Scores

মতামতঃ ঘোলা করে জল না খাওয়ার অনুরোধ

ছবিঃ Rediff.com

গাধা জল ঘোলা করে খায়।

প্রিয় পাঠক,

প্রথমেই আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। দুঃখ প্রকাশের কারণ এই- আর্টিকেলটির প্রথম লাইন হিসেবে আমি যে প্রবাদটি ব্যবহার করেছি তা বা তদসংশ্লিষ্ট ব্যাপারস্যাপার আপনারা আর্টিকেলের একদম শেষ প্যারার আগের প্যারায় না গেলে পাবেন না।

Also Read - 'ভুল শুধরে মূল পর্বে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ'


এবার আমার গল্প শুরু করা যাক। অনুরোধ, আর্টিকেলটিকে আপনারা গল্প হিসেবেই নেবেন।

ক্রিকেটারদের কাজ আমার আম্মু কিংবা আপনার আম্মুর মতো।

আমার আম্মু প্রতিদিন আমার জন্য মজার মজার খাবার রান্না করেন, প্রমাণস্বরূপ দাঁড় করানো যেতে পারে আমার মোটাসোটা ভুঁড়িটাকে। যখন যা খেতে চাই, তা-ই পরের বেলা খাবার টেবিলে পাই (এবং ইদানীং পাই বা পাচ্ছি ইফতার/সেহরির টেবিলে)। যেদিন কোনো কারণে রান্নাটা আমার পছন্দ হয় না, সেদিন আম্মুর উপর রাগ দেখাই, অভিমান করি, ক্ষোভ প্রকাশ করি। একই কাজ আপনিও করেন। আমার জন্য আম্মু এত কষ্ট করে গরমের মধ্যে রোজা রেখে চুলোর তাপে ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে যে রান্না করলেন, এজন্য আম্মুকে কখনও থ্যাংকস দেওয়া হয় না। ভুল পেলে কেবল ক্ষোভটা প্রকাশ করা হয়।

তবুও হাসিমুখে পরের বেলা রান্না বসান আম্মু। উদ্দেশ্য- ছেলের মুখে হাসি ফোটানো। মাশরাফি যখন ঊরুর নিচ থেকে পুঁজ জাতীয় তরল পদার্থ ইয়া মোটা এক সূচ দিয়ে বের করে আবারও দৌড়াচ্ছেন ২২ গজের দিকে, তখন তারও উদ্দেশ্য কিন্তু এটাই- আমাদের মুখে হাসি ফোটানো। আল্লাহর রহমতে মাশরাফির অর্থকড়ির অভাব নেই এবং তিনি যে টাকার জন্য খেলছেন না এটা একটা শিশুও বোঝে। আপনার-আমার আম্মুর আদর্শ বড় ছেলের ভূমিকায় নড়াইল এক্সপ্রেসকে দাঁড় করালে, খুব বড় অপরাধ করবো আমি? যদি না করে থাকি, তাহলে আমরা নাহয় তার ছোটভাই-ই সাজলাম। মায়ের মতো থ্যাংকসলেস জব করা বড়ভাইকে আমরা যখন থ্যাংকস দিচ্ছি না, অন্তত ভালোবাসা দেই। অথবা, অন্তত ঘৃণা না করি।

আমি সাজিয়ে-গুছিয়ে লিখতে পারি না। কীভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছিলাম না। তবুও এতক্ষণে যারা বোঝে গেছেন- আমার লেখার টপিক ক্রিকেটারদের সমর্থন সম্পর্কিত, তাদেরকে ধন্যবাদ।

আমি মানুষ খুব একটা ভালো নই। এজন্য হয়ত আর্টিকেলটিতে আমার অতি-ব্যক্তিগত অনেক কথাবার্তা ঢুকিয়ে দিবো। দুঃখ প্রকাশ করলাম দ্বিতীয় দফায়।

প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টারস এসোসিয়েশনের সাথে যুক্ত আছি। বিডিক্রিকটাইম-এর সাথে যুক্ত আছি প্রায় তিন বছর হল। আমি ক্রিকেট সম্পর্কে খুবই স্বল্প জ্ঞান রাখি। যেহেতু আমার উঠাবসা ক্রিকেট মাখিয়ে ভাত খাওয়া দুটি কমিউনিটির সাথে, সে হিসেবে প্রায়ই আমার চোখে আসে সমর্থকদের কটূক্তি। কানে আসে না, চোখেই আসে। ভাগ্যিস। নাহলে মারপিট করে এতদিনে জেল খাটার রেকর্ড হয়ে যেত! চর্মকার আমাদের জুতোর ছেঁড়া চামড়া আপনার-আমারও আগে দেখতে পান। আইনজীবী হাসিখুশি পরিবেশেও ঝামেলা খুঁজে বের করতে পারেন। ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড অনুষ্ঠানের বেয়ার গ্রিলস খুব সহজেই প্রোটিনের অস্তিত্ব টের পান। একইভাবে, সমর্থকদের কটূক্তি আমাদের কানে তথা আমার কানে আগেভাগেই চলে আসে। ভুল বললাম- কানে নয়, চোখে! কানে আসলে তো এতদিনে জেল খাটার করুণ অভিজ্ঞতা থাকত!

বাংলাদেশ কোনো ম্যাচে হারলেই নেতিবাচক মন্তব্য আকাশে-বাতাসে উড়তে দেখি। ‘আকাশে-বাতাসে’ এবং ‘উড়তে’ শব্দ তিনটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হলেও, যা বোঝানোর তা সার্থকভাবেই বোঝাচ্ছে বলে আশা করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বলতে এখন তো আর শুধু ফেসবুককে বোঝায় না। অনলাইন টেলিভিশন আছে, ইউটিউবে স্ট্রিমিং আছে, টুইটার আছে, আছে আরও কতকিছু। আমাদের দেশে মেগাবাইট-গিগাবাইট সস্তা না হলেও ইন্টারনেট প্যাক কিনতে আমরা কার্পণ্য করি না। যার কারণে ক্রিকেট মাঠে পান থেকে চুন খসলেই সবার আগে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং সেখানে ক্রিকেটারদের পারফরমেন্স, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, স্ত্রী, বাচ্চাকাচ্চার নামের পোস্টমর্টেম করি। কী জঘন্য একটা ব্যাপার! আরও ভয়ংকর হচ্ছে খোলস পাল্টানো। ম্যাচ হারলে আমাদের যে চেহারা, ম্যাচ জিতলে সেটা পুরো পাল্টে যায়, একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে যায়। এতে আমরা ‘সমর্থক’ নাম লাগিয়ে চলা জঘন্য লোকগুলোকে চিনতে পারি না।

‘সমর্থন’ একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘Support’। আমি যেকোনো বিষয়েই খুব কম জানি এবং এজন্য ডিকশনারির সাহায্য নিয়ে দেখলাম, সমর্থন শব্দের অর্থ হচ্ছে সহায়তা, অবলম্বন, ভারবহন, পক্ষাবলম্বন, ভরণপোষণ, পৃষ্ঠপোষণ, আনুকূল্য, আশ্রয়, ঠেস দেওয়া, সহ্য করা ইত্যাদি। আমি আর্টিকেল লেখা শুরু করার পর ডিকশনারি খুলেছি এবং লেখার এই পর্যায়ে অনেক খুশি এই কারণে যে, সমর্থন শব্দটি সম্পর্কে আমার ধারণা আমার পক্ষেই এসেছে এবং আমি লেখা লম্বা করার উপায় পেয়েছি।

আজেবাজে কথা বাদ দিয়ে এবার কাজের কথায় আসি। ‘সমর্থক’ শব্দটি এসেছে ‘সমর্থন’ থেকে। যে সমর্থন করে সেই সমর্থক। সমর্থন শব্দের অর্থ যেহেতু সহায়তা, অবলম্বন, ভারবহন, পক্ষাবলম্বন, ভরণপোষণ, পৃষ্ঠপোষণ, আনুকূল্য, আশ্রয়, ঠেস দেওয়া, সহ্য করা ইত্যাদি; সেহেতু সমর্থক সেই- যে সহায়তা করে, অবলম্বন হিসেবে কাজ করে, ফলাফলের ভারবহন করে, সবসময় পক্ষে থাকে, অনুকূলে অবস্থান করে, দুঃসময়ে আশ্রয় দেয়, সব সিচুয়েশন সহ্য করে এবং ঠেস দিয়ে ধরে রাখে- পড়তে দেয় না। এবার আপনারাই বলুন, বাংলাদেশ ম্যাচ হারার পর আমরা (আমাকেও সেই কাতারে রাখলাম, কারণ ক্রিকেট সম্পর্কে আমার খুব বেশি জ্ঞান নেই) যারা দলকে গালিগালাজ করি, তারা কি আদৌ সমর্থকের কাতারে পড়ি? আমরা তো ‘দুধের মাছি’। বড়োজোর নিজেদের লোভী দর্শক আখ্যা দিতে পারি।

ঘটনা এখানে শেষ হলেও কথা ছিল না।

তথাকথিত সমর্থকদের সবচেয়ে বড় অপরাধ গিরগিটির মতো রঙ পাল্টানো। সদ্য সমাপ্ত ত্রিদেশীয় সিরিজের শেষ ম্যাচের আগে আমি এমন অনেকগুলো ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখেছি, যেখানে লেখা- বাংলাদেশ ওসব আয়ারল্যান্ডের মতো দেশের সাথেই কেবল জিততে পারে, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশকে হারাতে হলে নিজের দেশে খেলতে হয়, বাংলাদেশের এখন ফর্ম নেই… এসব। বিশ্বাস করুন, এরকম স্ট্যাটাস দেওয়া লোকগুলো বাংলাদেশের মানুষ এবং তারাই, পরের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশ র‍্যাংকিংয়ের ছয় নম্বরে চলে আসার পর ‘সাবাস বাংলাদেশ’ বা এরকম কিছু লিখে স্ট্যাটাস দিয়েছে।

কথা হচ্ছে- বাংলাদেশের প্রশংসা করে, আবার সমালোচনায় ডুবিয়ে, এরপর আবার প্রশংসা করাটা কি জল ঘোলা করে খাওয়ার মতো হয়ে গেল না? তা, জল ঘোলা করে তো গাধা খায়।

প্লিজ, আমরা কেউ গাধা হবো না। ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমরা বাঘ, বাঘ হয়েই থাকবো। দলকে যদি সমর্থন দিতে না পারি, তাহলে নিজেকে সমর্থক মনে করবো না এবং ক্রিকেট দেখাটাই ছেড়ে দিবো। দুই সময়ে হাততালি দেওয়া যায়- যখন কেউ পড়ে যায় অথবা যখন উঠে দাঁড়ায়। আমাদের হাততালি যে দলের উঠে দাঁড়ানোর কারণে দেওয়া হচ্ছে, সেটি আমাদের প্রমাণ করতে হবে। বিশ্বের ১২৫টিরও বেশি দেশ ক্রিকেট খেলে। এতগুলো দেশের মধ্যে আমরা ৬ নম্বরে আছি। আমরা কেন গাধার মতো জলঘোলা করবো! ক্রিকেট দলের উন্নতি হচ্ছে, সমর্থকদের মানসিকতারও তো উন্নতি প্রয়োজন। দেশটাকে তো শুধু ক্রিকেটাররাই রিপ্রেজেন্ট করেন না। সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে আপনি-আমিও করি।

সামনে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। র‍্যাংকিংয়ের সাতে থেকে এই আসরে নাম লিখিয়েছিলাম আমরা। আসর শুরুর আগেই ছয়ে উন্নীত হয়েছি। স্বাভাবিকভাবেই দলের প্রতি প্রত্যাশা বেড়ে গেছে। চাপ বেড়ে গেলেই কিন্তু বেলুন ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই অনুরোধ- অধিক চাপে প্রত্যাশার বেলুন যেন ফেটে না যায়! হ্যাপি ক্রিকেটিং! 

  • সিয়াম চৌধুরী
নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
Tweet 20
fb-share-icon20

Related Articles

বৃহস্পতিবারই বোনাস পাচ্ছেন ক্রিকেটাররা

পজিশন পরিবর্তনে ইমরুলের হতাশা

মানসিক বিশ্রামে স্বস্তি খুঁজছেন সৌম্য

গাঙ্গুলি, আকরাম, মরগ্যানের কণ্ঠে বাংলাদেশের প্রশংসা

চোটের কারণে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি অনিশ্চিত স্টোকসের