*রবিউল ইসলাম
মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই ক্রিকেটের প্রেমে পড়েন ইকবাল হাসান ইমন। বল না পেলে মাটির দলাকেই বানিয়ে নিতেন ক্রিকেট বল। একটু বড় হয়ে মামার সঙ্গে নিয়মিত খেলতে যেতেন, যদিও বেশিরভাগ সময়েই থাকতে হতো দর্শক হয়ে। একদিন হঠাৎ খেলার সুযোগ মেলে, টেপ টেনিসে তার গতিময় বোলিং দেখে অবাক হন সবাই। হাসতে হাসতে কেউ একজন বলেছিল, ‘তুইতো ঢিল মারিস’—সেই কথাটাই জেদে পরিণত হয় ছোট্ট ইকবালের মনে। তখনই ঠিক করে ফেলেন, বড় হয়ে হবেন একজন পেসার। [গুগল নিউজে বিডিক্রিকটাইম ফলো করুন]
যুবা টাইগারদের পেস তারকা ইকবাল হোসেন ইমন। তবে স্বপ্নটা সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক চাপে বিদেশে পাঠানোর কথাও উঠেছিল। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। ধৈর্য, পরিশ্রম আর প্রতিভা মিলিয়ে ইকবাল পাড়ি দিয়েছেন প্রতিকূলতার পথ। গত যুব বিশ্বকাপেও দলের অংশ ছিলেন। গত দুই বছরে হয়েছেন আরও পরিণত। এখন অপেক্ষায় বিশ্বকাপ মাতানোর। বাংলাদেশ দলের পেস আক্রমণের অন্যতম ভরসা এখন তিনিই।
অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৫ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বিডিক্রিকটাইমে। আজ থাকছে পেসার ইকবাল হাসানের সাক্ষাৎকার।
প্রশ্ন: পরিবারের চাপে পড়ে আপনাকেতো বিদেশ চলে যেতে হচ্ছিল?
ইকবাল হাসান ইমন: অনূর্ধ্ব-১৬ দলে খেলার পর দুই বছর ক্রিকেটের বাইরে ছিলাম। টেপ টেনিস বলে খেললেও ক্রিকেট বল হাতে নেওয়ার সুযোগ পেতাম খুব কম। সেই সময় আমাকে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন আব্বা-আম্মা। তাদের যুক্তি ছিল– ‘যেহেতু ক্রিকেটে আশাব্যঞ্জক কিছু হচ্ছে না, তাই দেশে থেকে লাভ নেই। বিদেশে গিয়ে বরং সংসারের হাল ধরো।’
প্রশ্ন: পরিবারকে বোঝানো কতটা কঠিন ছিল?
ইকবাল: আম্মা-আব্বাকে বলেছিলাম– যেহেতু চার বছর কষ্ট করেছি, আরও দুই বছর কষ্ট করে দেখি। এরপরও কিছু না হলে তোমরা যা বলবা সেটাই হবে।’ আমার কথার ওপর আস্থা রেখেছেন আব্বা-আম্মা। পরিবার থেকে যতটা সমর্থন পাওয়া দরকার, পুরোটাই আমাকে দিয়েছেন তারা। এছাড়া আমার ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে বড় মামার ভূমিকা আছে। মৌলভীবাজারে তার বাসায় দুই বছর থেকে ক্রিকেট খেলেছি। মামা আমার খোঁজখবর রাখতেন সবসময়। তিনি এখন বিদেশে আছেন।
প্রশ্ন: টানা দুইটি যুব বিশ্বকাপে খেলার দ্বারপ্রান্তে আপনি, আপনার পরিবার এখন কী বলে?
ইকবাল: এখন আমি এমন একটা পর্যায়ে এসেছি, তাদের খুশি করতে পেরেছি। তারা এখন আমাকে অনেক বেশি সাপোর্ট দেয়। মানসিকভাবেও আমি অনেক ভালো আছি, পুরো ফোকাস ক্রিকেটেই দিতে পারছি।
প্রশ্ন: পেসার না হয়ে অন্য কিছুতো হতে পারতেন, পেস বোলিংকেই বেছে নেওয়ার কারণ কী?
ইকবাল: চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্রিকেট খেলা শুরু করি। গ্রামের বড় ভাইদের সঙ্গে খেলতাম। মামার সাথেও খেলতে যেতাম, মামার বন্ধুরা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করতো। তাদের সঙ্গে ক্রিকেট নিয়ে মজার একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হলে পেসার হয়ে উঠতাম না। আমি মামাকে দেখেই পেস বোলিং করা শিখেছি। আমার মামা মো: শাহ পারভেজ, উনি টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলতেন। তখন আমার বয়স ৯-১০ বছর হবে, ক্লাস ফাইভে পড়ি। যখন গ্রামে খেলতাম, বড় মামার বন্ধু এবং বড় ভাই যারা ছিলেন তারা বোলিং করতেন হাত ঘুরিয়ে আর আমি চাক মারতাম! একদিন ব্যাটিংয়ে থাকা মামার এক বন্ধু ঠাট্টা করে বলেন, ‘তুই তো বোলিং পারিস না, শুধু ঢিল মারিস।’ সেই ঠাট্টাই আমাকে পেসার বানিয়ে তুলেছে! সেদিন চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম পেসার হবো, গ্রামের সবাইকে পেস বোলার হয়ে দেখিয়ে দেবো।
প্রশ্ন: ক্রিকেটে ডুবে থাকার কারণে মা-বাবার বকা খেতে হতো না?
ইকবাল: আম্মা বেশি বকা দিতেন। মাঝে মধ্যে আমাকে খুঁজে না পেয়ে রেগে যেতেন তিনি। সন্ধ্যা গড়ানোর পরেও বাসায় ফিরতাম না। কখনও কখনও এশার আজান হয়ে যেত ফিরতে। আম্মা তখন অনেক বকাঝকা করতেন। তবে কয়েক বছর ধরে সেই পরিস্থিতি বদলেছে। এখন তারা আমাকে অনেক সাপোর্ট করেন। আম্মা-আব্বা সবসময় একটা কথাই বলেন– ‘তুই খেলতে থাক, তোর যা লাগে আমরা দেবো।’
প্রশ্ন: মৌলভীবাজার ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার ঘটনা কী ছিল?
ইমন: ছোটবেলা থেকে ক্রিকেটের প্রতি আমার দুর্নিবার আকর্ষণ। একদিন বড় মামার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ক্রিকেট খেললাম। মামা খেলা দেখে বলেন, ‘তুই তো ভালোই খেলিস।’ তার বন্ধুর বয়সভিত্তিক একটি ক্রিকেট একাডেমি ছিল। মামা আমাকে সেখানে ভর্তি করিয়ে দিতে আম্মাকে বললেন। খরচের কথা ভেবে আম্মা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজি করান মামা। এরপর মামার বাসায় থেকেই একাডেমির কোচ রাসেল আহমেদ স্যারের কাছে ক্রিকেট শেখা শুরু করি। তিনি মামার বন্ধু। মামা সবসময় বলতেন, ‘আমার বন্ধুর কাছে মনোযোগ দিয়ে ক্রিকেট শিখতে থাক, তুই বড় ক্রিকেটার হতে পারবি।’
প্রশ্ন:: প্রথমবার অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পেলেন কীভাবে?
ইমন: একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর একাডেমি লিগ খেলেছি। এরমধ্যে অনূর্ধ্ব-১৪ দলে ট্রায়াল দিয়ে টিকে যাই। যদিও অনূর্ধ্ব-১৬ মূল দলে সুযোগ পাইনি। এরপর দুই বছর কোনও ক্রিকেট খেলা হয়নি আমার। তখন মৌলভীবাজারে গোল্ডেন স্টার ক্লাবের হয়ে টেপ টেনিস খেলতাম। রাসেল স্যার আমাকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘যদি টপ লেভেলে যেতে চাও, তাহলে টেপ টেনিস বাদ দিতে হবে।’ তার পরামর্শে টেপ টেনিসে ক্রিকেট খেলা বাদ দেই। মাঝে যদিও ২০১৮-১৯ সালে স্কুল লিগে কাশীনাথ আলাউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে টেপ টেনিসে খেলেছি। পরে রাসেল স্যারের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনূর্ধ্ব-১৮ দলে সুযোগ পাই। প্রথম বছর স্ট্যান্ড-বাই থাকলেও অন্য এক পেসার অন্য দলে চলে যাওয়ায় সুযোগ হয় আমার। সেখানে দুই ম্যাচ খেলেই বিভাগীয় দলে সুযোগ পাই। এরপর ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে ভালো খেলে সুযোগ পাই অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলে।
প্রশ্ন: মাশরাফি আপনার প্রিয় ক্রিকেটার। কেন সে প্রিয় ক্রিকেটার?
ইকবাল: মাশরাফি ভাই দলের জন্য যা যা করেছে, সেটি আমার মনে হয় না কোন ক্রিকেটার করেছে। ওনার অধিনায়কত্ব, মাঠের বাইরে ওনার যে প্রভাব, ওনার মানসিকতা এইসব আমাকে মুগ্ধ করে।
বিশ্বকাপের মঞ্চ মাতাতে প্রস্তুত ইকবাল হোসেন ইমন। প্রশ্ন: এবার অভিজ্ঞ হয়ে খেলতে যাচ্ছেন, আপনার উপর নিশ্চয়ই অনেক বড় দায়িত্ব?
ইকবাল: আলটিমেটলি আপনি ম্যাচ খেলবেন, আপনার খেলা ততো উপরে উঠতে থাকবে। আমি একটা বিশ্বকাপ খেলেছি, ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছি। আমার কাছে মনে হয় আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে দেশকে কিছু দিতে পারলে, সেটি ব্যক্তিগত ভাবে আমার ক্যারিয়ারকেও আরেক ধাপে নিয়ে যাবে। আমি মনে করি বিশ্বকাপে ভালো করতে পারলে পরের লেভেলে যাওয়াটা আমার জন্য সহজ হবে।
প্রশ্ন: বয়স ভিত্তিক ক্রিকেটের একদম শেষ ধাপে আপনি। বিশ্বকাপে লক্ষ্যটা কী?
ইকবাল: বিশ্বকাপে আমার লক্ষ্য হলো দলের প্রয়োজন মেটানো। ব্যক্তিগত লক্ষ্য যদি বলেন, তাহলে আমি চাই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হতে।
প্রশ্ন: গত দুই বছর কিন্তু বড়দের সাথেও ক্রিকেট খেলেছেন, অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ইকবাল: বড়দের সাথে খেলতে গিয়ে একটা জিনিস শিখেছি, কখনোই হাল ছাড়া যাবে না। সুযোগ আসবেই, শুধু লেগে থাকতে হবে। আমি নিশ্চিত, বিশ্বকাপে এই জিনিসটা খুব কাজে দেবে।
প্রশ্ন: মাশরাফি আপনার অনুপ্রেরণার জায়গা, তবে শোয়েব আখতারকে আপনি ফলো করেন, ঠিক কী কারণে?
ইকবাল: শোয়েব আখতারকে আমি প্রথম দিকেই ফলো করতাম। ওনার যে গতি, যেরকম বোলিং করতো ওইগুলাকেই ফলো করতাম।
একনজরে
পুরো নাম: ইকবাল হাসান
ডাকনাম: ইমন
জন্ম: ৫ ডিসেম্বর, ২০০৬
জন্মস্থান: করিমপুর, সাধুহাটি, মৌলভীবাজার
বাবা: আবু বক্কর তালুকদার
মা: শাহনাজ বেগম
উচ্চতা: ৬ ফুট
পড়াশোনা: এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষ
প্রথম ক্লাব: মৌলভীবাজার ক্রিকেট অ্যাকাডেমি
বর্তমান ক্লাব: মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব
প্রথম কোচ: মোহাম্মদ রাসেল আহমেদ
বোলিং স্টাইল: ডানহাতি পেস
বোলিংয়ে শক্তির জায়গা: গুড লেন্থ
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি
যুব ওয়ানডেতে উইকেট: ৩৮ ম্যাচে ৬৫
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে উইকেট: ৯ ম্যাচে ৪
টি-টোয়েন্টি উইকেট: ৭ ম্যাচে ৭
প্রিয় মানুষ: বাবা ও মা