Scores

বিশ্বকাপজয়ী আকবরদের পেছনের গল্প শোনালেন মাসুদ হাসান

বিশ্বের বুকে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ায় যে, সেইতো বীর। এমন বীরদের হাত ধরেই আজ বিশ্বজয় বাংলাদেশের। লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা ছিনিয়ে এনেছে বাংলাদেশের যুবারা। যে দলের ৭ জন ক্রিকেটারের বেড়ে উঠা বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি)। সেই সাত ক্রিকেটারের গল্প শোনালেন প্রতিষ্ঠানটির ক্রিকেট কোচ মাসুদ হাসান।

হাসান মাসুদ-বিকেএসপি’র কোচ

বাংলাদেশের যাবতীয় খেলাধুলার সিংহভাগ খেলোয়াড়ই যোগান দিয়ে থাকে বিকেএসপি। ক্রিকেটেও এ সংখ্যা নেহায়েত কম না। সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, সৌম্য সরকাররা এ প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি হয়েই পেয়েছেন জাতীয় দলের টিকিট। সেই বিকেএসপি থেকে এবার ৭ জন ক্রিকেটার সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। তাদের হাত ধরেই প্রথমবারের মত বিশ্বজয় বাংলাদেশের।

Also Read - বিশ্বকাপে বল ‘না পাওয়া' শাহাদত আলো ছড়ালেন বিকেএসপিতে


এই সাত ক্রিকেটারের কয়েকজন আবার সুযোগ পেয়েছেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দু’দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে। ভেন্যু হিসেবে পেয়েছেন নিজেদের ঘরের মাঠ বিকেএসপি। বিশ্বজয়ী শিষ্যদের খেলা নিজ চোখে দেখতে হাজির হয়েছিলেন হেড কোচ। ১২ বছর বয়স থেকে গড়ে তোলা আকবর আলী, শামিম পাটোয়ারি, মাহমুদুল হাসান জয়, পারভেজ হোসেন ইমন, হাসান মাহমুদ ও তানজিদ হাসান সাকিবদের নিয়ে উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না মাসুদ হাসানের।

আকবরদের বেড়ে উঠা, তাদের ক্রিকেট জ্ঞান, তারকা হয়ে উঠা, বিশ্বকাপ জয়, এমনকি জাতীয় দলের সুযোগ পাওয়ার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বললেন মাসুদ হাসান। এক সাক্ষাৎকারে শিষ্যদের নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলে বিষদ জানিয়েছেন তিনি। পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো মাসুদ হাসানের সাক্ষাৎকারটি।

প্রশ্ন: ফাইনাল ম্যাচের দিন কোনো টেনশন কাজ করেছে?

মাসুদ হাসান: টেনশনতো কাজ করছিল যে কি হতে যাচ্ছে। কারণ এরকম ম্যাচ তো আমরা অনেকদিন ধরে ভুগে আসছি, পোড় খাওয়া। নাম বলছি আরকি সৌম্য সরকার এরকম ছিল। একটা ম্যাচ ছিল প্রিমিয়ার লিগের, তখন প্রিমিয়ার লিগে বিকেএসপি ছিল। মোহামেডানের সাথে প্রায় জেতা ম্যাচ সে ম্যাচটা হারছি। প্রিমিয়ার লিগে বগুড়া স্টেডিয়ামে খেলা, ঢাকার খেলা বগুড়ায় শিফট হয়েছিল আরকি। ওখানে খেলা হচ্ছিল জেতা ম্যাচটা হারাইছে। মানে কি বলবো আর এই যে পোড় খাওয়াটা, প্রতিনিয়তই অভ্যস্ত আমরা।

আর এই ম্যাচতো আসলে ওরকমই। দোদুল্যমান একটা পরিস্থিতি কি করে না করে! মানে আত্মবিশ্বাস ছিল যে হ্যা আমরা জিততে পারবো। কিন্তু তারপরও কি হয় বলা যায়না কারণ একটা ভুল সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড়টা ঘুরিয়ে দিতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত আকবর আলী স্ট্রাইকে ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত আত্মবিশ্বাস ছিল এরকম কিছু ঘটবেনা। আকবর স্ট্রাইক না নিলেই একটা ভয় কাজ করে। আবার ও যখন স্ট্রাইক পায় মনে হয় সব ওকে।

প্রশ্ন: জয়ের পর উদযাপন কেমন ছিল আপনাদের?

মাসুদ হাসান: উদযাপন বলতে মহাপরিচালক (বিকেএসপি) থেকে সবাই খুশি। সবাই বলছে যে আমরা তাদের একটা অভ্যর্থনা দিবো কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ছেলেদেরকে এরকমভাবে আসলে কাছে পাচ্ছিনা। এই যে এটায় (জিম্বাবুয়েত বিপক্ষে চলমান প্রস্তুতি ম্যাচ) যারা যারা খেলছে এদের পাচ্ছিনা বলেই আয়োজন করতে পারছিনা। মহাপরিচালক নিজেই অভ্যর্থনা দেওয়ার জন্য বিকেএসপির পক্ষ থেকে চাইছে। আসলে আমাদের এটাতো আবাসিক প্রতিষ্ঠান, আবাসিকের ছেলেরা আছে, এরা আকবর আলীদের মাঠের পাশ দিয়েই ট্রেনিং করার সময় যেত। এখনতো নতুন আকবর আলীদের দেখবে।

প্রশ্ন: শিরোপা জয়ের পর কথা হয়েছে ওদের সাথে?

মাসুদ হাসান: ফোনে কথা হয়েছে আকবর আলীর সাথে। অন্যরাও যারা আছে দেশে ফিরে বাড়িতে যাওয়ার সময় কথা হয়েছে, বললো বাড়িতে যাচ্ছি। আমি বললাম যাও এখন বাড়িতে যাও। ঢাকার পর্ব শেষ করে এখন বাড়িতে যাও।

প্রশ্ন: কাদের মধ্যে বড় খেলোয়াড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে?

মাসুদ হাসান: আছে বড় খেলোয়াড় যেমন স্বীকার করতেই হয় আকবর আলীর কথা। আশা করি সে ভালো লেভেলের প্লেয়ার হবে। পাশাপাশি সবাই যেহেতু ছাত্র, সবাইতো চিন্তা করে, স্যারতো মনে হয় আমাকে ওই (ভালো) দৃষ্টিতে দেখেনা। দৃষ্টি কিন্তু আছে যেমন মাহমুদুল হাসান জয়ের কথা যদি বলি, তারও একটা ভালো ভবিষ্যৎ আছে। ভালো লেভেলের খেলোয়াড় সে। শামীম পাটোয়ারির কথা যদি বলি, সেও ভালো। কিন্তু তার গাইডটা বেশি দরকার। মানসিক দিক যেটা, মাহমুদুল হাসান জয়ের রয়েছে। তবে তার (শামীম) মানসিক সামর্থ্য কিন্তু এক না। মাহমুদুল হাসানকে যতটুকু দিক নির্দেশনা দেওয়া দরকার, তার চাইতে বেশি শামীমের দরকার। এটা একটা বিষয়।

এই যে একেকটার মধ্যে একেকটা, মানে এদের মধ্যে পার্থক্য এখানেই। তারা ভালো পারফর্মার বলেই আজকে এখানে স্বীকৃতিটা পেয়েছে। আজকে এই লেভেলটা তারা অর্জন করেছে। কিন্তু ওই পার্থক্যটা যেখানে রয়েছে সেখানে কর্তৃপক্ষ বা আমরা যারা কোচ রয়েছি বা এধরণের দিক নির্দেশক রয়েছি তাদের নজর দেওয়ার দরকার যে এটা কীভাবে কমানো যায়। এই পার্থক্যগুলো যদি আমরা নিদারুণ করতে পারি, এর মধ্য থেকে ৪ থেকে ৫ জনতো উপরের পর্যায়ে খেলবেই।

প্রশ্ন: কবে থেকে কোচিং করান?

মাসুদ হাসান: ১৯৯৮ সাল থেকে। বিকেএসপিতে ২২ বছর বলতে পারেন। আসলে ওইটাইতো তখন পরিচয়টা বহন করে। কাজটা যিনি বা যারা কাজ করেছেন তাদের কাজটা সঠিক ছিল কিনা ফলাফলই বলে দেয়। অর্থাৎ যুদ্ধের ফলাফলই বলে দেয় কার কি রকম অবস্থান। তাইনা? সেরকম একটা, ওদের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, ওরা দেখিয়ে দিয়েছে বা মানুষ মেনে নিয়েছে যে ইয়েস বিকেএসপিতে ওরকম ধরনের কাজ করছে যেটা প্রত্যাশা যেরকম ছিল সে অনুযায়ী তারা সার্ভিসটা দিচ্ছে বা ফুলফিল করেছে এরকম একটা কিছু।

প্রশ্ন: ওদের শুরুর সময়টা নিয়ে বলুন…

মাসুদ হাসান: বিকেএসপিতে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়েছে আকবর আলী। ২০১২ তে ভর্তি হয়েছে তারা, ১৩ পর্যন্ত ছিল দিনাজপুরে। ওখানে ক্লাস সেভেন শেষ করে তারপর থেকে এখানে। এখন এখানে রয়েছে, এরপরে অনূর্ধ্ব-১৬ খেলল অনূর্ধ্ব-১৮ খেললো। তারপরে তো পৌঁছে গেল জায়গামত, এখনতো আর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নাই।

প্রশ্ন: ভর্তির পরই কি ওদের ব্যাটিং, বোলিং আলাদা করেছেন?

মাসুদ হাসান: ভর্তির সময়তো ওইভাবেই হয়েছে। এখানেতো আর বাড়তি কিছু হয়না! যেমন আমিনুল ইসলাম বিপ্লব, এর কথাটা বলি। এ কিন্তু মূলত ব্যাটসম্যান, আমরা ওকে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবেই যুক্ত করেছি। ওয়ান ডাউন বা এরকম খেলানো। কিন্তু মাঝে মধ্যে সে লেগ স্পিন করতো। এ অর্জনটা কিন্তু তার নিজের। সে যতক্ষণ করতো নিজে থেকেই করতো, আমরা কিন্তু শিখাইনি যে এভাবে বল গ্রিপ করো।

মাহমুদুল হাসান জয় আছে। ও কিন্তু ভালো অফ স্পিন করে। শামীম হোসেন অফ স্পিনার, এগুলো নিজের অর্জন ওদের। আমরা কিন্তু মূল ফোকাসটা কিন্তু ব্যাটিংয়ে দিয়েছি। বিপ্লবের বিষয়টা, লেগ স্পিনের। ও যখন সিলেক্ট হল জাতীয় দলে, সাংবাদিকরা সব ফোন করেছে কি ব্যাপার লেগ স্পিনার কীভাবে হল? (হাসি)।

প্রশ্ন: আকবরের মানসিকতাটা (লড়াই করার) কি শুরু থেকেই এমন ছিল?

মাসুদ হাসান: প্রথম থেকে এরকম। এ জন্যইতো আমি বিসিবিতে নক করেছি যে অনূর্ধ্ব-১৯ এ ঢুকানোর জন্য। আরও দুই একজনতো ছিল। ওরাও টেকনিক্যালি সাউন্ড, ভালো পারফর্ম করতে পারে। কিন্তু আকবর আলী যে গুনটা আছে, পার্থক্য যেটা আছে বললাম আকবর আলীর মত মানসিক লেভেল ওদের নাই। যে কারণে আমি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করেছি, নক করেছি দলে ওকে ঢুকানো যায় কিনা।

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
Tweet 20
fb-share-icon20

Related Articles

সাকিবের অর্জন ‘গল্প’, আকবরদের অর্জন ‘গর্ব’

বিশ্বকাপে বল ‘না পাওয়া’ শাহাদত আলো ছড়ালেন বিকেএসপিতে

বড় ভাইয়ের আত্মত্যাগে আজকের মাহমুদুল হাসান

এই বিশ্বকাপ সাকিব-তামিমদের ‘প্রেরণা’ হিসেবে কাজ করবে

এতো বড় অভ্যর্থনা কল্পনাতেও ছিল না বিশ্বকাপজয়ী দলের