
প্রথমেই একটা বিষয় পরিষ্কার করে নেয়া যাক। সর্বত্র প্রচার করা হচ্ছে,
বাংলাদেশী নারী ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৬০০ করা হয়েছে। হ্যাঁ, এ তথ্য সত্য অবশ্যই, তবে কিছুটা ফাঁক আছে। ম্যাচপ্রতি ৬০০ টাকার যে হিসাব দেয়া হচ্ছে, সেটা জাতীয় ক্রিকেট লিগে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নয়। তাই ৬০০ টাকার আলাপ বাদ দিয়ে আসুন আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ে কথা বলি। তাতে সার্বিক চিত্রটা আরও পরিষ্কার হবে।
বাংলাদেশ জাতীয় ‘পুরুষ’ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচপ্রতি পান ২ লাখ করে। আর সেখানে নারী ক্রিকেটারদের প্রতিটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার বিনিময়ে দেয়া হয় ৮০০০ টাকা। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নারী ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি পুরুষ ক্রিকেটারদের ২৫ ভাগের ১ ভাগ।
শুধু এই হিসাব দিয়েও আসলে পুরো বিষয়টা বোঝানো যাচ্ছে না। পুরুষ ক্রিকেটাররা ধরা যাক বছরে ১৫টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন, সেখানে নারী ক্রিকেটাররা খেলেন বড়জোর পাঁচ-সাতটা। সেক্ষেত্রে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচে খেলে আয়ের অনুপাতটা নারী ও পুরুষ ভেদে দাঁড়াচ্ছে ৫৪:১।
এর বাইরেও পুরুষ ক্রিকেটাররা টি-টোয়েন্টি ও টেস্ট ম্যাচও খেলেন, সেগুলোর কথা না-ই বা ধরলাম। সেগুলো ধরলে হয়ত অনুপাতটা ১০০:১ হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ একশোজন নারী মিলে যত আয় করেন, একজন পুরুষ একাই সেই পরিমাণ অর্থ আয় করেন।
এ তো গেল ম্যাচ ফির কথা। এবার আসুন মাসিক বেতনের ব্যাপারে। জাতীয় দলের একজন পুরুষ ক্রিকেটারের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাসিক বেতন ৪ লাখ টাকা। আর একজন নারী ক্রিকেটারের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক্ষেত্রে একজন নারী ক্রিকেটারের মাসিক বেতন একজন পুরুষ ক্রিকেটারের বেতনের ১৩ ভাগের ১ ভাগ। যাক, অন্তত মাসিক বেতনের চিত্রটা কিছুটা হলেও ভালো।
এবার আমরা ফিরে আসি সেই জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচ ফির প্রসঙ্গে। একজন পুরুষ ক্রিকেটার জাতীয় লিগের প্রতি ম্যাচে খেলার বিনিময়ে পেয়ে থাকেন ৪০ হাজার টাকা। আর সেখানে এখন থেকে নারী ক্রিকেটাররা পাবেন ৬০০ টাকা করে। অর্থাৎ একজন নারী ক্রিকেটারের ম্যাচ ফি এক্ষেত্রে একজন পুরুষ ক্রিকেটারের ম্যাচ ফির ৬৬ ভাগের ১ ভাগ।
নারী আর পুরুষের মধ্যে যে কি বিশাল বৈষম্য, তা উপরের হিসাব থেকে বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে।
এবার আসুন বাস্তবতার নিরিখে এই বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করি। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল এখনো ওয়ানডে স্ট্যাটাস পায়নি। তাই আইসিসি থেকে বিসিবি নারী ক্রিকেট বাবদ কোন অর্থই পায় না। এবং নারী ক্রিকেটের জন্য আলাদা করে কোন স্পন্সরও নেই। সাধারণত পুরুষ দলের স্পন্সররাই নারী দল, অনূর্ধ্ব ১৯ দল ও ‘এ’ দলের স্পন্সরশিপের দায়িত্ব নিয়ে থাকে। কিন্তু এগুলো কখনোই তাদের কাছে গুরুত্ব পায় না। জাতীয় পুরুষ দল কেন্দ্রিক স্পন্সরশিপের চর্চাই চলে আসছে বিসিবিতে। এখন পর্যন্ত আলাদা করে নারী দলের জন্য কোন স্পন্সরের ব্যবস্থা করতে পারেনি তারা। আর সেজন্য, এই যে নারী ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি, মাসিক বেতন এগুলো সবই বিসিবি দিয়ে থাকে নিজস্ব কোষাগার থেকে।
কিন্তু এটা কখনোই নারী ক্রিকেটারদের বঞ্চিত করার পেছনে প্রযোজ্য যুক্তি হতে পারে না। ধরুন একটি পরিবারে পাঁচজন সদস্য। তার মধ্যে উপার্জন করছে তিনজন, আর নির্ভরশীল রয়েছে দুইজন। কিন্তু তাই বলে কি সব সুযোগ-সুবিধা ঐ উপার্জনক্ষম তিনজনই পেয়ে থাকে? নির্ভরশীল দুইজন কি কিছুই পায় না? হ্যাঁ, উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা হয়ত কিছুটা বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে, কিন্তু তাই বলে উপার্জনক্ষম ও নির্ভরশীলের মধ্যকার ফারাকটা কখনোই এত বেশি হয় না, যতটা আমরা বাংলাদেশ পুরুষ ও নারী ক্রিকেটারদের মধ্যে দেখছি।
আগামী আট বছরে আইসিসির কাছ থেকে ১০০০ কোটি টাকারও বেশি পাবে বিসিবি। স্পন্সরশিপ, বিপিএল, সরকারী অনুদান ইত্যাদি ধরে আরও ৬০০ কোটি টাকা জমা হবে তাদের কোষাগারে। এর সিংহভাগই যে জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের কল্যানেই আসবে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ১৬০০ কোটি বা তারও বেশি পরিমাণ অর্থ কিন্তু নেহাত কম নয়। এর সবই কি পুরুষ ক্রিকেটারদের পেছনে ঢালা হবে? নিশ্চয়ই না। তাই যদি হতো, তাহলে তো বাংলাদেশ ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি সবকিছুতেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসত, ওয়ানডে-টেস্ট-টি২০ তিন ফরম্যাটেই র্যাংকিংয়ে এক নম্বরে থাকত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিসিবিকে তো শুধু পুরুষ জাতীয় দল নিয়ে পড়ে থাকলেই হবে না। শুধু পুরুষ জাতীয় দলকে দুহাতে ভরিয়ে দিয়ে আর যাই হোক, প্রকৃত ক্রিকেট প্লেয়িং নেশন হওয়া সম্ভব না।
বিসিবিকে সব দিকেই নজর রাখতে হবে। তাদেরকে জেলাভিত্তিক, বিভাগভিত্তিক ক্রিকেটে উন্নতি ঘটাতে হবে, স্কুল ক্রিকেট বা বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে নজর দিতে হবে, বিসিএল-এনসিএল-বিপিএল-এনসিএলকে গুরুত্ব দিতে হবে, ‘এ’ দল ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে প্রাধান্য দিতে হবে, আবার নারী ক্রিকেটের প্রতিও দৃষ্টি দিতে হবে।
একটা কথা মনে রাখা দরকার, আজ হয়ত নারী ক্রিকেট থেকে বিসিবি কোন আর্থিক লাভের মুখ দেখছে না। কারণ নারী ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখনো খুব বেশি অগ্রসর হয়নি, ওয়ানডে স্ট্যাটাসও পায়নি। কিন্তু সেগুলো তো একসময় আমাদের পুরুষ জাতীয় দলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল। ধীরে ধীরে আমাদের পুরুষ জাতীয় দল বর্তমানে একটা ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে। কারণ তারা বরাবরই ভালো পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এসেছে।
নারী ক্রিকেটেও যদি সেরকম মানের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়, তাহলে নারীরাও নিশ্চয়ই একদিন ঠিকই ভালো করতে শুরু করবে। আর তখন নারী ক্রিকেটও বিসিবির জন্য আর্থিক লাভজনক হয়ে উঠবে। কিন্তু সেজন্য তো কিছুটা সময় দিতে হবে। আর যদি তা না করে নারী ক্রিকেটারদের প্রতি এরকম বৈষম্য, বঞ্চনা অব্যহত রাখা হয়, সেক্ষেত্রে নারী ক্রিকেটের সম্ভাবনাকে অংকুরেই বিনষ্ট করে ফেলা হবে।
আমাদের দেশে নারীদের ক্রিকেট খেলায় আসা এমনিতেই অনেক চ্যালেঞ্জিং। অনেক বাধা-বিপত্তি, সামাজিক সংস্কারকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ক্রিকেট খেলতে এসেছেন সালমা-শারমিন-রুমানারা। আজ যদি তাদের প্রতি এরকম অবিচার করা হয়, তাহলে সেটা ভবিষ্যতের নারী ক্রিকেটারদের নিশ্চয়ই ভালো কোন বার্তা দেবে না। তখন কি আদৌ আর কোন নারী ক্রিকেট খেলতে আসবে?
- জান্নাতুল নাঈম পিয়াল
**এটি সম্পূর্ণই লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত মতামত।