ফিফটিকে সেঞ্চুরি বানানোতে দারুণ দক্ষ নাজমুল হোসেন শান্ত। বাংলাদেশি ব্যাটারদের মধ্যে ফিফটিকে সেঞ্চুরি বানানোর প্রবণতা কিছুটা কমই, যা নিয়ে অনেক সমালোচনাও হয়েছে নানা সময়ে। এখানে বেশ ব্যতিক্রম শান্ত। নিজের ফিফটিকে সেঞ্চুরি বানানো প্রসঙ্গে শান্ত বলেছেন, ‘আমি কি আরেকটি প্রশ্ন করতে পারি? আমার কতগুলো সেঞ্চুরি আছে? মোট ১৪টি। এটা কি যথেষ্ট? সত্যি বলতে, আমি এভাবে ভাবতে পছন্দ করি না। যদি ১৪টির বদলে ৪০টি সেঞ্চুরি থাকত, তাহলে হয়তো বলতাম কিছু করেছি। তখন হয়তো কনভার্সন রেট নিয়ে কথা বলতাম। কিন্তু এখন আমি মনে করি এসব নিয়ে কথা বলার সময় আসেনি। অনেক ক্রিকেটারই ১৪টা সেঞ্চুরি করেছে। এটা খুব বড় কিছু না। আমি দলের জন্য আরও অনেক অনেক সেঞ্চুরি করতে চাই - যে সেঞ্চুরিগুলো দলকে ম্যাচ জেতাবে। সেটাই আমার লক্ষ্য। সত্যি বলতে, এখন পর্যন্ত সবকিছু ভালোই যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তুলনা করলে, ভালোই এগোচ্ছে। তবে সামনে আমাকে আরও ভালো করতে হবে।’
ফিফটির পর মাইন্ডসেটের বদল হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অধিনায়ক শান্ত বলেছেন, ‘আমি কখনও ব্যক্তিগত মাইলফলক নিয়ে ভাবি না। ব্যাটিংয়ে নামলে আমি ভাবি স্কোরবোর্ড কী চাইছে, দল কী চাইছে, কোনভাবে ব্যাট করা দরকার। আমার রান ৪০ না ৫০ - এসব নিয়ে ভাবি না। আমার বিশ্বাস, একজন ব্যাটার যখন ফিফটি করে, তখন তার দায়িত্ব দলকে আরও ভালো জায়গায় নেওয়া। তাই আমার ফিফটিগুলো যদি ১০০, ১২০, ১৩০ রান পর্যন্ত যায়, তাহলে দলও স্বাভাবিকভাবে ভালো জায়গায় যায়। সেটাই আমার লক্ষ্য।’
সিলেট টেস্টে ঐতিহাসিক জয়ের পর ফ্রেমবন্দী বাংলাদেশ দল। পাকিস্তানের সাথে দুই সিরিজে দুই দলই ছিল ভিন্ন ধাঁচের। তবে ২০২৪ সালের সিরিজ জয়ে চ্যালেঞ্জ ছিল অনেক বেশি। সেবার জয়ের প্রত্যাশাও সেভাবে করেননি কেউ। তবে হোম সিরিজে প্রত্যাশা ছিল। তার সাথে প্রাপ্তিটাও মিলেছে। দুই সিরিজের তুলনা করতে গিয়ে নাজমুল হোসেন শান্ত বলেছেন, ‘দুটো সিরিজই খুব কঠিন ছিল। বিদেশে সিরিজ জেতা এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। এই সিরিজে আমরা দুই টসই হেরেছি, ব্যাটারদের কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যাট করতে হয়েছে। তারপরও তারা ভালো ব্যাট করেছে, বোলাররা দুই ম্যাচেই ২০ উইকেট নিয়েছে। তাই আমি বলব, দুই টেস্টই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোনটা বেশি বিশেষ সেটা আলাদা করতে পারব না। অবশ্যই এই টেস্ট বিশেষ, কারণ প্রথমবার আমরা ঘরের মাঠে এভাবে জিতেছি। তবে চারটি টেস্টই আমার হৃদয়ের খুব কাছের।’
এবারের সিরিজ ভিন্ন ছিল বেশ কিছু কারণে। মাঠে শরীরী ভাষাতেও পাকিস্তানকে চাপে ফেলেছে বাংলাদেশ। চলেছে স্লেজিং। যা আগে বাংলাদেশের বিপক্ষে সবাই করত। এবার সেই পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে বাংলাদেশ।
স্লেজিং, শরীরী ভাষা প্রসঙ্গে শান্ত বলেছেন, ‘তাদেরও তো (আমাদের ভাষা) বুঝতে হবে, তাই না? (হাসি)। আমার মনে হয়, যখন মুশফিক ভাইয়ের মতো একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার যখন ড্রেসিংরুমে থাকেন, তখন মাঠে যে লড়াইগুলো আসে, সেই পরিস্থিতিগুলো কীভাবে সামলাতে হয়, চাপের মুহূর্তে কীভাবে শান্ত থাকতে হয় - এসব আমরা তাকে দেখে অনেক শিখেছি, এখনও শিখছি। আমাদের দলে এখন এমন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছে, যারা জানে এই ধরনের মুহূর্তগুলো কীভাবে সামলাতে হয়। এই মুহূর্তে সবচেয়ে ইতিবাচক ব্যাপার হলো, বিশেষ করে বোলিংয়ে আমাদের এমন রিসোর্স আছে, যেটা দিয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে, যেকোনো কন্ডিশনে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা যায়। তাই যখন আপনার এমন বোলিং আক্রমণ এবং মাঠে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আপনি প্রতিপক্ষকে টাফ টাইম দেবেন - সেটা স্লেজিং, বোলিং বা ব্যাটিং যেকোনো দিক থেকেই হোক।’
শান্ত আরও বলেছেন, ‘আমি বলব এই মানসিকতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এবং সেটাই হওয়া উচিত। দল জিততে থাকলে এই জিনিসগুলো আসবেই। খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগতভাবে ভালো করলে আত্মবিশ্বাসও আপনাআপনি চলে আসে। যেহেতু আমি ফলাফল নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করি না, খেলোয়াড়রাও জানে যে অধিনায়ক এসব নিয়ে অতিরিক্ত ভাবছে না। অধিনায়ক চায় তারা সাহস নিয়ে খেলুক, খোলা মনে পারফর্ম করুক। এই বার্তাটা সবার কাছেই পরিষ্কার।’
অধিনায়কের এমন বার্তার ফলেই বাড়তি স্বাধীনতা পাচ্ছেন ক্রিকেটাররা। যার ফলে ফলও আসছে ইতিবাচক। ক্রিকেটারদের এমন পারফরম্যান্সের সুবাদে দলও জিততে পারছে বেশি ম্যাচ। শান্ত বলেছেন, ‘তাই সবাই এখন স্বাধীনভাবে খেলতে পারছে। যখন কাউকে চাপে ফেলার সময় আসছে, তারা সেটা করছে। আবার যখন মনে হচ্ছে কঠিন মুহূর্তে দায়িত্ব নিতে হবে, তখন সেটাও নেওয়ার চেষ্টা করছে। এসব কারণেই দলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।’
আগামী জুলাইয়ে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে জিম্বাবুয়ে সফরে যাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সেখানেও আছে টেস্ট ম্যাচ। এরপরই অস্ট্রেলিয়া সফরে যাওয়ার কথা টাইগারদের। সেখানে আছে দুই টেস্টের সিরিজ। শান্ত বলেছেন, ‘দেশের হয়ে টেস্ট খেলা সবসময়ই গর্বের ব্যাপার। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর আমি জেতা-হারা নিয়ে একদম চিন্তা করি না। আমি ভাবি কীভাবে দল গড়ে তুলব, দল কীভাবে এগোবে, আমার সব ধরনের রিসোর্স আছে কি না। অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে নিজেদের প্রস্তুত করতে জিম্বাবুয়ে সিরিজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটাও নিজে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ - বিশেষ করে যারা নিয়মিত সুযোগ পায় না, তারা হয়তো সুযোগ পাবে সেখানে। জয়-পরাজয় খেলার অংশ। এমনকি আমরা যদি হারিও, তবুও আমার সমস্যা নেই - যতক্ষণ খেলোয়াড়রা শতভাগ চেষ্টা করে, শতভাগ প্রস্তুতি নিয়ে খেলে।’
সামনে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ আছে বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়া সফর বাংলাদেশের এখনকার দলের অনেক ক্রিকেটারের জন্যই হবে নতুন অভিজ্ঞতা। আগে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলা হয়েছে বাংলাদেশের। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপেও সেখানে খেলেছে টাইগাররা। তবে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে এখনের দলের প্রায় কেউই খেলেননি অজিদের মাটিতে। শান্ত নিজেও নতুন অভিজ্ঞতার জন্য অপেক্ষায় আছেন।
অধিনায়ক নাজমুল শান্ত বলেছেন, ‘আমি আগে সেখানে কখনও খেলিনি, তাই এটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে। তাদের বোলিং আক্রমণ ভালো। আমাদের ব্যাটাররা যদি ভালো ক্রিকেট খেলতে পারে, তাহলে আমরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারব। বাস্তবভাবে চিন্তা করলে, আমার প্রথম লক্ষ্য হবে পাঁচ দিন ধরে কীভাবে তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যায়। যদি আমরা সেটা করতে পারি, তাহলে দল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস পাবে। আমি কখনও বলব না যে শুধু জিততেই যাচ্ছি। অবশ্যই সবাই জেতার জন্যই খেলে। সেটাই লক্ষ্য থাকবে। তবে পাঁচ দিন ধরে কতটা ভালোভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছি, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
আগামী জুনে অবশ্য এর আগেই বাংলাদেশ সফরে আসছে অস্ট্রেলিয়ার সাদা বলের দল। বাংলাদেশ সফরে ৩ ওয়ানডে, ৩ টি-টোয়েন্টির সিরিজ খেলবে অজিরা।