অভিষেকেই ক্রিকেট বিশ্বে আলোড়ন তুলেছেন মোস্তাফিজুর রহমান- মেহেদী হাসান মিরাজরা। অভিষেকেই দারুণ ব্যাটিংয়ে ভক্তদের নজর কেড়েছিলেন সৌম্য সরকার-এনামুল হক বিজয়রা।

খুলনা বিভাগের এই সাফল্যের কারণ জানতে চাওয়া হলে সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন একদিন বলেছিলেন,

“‘আসলে নির্দিষ্ট কারণ বলা মুশকিল। ক্রিকেটার তৈরিতে এখনকার মাটি বোধ হয় উর্বর! অন্য বিভাগের তুলনায় খুলনা বিভাগের ক্রিকেট অবকাঠামো খুব যে উন্নত, তা বলা যাবে না। তবে খুলনা বিভাগ থেকে এত খেলোয়াড় উঠে আসার পেছনে দুটো কারণ বলা যেতে পারে, সবাই ভীষণ পরিশ্রমী এবং প্রতিভাবান। মফস্বল বা গ্রামীণ পর্যায়ে প্রচুর ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। সেটা টেপ টেনিসে হোক কিংবা অন্য বলে। সেখানে জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড়ও খেলেছে। এর বাইরে আরও একটি ব্যাপার রয়েছে। প্রায় প্রতিটি জেলাতেই দুই-একজন জাতীয় দলের খেলোয়াড় আছে। ফলে সেসব জেলার খুদে ক্রিকেটাররা আদর্শ হিসেবে নিজের এলাকারই কাউকে বেছে নিতে পারছে। ওই খেলোয়াড়ের পর্যায়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।”

খুলনা বিভাগের ক্রিকেটারদের নজরকাড়া পারফরম্যান্স সম্পর্কে খুলনার সন্তান ও দেশের অন্যতম সফল স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন,

“খুলনা অঞ্চলের খেলোয়াড়েরা মন খুলে খেলে ছোটবেলা থেকে। বাড়তি কোনো চাপ নেয় না। জাতীয় দলে খেলতে হবে বা অনেক কিছু করতে হবে, এমন চিন্তা খুব একটা কাজ করে না ভেতরে। এভাবে খেলতে খেলতে একদিন ঠিকই জাতীয় দলে খেলে ফেলে! তা ছাড়া এ অঞ্চলে প্রচুর খেলা হয়। বেশির ভাগ ফাইভ স্টার, টেনিস বা টেপ টেনিস বলে। এ টুর্নামেন্টগুলো খুবই প্রতিযোগিতামূলক। এখানকার বয়সভিত্তিক ক্রিকেট আগের তুলনায় অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। বিভাগীয় দলে সুযোগ পাওয়া অনেক কঠিন। এমনকি জাতীয় লিগে বিভাগের সেরা একাদশ নির্বাচনও অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়।”

খুলনা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও যুগ্ম সম্পাদক শেখ নিজাম উদ্দিন বিসিবিরএ সাবেক পরিচালক ছিলেন। খুলনা বিভাগের ক্রিকেট সম্পর্কে তাঁর মতামত, “এ অঞ্চলের কিছু কোচ ও সংগঠকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাঁরা অনেক খেলোয়াড় তৈরি করেছেন।

তাছাড়া এ বিভাগে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটকে ভীষণ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে ভীষণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় খুলনা বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে। প্রতিটি জেলা চায়, নিজেদের খেলোয়াড় যেন বিভাগীয় পর্যায়ে সুযোগ পায়। বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচিতে বেশ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রতিভা তুলে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কিছু কার্যকরী উদ্যোগের কথাও বলতে হবে।

খুলনা বিভাগকে সফল ক্রিকেটার তৈরির কারখানা বললে দ্বিমত হওয়ার মতো মানুষ খুব একটা পাওয়া যাবে না। খুলনা বিভাগের এই সাফল্য তো বাংলাদেশেরই সাফল্য।

-লিখেছেন তাহসিনা জামান অয়নী