দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে পুরো ক্রিকেটবিশ্বকে গর্জন শুনিয়েছে বাংলার তরণরা। আকবর আলীর নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের মানুষ পেয়েছে বিশ্বজয়ের আনন্দ। করোনাভাইরাসে ক্রিকেট থমকে যাওয়ার বছরটার বেশিরভাগ অংশ জুড়ে বিষাদ, সেখানে তৃপ্তি এনে দেয় বিশ্বকাপের স্বাদ।
বছরের শুরুতে বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তরা অপেক্ষায় ছিল বেশ কিছু সিরিজের। কিন্তু মহামারী করোনাভাইরাস সেই আশায় দিয়েছে গুঁড়েবালি।
আকবররা ওড়াল বিজয় নিশান
স্মৃতির পথ ধরে হেঁটে গেলে চোখে পর শুধুই মরু। সেই মরুর বুকে যেন এক পশলা বৃষ্টি হয়ে ধরা দেয় আকবর আলীদের কীর্তি। ২০২০ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের শিরোপা জয়ের ঘটনাই ছিল এ বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তদের জন্য সবচেয়ে বড় উপলক্ষ্য। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে দারুণ পারফর্ম করে ফাইনালে
ভারতের বিপক্ষে তিন উইকেটে রোমাঞ্চকর জয় পায় বাংলাদেশের যুবারা।

রাকিবুলের হ্যাটট্রিক, বোন হারানোর শোক চাপা দিয়ে আকবরের নেতৃত্ব, জয়ের শতক, তরুণ পেসার শরীফুল-সাকিবদের আগ্রাসন বা ফাইনালে ইনজুরি নিয়েই পারভেজ হোসেনের ইমনের ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়া- প্রত্যেকটি ঘটনাই গেয়েছে তরুণের জয়গান। ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে লাল-সবুজের বিজয় নিশান ওড়ায় তরুণেরা। বাংলাদেশের মানুষ প্রথমবারের মতো ক্রিকেটে কোনো বিশ্বকাপ জেতার স্বাদ পায়।
পাকিস্তানে বাংলাদেশ
২০০৯ সালে পাকিস্তানে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট দলের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর দীর্ঘদিন সেখানে বন্ধ ছিল ক্রিকেট। এরপর অনিরাপত্তার কারণে পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ক্রিকেট বন্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে শঙ্কা কমতে থাকে, ফিরে ক্রিকেট। বাংলাদেশ দল একযুগ পর ২০২০ সালে সফর করে পাকিস্তান।

সফরটি ছিল তিন ভাগে বিভক্ত। জানুয়ারীতে অনুষ্ঠিত হয় তিন টি-২০। সেখানে দুই ম্যাচে পরাজিত হয় বাংলাদেশ, একটি ম্যাচ ভেসে যায় বৃষ্টিতে। দুই ম্যাচের কোনোটিতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি সফরকারী বাংলাদেশ। ঐ সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের
ডট বল খেলা নিয়ে হয় বেশ সমালোচনা। প্রথম ম্যাচে ১২০ বলে ৪৫ বল ও দ্বিতীয় ম্যাচে ১২০ বলের মাঝে ৪৭ বল ডট খেলেছিল বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় ভাগে গিয়ে একটি টেস্ট ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। ঐ ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন নাসিম শাহ, বাংলাদেশ ম্যাচ হারে ইনিংস ব্যবধানে। পরের ভাগে একটি ওয়ানডে এবং একটি টেস্ট খেলার কথা থাকলেও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে তা বাতিল হয়।
নারী বিশ্বকাপে ব্যর্থতা
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অনুষ্ঠিত হয় নারী টি-২০ বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে ভারত, শ্রীলঙ্কা,
অস্ট্রেলিয়া ও
নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। চারটি ম্যাচেই পরাজিত হয় সালমা-জাহানারারা। মেলবোর্নে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের সুবর্ণ সুযোগ পেলেও ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণে জেতা হয়নি। নিউজিল্যান্ড নারী দলকে ৯১ রানে অলআউট করার পর বাংলাদেশ নারী দল অলআউট হয়ে যায় ৭৪ রান করে।
জিম্বাবুয়ের বাংলাদেশ সফর
জয়ের খরায় থাকা বাংলাদেশ তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নিজেদের খুঁজে পায়। সফরে বাংলাদেশের বিপক্ষে এক টেস্ট, তিন ওয়ানডে ও দুই টি-২০ খেলে জিম্বাবুয়ে।

টেস্টে দ্বিতীয়বারের মতো ইনিংস জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। কযারিয়ারের তৃতীয় ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকান
মুশফিকুর রহিম। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম শতক হাঁকান
মুমিনুল হক।
এরপর ওয়ানডেতেও ছিল রেকর্ডের বন্যা। ১১ বছর স্থায়ী ১৫৪ রানের নিজের রেকর্ডকে নিজেই ছাড়িয়ে যান
তামিম ইকবাল। সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচে সিলেটে ১৫৮ রানের ইনিংস খেলেন তামিম। পরের ম্যাচেই তামিমকে ছাড়িয়ে যান তারই ওপেনিং পার্টনার লিটন কুমার দাস। তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচে ১৭৬ রানের ইনিংস খেলে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংসের মালিক হন লিটন। ঐ সিরিজে তিন ম্যাচেই তিনশতাধিক রান করে বাংলাদেশ।
সিরিজের শেষ ম্যাচে অধিনায়ক হিসেবে পথচলার ইতি টানেন মাশরাফি বিন মুর্তাজা। ম্যাচশেষে টাইগারদের সকলে তার সম্মানে পরিধান করে এক বিশেষ জার্সি যেখানে লেখা থাকে 'থ্যাঙ্ক ইউ ক্যাপ্টেন'।
দুই ম্যাচের টি-২০ সিরিজেও জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। ওয়ানডে সিরিজের পর টি-২০ সিরিজেও সিরিজসেরা হন লিটন।
করোনার ধাক্কা
জিম্বাবুয়ে সিরিজের পর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। কিন্তু এক রুয়ান্ড ম্যাচ হওয়ার পর থেকেই করোনাভাইরাসের কারণে স্থগিত হয়ে যায় লিগ। করোনাভাইরাস এসে স্থবির করে দেয় পুরো জনজীবন, থমকে যায় ক্রীড়াঙ্গন। ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের ঘরবন্দী জীবনে বিনোদনের দারুণ উৎস হয়ে উঠে ফেইসবুকে তামিম ইকবালের লাইভ। মাশরাফির পর অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত হওয়া তামিমের লাইভে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের পাশাপাশি দেখা গিয়েছে ফাফ ডু প্লেসি, ওয়াসিম আকরা, বিরাট কোহলি, কেইন উলিয়ামসনদের।
করোনায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করতে ব্যাট নিলামে তুলেন
সাকিব আল হাসান। দীর্ঘদিন ব্যবহার করা ব্রেসলেট নিলামে তুলেন মাশরাফি বিন মুর্তাজা। ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যে ব্যাট দিয়ে মুশফিকুর রহিম ২০০ রানের ইনিংস খেলেন তাও নিলামে তুলেন। এরপর তাদের সাথে যোগ দিতে থাকেন
মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন,
তাসকিন আহমেদ, সৌম্য সরকাররা।
স্থগিত!
করোনাভাইসারের সংক্রমণ প্রতিরোধে বন্ধ হয়ে যায় সবকিছু। বাংলাদেশের একের পর এক সফর স্থগিত হতে থাকে। পাকিস্তানে একটি ওয়ানডে ও একটি টেস্ট,
আয়ারল্যান্ডে তিন ওয়ানডে ও চার টি-২০, ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই টেস্ট, শ্রীলঙ্কায় তিন টেস্ট, দেশে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্ট ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ওয়ানডে বাতিল হয়ে গিয়েছে। এছাড়া বাতিল হয়েছে এশিয়া কাপ ও টি-২০ বিশ্বকাপ। সব মিলিয়ে ক্রীড়াপ্রেমীরা দীর্ঘদিন কাটিয়েছে শূন্যতায়।
করোনাভাইরাসের বিরতির পর বাংলাদেশ এবং
আফগানিস্তান ছাড়া বাকি সব পূর্ণ সদস্যের দল ফিরেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। ২০২১ সালে
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বাংলাদেশ সফর দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরতে যাচ্ছে টাইগাররা।
অবশেষে ক্রিকেট ফিরল
ক্রিকেটারদের মাঠে ফেরাতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আয়োজন করে দুইটি টুর্নামেন্ট। প্রথমে অনুষ্ঠিত হয় তিন দলের ওয়ানডে টুর্নামেন্ট বিসিবি প্রেসিডেন্ট'স কাপ। এরপর বঙ্গবন্ধু টি-২০ কাপ। বিসিবি প্রেসিডেন্ট'স কাপে তিন দলের অধিনায়ক ছিলেন তামিম ইকবাল,
নাজমুল হোসেন শান্ত ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তাদের নামানুসারেই রাখা হয় দলগুলোর নাম। টুর্নামেন্টে শান্ত একাদশকে হারিয়ে শিরোপা জিতে মাহমুদউল্লাহ একাদশ।
বঙ্গবন্ধু টি-২০ কাপেও অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহই পান মুকুট। সাকিব-মাশরাফি-মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে গড়া দল জেমকন খুলনা ফাইনালে সৌম্য-লিটন-মিঠুনের গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামকে ৫ রানে হারিয়ে শিরোপা জিতেন মাহমুদউল্লাহ। টুর্নামেন্টে দারুণ পারফর্ম করে নজর কাড়েন শরীফুল, শামীম, পারভেজ, শান্ত, রাকিবুলের মতো তরুণরা।
সাকিবের প্রত্যবর্তন
বঙ্গবন্ধু টি-২০ কাপ দিয়ে ২০১৯ সালে পাওয়া নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে মাঠে ফিরেন সাকিব আল হাসান। যদিও ছন্দে ছিলেন না সাকিব। বঙ্গবন্ধু টি-২০ কাপে জেমকন খুলনার হয়ে ১২.২২ গড়ে মাত্র ১১০ রান করেন তিনি। বল হাতে শিকার করেন ছয় উইকেট।
টুর্নামেন্টের আগে সাকিব ছিলেন নতুন শিরোনাম। কলকাতায় কালীপূজো উদ্বোধন করতে গিয়েছেন- এমন খবর নিয়ে তৈরি হয় বেশ তর্ক-বিতর্ক। বেনাপোলে ভক্তের ফোন ভেঙে ফেলা, করোনার মাঝে জনসমাগমে উপস্থিত হওয়া নিয়েও উত্তপ্ত ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
দশকের সেরাদের মাঝে সাকিব
শুধু একটি বছরই নয়, একটি দশককেও বিদায় জানাতে যাচ্ছে সবাই। বিদায়ী দশকে কারা দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন তা নিয়ে চলছে আলাপ-আলোচনা। আইসিসির দশকসেরা ওয়ানডে দলে জায়গা করে নেন সাকিব আল হাসান। আইসিসির দশকসেরা একাদশে তিনিই একমাত্র বাংলাদেশের প্রতিনিধি।
মহামারীতে গ্রাস হওয়ে যাওয়া ২০২০ পার করে ২০২১ এ নতুন বাস্তবতাকে সঙ্গী করে পথচলা শুরু করার প্রত্যয় সকলের। নতুন বছরের প্রথম মাসে বাংলাদেশ সফর করতে আসছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। লাল-সবুজের জার্সিতে ক্রিকেটারদের ফের দেখা যাবে মাঠে। এশিয়া কাপ, টি-২০ বিশ্বকাপ ছাড়াও বেশ ব্যস্ত সূচি রয়েছে টাইরগারদের। বিষাদ আর শূন্যতার এ বছর ঢাকা পড়ুক ২০২১ সালের আনন্দ, সাফল্য আর পূর্ণতায়।
ল বাই বল লাইভ স্কোর পেতে আর নয় বিদেশি অ্যাপ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক খবর এবং বল বাই বল লাইভ স্কোর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে BDCricTime সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান ক্রিকেট অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।